সুমন সরকার
পড়াশুনা প্রেসিডেন্সী কলেজে স্ট্যাটিস্টিকস নিয়ে । বর্তমানে আইএসআই , কলকাতায় ডক্টরেট করছেন । ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে লেখালিখি শুরু । যেভাবে গীটার বাজিয়ে গান গাইতে ভালো লাগে , সেভাবে লিখতে ভালো লাগে , তাই লেখেন । লিখেছেন রম্যগদ্যের দুটো বই- 'লাকি থারটিন' , 'ফাউ' ।

এ পৃথিবীতে কিছু জিনিসের কখনোই সমাধান হবে না । যেমন ভারতে কাশ্মীর সমস্যা , শাশুড়ি বউমার সমস্যা , আর লোকাল ট্রেনে ঝগড়া । একটা লোকাল ট্রেন অমুক স্টেশন থেকে শুরু থেকে তমুক স্টেশন অবধি যাচ্ছে , আর তার একটা কামরাতেও ঝগড়া হচ্ছে না , এটা অবাস্তব ঘটনা । সব ঝগড়াই অমীমাংসিত । ঝগড়ার মধ্যে বিজ্ঞান নেই , রাজনীতি আছে । সুতরাং ঝগড়া যে ঢপের চপ হবে এতে সন্দেহ নেই । ভারতবর্ষের মতন সুন্দর একটি দেশ রাজনীতি নামক গোবরে সেই যে পড়েছে , আর উঠতে পারেনি । এই দেখুন আমিও রাজনীতি করে বসলুম । গু না বলে গোবর বললাম , এতে খিস্তিও করা হল , আবার পবিত্রতাও অটুট রইলো ।

যিনি ট্রেনের সিট বানিয়েছেন , তিনি চপে চুল মাপ নিয়েছেন । তিনজনের নয় , আবার চারজনেরও নয় । বলা উচিত সাড়ে তিনজনের একটা সিট । মানুষ তো আদ্ধেক হয় না । কিন্তু, ভগবান ( যদি থেকে থাকেন ) মানুষ বানাবার সময় বুঝতে পেরেছিলেন এই মানুষের মাথায় একদিন এমন বুদ্ধি হবে যে তাঁরা লোকাল ট্রেন বানাবে যেখানে সিটে সাড়ে তিনজন বসবার মতন জায়গা থাকবে । খেয়াল করে দেখুন মানুষের হাত , পা , চোখ , মাথা , কান ইত্যাদি সব কিছুই গোটা গোটা , শুধুমাত্র পোঁদটাই দু-আধখানা । কারণ , এই আদ্ধেক পোঁদ দিয়েই সাড়েতিন নম্বর ব্যাক্তি হয়ে লোকাল ট্রেনের সিটে বসতে হবে । এই আদ্ধেক পাছাও অনেকসময় সিটে ধরে না । এই আদ্ধেক ঝুলে থাকা প্যাসেঞ্জারের পাছাই হল পাক অধিকৃত কাশ্মীর , যা ছায়াযুদ্ধের জন্ম দেয় । এই সাড়ে তিন নম্বর অভাগার মনে হয় , নিশ্চয় জায়গা আছে । সিটে বাকি তিনজন তাঁকে দিচ্ছে না । নিশ্চয় ওঁরা দলবাজি করছে ডেলি প্যাসেঞ্জার বলে । তাই বলতে হয় – ‘দাদা , একটু সরে বসবেন’ । সিটে তিনজন বসে ছিলেন । জানলার ধারের লোকটি মুখ হাঁ করে ঘুমিয়ে আছে । বাকি দুজন কানে ইয়ারফোন গুঁজে স্মার্টফোনে মগ্ন । তিনজন চেষ্টা করলেন চেপে বসার , মানে দেখালেন যে তাঁরা চেষ্টা করছেন । সাড়ে তিন নম্বর ব্যাক্তিটি দেখলেন তাঁর জায়গার ক্ষেত্রফল একটুও বাড়েনি । তাই তিনি গলার জোর বাড়িয়ে বললেন – ‘দাদা , আর একটু চাপা যাবে না’ । বাকি তিনজন নিজের নিজের জায়গায় একটু দুলে উঠলেন । যেন মনে হবে , তাঁরা প্রাণপণ চেষ্টা করছেন সরে যাবার , আসলে তাঁরা নিজের জায়গায় বসে গা টা নাড়িয়ে দিলেন । ট্রেনে ঝাঁকুনি এই গা নাড়িয়ে দেবার কাজটা করে দেয় সুনিপুণভাবে । সাড়ে তিন নম্বর ব্যাক্তিটি এবার রেগে যাবেন – ‘আরে এতো জায়গা রয়েছে , আর একটু সরা যায় না !’ কান থেকে ইয়ারফোন খুলে কেউ উত্তর দেবেন – ‘অতো জায়গা যখন দেখছেন , ফ্ল্যাট বানিয়ে ফেলুন’ । সাড়ে তিন নম্বর ব্যাক্তি মুখটা বাংলার পাঁচের মতন করে চাপ দিতে থাকেন , যদি কোনোভাবে নিজের জায়গাটা একটু বাড়ে ! তিন নম্বর লোক খচে যান এই অপ্রত্যাশিত চাপে । তিনিও চাপ দিতে থাকেন । এভাবেই লেগে যায় ঝগড়া । মুশকিলটা হল সবাই জানে , যেদিন যার কপালে এই সাড়ে তিন নম্বর হওয়া লেখা আছে , সেদিন তাঁকে ভুগতেই হবে । এতো চাপাচাপিতে কেউই নিজের জায়গা একটুও বাড়িয়ে উঠতে পারে না , শুধুমাত্র নিজেদের ঘামের গন্ধ বিনিময় করে নেয় ।

