১৫য় বিয়ে, ১৮তে বিধবা, একাকী মায়ের জীবন সংগ্রামই তৈরি করল ভারতের প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার

998
India's 1st Woman Engineer

১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয়, ১৮ তেই স্বামী হারান এ ললিথা। ১৯৩৭ সাল। কন্যার বয়স তখন মাত্র চার মাস। এরপর এই একাকী মায়ের লড়াই ইতিহাস গড়েছিল। ‘দেড়শ’ বছর আগে ভারতবর্ষের মত দেশে আমাকে স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যেতে হতে পারত। হতেই পারত এমন, স্বামীর চিতার সঙ্গেই এই জীবন শেষ হত’। কিন্তু তার বদলে ইতিহাস তৈরি হল। এ. ললিথা হলেন ভারতের প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার।

একলা মায়ের দায়িত্বই তাকে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তখনকার দিনের হিন্দু বিধবাদের অবস্থা তো আমাদের জানা। মাথা ন্যাড়া করে, সাদা থান পরিয়ে, সংযমের এক কঠিন জীবনে তাদের জোর করে ঠেলে পাঠানো হত অথবা স্বামীর সঙ্গে যেতে হত সহমরণে। ইচ্ছে না থাকলেও শত কষ্ট হলেও এরকম জীবন থেকে তাদের নিষ্কৃতি ছিল না। কিন্তু মাদ্রাসে (বর্তমানে চেন্নাই) সেই সময়ে ‘সতী’ প্রথাটির প্রচলন খুব একটা ছিল না। তাই হয়ত বেঁচে গেছিলেন ললিথা। আধুনিক মনস্ক ছিলেন তিনি। হিন্দু সমাজের প্রচলিত, পুরনো খারাপ সংস্কারগুলোকে কখনো জীবনে স্থান দেননি। পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তাই। প্রচণ্ড পুরুষতান্ত্রিক এক সমাজে ললিথা সংকল্প করলেন তিনিই হবেন ভারতের প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার।

এ. ললিথার জন্ম ১৯১৯ সালের ২৭ অগস্ট। সাধারণ মধ্যবিত্ত তেলেগু পরিবারে মানুষ হয়েছেন তিনি। ভাইরা অনেক দূর অবধি লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছেন আর প্রাথমিক স্তর পেরলেই বোনদের পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তারপর বিয়ে দিয়ে দেওয়া হত। বিবাহই ছিল মেয়েদের একমাত্র নিয়তি। এই রেওয়াজের অন্যথা হয়নি ললিথার ক্ষেত্রেও। ১৫ বছর বয়স হতে না হতেই তাঁকেও বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দশম শ্রেণী অবধি পড়তে পেরেছিলেন ললিথা। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর মেয়েকে মানুষ করবেন বলে আবার পড়াশোনা শুরু করে প্রতিষ্ঠিত হতে চাইলেন ললিথা। কিন্তু সেই লড়াই তো সহজ ছিল না মোটেই।

ললিথা-কন্যা শ্যামলা চেনুলু শুনিয়েছেন মায়ের সেই যুদ্ধের কাহিনী। ‘যখন বাবা মারা গেলেন, মাকে অপরিসীম লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয়েছিল। তাঁর শাশুড়িও চরম গঞ্জনা দিতেন মাকে। নিজের ছেলেকে হারানোর শোক, হতাশা সব গিয়ে আছড়ে পড়ত পুত্রবধূর ওপর। কিন্তু এসবের মধ্যেও ললিথা পড়াশোনা চালিয়ে নিয়ে গেছিলেন। সমাজের রক্তচক্ষুর কাছে হার মানেনি তাঁর নিজস্ব আত্মবিশ্বাস আর জেদ। তিনি তাঁর স্থির সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। লেখাপড়া করে একটি সম্মানজনক পেশা বেছে নিতেই হবে তাঁকে, শত বাধাতেও এই দৃঢ় সংকল্প থেকে কখনো নড়েননি তিনি। সে ইসময় অনেক মহিলাই ডাক্তারি পড়তে যেতেন। কিন্তু ডাক্তারিতে সময়ের কোনও ঠিকঠিকানা থাকে না। পড়াশোনার পাশাপাশি মেয়েকেও তো সময় দিতে হবে। যখন তখন রাত বিরেতে মেয়েকে ফেলে বেরতেও পারবেন না। দশটা পাঁচটার চাকরি হলেই ভালো হয় তাঁর। তাই ডাক্তারি নয়, বাবা দাদাদের মত ইঞ্জিনিয়ার হবেন বলেই স্থির করলেন ললিথা। ললিথার পিতা পাপ্পু সুব্বা রাও ছিলেন মাদ্রাজের একটি বিখ্যাত ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যাপক। তিনি তাঁরই কলেজের অধ্যক্ষ কে সি চাকো এবং ডিরেক্টর অব পাব্লিক ইন্সট্রাকশন আর এম স্টাথাম মহোদয়ের সঙ্গে মেয়ের কলেজে ভর্তির ব্যাপারে কথা বললেন।

দু’জনেই অত্যন্ত সহযোগিতা করেন ললিথার ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে। ইতিহাস রচিত হয় মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গিনডি ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। কলেজের অন্যান্য সহপাঠীরা বড়ই সহযোগী ছিলেন। কলেজের একমাত্র ছাত্রী সে, কখনো বুঝতে দেয় নি ছাত্ররা। বন্ধুর মতই সহজে গ্রহণ করেছিলেন ললিথাকে। কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁর জন্য আলাদা হোস্টেলের ব্যবস্থা অবধি করেছিলন। ‘আমি মামাদের সঙ্গে থাকতাম আর মা কলেজে পড়ার সময়ে হোস্টেলে থাকতেন। সপ্তাহে একদিন করে দেখতে আসতেন’ জানানা ললিথাতনয়া। অসীম ধৈর্য আর অধ্যবসায় তাঁকে তাঁর স্বপ্নকে সত্যি করতে সাহায্য করেছিল। জীবনে আর বিয়ে করেননি। প্রাণ ঢেলে কন্যাকে মানুষ করেছেন আর লক্ষ লক্ষ ভারতীয় মেয়েদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়েছেন এ. ললিথা।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.