রুপোর ঝাঁঝরি থেকে দুধ‚ দই‚ ঘি‚ মধু সহস্রধারায় ঝরে পড়ে বিগ্রহের শ্রী অঙ্গে

বসন্তের মন জুড়নো হাওয়া‚ দোকানে বাজারে সারি সারি রকমারি পিচকিরি‚ ঢালাও রঙ আর আবিরের পসরা জানান দেয়‚ দোল এলো | বাংলার ঘরে ঘরে দোল আসে এক এক রকম সাজে | এই সুযোগে শোভাবাজার রাজবাড়ির দোল উৎসবের ছবিটা ভাগ করে নেওয়া যাক |

রাজবাড়িতে দোলের দোলা লাগে তার আগের দিন অর্থাৎ চাঁচরের দিন | ছোটবেলায় শ্রী শ্রী গোপীনাথ জিউর ঠাকুরদালান থেকে প্রায় ত্রিশফুট উঁচু বাঁশ আর খড়ে জড়ানো হোলিকা রাক্ষসীর অবয়বটা পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে বেশ ভয়ই করত | জ্বলতে জ্বলতে কাঠামোটা যখন বেশ ছোটখাটো‚ হয়ে আসত‚ তখন শান্তি |

দোলের আগের দিন প্রথমে চাঁচর দিয়ে শুরু | তারপর আরতি দর্শন করে গোপীনাথের সামনে দালানে বসে তাঁকে দোলের গান শোনানো হয় | এইভাবেই শোভাবাজার রাজবাড়ীতে প্রতি বছর দোল উৎসবের ঢাকে কাঠি পড়ে |

দোলের গান এই বাড়ির শতাব্দীপ্রাচীন প্রথা | এই গানের রচয়িতা‚ গায়ক এবং শ্রোতা‚ সকলেই এই বাড়ির সদস্য | পরিবারের মানুষের কাছে পুরোনো ধাঁচের সুরে তৈরি রাগাশ্রয়ী রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক এই গানগুলোর এক গভীর আবেদন আছে | গান শেষ হলে হরির লুঠের বাতাসা কুড়নো‚ তারপর ফাগের টিকা মাথায় নিয়ে সেদিনের মত যে যার ঘরে ফেরা | তবে ছোটবেলার এই ফাগের স্পর্শ লাগার মুহূর্ত থেকেই দোলের উত্তেজনাটা ছড়িয়ে যেত মনের অন্দরে |

পরের দিন সকাল হওয়ার আগেই তাই ঘুম ভেঙে যেত | ইচ্ছে হত‚ ঘড়ির কাঁটাটাকে ঠেলে ঠেলে সময়টা এগিয়ে নিয়ে যাই | গোপীনাথের ঠাকুর বাড়িতে অবশ্য ব্রাহ্ম মুহূর্ত থেকেই দেব দোল শুরু হয়ে থাকে | দোলের বিশেষ আরতির পর পুরোহিত মশাইরা ঠাকুরের চরণে আবির দিয়ে দোলখেলা শুরু করেন | বহু আগে‚ দোলপূর্ণিমার ব্রাহ্মমুহূর্তে কীর্তনিয়ারা এসে রাজবাড়ির গৃহদেবতাকে গান শোনাতেন | এখন অবশ্য সে চল উঠে গেছে |

সেদিন সকালে বাড়ির ছোটরা তাদের কোনও একটা বাতিলযোগ্য জামা পরে হাতে আবিরের ঝুলি নিয়ে নিয়ে তৈরি থাকত | বিশাল উঠোনে জমা হওয়া আমাদের কচিকাঁচার দল তেমন কম ছিল না | রঙ খেলা নিষেধ‚ তাই আবিরেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হত | তার ওপর বড়দের শুধু পায়ে আবির দেওয়ার নিয়ম | আবিরগোলা জলই বেলুনে ভরে নিজেদের গায়ে ছুঁড়ে সাধ মেটানো হত | যত খেলা সব একতলাতেই সারতে হত | কারণ দোতলায় ওঠার চেষ্টা করলেই মা ঠাকুমারা ‘সব নোংরা হয়ে যাবে’ বলে গেল গেল রব তুলতেন |

বাড়ির মহিলারাও দোল খেলতেন | তবে তাঁদের দোল খেলার পিছনে একটা অন্য উদ্দেশ্যও থাকত | আসলে বছরের এই একটা দিনই ভক্তেরা সর্বদা পুরোহিত দ্বারা পূজিত এবং চর্চিত শ্রী শ্রী গোপীনাথ জিউর চরণে আবির দেওয়ার সুযোগ পান | এই সৌভাগ্য লাভ করার জন্য বাড়ির সদস্য‚ বিশেষত মহিলারা চিরকালই খুব উদগ্রীব থাকেন | ঠাকুরের সঙ্গে দোল-পর্ব সারা হলে দালানের সামনের উঠোনে চলে আর এক প্রস্থ দোল খেলা |

সেদিন বিকেলের আর এক আকর্ষণ হল গোপীনাথের অভিষেক স্নান | সাধারণ ভক্তরা ফাগ দেওয়ায় বিগ্রহের স্পর্শদোষ ঘটে‚ তাই তাঁর অভিষেকের প্রয়োজন হয় | পুরোহিত মশাইদের তত্ত্বাবধানে দুধ‚ দই‚ ঘি‚ মধু এবং ভাদ্র মাসের বিশেষ তিথিতে তুলে রাখা গঙ্গাজল রুপোর সহস্রধারা (ঝাঁঝরি) থেকে বিগ্রহের শ্রী অঙ্গে ঝরে পড়ে | সুগন্ধি তেল এবং ডাবের জলও এই প্রক্রিয়ার অপরিহার্য উপাদান | এইভাবে শুদ্ধ হওয়ার পর দোলের বসন্ত-সন্ধ্যায় রাজবেশ ধারণ করে ঠাকুরদালানে বিরাজিত হন গোপীনাথ জিউ |

দোলের দিন আত্মীয়-বন্ধুদের রাঙিয়ে দেওয়ার মজা আছে‚ খেলার শেষে একে অপরের ভূত চেহারা দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ায় সুখ আছে | গুচ্ছের সাবান শ্যাম্পু ঘষে ঘষে কলঘরে রঙের নদী বইয়ে দেওয়ার রোমাঞ্চ আছে | কিন্তু এই রাজবাড়ির দোল উৎসবের হৃদয় তাদের কুলদেবতার চরণে নিবেদিত | পুরনো দিনের ঢিলেঢালা সময়ে দেবতাকে ঘিরেই বেশিরভাগ উৎসবের সূচনা হত | তারপর ধীরে ধীরে উৎসব হয়ে ওঠে প্রধান‚ দেবতা হন গৌণ | তবে অনেক পরিবর্তন পেরিয়ে এসেও এই পরিবারে দোল উৎসব আজও সেই পাঁচ হাজার বছর বয়সী‚ মাথায় ময়ূরের পালক গোঁজা বংশীধারী যুবককে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় |

(পুনর্মুদ্রিত)

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.