নুর-উন-নিসা নাম | ধমনীতে রাজরক্ত নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন রাজকীয়ভাবেই | কিন্তু পারেননি | কিছুটা যদি হয় জীবনের ঘটনাপ্রবাহের চাপে‚ বাকি অবশ্যই তাঁর পূর্বপুরুষের সংগ্রামী ঐতিহ্য | ভারতীয় বাবা ও আমেরিকান মায়ের মেয়ে নুরের জন্ম মস্কোয় | বড় হওয়া‚ পড়াশোনা ও চাকরি প্যারিসে |  বর্ণময় ও ঘটনাবহুল জীবনে নিজের পুর্বপুরুষদের থেকে কম সংগ্রাম করেননি হায়দার আলি ও টিপু সুলতানের এই সরাসরি বংশধর | গান্ধীবাদী ঘরানায় আলোকিত নুর ছিলেন প্রথম ব্রিটিশ এশিয়ান সমরনায়িকা |

নুরের বাবা ইনায়াৎ ছিলেন বরোদার এক সুফী সাধক, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের শিল্পী | তাঁর ধমনীতে প্রবাহিত রাজরক্ত চাপা পড়ে গিয়েছিল সঙ্গীতের সুরে | যে রক্ত এসেছিল তাঁর দিদিমার কাছ থেকে | ইনায়তের দিদিমা ছিলেন টিপু সুলতানের নাতনি | অর্থাৎ টিপু সুলতান ছিলেন নুরের ঊর্ধ্বতন পঞ্চম পুরুষ | 

বলা-ই বাহুল্য নুর সেসব গরিমা কিছুই দেখেননি | তাঁর বাবা বরোদার রাজসভা ও হায়দ্রাবাদের নিজামের দরবারে সভাগায়ক ছিলেন | ধরা গতের চাকরি ছেড়ে তিনি ভারত থেকে আমেরিকা ও ইউরোপে সুফীবাদ প্রচারে চলে গিয়েছিলেন ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে | আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকোর রামকৃষ্ণ মঠে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় মার্কিন তরুণী ওরা রে বেকারের | তাঁকেই বিয়ে করেছিলেন ইনায়ৎ | 

বিয়ের কয়েকদিন পরেই নব দম্পতি পাড়ি দেন মস্কো | সেখানেই নুরের জন্ম ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি | তাঁরা জারের অতিথি হয়ে আশ্রয় পেয়েছিলেন | কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আঁচ থেকে রক্ষা পায়নি এই পরিবার | মস্কো ছেড়ে ইনায়ৎ সপরিবারে চলে যান লন্ডন‚ সেখান থেকে প্যারিস |  শিল্প সংস্কৃতির পীঠস্থান প্যারিসেই শুরু হল নুরের পড়াশোনা | একসঙ্গে পাঠ নিলেন চিকিৎসাশাস্ত্র ও সঙ্গীতের |  

Banglalive-8

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে ধীরে ধীরে থিতু হওয়ার চেষ্টা করছিল পরিবারটি | কিন্তু যোদ্ধাবংশে কি অত সহজে স্থিরতা আসে ! ১৯২৭ সালে প্রয়াত হলেন ইনায়ৎ | চার ভাইবোনের মধ্যে সবথেকে বড় নুর তখন তেরো বছরের কিশোরী | মায়ের পাশে দাঁড়ালেন সংসারের হাল ধরতে | ধ্রুপদী গান গাইতে লাগলেন রেডিও ফ্রান্স-এ | শিশুপাঠ্য বই লিখলেন | 

Banglalive-9

এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্স আক্রমণ করল জার্মান বাহিনী | সন্তানদের নিয়ে নুরের মা চলে গেলেন লন্ডন | গান্ধী আদর্শে অনুপ্রাণিত হলেও নুর এবং তাঁর ভাই স্থির করলেন নাৎসিদের বিরুদ্ধে লড়বেন | নুরের ভাই বিলায়েৎ যোগ দিলেন রয়্যাল এয়ার ফোর্স বা ( RAF )-এ | নুর বেছে নিলেন Women’s Auxillary Air Force | তিনি ছিলেন সংস্থার প্রথম দিকের ওয়্যারলেস অপারেটরদের মধ্যে অন্যতম |  ১৯৪১ সাল ছিল নুরের জীবনে টার্নিং পয়েন্ট | তাঁর পোস্টিং হল RAF বম্বিং কম্যান্ডে | অ্যাবিংডনে তিনি কাজ শুরু করলেন নোরা ইনায়াৎ খান নামে |

ইতিমধ্যে গঠিত হল Special Operative Executive বা SOE | তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের তৈরি এই সংগঠনের শাখা বিভিন্ন দেশে ছিল | লক্ষ্য ছিল অক্ষ শক্তি অধিকৃত ইউরোপের বিভিন্ন অংশে স্থানীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা‚ গুপ্তচর বৃত্তি এবং সুযোগ বুঝে গুপ্ত হানা | সংগঠনের ফরাসি শাখায় নেওয়া হল নুরকে | 

