ডিম্বাণুদাত্রীর স্পর্শে সন্তানসুখের চুয়া-চন্দন

3812
IVF pregnancy

আরও একটা বসন্ত পেরিয়ে গেল | দীর্ঘশ্বাস ফেলল চুয়া | জন্মদিনের উপহারগুলো খুলতেও ইচ্ছে করে না | সাঁইত্রিশ বছর বয়সে পৌঁছে সব ফ্যাকাশে লাগে | অথচ চুয়ার কী নেই ! আইটি ফার্মে ঝা চকচকে চাকরি‚ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট স্বামী | ফ্ল্যাট‚ গাড়ি‚ বিদেশ ভ্রমণ—-জাগতিক সুখের সব মাপকাঠির চাবিকাঠি চুয়ার হাতের মুঠোয় | কিন্তু সে সবই যেন বালিঘড়ির বালুরাশির মতো হু হু করে বয়ে যায় | যেমন করে মনের মধ্যে বয়ে যায় শুন্য বাতাস | যখনই মনে হয় এত কিছু পেলেও সন্তান তো এল না |

জীবনের এই প্রান্তের চিন্তা তো প্রথম পর্বে মনে আসে না | তখন শুধুই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চিন্তা | ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে মেধাবী চুয়ার ভাল চাকরি পেতে সমস্যা হয়নি | কিন্তু চাকরি পেলেই তো হল না | কেরিয়ারকে একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্যেও সময় দরকার | সেই সময় দিতে গিয়ে বয়স পালিয়ে যায় | অপেক্ষা করে থাকে হতাশা | যখন ত্রিশে বিয়ে করা চুয়ার কোল খালি থাকে সাঁইত্রিশেও | 

কোল পূর্ণ করার চেষ্টা কম করেনি চুয়া আর তাঁর স্বামী চন্দন | কিন্তু সব আশাই শেষ অবধি নিরাশায় পরিণত হয়েছে | চিকিৎসকরা জানিয়ে দিয়েছেন চুয়ার ডিম্বাণু অপ্রতুল | আজীবন মেধার শীর্ষে থাকা চুয়াকে মেনে নিতে হয়েছে তাঁর এই শারীরিক অক্ষমতা | সে মা হতে পারবে | কিন্তু অন্যের ডিম্বাণুতে | 

এখানেই সব আটকে গিয়েছিল | চন্দন কিছুতেই মানতে পারছিল না | তাঁর ঔরসজাত সন্তানের একটা অংশ হবে কিনা বহিরাগতর ! কিছুতেই এই এই সঙ্কোচ থেকে বেরোতে পারেনি সে | কত রাতে ঘুম ভেঙে দেখেছে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কাঁদছে চুয়া | ইচ্ছে করেছে সব প্রতিরোধ ভেঙে দিতে | কিন্তু পারেনি | ইচ্ছের গলা টিপে ধরেছে দ্বিধা আর সংস্কার | 

কিন্তু আর নয় | গাড়ি চালাতে চালাতে ভাবছিল চন্দন | চুয়ার জন্মদিনেও অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরোতে পারেনি | সেই দেরিই হল | বাড়ি পৌঁছেই বেরোবে ডিনারে | নামী রেস্তোরাঁয় বুক করা আছে টেবল | তৈরি হয়ে ছিল চুয়াও | দুজনে রওনা দিল রেস্তোরাঁর উদ্দেশে | প্রতি বছরের মতো মোমবাতির মায়াবী আলোয় মূল্যবান উপহার পেল চুয়া | এখন আর হিরের দ্যুতিতেও চমক লাগে না | নিজের হাসিকে নিজেরই শুকনো মনে হয় |

কিন্তু এবার আরও কিছু অপেক্ষা করে ছিল | প্রায় প্রোপোজ করার মতো করে বলল চন্দন | সে বাবা হতে চায় | অন্যের ডিম্বাণু হলেও ক্ষতি নেই | নেই চুয়ার প্রতি কোনও অভিযোগ বা অনুযোগ | সে শুধু চায়‚ সুস্থ মা ও নবজাতক | শুনে চুয়ার মনে ঠিক কী যে হল‚ সে নিজেও বুঝতে পারল না | শুধু টের পেল দু গালের দামি ফাউন্ডেশন ধুয়ে যাচ্ছে নোনতা জলে |

