শিক্ষক ও গ্রামের শিশুদের মধ্যে শিক্ষার সেতু গড়লেন আইআইএম গবেষকেরা

172
E -Learning in India
E -Learning in India

ভারতবর্ষে স্কুলগুলোয় বাচ্চাদের লেখাপড়ায় সাংঘাতিক ঘাটতি রয়েছে বলে জানাচ্ছে অ্যানুয়াল স্টেটাস অব এডুকেশন-এর ২০১৮ সালের রিপোর্ট। অলাভজনক সংস্থা ‘প্রথম’ প্রকাশ করেছে এই উদ্বেগজনক রিপোর্টটি। সমীক্ষা থেকে জানা যাচ্ছে, ভারতের প্রাথমিক স্কুলের শিশুরা ছোটদের বইয়ের লেখাও ঠিক করে পড়তে পারে না। যথোপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাব, দক্ষ শিক্ষকের অপ্রতুলতা — স্বাধীনতার ৭২ বছর পর প্রাথমিক শিক্ষার এই বেহাল দশার মূল কারণ এসবই।

প্রাথমিক শিক্ষার এই বিপর্যস্ত দিকটি নজরে আসে কলকাতার দুই ছাত্রী প্রিয়দর্শিনী দে এবং অ্যারিনা বর্ধনের। অধ্যাপক সোমপ্রকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধীনে ২০১৪ সালে কলকাতার ইন্সটিউট অব ম্যানেজমেন্টে সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে গবেষণা করছিলেন তাঁরা। প্রিয়দর্শিনীর গবেষণার বিষয় ছিল, আইসিটির মাধ্যমে কীভাবে শিক্ষার মান উন্নত করা যায়, অন্যদিকে, অ্যারিনা গবেষণা করছিলেন, কীভাবে অবসরপ্রাপ্ত বয়স্ক শিক্ষকদের মূলধারার শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনা সম্ভব, তা নিয়ে। এঁদের গবেষণার কাজে মাণিকজোড় হয়েছিলেন কম্পিউটার সায়েন্সের আর এক গবেষক, জয়ন্ত বসাক। বিভিন্ন স্কুলে স্কুলে গিয়ে সমীক্ষা চালিয়েছিলেন তিনি। ‘আমরা পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের স্কুলগুলো দিয়ে শুরু করেছিলাম, সরকারি, বেসরকারি দুই-ই। সব স্কুলগুলোতেই কিছু সাধারণ সমস্যা দেখেছিলাম, যেমন শিক্ষকদের অনুপস্থিতির হার অত্যন্ত বেশি,শিক্ষকদের মানও সন্তোষজনক নয়, শেখাবার পরিবেশও উপযুক্ত নয়। নেই শিক্ষাদানের উন্নত পরিকাঠামো

এই তথ্যের ভিত্তিতে এরপর সমাজ বিজ্ঞানের ওই দুই পিএইচডি ছাত্রী ই-লারনিং নিয়ে কাজ শুরু করলেন। সামাজিক স্তরে ই-লারনিং বিষয়ে কিছু নিরীক্ষা চালিয়ে দেখলেন, এক ঢিলে দু’টি পাখি মারা যাচ্ছে। দু’জন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের খুঁজে বের করা হল কৃষ্ণনগরের এক অনাথ আশ্রমে বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য। একদিকে বাচ্চারাও শিখতে পারবে আর বয়স্করাও একাকীত্ব বা অবসাদ কাটিয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে মূল স্রোতের কাজে ফিরতে পারবেন। ভিডিও কনফারেন্সিং এর মাধ্যমে ঘরে বসেই পড়ালেন বৃদ্ধ বৃদ্ধারা। ৩৯ জন বাচ্চা ছ’মাসের মধ্যে ঠিকমত লিখতে পড়তে শিখে গেল।