SOE এজেন্ট নুর মন দিয়ে শিখলেন বন্দুক চালানো‚ বিস্ফোরক ব্যবহার‚ তালা ভাঙা‚ গুপ্তহত্যা এবং সাঙ্কেতিক চিঠি লেখা | প্রশিক্ষণের কঠিনতম অংশ ছিল নকল জেরাপর্ব | অর্থাৎ চরবৃত্তি করতে গিয়ে কেউ যদি নাৎসি গেস্টাপো বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে‚ তবে কী ধরণের জেরা বা অমানুষিক অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হবে‚ তার প্রশিক্ষণ | প্রশিক্ষকদের কিন্তু সন্তুষ্ট করতে পারেননি নুর | তাঁদের মতে‚ তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল ও নরম মনের | কিন্তু তাঁর ঝরঝরে ফরাসি ভাষা এবং রেডিও অপারেটর হিসেবে কাজের দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত | ফলে নুর নিযুক্ত হলেন শত্রুপক্ষে আড়ি পাতার কাজে |

১৯৪৩ সালের ১৭ জুন ফ্রান্সে পাঠানো হল নুরকে | কাজ ছিল‚ প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত গোপন বেতারবার্তা ফের ব্রিটেনে পাঠানো | দীর্ঘদিন ধরে ক্রমাগত নিজের ঠিকানা বদলে বদলে‚ নাৎসিদের চোখে ধুলো দিয়ে কাজ করলেন নুর | কিন্তু পথের কাঁটা বিশ্বাসঘাতকরা থাকে সব যুদ্ধেই | এক বিশ্বাসঘাতকের কাছেই হার মানতে হয়েছিল নূরকে | দুটি নাম শোনা যায় | একজন অঁরি দেরিকোর‚ আর একজন রেনে গ্যারি | বলা হয় অঁরি ছিলেন মিত্র ও অক্ষ দু দিকের ডাবল এজেন্ট | আর রেনের দাদা এমিলও ছিলেন ফরাসি এজেন্ট | অনেক সূত্র দাবি করে‚ রেনে নাকি নুরের সব তথ্য দিয়ে দিয়েছিল নাৎসিদের | ১৯৪৩-এর ১৩ অক্টোবর গ্রেফতার হলেন নুর | নিয়ে যাওয়া হল প্যারিসে গেস্টাপো সদর দফতরে | দু’বার পালানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি | কিন্তু ব্যর্থ হলেন | শেষে  অত্যন্ত বিপজ্জনক  তকমা দিয়ে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হল জার্মানির ফরঝেইম কারাগারে |

সেখানে তাঁর উপর অমানুষিক অত্যাচার চালানো হয় | কিন্তু শত নির্যাতনেও তিনি মাথা নোয়াননি জার্মানদের কাছে | যেমন তাঁর পূর্বপুরুষ নতিস্বীকার করেননি ব্রিটিশদের কাছে | নির্মম অত্যাচারের মুখেও নুর বলতেন তাঁর শৈশবের কথা | আত্মীয় পরিজনের কথা | কিন্তু তাঁর কাজ ? তখন নিশ্চুপ সুন্দরী নুর | গোপন তথ্য তাঁর কাছ থেকে বের করতে না পেরে নাৎসিরা তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল | ১৯৪৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর‚ মাত্র ৩০ বছর বয়সে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় টিপু সুলতানের উত্তরসুরি‚ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম গুপ্তচর নুর ইনায়ৎ খানকে | 

তাঁর আত্মত্যাগ ও বীরত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে ফরাসি সরকার নুর ইনায়ৎ খানকে সম্মানিত করেছে মরণোত্তর কোয়া দ্য গ্যের বা ক্রস অফ দ্য ওয়ার-এ | সামরিক বীরত্বের স্বীকৃতি এই সম্মান | ইংল্যান্ডের তরফে দেওয়া হয় দ্য জর্জ ক্রস | ২০১২ সালে লন্ডনে বসানো হয় নুরের ব্রোঞ্জমূর্তি | ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর নামাঙ্কিত স্ট্যাম্প | ২০২০ সালে ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ড আনবে ৫০ পাউন্ডের নোট | দাবি উঠেছে‚ তাতে থাকতে হবে নুর ইনায়ৎ খানের ছবি | যাঁর জীবন বলে দেয় সম্মুখসমরের মতোই বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রয়োজন চরবৃত্তিতেও | 

ডাশাউ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি ছিল বহু ডাচ ইহুদি | তাঁদের মধ্যে যারা ফিরতে পেরেছিলেন‚ বলেছিলেন গুলি করার আগে নুর ও তাঁর সঙ্গে থাকা আরও তিন মহিলা এজেন্টকে বীভৎস প্রহার করেছিল নাৎসি এস এস বাহিনী | তারপর দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড় করানো অবস্থায় বিদ্ধ করেছিল বুলেট | মৃত্যুর আগে নুরের শেষ কথা ছিল লিবার্তে  | কার থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন তিনি ? নিজের দুঃসহ ভাগ্য ও জীবন থেকে কি ?

আরও পড়ুন:  ইচ্ছাকৃতভাবেই খবরশূন্য সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠা

NO COMMENTS