খুব প্রচলিত একটি ধারণা আছে—নারী যুদ্ধ লাগাতে পারে, নারী আবার যুদ্ধ থামাতে পারে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়, ট্রয়ের হেলেন বা দ্রৌপদীর কথা। কিন্তু ইতিহাস একটু অন্যরকম বলছে। ঐতিহাসিকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই যৌনতা বদলে দিয়েছে ইতিহাসের গতি। যৌনতার জন্য ইতিহাস বাঁক নিয়েছে অন্য পথে। বদলে গিয়েছে সমাজটাই। বদলে গিয়েছে রাজনীতির ধারা।

Banglalive

 

সক্রাটিস এবং পেরিকেলসকে অনুপ্রেরণা দিতেন যৌনকর্মী আসপাসিয়া

পুরনো গ্রিসে আসপাসিয়া নামে এক বিখ্যাত যৌনকর্মী ছিলেন। বলা হয়, তিনি না জন্মালে হয়ত সক্রাটিস সক্রাটিস হতেন না, পেরিকেলস পেরিকেলস হতেন না। তাঁর অসম্ভব রূপ, লাবণ্য, বাগ্মিতা এবং বুদ্ধি। পেরিকেলস তাঁকে রক্ষিতা হিসেবে নিজের কাছে রাখেন। বলা হয়, পেরিকেলসের বাগ্মিতার পিছনে এই মহিলার অবদান অনেক। পরবর্তী সময়ে সক্রাটিস এই মহিলার সান্নিধ্যে আসেন। সক্রাটিস স্বীকার করেছেন, এই মহিলার থেকে তিনি কত সুন্দর করে কথা বলতে হয়, তার পাঠ নিয়েছিলেন।

রহস্য খ্রিস্টের জন্ম, সে জন্মের মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় বিশ্বের জনপ্রিয় ধর্ম 

কীভাবে মা মেরি গর্ভবতী হয়েছিলেন। তাঁর কথা যদি সত্যি বলে ধরতে হয়, তাহলে বিজ্ঞান মিথ্যা হয়ে যায়। তবে যাই হোক না, যৌনতা ছাড়া সন্তান উৎপাদন সম্ভব নয়, এ কথা তো বিশ্বের সব বিজ্ঞানীই মানেন। বিজ্ঞান সত্য হলে, আরও পরিষ্কার হয়ে যায় সেই সমাজের কথাও। সে সমাজে অবাধ যৌনতা নিষিদ্ধ। তাই যীশুকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে ঈশ্বর দ্বারা গর্ভধারণের কথা শোনাতে হয়েছিল মা মেরিকে (যেমন শুনিয়েছিলেন মহাভারতের কুন্তী)। তবে যীশুর জন্ম বিশ্বের ইতিহাসকেই বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষকে এক সূত্রে গেঁথেছে যীশুর খ্রিস্টধর্ম।  

যৌনতাকে ব্যবহার করেই সম্রাট হয়েছিলে চেঙ্গিস খান

সম্প্রতি একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, এশিয়াজুড়ে প্রায় এক কোটি ষাট লক্ষ বংশধর রয়েছে চেঙ্গিস খানের। এই তথ্য ইতিহাস গবেষকদের অন্য পথ দেখিয়েছে। তাঁরা বুঝতে পেরেছেন, ত্রয়োদশ শতকে চেঙ্গিস খানের একাধিক যুদ্ধজয়ের পিছনে আসলে কী কারণ। চেঙ্গিস খান যেখানে গিয়েছেন, সেখানে বিয়ে করেছেন। তাঁর স্ত্রী সংখ্যা কত, তা সহজে ধারণা করা খুব কঠিন। প্রত্যেক স্ত্রীকে সন্তান দিয়েছেন। আর প্রত্যেক স্ত্রীয়ের আত্মীয়দের তিনি নিজের সেনা বানিয়েছেন। আসলে চেঙ্গিস খান বুঝেছিলেন— আত্মীয়দের সেনা বানালে তাঁরা সম্রাটের অনুগত হবেন, নিজেদেরে সম্পত্তি বিস্তারে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ থাকবেন এবং পরপর যুদ্ধের জন্য কোনও দিন তাঁরা সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করবেন না। 

যৌনতায় জন্ম হয়েছিল সমান্তরাল ধর্মের, জন্ম নিয়েছিল বিবাহবিচ্ছেদ

অষ্টম হেনরির কোনও পুত্রসন্তান ছিল না । এক কন্যা সন্তান ছিল । বংশ রক্ষা কীভাবে সম্ভব তা নিয়ে উদ্বিগ্নই ছিল চতুর্দশ শতকের ইংল্যান্ডের রাজা। একটা ক্ষীণ আশার আলো এসে উপস্থিত হয়। রাজার রক্ষিতার গর্ভে সন্তান এসেছে। রাজা তৎপর হন, সেই সন্তানকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার। পোপের কাছে দ্বিতীয় বিবাহের অনুমতি নিতে যান। তা অবশ্য খারিজ করে দেন পোপ। এরপর রাজা নিজেই আলাদা একটি ধর্ম তৈরি করেন। তৈরি হয় ইংল্যান্ডের গির্জা। রাজা বিবাহবিচ্ছেদের আইন তৈরি করেন। আইনবলে নিজের স্ত্রীকে ডিভোর্স দেন রাজা। পুত্রসন্তান লাভের আশায় তিনি তাঁর রক্ষিতাকে বিয়ে করেন। অদৃষ্টের নিষ্ঠুরতা, ইতিহাসের পাতায় ডিভোর্সের জন্ম হলেও, রাজার নতুন রানি পুত্রসন্তানের জন্ম দেননি। তিনি কন্যাসন্তানের জননী হন।      

