ডিম্বাণুদাত্রীর স্পর্শে সন্তানসুখের চুয়া-চন্দন

IVF pregnancy

আরও একটা বসন্ত পেরিয়ে গেল | দীর্ঘশ্বাস ফেলল চুয়া | জন্মদিনের উপহারগুলো খুলতেও ইচ্ছে করে না | সাঁইত্রিশ বছর বয়সে পৌঁছে সব ফ্যাকাশে লাগে | অথচ চুয়ার কী নেই ! আইটি ফার্মে ঝা চকচকে চাকরি‚ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট স্বামী | ফ্ল্যাট‚ গাড়ি‚ বিদেশ ভ্রমণ—-জাগতিক সুখের সব মাপকাঠির চাবিকাঠি চুয়ার হাতের মুঠোয় | কিন্তু সে সবই যেন বালিঘড়ির বালুরাশির মতো হু হু করে বয়ে যায় | যেমন করে মনের মধ্যে বয়ে যায় শুন্য বাতাস | যখনই মনে হয় এত কিছু পেলেও সন্তান তো এল না |

জীবনের এই প্রান্তের চিন্তা তো প্রথম পর্বে মনে আসে না | তখন শুধুই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চিন্তা | ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে মেধাবী চুয়ার ভাল চাকরি পেতে সমস্যা হয়নি | কিন্তু চাকরি পেলেই তো হল না | কেরিয়ারকে একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্যেও সময় দরকার | সেই সময় দিতে গিয়ে বয়স পালিয়ে যায় | অপেক্ষা করে থাকে হতাশা | যখন ত্রিশে বিয়ে করা চুয়ার কোল খালি থাকে সাঁইত্রিশেও | 

কোল পূর্ণ করার চেষ্টা কম করেনি চুয়া আর তাঁর স্বামী চন্দন | কিন্তু সব আশাই শেষ অবধি নিরাশায় পরিণত হয়েছে | চিকিৎসকরা জানিয়ে দিয়েছেন চুয়ার ডিম্বাণু অপ্রতুল | আজীবন মেধার শীর্ষে থাকা চুয়াকে মেনে নিতে হয়েছে তাঁর এই শারীরিক অক্ষমতা | সে মা হতে পারবে | কিন্তু অন্যের ডিম্বাণুতে | 

এখানেই সব আটকে গিয়েছিল | চন্দন কিছুতেই মানতে পারছিল না | তাঁর ঔরসজাত সন্তানের একটা অংশ হবে কিনা বহিরাগতর ! কিছুতেই এই এই সঙ্কোচ থেকে বেরোতে পারেনি সে | কত রাতে ঘুম ভেঙে দেখেছে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কাঁদছে চুয়া | ইচ্ছে করেছে সব প্রতিরোধ ভেঙে দিতে | কিন্তু পারেনি | ইচ্ছের গলা টিপে ধরেছে দ্বিধা আর সংস্কার | 

কিন্তু আর নয় | গাড়ি চালাতে চালাতে ভাবছিল চন্দন | চুয়ার জন্মদিনেও অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরোতে পারেনি | সেই দেরিই হল | বাড়ি পৌঁছেই বেরোবে ডিনারে | নামী রেস্তোরাঁয় বুক করা আছে টেবল | তৈরি হয়ে ছিল চুয়াও | দুজনে রওনা দিল রেস্তোরাঁর উদ্দেশে | প্রতি বছরের মতো মোমবাতির মায়াবী আলোয় মূল্যবান উপহার পেল চুয়া | এখন আর হিরের দ্যুতিতেও চমক লাগে না | নিজের হাসিকে নিজেরই শুকনো মনে হয় |

কিন্তু এবার আরও কিছু অপেক্ষা করে ছিল | প্রায় প্রোপোজ করার মতো করে বলল চন্দন | সে বাবা হতে চায় | অন্যের ডিম্বাণু হলেও ক্ষতি নেই | নেই চুয়ার প্রতি কোনও অভিযোগ বা অনুযোগ | সে শুধু চায়‚ সুস্থ মা ও নবজাতক | শুনে চুয়ার মনে ঠিক কী যে হল‚ সে নিজেও বুঝতে পারল না | শুধু টের পেল দু গালের দামি ফাউন্ডেশন ধুয়ে যাচ্ছে নোনতা জলে |

