খানিকটা অবাক হওয়ার মতোই বটে। প্রায় হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে দেবী সরস্বতী পূজিত হয়ে আসছেন সুদূর জাপানে । জাপানবাসীর অত্যন্ত প্রিয় দেবী সরস্বতী সেখানে পূজিত হন ‘বেঞ্জাইতেন’ নামে ।

তবে জাপানের সরস্বতী দেবীর সঙ্গে আমাদের দেবীমূর্তির বেশ খানিকটা পার্থক্য রয়েছে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে দেবী চতুর্ভুজা হলেও, জাপানের বেঞ্জাইতেন কিন্তু দ্বিভুজা । জাপানে দেবীর দ্বিভুজা মূর্তি পুজোর প্রচলনই বেশি। এখানেই শেষ নয়। আমাদের মা সরস্বতী বাহন হাঁস, কিন্তু জাপানে বেশিরভাগ বিগ্রহে দেবীর কোনও বাহন নেই। তবে কোনও কোনও বিগ্রহে দেবীর সঙ্গে ড্রাগন (মতান্তরে সাপ) দেখা যায়। তবে দেবীর বাহন কেন ড্রাগন বা সাপ তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে পুরাণ মতে, মা সরস্বতী বৃত্রাসুরকে বধ করেছিলেন। ঋক বেদ অনুসারে, বৃত্রাসুরের অপর নাম ছিল ‘অহি’ বা সাপ। সেই কারণেই হয়তো জাপানে দেবী সরস্বতী তথা বেঞ্জাইতেনের বাহনরূপে ড্রাগন বা সাপের মূর্তি দেখতে পাওয়া যায় বলে মনে করেন অনেকে।

প্রায় হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে জাপানবাসী, মা সরস্বতী তথা বেঞ্জাইতেন-এর পুজো করে আসছেন, তাও আবার বিশুদ্ধ সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ করে। এমনকী জাঁকজমক করে হোম-যজ্ঞও করা হয়। জাপানি ভাষায় হোম -কে বলা হয় হাভান বা গোমা৷  তবে আমাদের দেবী সরস্বতীর হাতে যেমন বীণা থাকে, তেমনই জাপানে দেবী বেঞ্জাইতেন-এর হাতে থাকে বিওয়া, যা জাপানের একটি ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র।

Banglalive-8

জাপানে প্রায় একশোটিরও বেশি মন্দিরে পূজিত হন দেবী সরস্বতী । জাপানিরা দেবী সরস্বতীকে জনসাধারণ এবং রাষ্ট্রের রক্ষার্থে পুজো করে। আমাদের সংস্কারে তা অনেকটা দুর্গাপুজোর মতো । জাপানের সাগামি উপসাগরের এনোশিমা দ্বীপ, বিওয়া হ্রদের চিকুবু দ্বীপ এবং সেতো অন্তর্দেশীয় সাগরের ইৎসুকুশিমা দ্বীপের মন্দির গুলিতে ধুমধাম করে পালিত হয় বেঞ্জাইতেন-এর আরাধনা । পশ্চিম টোকিয়োর ইনোকাশিরা পার্কে টোকিয়োর সবচেয়ে পুরোনো ও বিখ্যাত সরস্বতী মন্দিরটি অবস্থিত। জাপানে বেশকিছু জায়গার জলাশয়ের নাম বেঞ্জাইতেন। সেইসব জলাশয়ের মাঝখানে বা তার কোনও এক কিনারায় একটি মন্দির থাকে, যার মধ্যে কোনও বিগ্রহ থাকে না। ওই জলাশয়ের জলকেই দেবী সরস্বতীরূপে পুজো করা হয়। খুব অদ্ভুতভাবে ভারতবর্ষেও সরস্বতী নামে একটি নদী ছিল। আর দেবীর বাহন হাঁস এবং দেবীর পাদপদ্মকেও জল ছাড়া কল্পনা করা যায় না।

Banglalive-9

তবে আপনাদের অনেকের মনেই হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে, মা সরস্বতী জাপানে পৌঁছলেন কীভাবে? বা মনে হতে পারে জাপানে হিন্দু ধর্ম ও সংষ্কৃতির প্রচলন ঘটল কীভাবে? তাহলে আমাদের একটু পিছিয়ে যেতে হবে। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত, চম্পা রাজ্যের হিন্দু রাজাদের প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বিশাল প্রভাব ছিল৷ বর্তমানে যেখানে মধ্য ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম অবস্থিত সেই অংশ জুড়ে ছিল সেই চম্পা রাজ্য। সেখান থেকেই হিন্দু ধর্ম পৌঁছে গিয়েছিল জাপানে, এবং তা বৌদ্ধ ধর্ম পৌঁছানোর অনেক আগে। আনুমানিক খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যেবর্তী সময়ে জাপানে দেবী সরস্বতী তথা বেঞ্জাইতেন-এর পুজো শুরু হয়।

আরও পড়ুন:  নিজের ঋতুস্রাবের রক্ত মেখে সাহসী বার্তা

শুধু মা সরস্বতীই নয়, বহু শতাব্দী ধরেই  লক্ষ্মী, গণেশ, ইন্দ্র, ব্রহ্মা প্রভৃতি হিন্দু দেবদেবী জাপানে বৌদ্ধ দেবদেবী হিসেবে পূজিত হচ্ছেন। আবার এমন কোনও প্রাচীন পুঁথি নেই যা জাপানি ভাষায় অনুবাদ হয়নি। যেমন ঋগ্বেদ, পাণিনি, মনুসংহিতা, অর্থশাস্ত্র, গীতা, উপনিষদ, মহাভারত, রামায়ণ, ত্রিপিটক, জাতক, পুরাণ, ইতিহাস, দর্শন, জ্যোতিষ, ভাষা, কলাবিদ্যা, নাট্যশাস্ত্র, থেকে কামশাস্ত্র।

জাপানের কোয়াসানে এখনও সংস্কৃত ভাষা শেখানো হয়। হিন্দুদের যেমন অগ্নিদেব আছেন তাই হিন্দুরা অগ্নিপুজো করেন। তেমনি জাপানেও  শিঙ্গন ও তেন্দাই বৌদ্ধরা আছেন, যাঁদের অগ্নিপুজোর সঙ্গে সুপ্রাচীন হিন্দুধর্মের  রীতিনীতি ও অগ্নিপুজোর মিল আছে৷ জাপানে অন্তত ১ ,২০০ মন্দিরে তাঁরা বিশুদ্ধ সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ করেই অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেন৷ সংস্কৃত তাই তাঁদের কাছে অতি পবিত্র ভাষা৷

NO COMMENTS