গড়ানো বয়সে প্রেম – শোভন না অশোভন?

বেশ ঝুনো বয়স। বাড়ি নারকেলডাঙা। মেওয়া ফলের মত শুকিয়ে যাওয়া চেহারা। একসময় সেই মানুষটি আমাদের মত “ডেলি পাষণ্ড” হয়ে ভোরের লোকালে উঠতেন। ভোরের গরম চায়ে চুমুক মেরে ওলটাতেন খবরের কাগজের পাতা। সবচেয়ে রসালো প্রেমের খবরগুলো পড়ত তার নজরে। পড়া শুরু করার আগেই বলতেন, ‘পেয়েছি, আবার একটা মেছো কেস”

ভালবাসার গায়ে যে মেছো গন্ধ – তা তার থেকেই প্রথম জেনেছি। বলতেন, “কবি সাহিত্যিরা সেই কোন কাল থেকে প্রেমের গায়ে চন্দনের ছিটে মারছেন, তবু তার সেই মেছো গন্ধ যেন আজো গেল না। কচিকাঁচাদের তাও এক রকম – ঝুনো প্রেমে তো ম ম মেছো গন্ধ।”

– “ভালবাসায় মেছো গন্ধ?” – প্রশ্ন শুনে বলতেন, “কাপলরা টের পায় না রে ভাই। তারা তো জমে জ্যাম। তবে চারপাশের কানু ভানু ভজা গজারা সে গন্ধ বেশ পায়। আর তাই তো ‘ম্যাও ম্যাও’ শব্দে ম্যাওবাদী হামলা!”

আমরা ডাকতাম এভারগ্রীনদা। প্রেমের একনিষ্ঠ সমর্থক। বেশ কয়েক গণ্ডা প্রেম করেছেন। তার প্রেমতত্ত্বও ছিল আলাদা। বলতেন, ‘বুঝলি, লোকে যে হৃদয় হৃদয় করে হেদিয়ে মরে – তা আসলে বুজরুকি। আসলে খেলা দেখায় ভাইরাস।”

– বলেন কী ? ভালবাসায় ভাইরাস? প্রশ্ন শুনে বলতেন, ভাইরাস ছাড়া আর কি? শালা কাকে যে কখন কলে ফেলবে কেউ জানে না। কলে পড়ে কচি-গোঁফের খোকাও ছুটছে, গোঁফে-কলপ-কাকুও ছুটছেন। এই তো সেদিন নিজেও আর একটা করে ফেললাম। তবে কচি বয়সে যেমন সামলেছি, এখন আর সেভাবে পারি না। বড্ড রিস্ক।”

– রিস্ক কেন?
– হবে না? ওই যে বললুম মেছো গন্ধ। বয়স যত গড়াবে, আঁশটে গন্ধও তত চড়া। চোখে চালসে, পেটে বড়সড় একটা প্যারাবোলা, মাথায় “এরা থাকে ওধারে” স্টাইলের চুল নিয়ে আধবুড়ো কাকুটি চুনুমুনু খেলবে আর হুলোরা ম্যাওম্যাও করবে না – তা কী হয় রে ভাই? আসলে তো সেই আদ্যিকালের জ্বলন?’

– সেফ গেমের কোনও উপায় নেই না?

– সেটাই তো খুঁজছি। মেছো গন্ধ ভ্যানিশ করার রাস্তাটা খুজে পেলেই, ম্যাওবাদী হামলার ভয় আর থাকবে না। তখন স্লগ ওভারে আরো বেশ কটা ছক্কা হাঁকিয়ে তবে ওপারে যাব।

চাকরির সময়ের হেরফেরে এভারগ্রীনদার সাথে যোগাযোগটা একদিন হুট করেই বন্ধ হয়ে গেল। তবে মেছো গন্ধ আর হুলোর চিৎকার – দুটো জিনিসের সাথে সাক্ষাৎ পরিচয় হল ক’দিন পরেই। বেশিদূরে আর যেতে হল না। পাড়াতেই ঘটে গেল ঘটনাটা।

