জলদ গুপ্ত
জলদ গুপ্ত লেখেন না, ভাবেন। নিজেকে মনে করেন মুদির দোকানের মালিক। কোথায় কোন মশলা আছে শুধু সেটুকুই উনি জানেন, খদ্দেরের চাহিদা অনুযায়ী কাগজে মুড়ে দিয়ে দেন...ব্যস। সিধুজ্যাঠার মত অনেক কিছু করার ক্ষমতা থাকলেও অন্যদের অসুবিধা হবে বলে কিছুই করেন নি। কবিতা, নাটক লিখতে পছন্দ করেন আর পাগলের মত পছন্দ করেন সঙ্গীত। পাহাড়ি জঙ্গলের টিলায় বসে হেঁড়ে গলায় গান আর দিনে ১৫ কাপ চায়ের জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত। আদিখ্যেতাকে ঘেন্না করেন, তর্ক করতে ভালোবাসেন। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন যেখানে কোন লেখক থাকবে না।

সময়টা দ্বাদশ শতকের শেষ দিক। বাংলার আকাশে বাতাসে তখন ভক্তিবাদের সুর। এই সময়েই কবি জয়দেবের কল্পনায় কাব্যিক মুর্ছনার মাধ্যমে প্রেমে বিহ্বল রাধা ধরা পড়লেন। ‘গীতগোবিন্দম কাব্য’এর অসাধারণ আবেশে আপামর বাঙালি প্রেমের মধ্যে দিয়ে ভক্তিরসে মেতে উঠলো। তৎকালীন ভারতবর্ষের এই অঞ্চলে তখনও কোন সর্বসম্মত দেবতার জন্ম হয় নি। মা দুর্গা জনপ্রিয় হলেও তিনি ছিলেন রাজা-রাজড়াদের দেবী। সাধারণ ঘরে তখনও তিনি পুজিত হতেন না। দেশের মধ্যে অন্যতম অনুন্নত এবং দুর্গম এই পুর্বাঞ্চলে সামগ্রিক ভাবে হিন্দু, মুসলিম বা বৌদ্ধদের বসবাস ছিল। প্রত্যেকেই তাদের নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদের মতো করেই সাধনা বা ঈশ্বর উপাসনা করতেন। সেখানে হিন্দু ধর্মের অনেক দেবতার আনাগোনা থাকলেও দেশের উত্তরাঞ্চল বা দক্ষিণাঞ্চলের শিব বা বিষ্ণুর মতো কোন একটি জনপ্রিয় দেব বা দেবী মানুষের মননে তখনও তীব্রভাবে চেপে বসে নি।

Banglalive

জয়দেবের রাধাকৃষ্ণের কাব্যিক কল্পনা ছবিটাকে বদলে দিল। ‘দেহিপদপল্লবমুদারং’ এর আকুল আকুতির মাধ্যমে বাংলার আকাশে বাতাসে এল প্রেমরসের সুর। এর অনেক পরে চৈতন্যদেবের আবির্ভাবে বাংলার মাটিতে ভক্তিরসের প্লাবন এল। বাঙালি মেতে উঠলো শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনে। বৈষ্ণব ভাবাদর্শের অহিংস মহিমায় দিক্ষিত হল বাঙালি। সেই সময় প্রবল পরাক্রান্ত মুসলিম শাসনের আওতায় থাকা বাংলাদেশ তাদের এই অসাধারণ ধর্মীয় দর্শনকে নির্বিঘ্নেই প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন, সেই অর্থে কোন প্রশাসনিক বাধা তারা পান নি, বরং উত্তরাধিকার সূত্রে বিদেশি হলেও ওই সময়ের মুসলিম শাসকরা বৈষ্ণব ভাবধারার কোন ধর্মীয় বিরোধিতা করেন নি, কারণ তারা এই অঞ্চল বা তাদের শাসন সীমানায় থাকা ভূখণ্ডকে তাদের নিজেদের দেশ বলেই মনে করতেন। তাই চুড়ান্ত ধর্মীয় মতান্তর থাকা সত্ত্বেও তারা অন্য ধর্মের প্রতি অসহিষ্ণুতা দেখান নি। যদি দেখাতেন তবে ওই সময়ে শ্রীচৈতন্যের ভক্তিরসাত্মক দর্শন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের চেহারা নিতে পারতো না, যাই হোক, মোটামুটিভাবে দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ থেকে সপ্তদশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত বাংলায় ‘রাধা-কৃষ্ণ’ই বাঙ্গালির জনপ্রিয়তম আরাধ্যদেবতা ছিলেন।

