সেদিন খুব স্পষ্ট বুঝেছিলাম অমিতাভের মত একজন মহাতারকাও কতখানি শ্রদ্ধা করেন ঋতুপর্ণ ঘোষকে

1379

ঋতুদার সঙ্গে যেদিন প্রথম আলাপ হয়েছিল, সেদিনটার কথা আমার বেশ পরিষ্কার মনে আছে | আমি তখন দিনভর খবর চলে এমন একটা বাংলা চ্যানেলে সদ্য যোগ দিয়েছি | শীতকাল | বিকেল সাড়ে পাঁচটাতেই অন্ধকার নেমে এসেছে | সকালে অফিসে এসেছি | ছুটি হওয়ার সময় হয়ে গেছে | এমন সময় আমারই এক সিনিয়র এসে বললেন, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও, তোমাকে ঋতুপর্ণ ঘোষের একটা ইন্টারভিউ করতে যেতে হবে | সাড়ে নটার স্পেশাল প্রোগ্রামে দেখাব |

আমি কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে একটু অসহায়ভাবে বলে ফেললাম, কিন্তু আমার সঙ্গে তো ওনার কোনও পরিচয় নেই, তাছাড়া কী নিয়ে ইন্টারভিউ…
পরিচয়ের দরকার নেই | আমি বলে দিচ্ছি | লাস্ট লিয়রের কাজ শুরু হয়েছে, সেটা নিয়ে বড় ইন্টারভিউ করে আনতে হবে | আধঘণ্টার প্রোগ্রাম |

বাড়ি ফেরার ভাবনা মাথা থেকে বেরিয়ে গেল | ক্যামেরা গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লাম | মনে বেশ একটু দোলাচল | ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছা বহুদিনের | সেদিক দিয়ে ব্যাপারটা খুবই ভাল | কিন্তু ভদ্রলোকের মেজাজ-মর্জি নিয়ে যেসব কথা শুনি, তাতে ইন্টারভিউটা যদি ঠিকমত করে আনতে না পারি, তাহলে আবার নতুন অফিসে মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি পড়বে | তাড়াহুড়ো করে বেরোতে হয়েছে | লাস্ট লিয়র নিয়ে ভাল করে কিছু জেনে আসারও সুযোগ হয়নি |

ভাবতে ভাবতেই গাড়ি পৌঁছে গেল বিজয়গড়ে | মাঝখানে কিছুদিন ঋতুদা নিজের ইন্দ্রাণী পার্কের বাড়ি ছেড়ে বিজয়গড়ে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে ছিল | সেখানেই গেছিলাম আমরা |

ছোট ফ্ল্যাট | বসার ঘরটাই সম্ভবত পড়ার ঘর | প্রচুর বইপত্রে ভর্তি | কাজের লোক এসে বলে গেল, একটু অপেক্ষা করতে হবে | বসে আছি | সেন্টার টেবিলের ওপর কিছু পত্র-পত্রিকার সঙ্গে দেখি রবীন্দ্রনাথের ‘অচলায়তন’ নাটকের বইটা রয়েছে | বিশ্বভারতীর হলুদ মলাটের বই | হাতে নিয়ে উল্টে দেখছি এমন সময় ঋতুদা ঘরে এল আর ঢুকেই বলল, খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে | দশ মিনিটের বেশি সময় দেব না |

আমার তো মাথায় বজ্রাঘাত | প্রোগ্রাম যে আধঘণ্টার | এদিকে শীতের সন্ধেতে ঋতুদার মুখে যেমন আষাঢ়ের অন্ধকার, তাতে আর কথা বাড়ানোর সাহস হল না | হাতের বইটা রেখে ক্যামেরাম্যানকে তৈরি হতে বলে সবে নোটবুকটা বার করেছি, হঠাৎ ঋতুদা বলল, ‘অচলায়তন পড়ছিলি?’

ভয়ে ভয়ে ঘাড় নাড়লাম |

‘আগে পড়েছিস?’ এবারও ডান দিকে ঘাড় কাত হল |

‘কতদিন আগে ?’

‘তা তো মনে নেই |’

ঋতুদা বলে চলল, কয়েকদিন ধরে আমি ‘অচলায়তনটা’ আবার নতুন করে পড়ছি | একটা কাজ করার ইচ্ছে হচ্ছে | আচ্ছা তোর কী মনে হয়, অচলায়তনের কোন জিনিসটা আজকের দিনে, মানে একেবার দৈনন্দিনে একটা খুব সহজ মেটাফর হিসাবে ব্যবহার হতে পারে?