Banglalive

ট্রেনে সবাই রাগী । সবাই মস্তান । একটু পায়ে পা লেগে গেলেই এমন ভাব করে যেন তাঁর বউ নিয়ে পালাচ্ছেন ! কেউ কেউ ঝগড়ায় ফোড়ন দেয় । ধরুন ঝগড়াটা পেচ্ছাপের অন্তিমপর্বের ধারার মতন হয়ে আসছে , তখন কেউ একটা ‘ছোটলোক’ , ‘পেটে শিক্ষা নেই’ , ‘আনকালচার’ এমন কিছু বলে উঠবে । ব্যাস , তখন আর দেখে কে । কেউ হয়তো একমুখ পান নিয়ে বসে ছিলেন । ঝগড়া জমে উঠেছে দেখে নিজেও কিছু ইনপুট দেবেন ভাবলেন । তাই জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পিচকারির মতন পিক ফেললেন । ঝগড়ার সময় কেউ একটা বড় বাতেলা মেরেই চারিদিকটা একবার ঘুরে তাকিয়ে নেয় । মানে কে কে ওঁর সঙ্গে আছে , দলটা ভারি কিনা । বরাহ এবং ডেলি প্যাসেঞ্জার দুজনের গর্ব একটাই , তাঁরা দল বেঁধে আসেন । উলটো দিকে যে দলহীন বেচারি ঝগড়ায় ফেঁসে গেছে সে প্রথমে প্রচুর তেল নেবে । কারণ , ট্রেনে উঠলেই বাঙালির ভেতরের উত্তম কুমার সত্ত্বার মৃত্যু ঘটে , অ্যাংরি ম্যান জেগে ওঠে । তাই , সে প্রথমে খুব উড়লেও , ডেলি প্যাসেঞ্জার গ্যাং এর সামনে পড়ে তাঁর ফুয়েল ফু হয়ে যায় । ফলে , সকলের কাছে প্রভূত চাট খেয়ে গেটে ঝুলতে ঝুলতে গন্তব্যে পৌছায় । এ প্রসঙ্গে বলতে হয় , ট্যালেন্টেড , সুশিক্ষিত লোকজন কখনোই দল বেঁধে আসেন না । ফলে , বরাহকূল থুড়ি ডেলিপ্যাসেঞ্জারকূল , যাদের জীবনের মূল অহংকার ‘দল বেঁধে ট্রেনে আসাযাওয়া’ তাঁদের মধ্যে ট্যালেন্টেড , সুশিক্ষিত মানুষ পাওয়া বেশ কঠিন । শুধু তাই নয় দীর্ঘদিন ট্রেনে যাত্রা করাও এই ঝগড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ । এই যেমন কিছু কিছু চাকরীর ক্ষেত্রে ওয়ার্ক এক্সপিরিয়েন্স খুবই জরুরি । তেমনি ট্রেনে ঝগড়ার ক্ষেত্রেও আপনার কদিন ট্রেনে যাতায়াতের অভিজ্ঞতা আছে সেটা ম্যাটার করে । অনেকেই ঝগড়ার মাঝখানে জিজ্ঞাসা করে বসেন – ‘কদিন যাতায়াত করছেন ট্রেনে ?’ কারণ, ওই মুহূর্তে সেই ব্যাক্তি বড় অসহায় । ঝগড়া চালিয়ে যাবার মতন উপযুক্ত অপযুক্তি নেই তাঁর ভাঁড়ারে । তাই , এবার ব্রম্ভাস্ত্র – ‘কদিন যাতায়াত করছেন ট্রেনে ?’ যদিও গোটা ঝগড়ায় চলা সবরকম বাজে ভাঁটের মধ্যে এটিই একমাত্র যুক্তিপূর্ণ কথা , যার উপরে দার্শনিকের লাল চেরিফল শোভা পাচ্ছে । সত্যিই , কেউ যদি দীর্ঘদিন লোকাল ট্রেনে যাতায়াত করে থাকেন তাহলে ট্রেনের নানান প্রাণী এবং তাঁদের নানান অসভ্যতা সম্পর্কে তাঁর অবগত হয়ে যাওয়া উচিত । যদিও কেউ কেউ বোধিলাভের করেও ধোবিলাভ করেন । আসলে ধোবি নয় ধোবির গাধাটিকে লাভ করেন তিনি , কারণ সেই গাধার মেধা এবং নিজের টকে যাওয়া মেধার মধ্যে তিনি সাদৃশ্য খুঁজে পান ।

