অম্লানকুসুম চক্রবর্তী
অম্লানকুসুমের জন্ম‚কর্ম‚ধর্ম সবই এই শহরে|বাংলা ছোটগল্পের পোকা|একেবারেই উচ্চাকাঙ্খী নয়‚অল্প লইয়া সুখী|

রামরাজাতলা স্টেশন। ট্রেনের চাকায় গোড়ালি থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া ডান পা নিয়ে ছটফট করছেন, যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন বছর ঊনপঞ্চাশের এক ব্যক্তি। মুরগীর ধড়টা দেহ থেকে আলাদা করার পর যেভাবে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে, সেভাবেই রক্ত উথলে পড়ছে ওই ভদ্রলোকের ক্ষতস্থান থেকে। মা-মাটি-মানুষের দেশের মাটি রাঙা হচ্ছে রক্তদাগে। পাশেই লেভেল ক্রসিং, ব্যস্ত প্ল্যাটফর্ম। জ্যাকেট, সোয়েটার, মাফলার, হনুমান টুপিতে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা লোকেরা দেখলেন কীভাবে গোঙাচ্ছেন, তিল তিল করে মরে যাচ্ছেন এক জন মানুষ। তাঁদেরই সহনাগরিক। শীতের সকালে, চোখের সামনে, যাকে বলে একেবারে থ্রিলি সিন। জননেত্রীর কথায়, বাংলার মানুষ অসমের মানুষের পাশে আছে। অসমের বাঙালিদের দুঃখে বাংলার বাঙালিদের চোখ ভেসে যায়। মাইকে অন্তত। কিন্তু, নিজের দেশের, নিজের শহরের, নিজের স্টেশনের পাশেই যখন একজন মানুষ কাতরে কাতরে শেষ হয়ে যান, একটা হাতও এগিয়ে আসে না। রামরাজাতলায় ঘণ্টাখানেক পরে রেলের অ্যাম্বুল্যান্স এসেছিল অবশ্য। হতভাগ্য মানুষটি ততক্ষণে অনেক দূরে চলে গিয়েছেন।

Banglalive

ফেয়ারলি প্লেস। মিলেনিয়াম পার্কের প্রধান গেট। মানুষ সেখানে মানুষকে ভালবাসতে যায়। স্ট্র্যান্ড রোড ধরে দুরন্ত গতিতে চলা হাওড়ামুখী মিনিবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উঠে পড়ল বাঁদিকের ফুটপাথে। বাসটা নাকি ব্যাঙ্কশাল কোর্টের দিক থেকে হঠাৎ চলে আসা আরও একটা মিনিবাসের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে চেয়েছিল। ফুটপাথে উঠে একটা গাছের সঙ্গে ধাক্কা মারার পরেই হয়ত বাসচালক বুঝতে পেরেছিলেন, বাস আর গাছের মাঝখানে কোনও কুকুর কিংবা বিড়াল নয়, ছিলেন একজন মানুষ। ততক্ষণে তাঁর ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে পুরোটাই থেঁতলে গিয়েছে। বাঁ পায়ের অবস্থাও বলার নয়। আবার সেই রক্তারক্তি কান্ড, সিনেমায় গুরু ভিলেনকে মারার পর শেষ দৃশ্যে যেমনটা হয়ে থাকে। পরের দিন খবরের কাগজে একটা ছবি বেরিয়েছিল। দেখেছিলাম, ওই মারাত্মক জখম ভদ্রলোককে ঘিরে রয়েছেন বেশ কিছু মানুষ, নকুলদানার চারদিকে যেভাবে ঘিরে থাকে পিঁপড়ের দল। গোটা কুড়ি তিরিশ তো হবেই। বিবিধের মাঝে দেখি মিলন মহান। সবাই আহত মানুষটির দিকে তাক করে রয়েছেন মোবাইল ফোন। ছবি তুলছেন, ছবি। নিশ্চয়ই ভিডিও-ও তুলেছিলেন কেউ কেউ। হয়ত ফেসবুক লাইভও বাদ যায়নি। কিন্তু কাতরানো মানুষটার অবজেক্ট হওয়ার থেকে অনেক বেশি জরুরি দরকার ছিল কয়েকটা হাত। যত জন ছবি তোলায় ব্যস্ত ছিলেন, তাঁদের সিকিভাগও যদি ক্যামেরার বদলে লোকটিকে ধরতেন, তাহলে হয়ত তাঁর চিকিৎসাটা আরও আগে করা যেত।

