প্রিয় প্রিয়, বিদায়

(পুরোটাই ব্যক্তিগত। না আছে রাজনীতি, না সাংবাদিকতা। এক কলম-প্রয়াসীর স্মৃতি মাত্র।)

 

দাশমুন্সি! এ আবার কেমন পদবি?

দাশ-টা পদবি। মুন্সি উপাধি। দুটো মিলেমিশে এখন পদবি হয়ে গেছে।

শুনিনি কোনওদিন বাপু এমন!

বাঙালদের হয়। জোড়া পদবি।

কিন্তু ইনি তো উত্তরবঙ্গের ওই মালদা না জলপাইগুড়ির। না?

জলপাইগুড়িরও না, মালদারও না। মাঝের পশ্চিম দিনাজপুরের।

না না। জন্ম ওপারেই। মানে অবিভক্ত দিনাজপুর গো। বুঝলে?

ওপরের এই আলোচনা হচ্ছিল আমার সামনেই। আমি নেহাতই নাবালক সে সময়। হাওড়া লোকসভা কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি।

কর্ডলাইনে একটু রাজনৈতিক কচকচি 

১৯৭৭ সালের লোকসভা ভোটে কংগ্রেস প্রথম ধাক্কা খায়। কিন্তু ধাক্কা যারা দেয়, তারা বছর তিনের মাথায় দুর্বল হয়ে যায়। এতই দুর্বল, যে লোকসভা ভেঙে যায়। পুনরায় ভোট। ফের ফেরে কংগ্রেস, একক ক্ষমতায়। ইন্দিরা গান্ধী চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হন। কিন্তু মেয়াদ ফুরোনর আগেই ঘটে মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনা। অক্টোবরের একত্রিশ, উনিশশো চুরাশি।

এর দু’মাসের মধ্যেই ভোট হয়। এই ভোটে, আজ অবধি রেকর্ড, বিপুল জয় নিয়ে আবার ক্ষমতাসীন হয় কংগ্রেস। রেকর্ড এই কারণে, যে এর পর থেকেই ভারতে একটি দলের একার সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠন অসম্ভব হয়ে পড়ে প্রায় দু’টি দশক ধরে। রেকর্ড এই কারণেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকের একাংশ বলে থাকেন, ১৯৮৪-র সেই ভোটে কংগ্রেসের অমন ব্যাপক জয় সম্ভব হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর ওইরকম আকস্মিক দুঃখজনক প্রয়াণে। আসমুদ্রহিমাচল জনগণের সহানুভূতি আর ভাবাবেগ উপচে পড়েছিল ব্যালট বাক্সে।

১৯৮৪-র সেই ভোটে প্রিয়রঞ্জন প্রায় এক লাখের কাছাকাছি ভোটের ব্যবধানে জেতেন। এর আগেও তিনি জিতেছিলেন, তখন বয়স মোটে ছাব্বিশ। ১৯৭১ সালের নকশাল জমানা সদ্য-থিতনো কলকাতা দক্ষিণ, বিপরীতে একদা স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী শাখার অন্যতম উজ্জ্বল নাম, হেভিওয়েট প্রাক্তন সাংসদ, বাম প্রার্থী গণেশ ঘোষ। ব্যবধান ছিল বাইশ-তেইশ হাজার। সাংসদ হয়ে প্রিয়রঞ্জন মন্ত্রীত্বও পান ১৯৮৫ সালে।    

ব্যাক টু মেন লাইন

যা নিয়ে কথা হচ্ছিল, ফিরি সে কথায়। ভোটে জয়ের পরে হাওড়া জেলার আন্দুলে একটি জনসভায় প্রিয়রঞ্জন বক্তব্য রাখেন। উপচে পড়ে ভিড়। আমার এক বন্ধুর কাছে শোনা, সেও তখন কিশোর, সেই ভিড়ের একজন — অসম্ভব সুন্দর করে বলছিলেন কথাগুলো। বুঝিনি কিছুই, তাই মনে নেই। শুধু মনে আছে মুগ্ধতা। খালি একটা কথা মনে আছে, প্রিয়রঞ্জন বলেছিলেন, ‘আমার মা রেণুকণা দাশমুন্সি বলতেন, কাউকে গালাগালি দিবি না।’

