গর্ব‚ অহংকার ছাড়া বাংলা ভাষা বাঁচবে না

আজ পাঁচুদার বাৎসরিক কাজ। প্রতিবছর এই দিনটা বেশ জাঁকজমক করেই পালন করে অভিষেক। অভি পাঁচুদার একমাত্র ছেলে। সকাল থেকে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরে, বগলে বডি স্প্রে দিয়ে সব একহাতে সামলাচ্ছে অভি। ওর বউ মোহনার এসব আদিখ্যেতা একদম ভাল লাগে না। একটা মরে যাওয়া মানুষকে নিয়ে এত হই চই করার কি মানে আছে কে জানে ? হ্যাঁ যখন উনি বেঁচেছিলেন তখন সত্যিই ওনার একটা পরিচিতি ছিল। মানুষ ওনাকে মানত, শ্রদ্ধা করতো। সকাল থেকে বসার ঘরে মানুষের ভিড়। কত শিল্পী, সাহিত্যিক, পন্ডিত ওনাকে অবলম্বন করেই পৃথিবীতে নাম করেছেন…কিন্তু আজ তো উনি একটা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি ছাড়া আর কিছুই নন। আরে বাবা বাস্তবটাকে মানতে হবে তো !

অভি কিন্তু আজকের দিনটাতে খুব সিরিয়াস। সব কাজ সরিয়ে রেখে আজ সে একেবারেই ফ্রি। মিটিং, কনফারেন্স, ক্লায়েন্ট মিট সব ক্যান্সেল, এমনকি আজ অফিসের কোন ফোনও সে রিসিভ করে না। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, বাবার কাছের লোকজন সবাইকে নেমন্তন্ন করে সে। বাবা যা যা ভালোবাসতেন যেমন, লাউ ডাঁটা দিয়ে পোস্ত চচ্চড়ি, পটলের দোর্মা, বড় বড় চ্যাটালো পুকুরে পুঁটিমাছ ভাজা, দই, কমলা ভোগ ছাড়াও বাবার প্রিয় সর্ষে-ইলিশও থাকে মেনুতে। খাওয়া দাওয়া ছাড়াও বিকেলের দিকে একটা স্মরণ অনুষ্ঠান হয়, যেখানে বাবার ছবিকে সামনে রেখে তাঁর সম্পর্কে বক্তব্য, গান, কবিতা, শ্রুতি-নাটক ইত্যাদি করা হয়। পাঁচুদার জীবনের উজ্জ্বল দিকগুলো নিয়ে তাঁর বন্ধুরা স্মৃতিচারণ করেন। তাঁর পাণ্ডিত্য, তাঁর রসবোধ, দেশ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার খ্যাতি সব প্রকাশ্যে আসে। বলতে বলতে কারো কারো চোখে জল চলে আসে। রুমালের খুঁট দিয়ে গড়িয়ে পড়া জল মুছে কেউ কেউ চিৎকার করে ওঠেন, ‘পাঁচুদা অমর রহে’।

সমস্যাটা এখানেই। অমর রহে বলে চিৎকার করলেই তো কেউ আর অমর হয় না। কালের নিয়মে সবাইকেই একদিন মরে যেতে হয়। সময় এগিয়ে চলে। পাঁচুদার বাৎসরিকের দিনটাও চলে যায়। পরের দিন সকাল থেকে আবার অফিস, ক্লায়েন্ট, মেয়ের স্কুল, গ্যাস, ব্যাঙ্ক, জি.এস.টি। সকাল আটটায় চান করে, বুকে টাই বেঁধে একমুঠো দুধেশ্বর সেদ্ধ, মাখন আর কাটাপোনার ঝোল গিলে মোবাইল কানে নিয়ে দৌড় আর দৌড়। এভাবেই ছুটতে ছুটতে আবার পরের বছর, আবার বাৎসরিক, আবার পাঁচুদা। কিন্তু সারা বছরের তিনশ পঁইশট্টিটা দিনের মধ্যে আর কোথাও পাঁচুদা থাকে না। তার ছবির মালাটা শুকিয়ে গিয়ে ঝরে পড়ে যায়। ছবিটাও ঝুল আর হাল্কা মাকড়শার জালের আড়ালে ক্রমশ ঝাপসা হতে থাকে। দেখা যায় না পাঁচুদার রোম্যান্টিক হাসি, কপালের তিল বা না আঁচড়ানো চুলের অবিন্নস্ত বিন্যাস। সময়ের নিয়মে এবং নিরন্তর অযত্নে পাঁচুদা একটু একটু করে হারিয়ে যেতে থাকেন।