উপরের দুটো ঘটনাই ঘটেছে আমাদের এই বৃহত্তর শহরে, গত কয়েক দিনে। এ রকম ঘটনা যখন খবর হয়, কাগজে ছাপা হয়, টিভিতে আলোচনা বসে ঘণ্টাখানেক, তখন শাসক, বিরোধী দল আর পুলিশের পাশে পার্শ্বচরিত্র হিসেবে একজন মনোবিদকেও সঙ্গে রাখা হয়। মনোবিদ থাকলে প্যানেলের বৃত্ত সম্পূর্ণ হয় আর কি। ঝগড়ায় অন্য মাত্রা যোগ হয়। আর ওই মনোবিদেরা বলেন আমাদের আত্মকেন্দ্রিকতার কথা। ক্ষয়ে যাওয়া মূল্যবোধের কথা। একটা ভয়ঙ্কর সুন্দর ভবিষ্যতের কথা। সবচেয়ে জমে ভাল কোনও মৃত বা আহত লোকের প্রিয়জনকে যোগাড় করা যায়। তাহলে ওঁর কান্নার ছবিটা সারা দিন ধরে দেখিয়ে টিআরপি বাড়ানো যায় সহজে। আমার কিন্তু খুব ইচ্ছে করে এমন এক জন মানুষকে ওই প্যানেলে বসাতে, যিনি ঘটনার ছবি তুলেছিলেন ফটাফট, মোবাইলের ক্যামেরা ভিডিও মোডে নিয়ে গিয়ে রেজোলিউশন পাল্টে এইচডি করে দিয়েছিলেন, যেন মাংস-অস্থি-মজ্জার  চলমান ছবি ওঠে কাচের মতো স্বচ্ছ। জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, আচ্ছা স্ক্রিনে আঙুল দিয়ে খেলা করতে করতে বৌ-প্রেমিকা-সানি লিওন-মা কালীর সঙ্গে যখন দুম করে চলে আসবে এই ছবিটা আপনার ফেদার টাচ স্ক্রিনে, এমোলেড ডিসপ্লেতে, তখন কেমন লাগবে আপনার? হাউ উড য়্যু ফিল? ওই মানুষটার কথা মনে পড়বে কি, যাঁর দিকে লেন্সটা না বাড়িয়ে যদি হাতটা বাড়াতেন, তা হলে হয়ত একটা প্রাণ বেঁচে যেত।  একটা রেয়ার পিক হয়তো হত না, কিন্তু একজোড়া কৃতজ্ঞ চোখ হয়তো খুঁজে বেড়াত আপনাকে, জীবনভর

এখন তো মেলার সিজন। বাঙালি আনন্দ করবে না তো কি শ্রাদ্ধ করবে? কচুরিপানার ঝোপের বিস্তারের মতো ক্রমশ বেড়ে চলেছে মেলার সংখ্যা। এসব মেলায় সন্ধেবেলার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে একটা গান খুব কমন। মানুষ মানুষের জন্য। জীবন জীবনের জন্য। এর সঙ্গে নাচ হয়। একটু সহানুভূতি কিইই.. বলার সময় মঞ্চের উপরে মরমিয়া দেহের চলন। এমনই এক মেলায় দেখেছিলাম, এই গানের সঙ্গে নাচের অনুষ্ঠানের সময়ই একজন বয়স্ক মানুষ হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। ওনার সত্তরোর্দ্ধ স্ত্রী ছাড়া আর কেউ ওনাকে মাটি থেকে তোলার জন্য হাত বাড়ায়নি। নাচ নাচের মতোই চলেছিল। পিছন থেকে উল্টে আওয়াজ এসেছিল, বুড়ো ভামগুলো মেলায় কি করতে আসে কে জানে। সম্প্রতি এক মফস্বলের বইমেলায় মঞ্চেই কবিতা পড়তে পড়তে হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন এক কবি। মারা গেলেন। অনুষ্ঠান চলেছে অনুষ্ঠানের মতো। বাকি কবিরা অভিমানী কবিতা পড়ে গিয়েছেন পর পর। নাচ গানও হয়েছে বলে শোনা যায়। অথচ সাহিত্যিকরা বলেন, মানুষকে না ভালবাসলে নাকি মহৎ সৃষ্টি হয় না।

সব ঘটনা খবর হয় না। হয়ত তা হওয়ার দরকারও নেই। এক জন অশীতিপর মানুষকে জানি, যিনি ব্যস্ত শ্যামবাজারের মোড় পার হওয়ার সময় বুভুক্ষুর মতো খোঁজেন একটি হাত। প্রতি দিন। পান না। এক অন্ধ ফেরিওয়ালা দমদম স্টেশনে লাঠি নিয়ে দিক হাতড়ান। ট্রেন এলে ছুটে যান দিগভ্রষ্টের মতো। তাকে ট্রেনে উঠিয়ে দেওয়ার কেউ নেই। অন্যের কথা ভাবার সত্যিই সময় নেই আমাদের। নিজেকে আর নিজের ছোট্ট বৃত্তকে লইয়া সুখী। এ এক অদ্ভুত নিস্পৃহতা। বিতর্ক হবে জানি। তাও বলছি। এই কদিন আগেই বাসে আমার পাশে বসা এক ভদ্রলোককে বলতে শুনেছিলাম, পুরো শহরটাই কেমন যেন সল্টলেক হয়ে গেল মশাই। কারও কিস্যু যায় আসে না।