শীতকাল | বিজয়গড়ের এদিকটায় বেশি মশা হয় বলে সব জানলা-দরজা বন্ধ | আমার একটু গুমোট লাগছিল | আর সেইজন্যই বোধহয় দুম করে বলে ফেললাম, আমার মনে হয় জানলা | মানে, জানলা খুলে দেওয়ার ব্যাপারটা রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখাতেই ঘুরে-ফিরে আসে | ডাকঘরে এসেছে | অচলায়তনেও উত্তরের জানলা খোলা বারণ, কারণ সেখানে একজটা দেবীর অধিষ্ঠান …

এতগুলো কথা একদমে বলে ফেলেই মনে হল, বোকার মত বলছি না তো? ঋতুপর্ণ ঘোষের দিকে তাকিয়ে দেখি মুচকি মুচকি হাসছেন,’ক্যামেরা রেডি হয়েছে? প্রোগ্রাম কতক্ষণের?’

‘আধঘণ্টা |’

‘ঠিক আছে | অচলায়তন মুখস্থ থাকে যে সাংবাদিকের তাকে আধঘণ্টা ইন্টারভিউ দেওয়াই যায় |’

ব্যস, ঋতুদার সঙ্গে ভাব হয়ে গেল আমার | ফোন নম্বর তুলে নিল নিজের মোবাইলে | বলে দিল আপনি বলার দরকার নেই আর দরকার পড়লে নিজেই ফোন করতে পারি | আমাকে যে পছন্দ হয়েছে সেটা বোঝানোর মধ্যে কোনও লুকোছাপা নেই | কারণটাও স্পষ্ট করে দিলেন –

‘সাংবাদিকদের অভ্যাস থাকে পেপারব্যাকের পিছনে লেখা সিনপসিসটা পড়ে নিয়ে বিজ্ঞের মত আলোচনা করা | তুই সেটা করিস না বোঝা গেছে |’

সেই বোঝার ইমপ্যাক্ট যে কতটা সেটা বুঝেছিলাম যখন লিয়র ছবির মুক্তি উপলক্ষে কয়েক মাস পরে অমিতাভ বচ্চন কলকাতায় এলেন | বৈদ্যুতিন মাধ্যমের হাতে গোণা দু-একজন সাংবাদিককে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে আলাদা ইন্টারভিউ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন ঋতুদা নিজে | তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম | সেই ইন্টারভিউ করতে পারাটা নিশ্চিত একটা বিশাল প্রাপ্তি | তবে সেদিন খুব স্পষ্টভাবে বুঝেছিলাম অমিতাভের মত একজন মহাতারকাও কতখানি শ্রদ্ধা করেন ঋতুপর্ণ ঘোষকে |

এই হল ঋতুদা | অসম্ভব তিক্ষ্ণধী | অগাধ পড়াশোনা | ওপর-চালাকি করার চেষ্টা করলে নিশ্চিত ধরে ফেলবে | তাহলেই কাছে যাওয়ার পথ বন্ধ | যা জানা নেই, খোলাখুলি বললে নিজেই বুঝিয়ে দেবে বিস্তারে | অসম্ভব মুডি | মন ভাল থাকলে যে কোনও বিষয় নিয়ে ফোনেই বহুক্ষণ গল্প হতে পারে | মন খারাপের দিনে ফোন ধরবেই না | অপেক্ষা করতে হবে কবে আবার সব ঠিকঠাক হয়, সেজন্য | যে বিষয়ে ভাবতেই পারিনি ইন্টারভিউ দিতে রাজি করাতে পারবে | তাতে অনায়াসে রাজি হয়ে যাবে | যাতে ভাবছি কোনও সমস্যাই হবে না, তাতে দিব্যি বলে দেবে,

‘না রে, আমার আজ ইচ্ছে করছে না | তুই অন্য কাউকে বল |’

সাংবাদিকতা করার সুবাদে প্রোথিতযশা মানুষজন, শিল্পী-সাহিত্যিক অনেকের সঙ্গেই পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে | কিন্তু ঋতুদার মত এমন রঙিন, আকর্ষণীয় কাউকে কখনও মনে হয়নি | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে যাঁরা ঘনিষ্ঠ ছিলেন তাঁদের লেখা-পত্রে অনেক সময় পড়েছি ব্যক্তিত্বের অদ্ভূত আকর্ষণের কথা | ঋতুদার মধ্যেও নিশ্চিত সেটা ছিল | হয়তো এইরকম তীক্ষ্ণ মেধা, অসম্ভব সংবেদনশীলতা-সৃষ্টিশীলতার মেলবন্ধন ঘটলে এমনটাই হয় |

ঋতুদার এই সৃষ্টিশীলতা বা কল্পনাশক্তির বিস্তার তাঁর লেখা-ছবি-পত্রিকা সম্পাদনা সবেতেই স্পষ্ট | প্রতিটি ছোটখাটো জিনিসকে তিনি কীভাবে গুরুত্ব দিতেন সেটা দু-একবার দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে | একটা ছোট্ট ঘটনার কথা বলি | তখন রবীন্দ্রনাথ তথ্যচিত্রের কাজ হচ্ছে | ছবির শ্যুটিং-এ ক্যামেরা নিয়ে হাজির হয়েছি | সমদর্শী অভিনয় করছে যুবক রবীন্দ্রনাথের ভূমিকায় | একটা নিচু জলচৌকিতে বসে বই পড়তে পড়তে সে চোখ তুলে একবার বাইরের দিকে তাকাবে | ডান দিক থেকে তার দৃষ্টিটা ধীরে ধীরে বাঁদিকে ঘুরবে | সমদর্শী দু-চারবার রিহার্সাল করল | পছন্দ হল না ঋতুদার |