Banglalive

যারা ট্রেন বানিয়েছিলো , তাঁরা শুধু সাড়ে তিনজনের সিট বানিয়ে ক্ষান্ত হননি । তাঁরা বুঝেছিলেন , এই সিট সংক্রান্ত ঝগড়া শুধু সিটেই সীমাবদ্ধ । তাই , ঝগড়ার সাম্রাজ্য বিস্তার করতে তাঁরা ট্রেনের গেট বানিয়ে দিয়েছেন । গেটে সবচেয়ে বেশী হাওয়া আসে । আমাদের রাজ্য হল পচা গরমের রাজ্য । ফলে বেশীরভাগ সময়ে চূড়ান্ত গরমে ধেবড়ে যাওয়া আমআদমি একটু গেটের হাওয়া খেতে চান । কিন্তু, অনেকের মনেই এমন চাওয়া আছে । এদিকে গেটে অত জায়গা নেই । আবার যারা সিটে বসে আছেন , বা দুই সিটের মাঝখানে চ্যানেলে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁদেরও হাওয়া চাই । এদিকে অনেকে গেটে দাঁড়াবার ফলে হাওয়া আটকে যাচ্ছে , সিট এবং চ্যানেল অঞ্চলের আদিবাসীরা হাওয়া পাচ্ছেন না । কাজেই আবার ঝগড়া । আগেই উল্লেখ করেছি , ট্রেনে যারা যাতায়াত করেন তাঁরা সকলেই রাগী । যারা গেটে দাঁড়ান , তাঁরা আরও রাগী । ফুটো ক্রিমিনাল বলাই যায় । তাই , তাঁরা রেলা নিয়ে ‘ট্রেনের হাওয়া গার্ড’ করেন । রেল ও রেলা একসঙ্গে চলে । কিছু বললে লেগে যায় ঝামেলা । এই ঝামেলা ভারি অদ্ভুত । দুজনেই দাবী করে – ‘গায়ে হাত দিয়ে দেখা’ । কিন্তু, কেউই গায়ে হাত দিয়ে উঠতে পারে না । এ বলে ‘তুই দে’ , ও বলে ‘তুই দে’ । এই করতে করতে হাওড়া বা শিয়ালদহ এসে যায় । কেউই কিছু দিয়ে উঠতে পারে না । অনেকসময় কেউ ধমকি দেয় , ‘তুই হাওড়ায় নাম , তোকে দেখে নেবো’ । এক্ষেত্রেও কেউই কাউকে দেখে নিতে পারে না । তবে এইধরনের ঝগড়ায় যেটা হয় , অনেকক্ষণ চলার পর দুই পক্ষের কেউ একটা নেমে যায় । সে নেমে গিয়ে কাঁচা খিস্তি দিয়ে যায় । ট্রেন থেকেও পালটা খিস্তি উড়ে আসে । ট্রেন ছেড়ে দেবার পর , যে নেমে গেলো আর যে ট্রেনে থেকে গেলো , দুই পক্ষই দাবী করে আর একটু হলেই কেলিয়ে সিধে করে দিতো । নবারুণ বাবুকে স্মরণ করে বলা যায় এরা শুধু খচ্চর নয় , এরা অসহায় ।