পাড়ার মধ্যে হুট করেই একদিন শোরগোল। ব্যাপার কী? – না, জটাধারী বাবা নাকি প্রেম করে শেষমেশ ছাদনাতলায় যাচ্ছেন। জটাধারী কে? – না পাড়ার মা কালীর মন্দিরের পুরোহিত। আর পাত্রীটি? – মন্দিরে পুজো দিতে আসা ডাগরডোগর এক ভক্তিমতি।

নিমেষেই সেই জটাধারী বাবা চলে এলেন আলোচনার এক নম্বরে। কপালে ভাঁজ পড়ল পাড়ার লোকজনের – ছি ছি ছি, মন্দিরে পুজোর নামে লীলাখেলা? শালা বুড়ো ভাম, নাম্বার ওয়ান ছুপা রুস্তম।

সব পাড়াতেই সবজান্তা কিছু বাগবাহাদুর থাকেন। তেনারা এগিয়ে এলেন যুদ্ধকালীন তৎপরতায়। বললেন, ‘আরে ভাই, এসব ফষ্টিনষ্টি কি আর আজকের কেস? অনেক দিন ধরেই চলছে। এই শালা জটাধারী মহা ধড়িবাজ মাল। ধ্যানের নামে চালাত চোখ মারার খেলা। আর প্রসাদের প্যাকেটে করে চালান দিত প্রেমপত্র। সেই শিষ্যার কথাই বা কি বলব? সেও তো আর এক জিনিস! চোখের রসগোল্লা! ধ্যানমন্দিরে তাকে আশীর্বাদের নামে যা দেখেছি রে ভাই – তা আর না বলাই ভালো!

শ্রোতার দলে যারা, তাদের চোখ তো কপালে উঠে গেল। শুনছেন, চমকে চমকে উঠছেন আর বলছেন, ‘ তাই নাকি? বলেন কী? তাই নাকি……।?

এই “তাই নাকি” দাদারা হাওয়া মেরে মেরে আগুন আরো ছড়ালেন। ফুসে উঠলেন আর এক দল। এরা অ্যাকশান পার্টি। গলার আওয়াজ আরো চড়া। তারা শুরু করলেন – শালা, প্রেম কি চপ ফুলুরি? – যখন তখন কিনে খেলেই হল? – একটা লাজলজ্জা থাকবে না? – কেন, সময় থাকতে কে বাধা দিয়েছিল চাঁদু? – গোঁফ গজালো, দাড়ি কড়কড়ে হল, গায়ের চর্বিতে গোটা দশেক লেয়ার পড়ে গেল – তখন কী মদনা নাকে সর্ষের তেল মেরে ঘুমোচ্ছিলিস? এখন এই বুড়ো বয়সে ঘোড়া রোগ? ওই জিনিস সামলানো কী তোর কম্ম?

সকালে বিকেলে পাড়ার চা এর দোকানে তখন জটাধারীর নামে নিন্দেমন্দ। প্রেমের একপাল দুশমন যেন এককাট্টা। শুনতে শুনতে ভাবতুম এভারগ্রীনদার কথা। ‘মেছো গন্ধ’ আর ‘ম্যাও ম্যাও’ – এ দুয়ের দাপটেই ঝুনো-প্রেম কোণঠাসা। কষ্ট হত জটাধারীর জন্য। কিন্ত হুলিগানদের দাপটে খাপ খোলার সাহস হত না।

ম্যাওবাদীদের দাপটে মন্দিরের চাকরিটা খোয়া গেল জটাধারীর।

জটাধারীর প্রেমের এই দুর্দশার কথা এভারগ্রীনদাকে জানানোর খুব ইচ্ছে হত। মেছো গন্ধ আর ম্যাওবাদী হামলার কিছু অ্যান্টিডোট খুঁজে পেলেন কিনা – সেটা জানার ইচ্ছেও ছিল।

সেদিন হঠাৎ করেই এভারগ্রীনদার সাথে দেখা হল শেয়ালদা স্টেশনে। দেখা হতেই বললেন, পেয়েছি রে ভাই, পেয়েছি, এতদিনে সেই বেগুনের খোঁজ পেয়েছি।

– “কোন বেগুন? কী বেগুন?” – প্রশ্ন শুনে হো হো করে হাসতে হাসতে এভারগ্রীনদা বললেন, সেই মেছো গন্ধ কাটানোর বেগুন।

বললাম, কী ভুলভাল বলছেন? মেছো গন্ধ কি আর বেগুনে কাটে নাকি?

