সুমন সরকার
পড়াশুনা প্রেসিডেন্সী কলেজে স্ট্যাটিস্টিকস নিয়ে । বর্তমানে আইএসআই , কলকাতায় ডক্টরেট করছেন । ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে লেখালিখি শুরু । যেভাবে গীটার বাজিয়ে গান গাইতে ভালো লাগে , সেভাবে লিখতে ভালো লাগে , তাই লেখেন । লিখেছেন রম্যগদ্যের দুটো বই- 'লাকি থারটিন' , 'ফাউ' ।

অফিসটার ছাদের উপর মুখোমুখি দুটো চেয়ার । ছাদটা সন্ধের পর একদম ফাঁকা হয়ে যায় । বিকেলের পর সময়টা যখন সন্ধ্যা নামক নিউট্রাল গিয়ারে নিজেকে রেখে চোখ রগড়ে ভাতঘুমের পিছুটি পরিষ্কার করে ,তখন থেকে সুবিনয় ছাদে ঘুরে বেড়ায় । অতো উঁচু ছাদে সন্ধের শাঁখ শোনা যায় না ,শুধু কানে আসে কলকাতার এক ব্যস্ত রাস্তার ব্যাকরণ মেনে চলা কোলাহল । তারপর সে এসে বসে একটা ফাঁকা চেয়ারে । অফিস থেকে কর্মী ছাড়াও অনেক আসবাবও অবসর নেয়, কেউ সময়ে কেউ বা সময় পেরিয়ে । সেরকম দুটো চেয়ারের একটায় সে এসে বসে ,আর একটা তাঁর সামনে । চেয়ারগুলো অবসর নিয়েও হয়তো অফিসের সঙ্গে এক মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে গেছে । রোজ সন্ধ্যায় সামনের শূন্য চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে অনেকটা সময় কাটায় সুবিনয় । ওই শূন্য চেয়ারটা ওঁর একাকিত্বকে ডিফাইন করে । মোবাইলের আলোটা হঠাৎ জ্বলে ওঠে , মোবাইল কোম্পানির মেসেজ আসার ফলে । মোবাইলের স্ক্রিন সেভারে তারিখটা ফুটে ওঠে , ১৪ ই ফেব্রুয়ারি !  ভ্যালেনটাইন্স ডে । এইদিন গোলাপের দাম বেড়ে যায় , বেড়ে যায় হার্ট শেপের লাল বেলুনের বিক্রি , শপিং মলে অফার চলে । এমন একটা দিনে হয়তো রাস্তায় হাতে হাত ধরে চলা ছেলেমেয়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী । তাতে ওঁর কি !  ওঁর সামনে অমোঘ বাস্তবের মতন বসে আছে একটা শূন্য চেয়ার । ওঁর জীবনেও একসময় সামনে বসা একটা মানুষ ছিল । চেয়ারের গদিতে শূন্যতা নয় উষ্ণতা ছিল , কারো দীর্ঘ উপস্থিতির উত্তাপ । এখন সময় পালটে, কারো Absence  যেন মৃত্যুর মতন শীতল । সেই অনুপস্থিত মানুষটা হয়তো একই শহরে সিনেমা হলের অন্ধকারে কারো হাতের উপর হাত রাখছে , কিম্বা কাঁধে মাথা , কিম্বা আলগোছে চুম্বন !  ওঁর প্রেমিকার চোখের ভাষা আজ অন্য কেউ পড়ছে , স্বরলিপি একই আছে গান পালটে গেছে । কানে গোঁজা হেডফোনে গান বাজে –  “সে চলে গেলেও থেকে যাবে তার স্পর্শ আমারই হাতের ছোঁয়ায় , নুয়ে পড়বেই স্মৃতিরা যেখানে , দেবদারু তার কপাল নোয়ায়” । মনখারাপের মেসেজের রিপ্লাই আসবে অনেক পরে – “যোগাযোগ নেই , যোগ আছে ।” 

Holi Hai

কনট্রাকচুয়াল পদে কর্মরত সামান্য বেতনের উচ্চ শিক্ষিত সুবিনয়ের কাছে ভ্যালেনটাইন্স ডে , হয়তো অন্যান্য দিনের মতই একটা শূন্য চেয়ারের সঙ্গে কাটানো কিছুটা সময় । হয়তো অন্যদিনের তুলনায় শূন্যতা খানিকটা গাঢ় , স্মৃতির কামড় একটু বেশীই গভীরে দাঁত বসায় । হয়তো ভ্যালেনটাইন্স ডে ওঁর কাছে প্রেম নয় , শূন্যতার উদযাপন । সুবিনয় হয়তো অনেকেই , কিম্বা কেউ নয় ! 

