প্রকৃত প্রজ্ঞায় বিজ্ঞান আর কলায় কোনও বিভেদ থাকে না | গণিত আর কাব্যও অভিন্নহৃদয় বন্ধু হতে পারে | দেখিয়ে দিয়েছিলেন এক প্রাচীন পারসিক | আজ থেকে প্রায় ৯৬৯ বছর আগে ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম পারস্যের নিশাপুরে | এখন সেটি ইরানের অংশ | পরবর্তীকালে সমৃদ্ধ বন্দর নগরী নিশাপুর মোঙ্গল আক্রমণে ধ্বংস হয়ে যায় |

Banglalive

বর্ধিষ্ণু নিশাপুরে সেই নবজাতকের নাম রাখা হয়েছিল ওমর | পারিবারিক পদবী খৈয়ম বা খায়ম | যাঁরা তাঁবু বানাতেন তাঁরা এই সামাজিক পরিচয় পেত মধ্যযুগে | তবে এই পেশা ছেড়ে দিয়েছিলেন তাঁর বাবা | তিনি ছিলেন চিকিৎসক | মায়ের পরিচয়-সহ বালকের জীবনের অনেক কিছুই অজানা | তার নিজের পরিচয়ও নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন | জীবিতকালে তিনি ছিলেন গণিতজ্ঞ‚ জ্যোতির্বিদ‚ চিকিৎসক ও দার্শনিক | পরে দেখা গেল তাঁর মতো কবি বিশ্ব সাহিত্যে বিরল | তিনি বহুমুখী প্রতিভাধর ওমর খৈয়ম |

ওমরের জন্ম সুন্নি মুসলিম পরিবারে | তাঁর বাবা এব্রাহিম ছেলের জন্য শিক্ষক নিয়োগ করেছিলেন বাহমনয়র বিন মার্জবেন নামে এক পারসিককে | উদারমনস্ক এব্রাহিম চেয়েছিলেন ওমর বড় হোক খোলা হাওয়ায় | মার্জবেন ছিলেন জরথ্রুস্টের ভক্ত | তাঁর কাছে ওমর গভীর ভাবে আয়ত্ত করেছিলেন গণিত‚ বিজ্ঞান ও দর্শন | প্রাচীন গ্রীক পাণ্ডিত্যের স্পর্শও তাঁর মধ্যে সঞ্চারিত করেছিলেন শিক্ষক মার্জবেন | বাবার কাছে হাতেখড়ি হয়েছিল চিকিৎসা শাস্ত্রের | অস্ত্রোপচারের সময় বাবাকে সাহায্য করতেন ওমর | 

১০৬৬ খ্রিস্টাব্দ ওমরের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ | ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হয় তাঁর | সে বছরই কয়েক মাসের ব্যবধানে হারান বাবা এবং গৃহশিক্ষককে | উঠে যায় নিশাপুরের বসবাসও | জীবনের দুই ধ্রুবতারাকে হারিয়ে ওমর সওয়ারি হন ক্যারাভানে | তিনমাস যাত্রা করে পৌঁছন সমরখন্দে ( এখন উজবেকিস্তানে ) | তখন এই জনপদ ছিল জ্ঞান গরিমার শীর্ষে | এই শহরে বাবার বন্ধুর আবু তাহিরের কাছে আশ্রয় পান | তিনি ছিলেন শহরের গভর্নর ও উজির | ওমরের পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হন তাহির | কয়েকদিনের মধ্যে ওমর চাকরি পান রাজকোষে | সেইসঙ্গে নামী শিক্ষকদের কাছে চালিয়ে যান বিদ্যাচর্চাও |

সমরখন্দ-পর্ব ওমরের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ | বহু যুগান্তকারী আবিষ্কার এ সময় তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে যায় | গণিতের বীজগণিত‚ জ্যামিতি-সহ একাধিক শাখা সমৃদ্ধ হয় তাঁর সূত্রে | তিনি দেখিয়ে দেন বীজগণিত ও জ্যামিতিও সম্পর্কযুক্ত | পাশাপাশি বর্ষগণনাতেও নতুন দিক খুলে দেয় তাঁর তত্ত্ব | দর্শন ও গণিতের মধ্যে যোগসূত্র সামনে আসে তাঁরই দৌলতে |

প্রায় ২৪ বছর ধরে সমরখন্দে জ্ঞানচর্চা করেন ওমর খৈয়ম | ১০৯১ খ্রিস্টাব্দে ফের ছন্দোপতন | ঘাতকের হাতে প্রাণ হারান শাসক প্রথম মালিক শাহ | বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয় উজির আবু তাহিরকে | ফলে ওমরের পায়ের তলা থেকে জমি সরে যায় |

কয়েক বছর আত্মগোপন করে থাকেন | তাঁর শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে বয়সের ভারে | পরে তিনি ফিরে এসেছিলেন জন্মভূমি পারস্যের নিশাপুরে | সেখানেই মৃত্যু হয় ১১৩১ খ্রিস্টাব্দে | শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁকে সমাহিত করা হয় এক উদ্যানে |

এর প্রায় ৭০০ বছর পরে এডওয়ার্ড ফিৎজজেরাল্ড প্রকাশিত করেন কালজয়ী রাবাইয়্ৎ অফ ওমর খৈয়ম ( Rubáiyát of Omar Khayyám ) | প্রাচীন পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধার হওয়া রত্নভাণ্ডার | ওমর খৈয়মের কাব্য | পাশ্চাত্যের হাত ধরে জানা গেল প্রাচ্যের এক বিরল প্রতিভার বিচ্ছুরণের একটি শাখা | বিশ্বসাহিত্য যতদিন থাকবে ততদিন থাকবে রাবাইয়ৎ |

কাজের বাইরে ওমর খৈয়মের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিশেষ কিছু জানা যায় না | তবে গবেষকরা মনে করেন তিনি একবার অন্তত বিয়ে করেছিলেন | ছিল দুই সন্তানও | কিন্তু স্ত্রী সন্তানদের নাম পরিচয় কিছুই সামনে আসেনি | 

ব্যক্তি ওমর খৈয়মকে পরিমাপ করাও দুঃসাধ্য | গবেষকদের মতে তিনি একদিকে প্রাচীনপন্থী সুন্নি মুসলিম | আবার সুফীবাদের ভক্ত | সেইসঙ্গে জরথ্রুস্টিয়ান মতবাদের সমর্থক | পাশাপাশি গ্রীক দর্শনের অনুরাগী | এবং‚ ঈশ্বরে অবিশ্বাসী | বিশ্বাস করতেন না আত্মার অস্তিত্বে | বলতেন সে-ই ভাগ্যবান যার দেহের এক কণাও লাগে সুরা তৈরিতে | আক্ষরিক অর্থেই ছিলেন সুরা-সুরসিক | জ্ঞানচর্চা ছাড়া জীবন অর্পণ করেছিলেন সুরাপাত্রকে | 

আরও পড়ুন:  বানিয়েছিলেন 'রাজা হরিশ্চন্দ্র ,' ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনকের নিজের জীবনও ওই পৌরাণিক চরিত্রের মতোই ট্র্যাজিক

NO COMMENTS