Motherhood Fertility  ক্লিনিকে যাওয়ার ব্যাপারে চন্দনই উদ্যোগ নিল | চুয়ার যাবতীয় লজ্জা ভেঙে নিজেই সব কথা খুলে বলল | শারীরিক পরীক্ষা করে জানা গেল‚ সে সন্তানধারণে সক্ষম | ইউটেরাস প্রস্তুতের জন্য কিছুটা সময় নিলেন চিকিৎসক | সেইসঙ্গে চলল আনুষঙ্গিক ওষুধ | যা দেওয়া হয় যেকোনও অন্তঃসত্ত্বাকে |

ছেলে বা মেয়ে যা-ই হোক না কেন‚ চুয়ার ইচ্ছে সন্তানের মাথায় থাকবে ঘন কালো কুচকুচে চুল | চন্দনের ইচ্ছে‚ সন্তান যেন লম্বা হয় | কারণ‚ সে আর চুয়া দুজনেই গড়পড়তা বাঙালির থেকে লম্বা | এই দুটো ক্রাইটেরিয়া বলেছিল Motherhood Fertility ক্লিনিকে‚ ডিম্বাণুদাত্রী যেন হন দীর্ঘাঙ্গী ও সুকেশী | আরও নাকি পছন্দসই জিনিস বলা যায় | কিন্তু অত জটিলতার মধ্যে যায়নি তারা | Motherhood Fertility ক্লিনিকের তরফে বলা হয় সবকিছু মেনেই ডিম্বাণুদাত্রী নির্বাচন করা হয় | প্রথমেই দেখা হয় সে থ্যালাসেমিয়া, এইচ আই ভি বা হেপাইটিটিসের ধারক ও বাহক কিনা | এছাড়াও অ্যালার্জি‚থাইরয়েড‚ সুগার‚ প্রেশার‚ লিপিড প্রোফাইল থেকে শুরু করে আরও সব ধরণের সাধারণ টেস্ট করে দেখে নেওয়া হয় ডিম্বাণুদাত্রীর শরীরে কোনও রকম অসুখের লক্ষণ আছে কি না | সেটা না হলে তবেই এগোনো হয় | এছাড়াও তাঁকে হতে হবে সুস্থ স্বাভাবিক সন্তানের জন্মদাত্রী অর্থাৎ তিনি আগেই মা হয়েছেন এবং সুস্থ ও স্বাভাবিক সন্তানের জন্ম দিয়েছেন | আর যিনি ধারণ করবেন তাঁর বয়স হতে হবে পঞ্চাশের নিচে | মধুমেহ বা উচ্চরক্তচাপের মতো অসুখ থাকলে তা আগে থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে | বাকি শর্ত আর বিশেষ কিছু নেই |

এই সব শর্ত পূর্ণ হচ্ছে দেখে চন্দনের দেহ থেকে নেওয়া হল শুক্রাণু | তার সঙ্গে ডিম্বাণুদাত্রীর ডিম্বাণুর নিষেক ঘটল ল্যাবে | নির্দিষ্ট দিন পরে তা প্রতিস্থাপিত হল চুয়ার দেহে | একসঙ্গে দুটি | কোনও ঝুঁকি নেওয়া হয় না | এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে স্থাপন করা হয় ব্লাস্টোসিস্ট এমব্রায়ো | ফলে আরও নিশ্চিত হয় গর্ভধারণ | 

চুয়ার ক্ষেত্রেও তেমন হল | ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের পরে যেতে বলেছিলেন চিকিৎসকরা | তাঁরাই জানালেন সুখবর | মা হতে চলেছে চুয়া !

মা হল চুয়া | সবকিছুই বাকিদের অতো স্বাভাবিক | প্রথম তিন মাস আর শেষ তিন মাস একটু সাবধানতা | আর সবই করেছে চুয়া | হাল্কা ঘরের কাজ থেকে অফিস | সবই সামলেছে | এখন সামলাচ্ছে দুষ্টুমি | একজন নয়‚ এক জোড়ার | চুয়া চন্দনের সংসার এখন কলকল করছে হিয়া আর দিয়ার হাসিকান্নায় | যে যমজ মুখদুটো নাকি লুকিয়ে ছিল তাদের হিয়ার মাঝে | 

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.