শহরের আরও নানা অঞ্চলে এই মডেলটির প্রচলন শুরু হল। ‘সব রকম আর্থ সামাজিক স্তর থেকেই আমরা অভূতপূর্ব সাড়া পেলাম। ছাত্র আর মা বাবারা সকলেই এই মাধ্যমটিকে অসম্ভব পছন্দ করল। এইভাবে পড়ানোর বিষয়টি যেমন জনপ্রিয় হল, তেমনই লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া এই ভাবে পড়ে পড়াশোনায় উন্নতি করল। অভাবনীয় সাফল্যের জন্য আমাদের এই ই-লার্নিং মডেলটি আমরা চালিয়ে নিয়ে গেলাম শুধু নয়, এটির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের ব্যাপারেও ভাবলাম’ – অ্যারিনা জানাচ্ছেন। এইভাবে, এই ভাবনাটি সম্পূর্ণত একটি সামাজিক ব্যাবসায় রূপ নিল। ‘নেক্সকানেক্ট ভেঞ্চারস প্রাইভেট লিমিটেড’ নাম হল তাঁদের সংস্থার।

২০১৭ সালে আইআইএম ক্যালকাটা ইনোভেশন পার্কে যাত্রা শুরু করল নেক্সকানেক্ট ভেঞ্চারস। সংস্থাটির প্রাথমিক লক্ষ্য হল, সবাইকে সঠিকভাবে পড়িয়ে শিক্ষিত করে তোলা, এবং বয়স্ক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের আবার পড়ানোর কাজে ফিরিয়ে আনা। পড়ানোর মাধ্যম ডিজিটাল প্রযুক্তি। শহরের প্রবীণ শিক্ষকরা ছাত্র পড়িয়ে উপার্জন করবেন আর দরিদ্র গ্রামের ছাত্রদের প্রায় বিনা পয়সায় পড়ানো হবে, এমন ঠিক করলেন সংস্থার কর্ণধাররা। গোড়ার দিকে, ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৮৫০ ছাত্র, ত্রিশ জন শিক্ষক এবং আটজন গ্রামবাসী (যারা এর মাধ্যমে তাদের ব্যাবসা শুরু করেছেন) নিয়ে পথ চলা শুরু করেছিল। ৩৫০০ ঘন্টা অনলাইন ক্লাস করিয়েছে নেক্সকানেক্ট ভেঞ্চারস। গ্রামে গঞ্জে ‘নেক্সকানেক্ট ইন্টারনেট স্কুল’গুলির নানা স্টাডি সেন্টার রয়েছে।

প্রথম দিকে প্রাপ্ত বয়স্ক ছাত্রছাত্রীরা বেশি আসত আরও ভালো শিখে ভালো চাকরি পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন জেলায় এদের প্রায় দশটি স্টাডি সেন্টার রয়েছে। কিন্তু বাড়ি বাড়ি গিয়ে মা বাবাদের রাজি করানো খুব শক্ত কাজ। যেহেতু প্রচলিত ধারার থেকে একটু আলাদা এই ডিজিটাল মাধ্যমে পড়ানোর পদ্ধতিটি, বেশিরভাগ মা বাবাই ভাবেন এটি বোধহয় তেমন নির্ভরযোগ্য নয়। তার বাচ্চাটির প্রতি আলাদা ভাবে মনোযোগ দেওয়া হবে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মনোভাব বদলাল। বাচ্চারা আসতে শুরু করল। প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরা নিয়ম করে এসে ক্লাস নিয়ে যায়। অঙ্ক, ইংরাজি, বিজ্ঞান সবই পড়ানো হয় ডিজিটাল মাধ্যমে। শহর থেকে প্রবীণ শিক্ষকদের বাছাই করা হয় তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পড়ানোর অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। ছাত্র আর শিক্ষকদের হাতে থাকে লগইন পরিচয়পত্র। সময় অনুযায়ী ক্লাশ হয়। গ্রামের ছাত্রদের থেকে যৎসামান্য গুরুদক্ষিণা নেওয়া হয়। বড়জোর ১০০ থেকে ২০০।

প্রবীণ শিক্ষিকা অনিন্দিতা রায় দুই দশক ধরে শহরের স্কুলে অঙ্কের দিদিমণি। তিনি এই ডিজিটাল মাধ্যমটিতে পড়িয়ে বেশ খুশি ‘গ্রামের বাচ্চাদের পড়াশোনায় বেশ আগ্রহ দেখলাম। তারা ভালো শিক্ষকেরমূল্য বোঝে’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.