বালক-বন্ধুর বোধের স্তরের এই কথাগুলো থেকে যায় মনে। সদ্য প্রয়াত প্রিয়রঞ্জনকে নিয়ে যখন দু’কথা বলছেন তাঁর পুরনো বন্ধুরা, নিজের বা অন্য দলের, সেই কথাই ফিরছে মুখে মুখে। আবেগে চলতেন। দেখনদারি নয়, ভালোবাসতেন অন্তর থেকে। বিরোধীদেরও তাঁর বিরুদ্ধে বলার থাকত না কিছু।

ইতিহাস বইয়ে পড়া “গুড অরেটর” সুরেন্দ্রনাথ ব্যনার্জীকে চোখে দেখিনি, দেখেছি প্রিয়রঞ্জনকে। সভামঞ্চে, টিভিতে, লোকসভা টিভি চ্যানেলে।

এর পরের লোকসভায় আবার ভরাডুবি হয় কংগ্রেসের। প্রিয়রঞ্জন সংসদে ফেরত যান ১৯৯৬-তে, হাওড়া থেকেই। মাঝের সময়টা অনুকূলে ছিল না তাঁর দলের। যদিও কংগ্রেস এসেছিল ক্ষমতায়, কিন্তু জোটের শর্তে, বাধ্যবাধকতায়। ঝরে যেতে হয়েছিল গান্ধী পরিবারের আরেক উজ্জ্বল মুখকে, আততায়ীদের চক্রান্তে। ভেঙে পড়েছিল এক মসজিদ, উগ্র হিন্দুতার ক্রোধে। তার জেরে আমাদের মতো কত আদ্যোপান্ত গেরস্থ মহল্লাতেই না জারি হয়ে গেছিল কারফিউ। দেশের সে বড় সুখের সময় নয়।                  

প্রিয়রঞ্জন ১৯৮৯-এর লোকসভা ভোটে দু’হাজার ভোটে, ১৯৯১-এর লোকসভা ভোটে সাত হাজার ভোটে হেরে গেছেন দু’দুবার। তবুও আসতেন। তখন উনি প্রাক্তন সাংসদই শুধু নন, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রীও। হেরে গেলেও ‘লেজ’ সহজে খসে না, এমনটাই দেখা যায় বেশি। ভোটে হেরে গেলে আর কী কী হতে দেখা যায়? এক তো, প্রার্থী ফিরেই তাকান না সেই এলাকার দিকে। সেখানে যাওয়া তো দূরের কথা! আর যা হয়, কমে যায় হেরো প্রার্থীর আশপাশ থেকে লোকজনেরা। সভা ডাকলে ভিড় জমে না। সঙ্গে থাকে জয়ী তথা বিরোধীদলের ব্যঙ্গ, কটূক্তি, হেয় করে করা মন্তব্য।

আমি আর নাবালক নেই তখন। দেখতাম প্রায়ই প্রিয়রঞ্জনকে। অলিতেগলিতে, ছোট মাঠে, রাস্তার কম চেনা মোড়ে, হয়তো মঞ্চ বাঁধা হয়নি, সেভাবেই বক্তব্য রাখছেন। যোগাযোগ রাখছেন।  বিরোধীরা সে সময় কুশ দিয়ে বিরাট চাবি (সম্ভবত উনি ভোট প্রচারে বলেছিলেন, সব বন্ধ কলকারখানা খোলার উদ্যোগ নেবেন) বা ওঁর প্রতিমূর্তি  বানিয়ে প্রতিবাদে মুখর হচ্ছে।

