বাংলার জমিদারদের কথা বললেই মনে আসে অনেকগুলি নাম । যাঁদের মধ্যে কলকাতার বাঙালি জমিদারের নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকলেও তাঁরা লোকমুখে অনেক বেশি পরিচিত। আর বংশপরম্পরায় তাঁদের কথা আমাদের বাবা-ঠাকুরদার মুখ থেকেই আমাদের কাছে অনেক বেশি কাছের হয়ে রয়েছে । তাঁদের মধ্যেই প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাধাকান্ত দেব, যদুনাথ সরকার, রাণি রাসমণি দাসী, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । তাঁদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বেশকিছু স্থান বিশেষত হালিশহর, বড়িশা, উত্তরপাড়া, নিমতা-বিরাটি-সহ বাংলাদেশের কিছু অংশ যাঁর দখলে ছিলেন তিনি হলেন সাবর্ণ রায়চৌধুরী । ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের আসার পূর্বে কলকাতায় একচ্ছত্র জমিদারি সামলেছে এই পরিবার । সাবর্ণ রায়চৌধুরীর কথা জানতে হলে আমাদের আর একটু পিছিয়ে যেতে হবে।

ওই পরিবারের পঞ্চানন গঙ্গোপাধ্যায় নামে এক জনৈক ব্যক্তি ষোলোর শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষ থেকে ‘খান উপাধি লাভ করেছিলেন । পাঠান সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দক্ষতা ও বীরত্বের জন্য তাঁকে এই উপাধিতে ভূষিত করা হয় । তখন দিল্লির মসনদে ছিলেন হুমায়ুন । ষোলো শতকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি একটি প্রাসাদ তৈরি করেন যাঁর নাম দেন ‘হাভেলি শহর’, যা পরবর্তীকালে হালিশহর নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। বেশ কয়েকটি হিন্দু মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন । পরবর্তীকালে ওই বংশের লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়কে একটা বিরাট অংশ জায়গীর দেওয়া হয় রাজা মান সিংহের পক্ষ থেকে।

Banglalive

সেইসময়ে বড়িশা ছিল একটি উন্নত জনপদ তাই তাঁদের পরিবারের দুর্গাপুজোও বড়িশার আটচালাতেই প্রথম শুরু হয় । ১৬১০ সালে তিনিই তাঁর পরিবারে প্রথম দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন । এই দাবি মানলে এটাই পশ্চিমসবঙ্গের আদি দুর্গাপুজো ।

Banglalive

Banglalive

বড়িশায় তাঁদের নাটমন্দিরের থামগুলি যে কতকালের পুরনো স্মৃতি বহন করে নিয়ে চলছে তার কোনও হদিশ নেই । আজও পুজোর সময়ে গমগম করে আটচালা । বহু ইতিহাস ও কালের স্মৃতিজড়িত । রায়চৌধুরী পরিবারের পাশাপাশি ওই তাঁদের মূল এবং আদি ঘাঁটি বড়িশাও অনেক পুরোনো ইতিহাসের সাক্ষী । এছাড়াও শিক্ষা ও ধর্মীয় সংস্কৃতির দিক থেকে এই স্থান ভীষণই ঐতিহ্যপূর্ণ। মনে করা হয় এটি কলকাতার অন্যতম বড় পরিবার প্রাচীনকালে যাঁর সদস্যসংখ্যা ছিল ৫০০০। বর্তমানে বড়িশা অঞ্চলে এখন তাঁদের প্রায় ২৫০০ সদস্য বসবাস করেন।

Banglalive

দুর্গাপুজোর পাশাপাশি রায়চৌধুরী পরিবারের চণ্ডীপুজো প্রায় দু’শতকেরও বেশি পুরনো। আজ যদিও পুজোটি বারোয়ারি । কিন্তু এই পুজো নিয়েও কিন্তু রহস্য কম নয় । জমিদার মহেশচন্দ্র রায়চৌধুরীর আমলে এই পুজো প্রথম শুরু হয়, ১৭৯২ সালে । আর প্রায় দু’শো বছর পরেও পুজোর জৌলুস ও চাকচিক্য একটুও হারায়নি, বরং দিন দিন যেন আরও বেশি প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে দেবীর মূর্তিতে ।

আরও পড়ুন:  ১৩ বছর বয়সেই ব্যাঙ্কের কর্ণধার এই বিস্ময় বালক, গল্প নয় সত্যি!

