কল্লোলিনীর এই রাজপথের নাম ফ্রি স্কুল স্ট্রিট হল কেন ?

‘…সদর স্ট্রিটের রাস্তাটা যেখানে গিয়া শেষ হইয়াছে সেইখানে বোধ করি ফ্রী-ইস্কুলের বাগানের গাছ দেখা যায়। একদিন সকালে বারান্দায় দাঁড়াইয়া আমি সেই দিকে চাহিলাম। তখন সেই গাছগুলির পল্লবান্তরাল হইতে সূর্যোদয় হইতেছিল। চাহিয়া থাকিতে থাকিতে হঠাৎ এক মুহূর্তের মধ্যে আমার চোখের উপর হইতে যেন একটা পর্দা সরিয়া
গেল। দেখিলাম একট অপরূপ মহিমায় বিশ্ব সংসার সমাচ্ছন্ন, আনন্দে এবং সৌন্দর্যে সর্বত্রই তরঙ্গিত। আমার হৃদয়ে স্তরে স্তরে যে একটা বিষাদের আচ্ছাদন ছিল তাহা এক নিমিষেই ভেদ করিয়া আমার সমস্ত ভিতরটাকে বিশ্বের আলোক একেবারে বিচ্ছুরিত হইয়া পড়িল। সেইদিনই ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি নির্ঝরের মতোই যেন
উৎসারিত হইয়া বহিয়া চলিল…’ লিখছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই কথাগুলি তাঁর সদর স্ট্রিটের স্মৃতি। কিন্তু
এই কথাগুলির মধ্যে জড়িয়ে রয়েছে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ছবিটাও ।

আজকের ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে একটি সুন্দর বাগান ছিল । বাগান বললে কম বলা হবে, একটা সুন্দর বাগানবাড়ি। এই বাড়িটিতেই গড়ে উঠেছিল বিদেশি ছেলেমেয়েদের জন্য বৈতনিক শিক্ষাকেন্দ্র। তবে কবে থেকে তা চালু হয়েছিল, তার তারিখ নিয়ে কিন্তু একটা ধন্দ আজও রয়ে গিয়েছে। তবে অনেকেরই মতে এই স্কুল চালু হয়েছিল ১৭৮৯ সালে। প্রাণকৃষ্ণ দত্ত লিখছেন—‘কেউ কেউ বলেন ওল্ট ক্যালকাটা চ্যারিটির প্রদত্ত অর্থে এই অবৈতনিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ইং ১৭৮৯ অব্দে; সহযোগিতা করে ফ্রি স্কুল সোসাইটি। প্রতিষ্ঠার সময় তখনই নাকি অর্থ ব্যয় হয় আনুমানিক তিন লক্ষ টাকা। জানবাজারের এই বাবদে একটি বাগান-বাড়ী ক্রয় করা হয় আটাশ হাজার টাকা।তখন তৎকালীন সরকার প্রচুর অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। বহু নামজানা খ্রীষ্ট-ভক্ত অর্থ দান করেন। প্রথমে ছাত্র-বিদ্যালয় হিসাবে প্রচলিত হলেও এই সময় থেকে ছাত্রীদেরও পাঠার জন্য ভর্তি করা হয় এবং এই কারণে এই স্থানেই পৃথক একটি গৃহ নির্ম্মিত হয়। ধর্ম্মযাজক বিশপ টার্নার বিদ্যালয়টিকে খ্রীষ্টিয় ধর্ম্মযাজকদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত করতে উদ্যোগী হন। তাঁরই চেষ্টায় বিদ্যালয়ের লাগোয়া ফ্রি স্কুল চার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশপ উইলশন গির্জ্জাটিতে ধর্ম্মকার্য্য আরম্ভ করেন।’

এবার বোঝা যাচ্ছে ফ্রি স্কুলের নামেই কালক্রমে এই রাস্তা হয়ে যায় ফ্রি স্কুল স্ট্রিট। এখন অবশ্য নাম পরিবর্তন করে এ রাস্তা মির্জা গালিব স্ট্রিট। মাদার টেরেসা সরণি (পার্ক স্ট্রিট) এবং লেনিন সরণিকে (ধর্মতলা স্ট্রিট) যুক্ত করে। তবে আগে কিন্তু দুই রাস্তার যোগাযোগ হতো না ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মাধ্যমে। অনেক পরে ১৮৬৬ থেকে ১৮৭৬ সালের মাধ্যে এই রাস্তা দুই রাজপথকে জুড়ে দেয়।