প্রতিবছরই আমি পাঁচুদার বাৎসরিকে যাই। এতবড় মাপের একজন মানুষ, তাঁর স্মরণ অনুষ্ঠান। না গিয়ে থাকা যায় না। যখন বেঁচে ছিলেন তখনও যেতাম। মানুষ পাঁচুদাকে খুব ভালোবাসত। কত সম্মান, পুরস্কার, কত ছাত্রছাত্রী। দেশের মানুষ পাঁচুদাকে মাথায় করে রাখত। দেশ বিদেশ থেকে কত মানুষ আসতেন, আলাপ, আলোচনা… কিন্তু সেই সময় আর রইলো না। কেমন যেন সব বদলাতে শুরু করলো। সবার কাছেই পাঁচুদা কাজের মানুষ থেকে শুধুমাত্র শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠতে লাগলেন। মানুষের কাছে পাঁচুদার প্রয়োজন ফুরোতে লাগলো। চারপাশের মানুষের অযত্ন, আর অবহেলা একটু একটু করে পাঁচুদাকে খুব একা করে দিল। এই একা হয়ে যাওয়া পাঁচুদার কাছেও আমি যেতাম। শুনতাম তাঁর অতীত গৌরব, ঐতিহ্যের কাহিনি।

এভাবেই বোধহয় সব কিছু হারিয়ে যায়। সময়ের স্রোতে অযত্ন আর অবহেলাকে সঙ্গী করে ভেসে যায় গ্রাম, ঘর, শহর, নগর বা পাঁচুদারা… হারিয়ে যায় সভ্যতা, সংস্কৃতি, ভাষা। পাঁচুদার মতই একরাশ ঐতিহ্য আর গরিমা নিয়ে আমাদের গর্বের বাংলা ভাষাও কি একদিন হারিয়ে যাবে ? হারিয়ে যাবে তার কাব্য, সাহিত্য, সঙ্গীত ? আশংকাটা একেবারেই অমূলক নয়। পাঁচুদার জীবনের সঙ্গে বাংলা ভাষার ইতিহাসের বড্ড মিল। ওনার মতোই বাংলা ভাষাও একসময় সবার কাজের ভাষা, কাছের ভাষা ছিল। বাঙ্গালিরা বাংলা ভাষা নিয়ে গর্ববোধ করতো। বাংলা পড়া বা লেখাটা খুবই স্বাভাবিক বিষয় ছিল। কিন্তু আজ ছবিটা অনেকটাই বদলে গেছে। আরও খারাপ ভাবে বললে বলা যায় খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের ডিজিটাল জেনেরেশনের কাছে বাংলায় কথা বললে স্টেটাস থাকে না। এরা রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের ইংরাজি অনুবাদ পড়ে। স্কুলে ইংরাজি বা হিন্দি এদের প্রথম ভাষা। রবীন্দ্র, বিভূতি বা শরৎ রচনাবলীর মোটা মোটা বইগুলো দিয়ে বসার ঘরের বইয়ের আলমারির একটা তাক ভরিয়ে রাখে কিন্তু অন্য সব তাকে সাজানো থাকে বিদেশি সাহিত্যের আলোড়ন ফেলা বই।

পাঁচুদার মতোই বাংলা ভাষাও আজ আর কাজের ভাষা নেই। অফিস, কাছারি, ব্যাঙ্ক বা রেলের কাউন্টারে বাংলা ভাষা আর কাজে লাগে না। একসময় ইংরেজদের রাজধানী থাকার কারণে কলকাতার অফিস কাছারিতে ইংরাজিটাই ছিল কাজের ভাষা। ইংরেজ চলে গেলেও অফিস কাছারি থেকে আমরা ইংরাজিকে হটাতে পারি নি বা, ইংরাজিটা রেখে সমান্তরাল ভাবে বাংলাকেও কাজের ভাষা হিসেবে গড়ে তুলতে পারি নি। বেশ কিছু দরকারি শব্দের সমার্থক বাংলা শব্দও তৈরি করা যায় নি, তৈরি হয় নি বাংলা ভাষার সর্বজনগ্রাহ্য কোন অভিধান। এই অনেক কিছু না পারার যাঁতাকলে পড়ে বাংলা ভাষা ক্রমশ সাহিত্য, বই বা গ্রাম বাংলার কথ্য ভাষাই থেকে গিয়েছে। রোজগার বা বেঁচে থাকার মৌলিক অবলম্বন হয়ে ওঠে নি।