– সংস্কৃত পড়িসনি তো, জানবি কোত্থেকে? সংস্কৃতে আছে, “বার্তাকু সহযোগেন সর্ব মৎস্যা নিরামীষা”। মানেটা হল, বেগুন সহযোগে রাঁধলে সব মাছই নিরামিষ। মাছের সাথে যেমন বেগুন, প্রেমের সাথে তেমনি কয়েক ছটাক ভুত। মেশালেই প্রেম শুদ্ধ।’

– বলেন কি?

শোন তাহলে গল্প। গল্পের নায়ক আমার প্রতিবেশী স্বপন। রিটায়ার্ড। বেশ ছিল একা একা। হঠাৎ ভূতের আশীর্বাদে প্রেমে পড়ে গেল। ভূত আর কেঊ নয় – তারই প্রতিবেশী রতন। সেই রতনের ভূতের তাড়ায় সে বেচারী সকাল-সন্ধ্যে ছুটে যাচ্ছে রতনের বিধবার কাছে। দিবালোকে রসালাপ, খুনসুটি, খোঁপায় গোলাপ পর্যন্ত পরিয়ে দিচ্ছে। পথে ঘাটেও খুল্লম-খুল্লা ভালোবাসা।

-পাড়ায় নিন্দেমন্দ নেই?

– কিচ্ছুটি না। স্বপন তো আর স্বপন নেই। সব খেলাই তো এখন রতনের। লোকে বলছে, ‘আহা ভূত হয়েও বৌ এর জন্য কী টান দেখ রতনের!” পাড়ার সধবারা তো কর্তাদের চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে, ” দেখে শেখো, একে বলে প্রেম! মরার পরেও কী ভালোবাসা! বৌকে যেন চোখের আড়াল করতে চায়না।

– আর কর্তারা কি বলে?

– কি আর বলবে? গোঁজ মুখ করে শোনে আর হয়ত মনে মনে আপসোষ করে, হে ভগবান, এমন ভুত আমায় ধরেনা কেন!”

বলতে বলতে এভারগ্রীনদা হো হো করে হেসে উঠলেন। আমি বললাম, আপনার কোনো আপশোষ নেই তো?

এভারগ্রীনদা হাসতে লাগলেন। হাসতে হাসতে বললেন, “ভূত মিশিয়ে স্বপণ চালাচ্ছে। ভেবে দেখলুম, একই স্টাইল একই পাড়ায় চলবে না। ভগবানকে কোনোভাবে কাজে লাগান যায় কী না – তা নিয়েই এখন ভাবছি।

আমার অবাক চাহনি দেখে বললেন, “হাঁ করে তাকিয়ে কী দেখছিস? শোন ভাই, সমাজের খুব ওপরতলার কেষ্ট বিষ্টু যারা নন, তাদের প্রেমকে শোভন বানাতে হয় দুটোই মোটে রাস্তা – হয় ভূত আর নয় ভগবান। নয়তো সবই অশোভন -সেই মেছো গন্ধ আর ম্যাওবাদীদের ‘ম্যাও ম্যাও’ ঘ্যানঘ্যান। অন্য কোন নিরাপদ রাস্তা আপাতত জানা নেই।”

ফিরতে ফিরতে মনে হল, ভগবানকে ঠিকঠাক কাজে লাগালে জটাধারীর চাকরিটাও নির্ঘাৎ টিকে যেত!

তন্ময় চট্টোপাধ্যায়
জন্ম ১৯৭৩ সালে | বাঁকুড়া খ্রিশ্চান কলেজ থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতক | স্নাতকোত্তর রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে | পড়াশুনা শেষে সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা | সাহিত্যের প্রতো ভালোবাসা ছেলেবেলা থেকেই | সাহিত্য পাঠের আনন্দই মৌলিক লেখালেখির অনুপ্রেরণা | আনন্দমেলা পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত গল্প 'সন্ধি' |

4 COMMENTS

  1. হতাশ হলাম, একদম ভালো লাগেনি, অহেতুক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে মনে হল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here