সিফিলিস এসেছিল কলম্বাসের হাত ধরে

কলম্বাস আমেরিকায় প্রথম পৌঁছেছিলেন। আবিষ্কার হয়েছিল একটি নতুন বিশ্বের। সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে ইওরোপে সিফিলিস এসেছিল ক্রিস্টোফার কলম্বাস এবং তাঁর সঙ্গীদের হাত ধরে । আমেরিকা থেকে কলম্বাস এবং তাঁর সঙ্গীদেররা সিফিলিস নিয়ে ফিরেছিলেন। তাহলে প্রশ্নটা উঠেই যায়, সে সময় কি কলম্বাস এবং তাঁর সঙ্গীদেরদের সঙ্গে আমেরিকার আদিবাসীদের যৌন সংসর্গ হয়েছিল ? তখন থেকেই কি অবাধ মেলামেশায় অভ্যস্থ ছিলেন আমেরিকার আদিবাসীরা ?

জীবন্ত শুক্রাণুর ধারণা

সপ্তদশ শতাব্দীর আগে পর্যন্ত পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল জন্মের জন্য একমাত্র প্রয়োজন ডিম্বাণু। কিন্তু সে ধারণাটাই বদল আনলেন অ্যান্টনি ভ্যান লিউওয়েনহক। মাইক্রোস্কোপের লেন্সের তলায় কোনও জিনিস রেখে পরখ করার শখ ছিল এই বিজ্ঞানীর । কী না পরীক্ষা করেননি তিনি—নিজের রক্ত, থুতু, চোখের জল সব কিছু। একদিন তিনি নিজের শুক্রাণুকে মাইক্রোস্কোপের তলায় রেখে দেখলেন, তার মধ্যে জীবন্ত কোষ। ব্যস, বদলে গেল ধারণা । বদলে গেল বিজ্ঞানের ধারা।

যৌনতার হাত ধরেই বিশ্বের প্রথম আধুনিক সেলিব্রিটি

অষ্টাদশ শতকে কিটি ফিশার নামে এক যৌনকর্মী বা রক্ষিতা ছিলেন ইংল্যান্ডে। রূপ-লাবণ্য এবং নিজের যৌন আবেদনকে ব্যবহার করে আর্ল অফ কনভেনটরি জয় করে নিয়েছিলেন ফিশার। তাঁর যৌন আবেদন ইংল্যান্ডে চর্চার বিষয় ছিল। এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে শিল্পীরা তাঁর পোর্ট্রেট আঁকার জন্য রীতিমতো লাইন দিতেন। কিটি মাঝে মধ্যেই নিজের জীবনের বিতর্কগুলিকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে প্রকাশ করতেন। এতে রসদ পেত সংবাদমাধ্যম। আসলে সংবাদমাধ্যমকে নিজের রূপ-যৌন আবেদন এবং এর সঙ্গে যুক্ত বিতর্ককে উস্কে ইচ্ছা মতো ব্যবহার করাই ছিল কিটির লক্ষ্য। নেতিবাচক খবরে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তেই থাকে। কিটির এই বুদ্ধিমত্তা তাঁকে সেলিব্রিটি করে তোলে। সংবাদপত্রকে কীভাবে প্রভাবিত করা যায়, কীভাবে আত্মপ্রচার করে জনপ্রিয় হওয়া যায়, তা মুচকি হেসেই সম্ভবত শিখিয়ে দিয়েছিলেন কিটি। যা পারেননি কিটির সমসাময়িক অন্য সুন্দরীরা। তাঁরা হিংসার আগুনেই হারিয়ে গেছেন ইতিহাসের পাতা থেকে।   

যৌনতা বদলে দিয়েছে সাহিত্যের ইতিহাস

তখন অতটা নাম হয়নি পার্সি শেলির। লোকে যাঁকে চেনে পি বি শেলি নামে। নাম হয়নি ম্যারি গডউইনেরও। স্কটল্যান্ডে দুজনের দেখা হয়। দুজন দুজনের প্রতি প্রবল আকৃষ্ট হন এবং প্রেমে পড়েন। শেলি তখন বিবাহিত। তাও গডউইনকে নিয়ে তিনি পালিয়ে যান ইংল্যান্ডে। সেখানে থাকতে শুরু করেন দুজনে। শেলি আর ম্যারির হাত দিয়ে একের পর এক যুগান্তকারী লেখা বেরোতে থাকে। শেষ জীবন পর্যন্ত দুজনে এক সঙ্গেই কাটিয়েছিলেন। 

(পরের পর্বে সমাপ্য)

আরও পড়ুন:  মেকআপ কিট ক্যারি না করলেও সারাক্ষণ ব্যাগে রাখুন এই ৫টি অতি প্রয়োজনীয় জিনিস

NO COMMENTS