আমার এক প্রবাসী বন্ধুর সঙ্গে দেখা হল সম্প্রতি। গত দশ বছর আমেরিকায়। জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেমন আছিস। কেমন লাগছে ও দেশ? বলেছিল, সব পেয়েছির দেশে ভাল লাগার সব চেয়ে এক্সাইটিং কারণটা হল পিপল ডু নট পোক দেয়ার নোজেজ ইনটু ইওর লাইফ। শুধিয়েছিলাম, আর নাক গলালে?’ ও বলেছিল, উই স্ক্রিউ দ্য বাগ্। বিশ্বায়নের যুগে হয়ত এটাই এখন ট্রেন্ড। আর এই পোক না করার কোলাজই তো আমরা দেখে চলেছি প্রতি দিন।

নিজের বৃত্তকে নিয়ে থাকার পরিণতিটা কিন্তু ভয়ঙ্কর। কয়েকটা জিনিস মেলাতে পারি না। এক দিকে মানসিক ভারসাম্যহীন স্ত্রী তাঁর মৃত স্বামীর দেহ আগলে বসে থাকেন চার-পাঁচ দিন, আর অন্য দিকে অন্য এক তুমুল সুস্থ স্ত্রী তাঁর প্রেমিকের সঙ্গে যোগসাজশ করে স্বামীকে খুন করেন। শুধু তাই নয়, স্বামী খুন হওয়ার সময় তাঁর আর্তনাদ শোনেন প্রেমিকের মোবাইল ফোনে, লাইভ। কানে আর্তধ্বনি নিয়ে হয়ত সেই সময় গরমাগরম মুড়ি সিঙাড়াও খাচ্ছিলেন তিনি। রিয়্যালিটি শো দেখার সময় যেমন হয়। এটাও তো একটা আধুনিক রিয়্যালিটি শো। খাল্লাস।

এই লেখাটা লেখার সত্যিই কোনও উদ্দেশ্য নেই। পাগলের প্রলাপ। একটা বিখ্যাত কথা আছে। কোনও কিছুকে যদি তুমি বদলাতে না পারো, তা হলে সেই বদলটার সঙ্গে নিজেকে বদলে নাও, মানিয়ে নাও। এই মানিয়ে নেওয়ার দৌড়ে আমরা যেন সবাইকে টেক্কা দিতে পারি দ্রুত। রাস্তায় যদি কোনও রক্তাক্ত অভিমন্যুকে দেখি এর পর, চক্রব্যুহের মতো যেন তাঁকে ঘিরে ধরতে পারি চোখের নিমেষে। তাঁকে যেন জাপ্টে দিতে পারি ফ্ল্যাশবাল্বের ঝলকানিতে। যেন বলতে পারি, দাদা, আলাদা হয়ে যাওয়া পা-টা একটু এদিকে ঘোরাবেন প্লিজ..আরেকটু..আরেকটু। নিচ্ছি কিন্তু। পারফেক্ট। আর যদি ভিডিও করতে করতেই কেউ মারা যান, তা হলে সেটা ফেসবুকে আপলোড করার সময় আগের বেঁচে থাকার আনওয়ান্টেড অংশটা কেটে উড়িয়ে দিয়ে শেষ দশ সেকেন্ড রাখবেন। একটা কাউন্টডাউন টাইমার জুড়ে দেবেন স্ক্রিনে। স্টিল অ্যালাইভ..নয়, আট, সাত…তিন, দুই, এক..হি ইজ নো মোর। থ্যাঙ্কস ফর ওয়াচিং|

আরও পড়ুন:  ছাঁচি কুমড়োর সুক্তো

3 COMMENTS

  1. দারুন লিখেছেন।এই যুগে আর কারো মনে হয়না ছবি তুলে পোস্ট করার পরিবর্তে সাহায্য করার আনন্দটা অনেক বেশি।

  2. manus e rokm hoey gechey.puro sarthopr nijer kotha vabey.hatey mobile kono sympathy nei je ko gjtona agey chobi tolo.ar social nrt work e post.satti apnr lekha porey valo laglo.ektu manus sachey ton hok