মূক ও বধির না হয়েও এই গ্রামের বাসিন্দারা ‘কথা’ বলেন ইশারায়

ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। জঙ্গল, পাহাড়ের সৌন্দর্যে ঘেরা উত্তর বালির প্রত্যন্ত গ্রামগুলি। চাষ, পশুপালন এখানকার বাসিন্দাদের প্রধান পেশা। গ্রামের মানুষজন প্রত্যেকেরই প্রায় হাসিমুখ। পর্যটকদের মন খুলে স্বাগত জানান তাঁরা। কিন্তু অনেকেরই অজানা এখানকার বেঙ্গকালা নামের আজব এক গ্রামের কথা।

এখানকার প্রায় তিন হাজার লোক মৌখিক ভাষার বদলে ব্যবহার করেন সাংকেতিক ভাষা বা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ। ইন্দোনেশিয়ার এই গ্রামের নাম তাই বধিরদের গ্রাম ‘The Village Of Deaf’। উত্তর বালিতে পাশাপাশি দু’টি গ্রামের মধ্যে বিজ্ঞানীরা এই বেঙ্গকালা গ্রামটিকে নিয়ে মূলত চর্চা করেন। এই গ্রামে হাজার তিনেক মানুষের বাস। তবে প্রায় সকলেই কথা বলেন ইশারায় যাকে বলে সাংকেতিক ভাষা। গোটা গ্রামটাতেই এই ভাষাতেই চলে ভাব বিনিময়।

এই গ্রামের বাসিন্দারা পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য নিজস্ব সাংকেতিক ভাষা কাতা কোলক ব্যবহার করেন। তাই এখানকার বাসিন্দারা কোলক নামেই বেশি পরিচিত। সকলেই সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করেন বলে অনেকের ধারণা, এই গ্রামে সকলেই বধির। এই ধারণা ভুল। বধির বা বোবা না হয়েও গ্রামের প্রতিটি মানুষই হাতের ইশারার এই ভাষাকে তাদের অন্যতম প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন কয়েকশো বছর ধরেই।

এই গ্রামের এক বাসিন্দা উইষ্ণু জানান, বর্তমানে প্রায় পঞ্চাশেক বাসিন্দা কথা বলতে পারেন না এবং কানেও শুনতে পান না। তবে গ্রামের কেউই তাঁদের প্রতিবন্ধী বলতে রাজি নন, তাই সকলেই এমন সাংকেতিক ভাষায় কথা বলেন, যাতে তাঁদের কখনও অস্বস্তিতে না পড়তে হয়। আর বছর বছর ধরেই এই রীতিই চলে আসছে এই বেঙ্গকালা গ্রামে।

বিজ্ঞানীদের মতে, প্রাকৃতিক কারণে ডিএফএনবি৩ নামের একটি জিন এই এলাকার মানুষের শরীরে বর্তমান। বধির মা-বাবার স্বাভাবিক বাচ্চা হওয়াও যেমন অস্বাভাবিক নয়, তেমনি সম্পূর্ণ সুস্থ-স্বাভাবিক মা-বাবার বাচ্চাও বধির হয়ে জন্ম নেওয়াটা স্বাভাবিক ঘটনা এখানে। আর এখানে বাসিন্দাদের মধ্যে এই জিনের অস্তিত্ব প্রায় সাত প্রজন্ম ধরে রয়েছে বলে তাঁদের মত। তবে গ্রামের সকলেরই সাংকেতিক ভাষা জানায় ভাব আদান-প্রদান করেন বলে কোনও সমস্যা হয় না।

তবে এই জিনগত কারণ মেনে নিতে নারাজ অনেক বাসিন্দাই। তাঁদের মতে এর পিছনে রয়েছে এক অজানা রহস্যময় কাহিনি। গ্রামবাসীদের মতে, একবার বেঙ্গকালা গ্রামে দুই জাদুকর জাদু দেখাতে আসেন। দুই জাদুকরের মধ্যে চলতে থাকে অলৌকিক শক্তির লড়াই। এই লড়াইয়ের এক পর্যায়ে দুজনেই একে অপরকে বধির হওয়ার অভিশাপ দেন।

তবে বর্তমানে এই গ্রামের বাসিন্দারা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী সাংকেতিক ভাষার বাইরে  আন্তর্জাতিক সাংকেতিক ভাষাও শিখছে। কোলকদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে দেশ বিদেশের প্রচুর আগ্রহী পর্যটকরা আসেন। দি ডেফ অফ ভিলেজ-এ বর্তমানের মূল অকর্ষণ হল “জাঞ্জের কোলক” বা “বধিরদের নাচ”। বধির জনগোষ্ঠীর এই ঐতিহ্যবাহী নৃত্য তিন দশক ধরে এই গ্রামের নাম গোটা বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছে। প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও এই অসাধারণ নাচের তালে মেতে ওঠে বেঙ্গকালা সহ গোটা দুনিয়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here