Banglalive

স্মার্ট ফোন এসে ট্রেনে ঝগড়া একটু কমেছে । লোকে সারাক্ষণ ফোন খুঁটে চলেছেন । এমনকি ট্রেনে যেতে যেতে যাদের নাক খোঁটার , পোঁটা গোল পাকাবার , পায়ের দাদ চুলকানোর দীর্ঘদিনের অভ্যাস তাঁরাও সেই অভ্যাস ছেড়ে স্মার্টফোন খুঁটছেন । তাঁরা একসময় ট্রেনের দাগী ঝগড়ুটে ডেলিপ্যাসেঞ্জার ছিলেন । এখন স্মার্টফোন হাতে পেয়ে সৎপথে ফিরেছেন । কিন্তু, যারা বসার জায়গা পায়নি , এমনকি দাঁড়িয়ে স্মার্টফোন খোঁটার উপযুক্ত জায়গা পাননি , তাঁদের তো একটু ঝগড়া করতেই হয় । এখন আবার অনেকে ছোকরা বান্ধবী সমেত ওঠেন । এইটা দেখে অনেকেই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন । এদিকে যে ছোকরা বান্ধবী নিয়ে উঠেছে সে চোখে ফুটপাথের সানগ্লাস পরে আর কানে ইয়ারফোন গুঁজে পৃথিবী উদ্ধার করে ফেলেছে ভাবছে । সে তাঁর বান্ধবীর সামনে দাঁড়িয়ে হলদে দাঁত বার করে বকবক করছে । ওঁদের দেখে অনেকেরই মনে হচ্ছে ওঁরা যেন ট্রেনে বেশী জায়গা নিয়েছে । অথচ ওঁরা বেশ চিপকে রয়েছে । ওঁরা দুজন যদি অচেনা ছেলে মেয়ে হতো তাহলে অনেকটা গ্যাপ রেখে দাঁড়াবার চেষ্টা করতো । সেক্ষেত্রে জায়গা কিন্তু বেশীই লাগতো । কিন্তু, যেহেতু একটা ছেলে তাঁর বান্ধবীর গাঁ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গপ্পো করছে , সেই দৃশ্য দেখে অনেকেই ভাবছে ওঁরা প্রয়োজনের তুলনায় জায়গা বেশী নিয়েছে । একহাতে তালি বাজে না । ফুটপাথের সানগ্লাসওয়ালা ছেলেটি যে দেবসিনেমায় শিক্ষিত সে নিজেকে রংবাজ ভাবে । কাজেই তাঁর সঙ্গে দুএকজনের ঝগড়া লাগতে বাধ্য । এরা বুড়ো লোক । ফলে , কিছুক্ষণ পরেই ছেলেটিকে শুনতে হবে – ‘বড়দের সঙ্গে তর্ক করছো কেন ?’ আমাদের ছোটো থেকে শেখানো হয় যে বুড়োভাম মানেই সঠিক কথা বলেন । আজকাল সবার হাতেই স্মার্টফোন । তাই , এমন ঝামেলা দেখলে তাঁরা মোবাইল বার করে রেকর্ড করার প্ল্যান করেন । একবার যদি ভালো ফুটেজ মেলে , তাহলে ফেসবুকে অনেক লাইক শেয়ার মিলবে ।

Banglalive
আরও পড়ুন:  বেলাশেষের আলো

3 COMMENTS

  1. সুমন তোমার অনুসন্ধিৎসু চোখ আর রসবোধের সত্যি তুলনা হয়না ।

  2. Suman tomar lekha porte khub valo… akhono porjonto ja likhecho banglalive e porar chesta korechi somoy khuje……..aro likho ……….

এমন আরো নিবন্ধ