Motherhood Fertility  ক্লিনিকে যাওয়ার ব্যাপারে চন্দনই উদ্যোগ নিল | চুয়ার যাবতীয় লজ্জা ভেঙে নিজেই সব কথা খুলে বলল | শারীরিক পরীক্ষা করে জানা গেল‚ সে সন্তানধারণে সক্ষম | ইউটেরাস প্রস্তুতের জন্য কিছুটা সময় নিলেন চিকিৎসক | সেইসঙ্গে চলল আনুষঙ্গিক ওষুধ | যা দেওয়া হয় যেকোনও অন্তঃসত্ত্বাকে |

ছেলে বা মেয়ে যা-ই হোক না কেন‚ চুয়ার ইচ্ছে সন্তানের মাথায় থাকবে ঘন কালো কুচকুচে চুল | চন্দনের ইচ্ছে‚ সন্তান যেন লম্বা হয় | কারণ‚ সে আর চুয়া দুজনেই গড়পড়তা বাঙালির থেকে লম্বা | এই দুটো ক্রাইটেরিয়া বলেছিল Motherhood Fertility ক্লিনিকে‚ ডিম্বাণুদাত্রী যেন হন দীর্ঘাঙ্গী ও সুকেশী | আরও নাকি পছন্দসই জিনিস বলা যায় | কিন্তু অত জটিলতার মধ্যে যায়নি তারা | Motherhood Fertility ক্লিনিকের তরফে বলা হয় সবকিছু মেনেই ডিম্বাণুদাত্রী নির্বাচন করা হয় | প্রথমেই দেখা হয় সে থ্যালাসেমিয়া, এইচ আই ভি বা হেপাইটিটিসের ধারক ও বাহক কিনা | এছাড়াও অ্যালার্জি‚থাইরয়েড‚ সুগার‚ প্রেশার‚ লিপিড প্রোফাইল থেকে শুরু করে আরও সব ধরণের সাধারণ টেস্ট করে দেখে নেওয়া হয় ডিম্বাণুদাত্রীর শরীরে কোনও রকম অসুখের লক্ষণ আছে কি না | সেটা না হলে তবেই এগোনো হয় | এছাড়াও তাঁকে হতে হবে সুস্থ স্বাভাবিক সন্তানের জন্মদাত্রী অর্থাৎ তিনি আগেই মা হয়েছেন এবং সুস্থ ও স্বাভাবিক সন্তানের জন্ম দিয়েছেন | আর যিনি ধারণ করবেন তাঁর বয়স হতে হবে পঞ্চাশের নিচে | মধুমেহ বা উচ্চরক্তচাপের মতো অসুখ থাকলে তা আগে থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে | বাকি শর্ত আর বিশেষ কিছু নেই |

এই সব শর্ত পূর্ণ হচ্ছে দেখে চন্দনের দেহ থেকে নেওয়া হল শুক্রাণু | তার সঙ্গে ডিম্বাণুদাত্রীর ডিম্বাণুর নিষেক ঘটল ল্যাবে | নির্দিষ্ট দিন পরে তা প্রতিস্থাপিত হল চুয়ার দেহে | একসঙ্গে দুটি | কোনও ঝুঁকি নেওয়া হয় না | এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে স্থাপন করা হয় ব্লাস্টোসিস্ট এমব্রায়ো | ফলে আরও নিশ্চিত হয় গর্ভধারণ | 

চুয়ার ক্ষেত্রেও তেমন হল | ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের পরে যেতে বলেছিলেন চিকিৎসকরা | তাঁরাই জানালেন সুখবর | মা হতে চলেছে চুয়া !

মা হল চুয়া | সবকিছুই বাকিদের অতো স্বাভাবিক | প্রথম তিন মাস আর শেষ তিন মাস একটু সাবধানতা | আর সবই করেছে চুয়া | হাল্কা ঘরের কাজ থেকে অফিস | সবই সামলেছে | এখন সামলাচ্ছে দুষ্টুমি | একজন নয়‚ এক জোড়ার | চুয়া চন্দনের সংসার এখন কলকল করছে হিয়া আর দিয়ার হাসিকান্নায় | যে যমজ মুখদুটো নাকি লুকিয়ে ছিল তাদের হিয়ার মাঝে | 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

কফি হাউসের আড্ডায় গানের চর্চা discussing music over coffee at coffee house

যদি বলো গান

ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স-এ সারা রাত ক্লাসিক্যাল বাজনা বা গান শোনা ছিল শিক্ষিত ও রুচিমানের অভিজ্ঞান। বাড়িতে আনকোরা কেউ এলে দু-চার জন ওস্তাদজির নাম করে ফেলতে পারলে, অন্য পক্ষের চোখে অপার সম্ভ্রম। শিক্ষিত হওয়ার একটা লক্ষণ ছিল ক্লাসিক্যাল সংগীতের সঙ্গে একটা বন্ধুতা পাতানো।