এর জন্য মুলত আমরাই দায়ী নাহলে কবিগুরু, বিদ্যাসাগর, শরৎচন্দ্রের মতো বেশ কিছু মানুষ যে ভাষাকে আন্তর্জাতিক স্তরে একটা উচ্চতায় নিয়ে গেলেন, যে ভাষাকে মাতৃভাষা করার দাবিতে বহু মানুষ প্রাণ দিল, যে ভাষার জন্য আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারে একটা দিন ‘মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়, যে ভাষাকে ইউনেস্কো পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রুতিমধুর ভাষা বলেছে…সেই ভাষায় কথা বলা মানুষগুলো আমাদের সামনেই বাংলা নিয়ে আর গর্ববোধ করে না। সে তার সন্তানদের বাংলা বই , বাংলা গান, বাংলা সিনেমা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে, নিজের সন্তানের বাংলা বলতে না পারাটা শহুরে বাঙালি বাবা মায়ের কাছে এখন গর্বের বিষয়, খোদ কলকাতা শহরে মাত্র আঠাশ শতাংশ মানুষ বাংলায় কথা বলে। আর আমরা চুপচাপ সব কিছু মেনে নিয়ে আমাদের গর্বের ভাষাকে একটু একটু করে মেরে ফেলছি। যদিও এ সবকিছুই পশ্চিমবঙ্গ বা আরও নির্দিস্ট করে বললে বলা যায় কলকাতা শহরের চিত্র। এই বঙ্গের গ্রামাঞ্চল বা বাংলাদেশের ছবিটা কিন্তু একেবারেই আলাদা, সেখানে বাংলা ভাষা সম্পর্কে ভাবনাটাই অন্যরকম। অনেক সংগ্রাম, আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা হবার কারণে এ ভাষা তাদের অহংকার, অলঙ্কার। আসলে শুধুমাত্র ভালবাসলেই কোন কিছুকে টিকিয়ে রাখা যায় না, তার জন্য দরকার হয় গর্বের, অহংকারের। বাংলাদেশিদের বাংলা ভাষা নিয়ে সেই গর্ব – অহংকার আছে। এই বাংলার মানুষ এ ব্যাপারে বোধহয় একটু হলেও উদাসীন। যে উদাসীনতা একটু একটু করে মৃত্যুকে ডেকে আনে।

আজ ২১ শে ফেব্রুয়ারি পাঁচুদার বাৎসরিক এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনে অনেক তাজা তরুণের রক্তে ভিজে যায় বাংলাদেশের মাটি। ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়ার এই অসাধারণ ইতিহাস বিশ্বের মানচিত্রে বাংলা ভাষাকে এক উজ্জ্বল জায়গায় বসিয়ে দেয়। কিন্তু সেই জায়গাটিও আজ কেমন যেন টলমলো। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় বাংলা ভাষা আজ কেমন যেন বহিরাগত। পাঁচুদার মতোই বাংলা ভাষারও অতীত গৌরব আছে, সম্মান পুরস্কার আছে কিন্তু বর্তমান নেই। নেই কোন জোরালো ভবিষ্যৎ। অন্য দুই ভাষার দৈনন্দিন চাপে এই বাংলায় বাংলা ভাষা কেমন যেন ধুঁকছে, তাই বাংলাকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে আজ আমাদের বোধহয় একটু কঠোর হতেই হবে। ইংরাজি হিন্দি বা অন্য কোন ভাষার সঙ্গে বাংলার কোন বিরোধ নেই। পেশাদারি অপেশাদারি বিভিন্ন ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংরাজি বা হিন্দি শেখা অবশ্যই দরকার কিন্তু বাংলায় থাকা মানুষদের কঠোরভাবে এটা বোঝাতে হবে যে, বাংলায় থাকতে গেলে বাংলাটাকে জানতে হবেই, বাংলা বলতে হবেই নাহলে ভাষা দিবস এই বাংলার মানুষের কাছে পাঁচুদার বাৎসরিক কাজের মতো শুধুই একটা অনুষ্ঠান হয়ে বেঁচে থাকবে যার পরের দিন সকাল থেকে আবার অফিস, ক্লায়েন্ট, মেয়ের স্কুল, গ্যাস, ব্যাঙ্ক, জি.এস.টি……।।

জলদ গুপ্ত
জলদ গুপ্ত লেখেন না, ভাবেন। নিজেকে মনে করেন মুদির দোকানের মালিক। কোথায় কোন মশলা আছে শুধু সেটুকুই উনি জানেন, খদ্দেরের চাহিদা অনুযায়ী কাগজে মুড়ে দিয়ে দেন...ব্যস। সিধুজ্যাঠার মত অনেক কিছু করার ক্ষমতা থাকলেও অন্যদের অসুবিধা হবে বলে কিছুই করেন নি। কবিতা, নাটক লিখতে পছন্দ করেন আর পাগলের মত পছন্দ করেন সঙ্গীত। পাহাড়ি জঙ্গলের টিলায় বসে হেঁড়ে গলায় গান আর দিনে ১৫ কাপ চায়ের জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত। আদিখ্যেতাকে ঘেন্না করেন, তর্ক করতে ভালোবাসেন। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন যেখানে কোন লেখক থাকবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here