আরও পড়ুন:  অ্যানিমিয়ায় ভুগছেন দীর্ঘদিন? এই খাবারগুলি ডায়েটে রাখুন

এরপর অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরু থেকে দ্রুত অবস্থার বদল ঘটে। প্রথমে পর্তুগীজ এবং পরে ইংরেজদের লুঠেরা দৃষ্টি ভারতবর্ষের এই অঞ্চলের ওপরও পড়তে শুরু করে। ওলন্দাজ, পর্তুগীজ বা ইংরেজদের কাছে আমাদের দেশ শুধুমাত্র লুন্ঠনভূমিই ছিল, তারা আমাদের দেশকে তখনও আপন করার কথা ভাবে নি, ভালোবাসেনি বা এদেশের মানুষদের ওপর তাদের কোন মায়া মমতাও তৈরি হয় নি। এদের চরম অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে অসহায়,অহিংস, নিরস্ত্র বাঙালি কোন ভয়ঙ্কর সশস্ত্র দৈবশক্তির আশ্রয় চাইল, যাকে অবলম্বন করে তারা বাঁচতে পারবে। ওই দস্যুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে পারবে।

ঠিক এই সময়ই তন্ত্র-মন্ত্রের আবছায়া থেকে বেরিয়ে এলেন এক ভয়ঙ্কর নারীমুর্তি যার গলায় কাটা নরমুণ্ড-এর মালা, হাতে রক্ত মাখা খড়গ, যিনি বিবসনা-উলঙ্গ। যার পায়ের নিচে মহাকাল শিব আর চোখে মহাপ্রলয়। এই উগ্রচণ্ডা তন্ত্রের দেবীই হলেন কালী। যাকে আশ্রয় করে তথাকথিত শান্ত বাঙালি প্রতিরোধ করতে জানলো , অসহায় আত্মসমর্পনের ভাবধারাকে ছুঁড়ে ফেলে তারা লড়াই করতে শিখলো, পেল আত্মবলিদানের আনন্দ। এই সময় থেকেই কালী শুধুমাত্র তন্ত্রসাধক এবং ডাকাতদের আস্তানা ছেড়ে সাধারণের ঘরে প্রবেশ করলেন। সর্বজনীনভাবেও তার আরাধনা শুরু হল। আঁধারের আড়াল ছেড়ে কালী হয়ে উঠলেন সকলের জননী, আলোর প্রতীক। এ প্রসঙ্গে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কালীপুজা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সম্ভবত তিনিই প্রথম কালীপুজাকে সর্বজনীন পুজার রুপ দেন। তাঁর হাত ধরেই সাধারণ মানুষ কালী আরাধনায় অংশগ্রহণ করবার সাহস পায়। কাব্যে সাহিত্যেও তার অবাধ প্রবেশ ঘটে। কবি রামপ্রসাদের কল্পনায় কালী হয়ে ওঠেন আমাদের ঘরের মেয়ে, যে লাল পাড় শাড়ি পরে তাঁর  বাবাকে ঘরের কাজে সাহায্য করে, যার কাছে তিনি তার মনের সব দুঃখ, কষ্ট যন্ত্রনা বলতে পারেন। পরবর্তীকালে কমলাকান্ত, দিজেন্দ্রলাল রায়, নজরুল, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ প্রমুখ মনিষীদের মাধ্যমে মা কালী বাঙ্গালির আরও আপনারজন হয়ে ওঠেন। এভাবে একদিকে কালী যেমন বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে সর্বসম্মত দেবী হয়ে উঠলেন অন্যদিকে বিপ্লবীরা ইংরেজের বিপক্ষে স্বাধীনতা সংগ্রামে মা কালীকেই তাদের আরাধ্য দেবী হিসেবে বেছে নিলেন। এভাবেই কালী বাঙ্গালির মননে সর্বজনীন দেবী হিসেবে স্থান করে নিলেন।     