১৯৯৬-এর পর প্রিয়রঞ্জন হাওড়া থেকে তাঁর শিকড়ে চলে যান। রায়গঞ্জ থেকে দাঁড়িয়ে প্রথমে হারেন। পরের বছরেই আবার ভোট হয়। উনি জেতেন। পাঁচ বছর পর আবার জেতেন। এর পরের ভোটে আর দাঁড়ানো হয় না ওঁর। তার আগেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে তিনি শয্যাশায়ী।

বাকিটা ব্যক্তিগত

সালটা ১৯৯২ হবে। সামনেই কোনও বড় ভোট নেই। তাঁর স্ট্যাটাস, তিনি আগের ভোটে হেরে যাওয়া প্রার্থী। সেসময়েই কোনও এক বিকেলে মহিয়াড়ি পাবলিক লাইব্রেরি থেকে বই বদলে বেরিয়ে সাইকেলে চাপব, দেখি সামনের মাঠের (মাঠ বলা যায় না আদৌ, ফালি জমি, নগণ্য রাস্তার মোড়) দলীয় জনসভায় উনি এলেন। নেহাতই সাদামাটা, ছোট জমায়েত। ওঁর সঙ্গে সঙ্গে এলেন দলেরই জনাতিনেক। সুরক্ষা বলয়, বাউন্সার ইত্যাদি কিছুমাত্র নেই। দাঁড়িয়ে গেলাম এক পাশে। মঞ্চে উঠলেন প্রিয়রঞ্জন। বক্তব্য পেশ করলেন নিজস্ব সুললিত ভঙ্গিমায়। খুব কম মানুষই পারেন অত সুন্দর করে বলতে।

বক্তৃতা শেষে খানিক বসলেন। কথা বললেন বাকিদের সঙ্গে। এবার নেমে আসবেন। মঞ্চ থেকে সিঁড়িতে একটা ধাপ নেমেছেন, আরও দুটো ধাপ বাকি। সাইকেলটা হাঁটিয়ে নিয়ে আমি এমনভাবে লোকজনের ফাঁক গলে ঢুকে গেলাম, যাতে শেষ ধাপ থেকে উনি নামলেই মুখোমুখি হয়ে যাই। হলও! শাদা ধুতি-পাঞ্জাবি। আশপাশের লোকেরা হাঁ হাঁ করে ওঠার আগেই উনি হাত তুললেন তাঁদের উদ্দেশ্যে। হাসলেন আমার দিকে তাকিয়ে। সাইকেলের সিটটা ধরে সামনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘চ বাবা, চ।

প্রায় পঁচিশ বছর বাদে, আমার লেখালিখি যৎসামান্য পরিচিতি পেয়েছে ইতোমধ্যে, শারদীয় সংখ্যায় গল্প লেখার জন্য আমন্ত্রণ পাই একটি পত্রিকার তরফে। সে পত্রিকার একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বরিষ্ঠ গুণীজনেদের স্মৃতিতে আজও অমলিন। বিশেষ মনে পড়ে যায় মহালয়া তিথিতে। সে পত্রিকার সম্পাদক প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি। হ্যাঁ, অফিশিয়ালি। বাস্তবে তিনি তখন আর কর্মক্ষম ছিলেন না। যত্নে সে ভার বহন করে যাচ্ছেন তাঁর কাছের কিছু প্রিয়জন।     

চার দিন আগে, কুড়ি তারিখে, তিনি চলে গেলেন। শূন্য হয়ে গেল সম্পাদক পদটি। কোনওভাবে সে দিনের সেই নাবালক, অলক্ষ্য একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ করে, এই সম্পাদকটির সঙ্গে জড়িয়ে গেছিল মায়ার বাঁধনে। ছিঁড়ে গেল তা।   

     

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

One Response

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

pakhi

ওরে বিহঙ্গ

বাঙালির কাছে পাখি মানে টুনটুনি, শ্রীকাক্কেশ্বর কুচ্‌কুচে, বড়িয়া ‘পখ্শি’ জটায়ু। এরা বাঙালির আইকন। নিছক পাখি নয়। অবশ্য আরও কেউ কেউ