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১৯)

বাঙালিদের দুখানা ভ্যালেনটাইন্স ডে । একটা সরস্বতী পুজোর দিন আর একটা ১৪ ই ফেব্রুয়ারি ।  প্রেমের জন্য আদৌ কোনো দিন হয় নাকি ! দিবসের ধারনাটা উদযাপনের জন্যই । রোজকার জীবনের মোটাচালের ভাত যদি একদিন সরু-সুগন্ধি চালের হয় । মন্দ কি ! সরস্বতী পুজো সবার ভ্যালেনটাইন্স ডে , যাদের জীবনের প্রেম আছে তাঁদের , যাদের নেই তাঁদেরও । ১৪ ই ফেব্রুয়ারি শুধু তাঁদের জন্যই , যাদের জীবনে একটা সম্পর্ক আছে , যে সম্পর্কের জামায় দাম্পত্যের ভাঁজ পড়েনি । সেই দাম্পত্যের ভাঁজ কোনো ইস্ত্রি সমান করতে পারে না । মেয়েদের সব তারিখ-টারিখ মনে থাকে । কিস ডে , রোজ ডে , ভ্যালেনটাইন্স ডে । দিন ভুলে যাবার অভ্যাস ছেলেদের । এমনকি প্রেমিকার জন্মদিন , অ্যানিভারসারিও ভুলে যায় অনেকে । সব ঠিকঠাক যারা মনে রাখে তাঁরা হয়তো প্রেমিক নয় ।

প্রেম তো আসলে একটা মিউজিক্যাল চেয়ার খেলার মতন । অসহায় প্রেমপ্রার্থীর দল এক পূর্বরাগের রেকর্ড শুনে ঘুরে চলেছে ,যখনই মিউজিক থেমে যাবে ,কোনো এক ভাগ্যবান পেয়ে যাবে প্রেমিকের চেয়ারখানি । কিন্তু,আদৌ সে কি প্রেমিক !  নাকি ভাগ্যবান মাত্র !  হয়তো আসল প্রেমিক চেয়ার থেকে বেশ খানিকটা দুরে থমকে দাঁড়িয়েছে । আর কটা স্টেপ এগিয়ে দাঁড়ালেই তো তাঁর ভালবাসার পেতে পারতো কেউ , কিম্বা  সে পেতে পারতো কারোর ভালোবাসা !এই যে আমরা প্রেমে পড়ি , প্রেম করি এগুলো সবকিছুই কেমন যেন বাচ্চাদের পাজেল গেমের মতন নয় কি !  যেন সবকিছুই আছে , স্রেফ আপনাকে জুড়ে জুড়ে সম্পূর্ণ অবয়ব দিয়ে , ভাগ্যের ফাইনাল টাচের অপেক্ষা করতে হবে । পিস্তল , রাইফেল , মেশিনগান সব কিছুই একটি নির্দিষ্ট রেঞ্জ অবধি ফায়ার করতে পারে , রেঞ্জের বাইরে বুলেট একটা অর্থহীন পূর্ণছেদ মাত্র ! আমাদের প্রেমটাও এই রেঞ্জ মেনে চলে । আমরা হয়তো টিউশনির ব্যাচে , গানের ক্লাসে , ইস্কুলে , কলেজে , ইউনিভার্সিটিতে , বা অফিসে কারো প্রেমে পড়ি । প্রেম হয়তো সফল হয় , তারপর দাম্পত্য আসে , একসঙ্গে জীবন কাটে । কিন্তু,  সেই প্রেমটা কি আসল প্রেম ছিল !  Real Love  বলতে যা বোঝায় , সেরকম ছিল কি ! 