যাইহোক, আবার আসা যাক ফ্রি স্কুলের কথায়। অনেকেরই ধারণা এই ফ্রি স্কুলই হল কলকাতার প্রথম ফ্রি স্কুল বা অবৈতনিক বিদ্যালয়। একদমই তা নয়। নথি বলছে—‘a charity school for Eurasian boys (the Free School) was first set up about 1727 by Mr. Bourchier, a merchant, who was afterwards appointed Governor of Bombay.’ (Census of India 1901)। অর্থাৎ ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ফ্রি স্কুল অনেক পরেই শুরু হয়েছিল, তা ধারণা করে নেওয়া যায়। আর ফ্রি স্কুল যেখানে গড়ে উঠেছিল সেখানে ছিল একটি জঙ্গল। বাঁশের জঙ্গল। নথি সে কথা বলছে। হেনরি কটন তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছেন—‘Free School Street was a bamboo jungle in 1780, which people were afraid to pass at night.’

তবে স্কুল গড়ে ওঠার অনেক আগে থেকেই সেজে উঠছিল ফ্রি স্কুল স্ট্রিট। যে বাগান বাড়ি কিনে স্কুল বিল্ডিং গড়ে তোলা হয়েছিল, সেই বাগান বাড়িটি আসলে ছিল তৎকালীন সুপ্রিম কোর্টের জাস্টিস লিমেস্টারের। প্রাণকৃষ্ণ দত্ত লিখছেন, আসলে লিমেস্টারের বাড়িটি ছিল ফ্রি স্কুলের পূব দিকে। এই লিমেস্টারই মহারাজা নন্দকুমারকে জেলে পাঠিয়েছিলেন। লিমেস্টারের বাড়ি যেখানে, সেখানে যে অন্যান্য অনেক বাড়ি থাকবে, এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ফ্রি স্কুল তৈরির পর এই রাস্তায় আরও যেন জমজমাট হয়ে উঠল। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এর মধ্যে অন্যতম ‘দি পেরেন্টাল অ্যাকাডেমি ইনস্টিটিউশন’। বহু পরিবার এসে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের বাসিন্দা হলেন। এই ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ৩৭ নম্বর বাড়িতে জন্ম নেন বিখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক উইলিয়াম মেকপিস থ্যাকারে। সালটা
১৮১১।

প্রাণকৃষ্ণ দত্ত একটি ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন এই ফ্রি স্কুল স্ট্রিটকে কেন্দ্র করে—“..প্রফুল্ল চাকীর ফাঁসী হওয়ায় কর্ত্তিত মুণ্ড তদানীন্তন সরকার বিচারালয়ে হাজির করেছিলেন—যেজন্য ব্রহ্মবান্ধব ‘সন্ধ্যা’য় সম্পাদকীয় লিখেছিলেন ‘কাটামুণ্ডু কথা কয়’ এই শিরোনামায়। প্রফুল্ল চাকীর ফাঁসীতে দেশে বিক্ষোভ দেখা দেওয়ায় তৎকালীন সরকার এই ফ্রি স্কুল স্ট্রীটের পথি-পার্শ্বস্থ কোন এক বৃক্ষের তলদেশে ছিন্নমুণ্ড প্রোথিত করেন…”

হাজার ইতিহাস এই পথকে ঘিরে। স্কুল, জন্ম, মৃত্যু—সব একাকার হয়ে গিয়েছে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে। তবে ফ্রি স্কুলের বাড়িটি বেশিদিন থাকেনি। ভেঙে পড়ে। ১৮৫০-এর দশকে। তার পাশে গড়ে তোলা হয় একটি বাড়ি। সেখানে চলতে থাকে মেয়েদের স্কুল। সে স্কুলটিও অনেক দিন চলেছিল। স্কুল এখন আর নেই। কলকাতা তো বটেই, রাজ্যে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা এখন পুরোটিই প্রায় অবৈতনিক। তবু ফ্রি স্কুল বেঁচে আছে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটেই।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here