আরও পড়ুন:  উচ্ছে চিংড়ি

এগুলো তো গেল বাংলার ইতিহাসের কথা। পুরাণেও কালী খুবই গুরুত্বপুর্ণ দেবী হিসেবে পূজিত। কালী শব্দের অর্থ হল, যিনি কাল মানে সময়কে ধারণ করেন অর্থাৎ এই বিশ্বে সময় সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে, আবার সময়ের অতল গর্ভে সবকিছুই মিলিয়ে যায়। এখানে কোন উন্নতি বা পরিনতি নেই, নেই কোন নিয়ন্ত্রণ বা প্রক্ষেপণ। এই ‘সময়’ বা ‘কাল’এর প্রত্যক্ষ প্রভাবেই জগতের উৎপত্তি। আবার এই সময়ের অতল সাগরেই জগৎ সংসার বিলীন। মহাসৃস্টির চরম সন্ধিক্ষণ থেকে মহাপ্রলয়ের চুড়ান্ত অন্ধকার পর্যন্ত সবকিছুই ক্ষণিক উপলব্ধি। এই সমষ্টিগত উপলব্ধি কালশক্তি রুপে মহাকালীর আধারেই নিমজ্জিত।

দেবী কালীর এই কঠিন শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যাকে সরিয়ে রাখলেও কালীর শাস্ত্রগত উৎপত্তিকে সরিয়ে রাখা যায় না। শাস্ত্রমতে কালী আসলে তন্ত্রের দেবী। তন্ত্র মানে যা কিছু ত্রাণকারী, অর্থাৎ যে সাধনার মাধ্যমে জীবের ত্রাণ বা মুক্তিলাভ সম্ভব তাকেই তন্ত্র বলে। তন্ত্র দর্শনের জন্মদাতা আমাদের এই বঙ্গভূমি। ধর্মীয় শিক্ষায় সুশিক্ষিত এবং অসাধারণ দার্শনিক বোধসম্পন্ন বাঙালি দার্শনিকরাই এই সাধন পদ্ধতির প্রচলন করেন। পরে সারা ভারত তথা বিশ্বে এই সাধন পদ্ধতি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তথাকথিত ভাবে বেদ বিরোধী এই সমাজ পরিত্যক্ত শাস্ত্র লোকচক্ষুর আড়ালেই থাকতে পছন্দ করতো। এ সম্পর্কে প্রাচীন একটি গল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একসময় ঋষি বশিষ্ঠ হাজার হাজার বছর তপস্যা করেও ব্যর্থ হন। তাঁর আকাঙ্ক্ষিত কোন ফললাভ না হওয়ার জন্য তিনি বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। বিষ্ণু তাকে আরাধনার জন্য চিন দেশে যেতে বলেন। বশিষ্ঠ চিনদেশে গিয়ে দেখেন সেখানে পঞ্চ ‘ম’ অর্থাৎ মৎস্য, মদ্য, মাংস, মুদ্রা ও মৈথুন সহযোগে দেবী আরাধনা করা হচ্ছে। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে বেদ অনুযায়ী পুজাচারের সম্পুর্ন বিরোধী এই সাধন ধারা। বেদ মতে ঈশ্বর আরাধনার মুল উপাদান হল ‘পঞ্চগব্য’ অর্থাৎ দধি, দুগ্ধ, ঘৃত, গোমূত্র এবং গোময় যেগুলি সম্পুর্নরুপে ‘পঞ্চ –ম’এর বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। ঋষি বশিষ্ঠ বেদ বিরোধী সেই সাধন পদ্ধতি শিখে বঙ্গ দেশে আসেন এবং তন্ত্রমতে দেবী আরাধনা শুরু করেন। এই আরাধনার একচ্ছত্র দেবীই হলেন কালী। যিনি ভিন্ন ভিন্ন নামে বিভিন্ন জায়গায় পুজিতা। তারা, চামুন্ডা, ছিন্নমস্তা, ভৈরবী, গুহ্যকালী, মহাকালী, ভদ্রকালী, শ্মশানকালী, রক্ষাকালী ইত্যাদি সবই কালীর বিভিন্ন রুপ। বেদ চর্চায় কালী আরাধনার উল্লেখ থাকলেও তা কিন্তু সম্পুর্ন বেদের ধারা অনুযায়িই কথিত। সেই কালী ভাবনা কিন্তু আজকের কালী ভাবনাকে সমর্থন করে না।

আরও পড়ুন:  ফলের সাহায্যে ত্বক হবে উজ্জ্বল‚ দাগহীন; কোন ফলে কী উপকার জেনে নিন

3 COMMENTS

  1. খুব ভাল , তবে পাঠক মন আরও একটু ডিটেইলস চাইছিল…