Real Love  বলতে আমরা আদৌ কি কিছু বুঝি !  নাকি সবটাই কিছু অনুভূতির ভোজবাজি মাত্র !  নাকি মেনে নিতে হয়েছে , অভ্যাস হয়ে গেছে !  নাকি প্রেম করতে হবে বলেই ,  যা জুটেছে তা দিয়েই কাজ চালিয়ে নেবার মতন বোকামি , যেখানে একাকিত্বের হিউমেন হরমোনের হাহাকারটাই মুখ্য !  কোনো এক অমিতের সঙ্গে কোনো এক মধুরিমার কলেজে আলাপ , প্রেম । কে বলতে পারে , অমিতের আসল প্রেম হয়তো ওঁর থেকে ছশো মাইল দুরে কোথাও অপেক্ষা করছিল । কিম্বা মধুরিমার আসল প্রেম হয়তো , অমিতেরই এক বন্ধু , যে মুখ ফুটে বলে উঠতে পারেনি । অমিত আর মধুরিমা সেই প্রেমের রুবিক কিউবটা সলভ করে ফেলেছে , সম্পর্ক হয়েছে । আসল প্রেম হয়তো অধরাই !  কেউ কেউ বলেন Real Love  তো ঈশ্বরের মতন । ঈশ্বরকে দেখা যায় না , বিশ্বাস করতে হয় । ধরে নিতে হয় ভগবান , যীশু বা আল্লাহর মধ্যে তিনি আছেন । অমিত , মধুরিমা সেই Real Love  বলতে নিজেদের প্রেমটাকে ধরে নিয়েই জীবনের অনেকটা বা খানিকটা সময় কাটিয়েছিল । নাস্তিকও প্রেমের কাছে বোকা বনে যায় । সে ঈশ্বরকে অবিশ্বাস করে , প্রেমকে করতে পারে না । নাস্তিকও প্রেম করে । নাস্তিকতা প্রেমের কাছে এক দানেই চেক মেট হয়ে যায় , খেলার সুযোগ পায়না ।

আরও পড়ুন:  দম্পতি

আমাদের স্কুলের মাস্টারমশাই ঋত্বিকবাবু একদিন বাংলা রচনার ক্লাস নিচ্ছিলেন । আমরা তখন ক্লাস টেনে পড়ি , আর বাংলা রচনাটা বাজারি মানেবই থেকে মুখস্থ করে নিই । এক অলীক নিয়মে সবাই প্রশ্নপত্র ছুঁয়েই বাংলা রচনা কমন পেয়ে যায় । সেদিন ঋত্বিকবাবু আমায় বলেছিলেন – “একটা গ্রামের বর্ণনা ব্যস্ত শহরে বসেই সবচেয়ে ভালো লেখা যায় ।”  ভ্যালেনটাইন্স ডে অনুভব করতে পারে তারাই , যাদের জীবনে সেই সময় প্রেম নেই । পানের দোকান থেকে ঝুলন্ত দড়ির আগুন থেকে গোল্ড ফ্লেক ধরিয়ে কেউ যখন দেখে পাশের ফুলের দোকানে সুন্দর পোশাক পরা একটা ছেলে গোলাপের জন্য দরাদরি করছে , সে বুঝতে পারে ওই দিনটার মানে । বাকিরা হয়তো প্রেমের দিবসের উদযাপন করে নিয়মরক্ষা করে মাত্র । মন জুগিয়ে না চললে তো মান , অভিমান । গ্রিটিংস কার্ড বা গোলাপ আনতে ভুলে গেলে তো কয়েকদিনের ঝগড়া !   