দেবী চণ্ডীর রং রক্তবর্ণ, দেবীর মূর্তি একাধারে যেমন শান্ত তেমনই জ্যোতির্ময়ী । অন্যদিকে আটচালার মা দুর্গামুর্তিতে একটা মাতৃসুলভ আবেদন রয়েছে । রায়চৌধুরী পরিবারে চণ্ডীদেবীর যে নিত্যপুজো হয়, তা কিন্তু কোনও মূর্তি না। মহেশচন্দ্র চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত অষ্টধাতুর ঘটই তাঁদের কুলদেবী। মনে করা হয় যে পঞ্চমী তিথি হল মায়ের জন্মতিথি। প্রতি বছর পঞ্চমী তিথিতে বদলানো হয় ওই ঘটের জল। হোমযজ্ঞ করে রীতিমতো তন্ত্রমতে পুজো করা হয় দেবী চণ্ডীকে। মায়ের মুখ হল ঘটের উপর রাখা ডাব। ডাবের শিষ হল মায়ের নথ। প্রতি বছর পঞ্চমীর দিন ওই ডাবটি আবার নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তারপরে সারা বছর ধরে ওই ডাবটিকেই দেবী চণ্ডীরূপে পুজো করা হয়। বিস্ময়ের কথা এই যে, এই গোটা একটা বছর ওই ডাবের শিষ এবং ঘটের জলে কোনওরকম পরিবর্তন আসে না। আবার পরের বছর যখন নতুন ভাবে মায়ের প্রতিষ্ঠা হয়, তখন ওই জল বদলে ফেলা হয় মাত্র। এছাড়া আর কোনওরকম পরিবর্তন আসে না।  বড়িশা এলাকায় বসবাসকারী সকল মানুষের মধ্যে দুর্গাপুজোর থেকেও চণ্ডীপুজো এবং তার সংলগ্ন মেলা নিয়ে উন্মাদনা কিছু কম নয় । তার অন্যতম কারণ অবশ্যই এই পুজোর আভিজাত্য ।

রায়চৌধুরী পরিবারের চণ্ডীপুজোর ইতিহাস এতটাই রোমহর্ষক যা শুনলে রীতিমতো অবাক হতে হয় । এবছর ২২৬তম বর্ষ । রায়চৌধুরী পরিবারের ৩৬তম পুরুষ শুভদীপ রায়চৌধুরীর কথায় মহেশচন্দ্র রায়চৌধুরী ১৭৯২ সালে মা চণ্ডীর ঘট ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। অনেকেই হয়তো জানেন না ‘সাবর্ণ’ তাঁদের গোত্র এবং ‘রায়’ ও ‘চৌধুরী’ তাঁদের উপাধি, পদবি গঙ্গোপাধ্যায় । পরবর্তীকালে তাঁদের বংশধররা অবশ্য ‘রায়চৌধুরী’কেই পদবি হিসেবেই ব্যবহার করেন । এবং লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরীর হাত ধরেই শুরু ।

চণ্ডীপুজোর ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শুভদীপ রায়চৌধুরী বলেন মহেশচন্দ্র রায়চৌধুরী একদিন স্নান করতে গিয়ে তাঁর পায়ে কিছু একটা বাধা অনুভব করেন । তারপর পুকুরের ডুব দিয়ে তিনি উদ্ধার করেন অষ্টধাতুর একটি কলস । প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে না পেরে তিনি কলসটি তাঁদের দালানে গিয়ে রাখেন । দিন-তিনেক পর তিনি ‘মা’-এর স্বপ্নাদেশ পান । ‘মা’ তাঁকে বলেন তাঁর পুজো করতে ।