বলল,’আমার হাতটার দিকে তাকিয়ে থাক | হাতটা যেভাবে মুভ করবে সেই অনুযায়ী চোখটা সরাবি |’ সমদর্শীর উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আঙুলগুলো দিয়ে অনেকটা পাখি ওড়ার মত ভঙ্গি করে আস্তে আস্তে হাতটা সরালো ঋতুদা | দৃশ্যটা ক্যামেরাবন্দি হয়ে গেলে, আমি ভারি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি আঙুলগুলো ওভাবে নাড়াচ্ছিলে কেন?

‘আরে আমি তো দেখাতে চাইছি রবীন্দ্রনাথ বই পড়তে পড়তে চোখ তুলে দেখলেন বাগানে এক ঝাঁক মৌমাছি একদিক থেকে অন্যদিকে উড়ে গেল | সমদর্শী তো আর রবীন্দ্রনাথ নয়, কবিও নয় | জন্মে মৌমাছি উড়ে যাওয়াও দেখেনি | দৃষ্টি তো ফ্ল্যাট হয়ে যাচ্ছে | সেজন্যই ওরকম করছিলাম, যাতে উড়ন্ত কিছু দেখলে যে রকম চোখের ভাব হয় সেটা অন্তত আসে |’

চমক লেগেছিল | শুধু সেদিন নয় অবশ্য | বহুবার, বহু ঘটনায় | চিন্তার অভিনবত্বে, মননের গভীরতায় লেখনীর মাধুর্যে এবং নিশ্চিতভাবে নিজস্ব মতামত প্রকাশের সাহস এবং বলিষ্ঠতায় |

ঋতুপর্ণ ঘোষ কেমন যেন একটু মেয়েলি | প্রসঙ্গটা কোনও আলোচনায় উঠলেই গড়িয়ে যেত কিছু হাসি-মস্করায় | আমার বলতে ইচ্ছে করত,কজন মেয়ে দেখেছ যারা ঋতুপর্ণর মত অমন কোমল-সংবেদনশীল? কজন পুরুষকে চেনো যাদের সাহস আছে অমন নিঃসংশয়ে নিজেকে প্রকাশ করার?

আমি তো ঋতুপর্ণ নই | তাই সব সময় বলতে পারিনি | আর পারিনি বলেই বোধহয় কয়েক বছর আগে ৩০ মে নিজেকে অমন অসহায় বোধ হয়েছিল | কোনও অনাত্মীয় তো নয়ই, কোনও আত্মীয় বিয়োগেও অমন শূন্যতা বোধ হয়েছে কিনা সন্দেহ | সকাল বেলাতেই অফিসে গেছিলাম সেদিনও | খবরটা আসার পর থেকে নিখুঁতভাবে নিজের দায়িত্বও পালন করেছিলাম | ইন্দ্রাণী পার্কের বাড়ি থেকে যখন বার করা হল ঋতুদাকে, টেলিভিশনের পর্দায় পদ্মের পাপড়ির মত সেই বুজে থাকা চোখ দুটোর দিকে একবার তাকিয়েই দৃষ্টি সরাতে হয়েছিল | বিকেলে ছুটি হলে গেলাম রবীন্দ্রসদন | গলা থেকে অফিসের কার্ড খুলে নিয়ে আপামর জনগণের সঙ্গে লাইনে দাঁড়ালাম দাঁড়ালাম, আর একবার শুধু দেখব বলে |

ফেরার পথে রবীন্দ্রসরোবরের লেকের ধারে একলাটি বসেছিলাম অনেকক্ষণ | চোখে জল ছিল না | শুধু একটা হা-হা অনুভূতি |

ফোন আসত ভোরবেলায় | আমিও করতাম ভোরেই, অফিস যাওয়ার পথে | এখনও মাঝে মাঝে সকালে অফিস যাওয়ার সময় মনে হয়, আচ্ছা এই ব্যাপারটা একটু ঋতুদার সঙ্গে আলোচনা করে দেখলে হয় না?

পরক্ষণেই ভুল ভাঙে, দূর বাবা | চলেই গেল মানুষটা | এত তাড়াতাড়ি না গেলে যেন চলছিল না |

নিজেকেই সান্ত্বনা দিই, ঋতুদা যে আলোর পথের যাত্রী | ও যে থামতে জানে না | ওর প্রতিভার বিচ্ছুরণই হয়তো আমাদের নতুন পথের সন্ধান দেবে |

(পুনর্মুদ্রিত)

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.