ভালবাসার কাঙালপনা সবাই করে । দাঁতে দাঁত চিপে সহ্য করতে হয় যন্ত্রণা , চকচকে স্মার্ট ইয়ার্কির মোড়কে লুকিয়ে থাকা তেতো অপমান । ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ছবির শুরুর দিকে সাদা এম্বাসাডরের ভেতর শেখরের মুখের উপর হরি যেমন বলেছিল – “তোমার জোটে না তাই ।” প্রেমের চাকরির নিরিখে যারা বেকার , তাঁদের কি সত্যিই জোটেনি !  কিছুক্ষণ আগেই বলতে চেয়েছি ,তথাকথিত ভালবাসা আপনি যে বৃত্তে আছেন তার উপর নির্ভরশীল । যাদের ‘জোটেনি’বলে গঞ্জনা সহ্য করতে হচ্ছে , হয়তো অন্য কোনো বৃত্তে থাকলে তাঁরা পেয়ে যেতে পারতেন ভালবাসার মানুষটিকে । কিম্বা সেই মিউজিক্যাল চেয়ার খেলায়  ওই ‘জোটেনা’র দল পিছিয়ে পড়েছিল । মুখ ফুটে বলতে পারেনি । ভালবাসার কথা বললে তো অপমানিত হতে হয় । তখন ভালবাসা যে আসলে একরকম রাজনীতি ,ধান্দাবাজি সেটাই যেন ফুটে ওঠে । ‘তুই ভাবলি কী করে , আমার সঙ্গে প্রেম করবি’ –  এমন উত্তরের ভয়ে কত প্রেমের ভ্রূণহত্যা হয়েছে কেউ খবর রাখেনি । ডিপ মাস্কারায় আশকারা ছিলনা , ছিল রিজেকশন । কীসের ভালবাসা !  কীসের প্রেম ! পাত্তা দেবে না ,ঘাস দেবে না ,অওকাত নেই , এমন সব বুলিতে ভারাক্রান্ত প্রেমের লিটারেচর । কেউ কেউ যেন প্রেম করে দয়া করেন ! প্রেমিক বা প্রেমিকা কি মাল্টিপল চয়েস পরীক্ষার অপশন ! যেখানে দুলকি চালে দোনামনা ,ওইটা ঠিক না এইটা ! ‘টাক নেই ,টাকাও নেই’ভালো? নাকি ‘টাকা আছে টাকও আছে’ভালো !দিনের শেষে তো ওই কথাটাই সত্যি ,জো জিতা বহি সিকন্দর !   ওই যে মানুষটা মিউজিক বন্ধ হতেই চেয়ারে বসে পড়েছিল !  যারা পারেনি ,তাঁরা ময়দান চত্বরে লেবু-চায়ের থেকে ওঠা একাকিত্বের ধোঁয়ার ফুঁ দিয়ে কাঁধে মাথা রাখা ভালবাসাগুলোর দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে । শীতকাল আসুক বা না আসুক ওঁদের চুম্বনস্পর্শশূন্য ঠোঁট সবসময় শুষ্ক ,ফ্যাকাসে ,সাদা চামড়া উঠছে । ঠোঁটগুলোয় প্রেমহীনতার রক্তাভ ভাঁজের রেখা স্পষ্ট । এই প্রেমহীনতা বন্ধ ঘরের দেওয়াল থেকে ছিটকে এলে বিনা নোটিসে আসা কান্নার মতন গিলে নেয় ওঁরা । তারপর হাতড়ে বেড়ায় চারিদিক । খুলে বসে ফেসবুক । খুঁজে বেড়ায় ,যদি কেউ থাকে । ফেসবুকে অংশুমিত্রা , শ্রেয়সী , মধুমিতা , সুপর্ণা , শিঞ্জিনী ,সবাইকেই তো ভালো লেগেছে কখনো না কখনো । দুর্গাপুজোর সময় গড়িয়াহাটে দাঁড়িয়ে একটা লোক , ছোট্ট খেলনা দিয়ে সাবানগোলা জল থেকে গুচ্ছ গুচ্ছ রঙিন বুদবুদ বার করে । এই অংশুমিত্রা , শিঞ্জিনীরা ওই রঙিন বুদবুদগুলোর মতন , উপরে উঠে আলোয় কিছুক্ষণ চিকচিক করে , তারপর ভ্যানিশ হয়ে যায় ।

আরও পড়ুন:  ভানুমতী কিংবা সরস্বতী কা খেল!

1 COMMENT

এমন আরো নিবন্ধ