আরও পড়ুন:  পরীক্ষার নামে হলেও আসল উদ্দেশ্য ভক্ষণ ? ফের বাণিজ্যিক তিমি-নিধন হবে জাপানে

পরপর তিনদিন এই একই স্বপ্ন পাওয়ার পরে মহেশচন্দ্র রায়চৌধুরী ভাটপাড়ার পণ্ডিতদের কাছে যান এবং জানতে চান কে তাঁকে এমন স্বপ্ন দিচ্ছেন, এর পিছনে কোন হেঁয়ালি রয়েছে । ভাটপাড়ার পণ্ডিতরা পুঁথি পড়ে বিচার করে বলেন ইনি ‘মা চণ্ডী’। বড়িশা সখেরবাজারে বর্তমান যে চণ্ডীমন্দির রয়েছে তা প্রতিষ্ঠা করেন এরপর মহেশচন্দ্র রায়চৌধুরীর পুত্র হরিশচন্দ্র রায়চৌধুরী । তার পর থেকে প্রতি বছর অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে মায়ের রূপ দান করা হয় এবং তাকে উপলক্ষ করে চলে বিশাল মেলা । সেই ১৭৯২ সাল থেকে আজ ২০১৮ সালে এসেও রায়চৌধুরী পরিবারের বংশধররা করে আসছেন মা চণ্ডীর আরাধনা ।

পরিবারের বাকি সদস্যদের কথায় বছরে এই একবার মেলা হলেও তাঁদের প্রস্তুতি কিন্তু শুরু হয়ে যায় এক বছর আগে থেকেই। এছাড়াও সারাবছর ধরে চলে নিত্যপুজো। তাঁদের ভোগের বিষয়টিও বেশ অনন্য। অষ্টমীর দিন মা’কে নিবেদন করা হয় খিচুড়ি, পাশাপাশি অন্নভোগ সাদা ভাত, বিভিন্ন রকমের ভাজা, তরকারি, মাছ, চাটনি, পায়েস, সন্দেশ । এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল মাছ, মাছ ছাড়া মা চন্ডীর পুজো সম্পন্ন হয় না। আরও বিস্ময়কর বিষয় হল, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্গাষষ্ঠী বা দুর্গাষ্টমীতে নিরামিষ খাওয়ার একটা রেওয়াজ থাকেন। অনেকে আবার ওইদিন অন্নও খান না। কিন্তু রায়চৌধুরী পরিবারের রীতি অনুসারে ‘মা চণ্ডী’কে অষ্টমীর দিনই ভোগে মাছ নিবেদন করা হয়। এবং পুজো শেষে পরিবারের সকলেই মাছ এবং অন্নই প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করেন তাঁরা।

রায়চৌধুরী পরিবারের বউরা মেনে চলেন এক অদ্ভুত নিয়ম। এই পরিবারের বউরা কখনওই সোনা দিয়ে বাঁধানো লোহা পরেন না । তাঁরা শুধু লোহা পড়েন । জানা গেল, মা চণ্ডীকে সোনা-বাঁধানো লোহা পড়ানো হয় । মায়ের সন্তান হয়ে তাঁরা কখনওই মায়ের মতো করে গয়না পরতে চান না।

ইত্যাদি নানা গল্পগাথায় মুখর হয়ে রয়েছে প্রায় দুশো বছরের পুরোনো এই পুজো । রাত-দিন ভক্তদের ঢল লেগেই থাকে। ভোর রাত থেকে বা কখনও কখনও আগের দিন রাত থেকে পড়ে মায়ের পুজো দেওয়ার লাইন।

আরও পড়ুন:  মুখোমুখি সংঘর্ষে কুপোকাত গাড়ি‚ অক্ষত সাইকেল !

নানান ইতিহাসকে সঙ্গী করে, বর্তমানের হাত ধরে ভবিষ্যতের পথে পা বাড়াচ্ছে রায়চৌধুরী পরিবারের চণ্ডীপুজো ও তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই সুবিশাল মেলা, যা ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে নিয়ে আসছে মিলনের বার্তা ।

NO COMMENTS