শুধু গির্জা নয়‚ ভস্মীভূত পৌত্তলিক স্থাপত্যে দাঁড়িয়ে থাকা প্যারিসের গর্বের রমণী

নোত্র দাম দ্য পারি‚ অর্থাৎ Our Lady of Paris | আইফেল টাওয়ারের পরেই ফরাসি আইকন | বিশ্বজুড়ে ফরাসি জাত্যভিমানের অন্যতম সেই প্রতীক বিধ্বংসী আগুনে ভস্মীভূত | মধ্যযুগে দ্বাদশ ও চতুর্দশ শতকের মধ্যে নির্মিত এই স্থাপত্য ছিল ফরাসি রাজতন্ত্রের ধারক ও বাহক | পোড়া ছাই থেকে ফিনিক পাখির মতো জেগে উঠবে ইতিহাস | তার আগে ইতিহাসের কিছু চমকপ্রদ তথ্য |

# বলা হয়‚ পৌত্তলিক সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের উপরে দাঁড়িয়ে আছে এই স্থাপত্য | ইল-দ্য-লা-সিতে‚ যার উপর এই গির্জা তৈরি হয়েছিল তা আসলে গ্রেকো রোমান শহর লুতেশিয়ার অংশ | ৫২ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে রোমানদের কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল ফরাসিরা বা গল-রা | তারপর লুতেশিয়া শহর অধিকার করেছিল রোমানরা | ঐতিহাসিকদের ধারণা‚ প্রাচীন এই নগরের কোনও মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের উপরে বানানো হয়েছিল গির্জাটি |   

# ১৭১০ খ্রিস্টাব্দে নোত্র দাম গির্জার অল্টারের নিচ থেকে খননের ফলে আবিষ্কৃত হয় আরও একটি পুজোর বেদি | তা ছিল‚ প্রাচীন রোমান দেবতা জুপিটার বা আমাদের বৃহস্পতি দেবতার  | পরবর্তীকালে আবিষ্কৃত হয়েছে আরও বেশ কিছু পৌত্তলিক নিদর্শন | এর গথিক স্থাপত্যরীতি বারবার মনে করিয়ে দেয় সুপ্রাচীন রোমান সভ্যতাকে |

# এর আর এক নাম দ্য ফরেস্ট | কারণ নোত্র দাম জুড়ে আছে অনিন্দ্যসুন্দর কাঠের কারুকাজ | দ্বাদশ শতকে প্যারিসে প্রায় ৫২ একর জমি জুড়ে কাটা হয়েছিল গাছ | তার বেশিরভাগই স্থান পেয়েছে নোত্র দামের সজ্জায় | বিশেষত এর সিলিং-এ যে বিম আছে‚ তা তৈরি হয়েছে এক একটি গাছ দিয়েই | অন্যদিক দিয়ে বলা যায় এগুলি ওল্ডেস্ট সার্ভাইভিং উড টিম্বার ফ্রেম |  

# ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবের মধ্যগগনে‚ রাজা ষোড়শ লুই-কে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়েছিল গিলোটিনে | সেইসঙ্গে মস্তক ছেদ হয়েছিল নোত্র দাম গির্জার আটাশ জন বাইবেলীয় রাজার প্রস্তরমূর্তির | যাঁরা বাইবেলের কোনও না কোনও অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছেন | 

# ১৯৭৭ সালে একটি ফরাসি ব্যাঙ্কের বেসমেন্ট সারাইয়ের সময় পুনরায় আবিষ্কৃত হয় নোত্র দাম গির্জার সেই খণ্ডিত মস্তকগুলি | এখন সেগুলো সজ্জিত ক্লুনির জাদুঘরে | 

# এক ঝলকে মনে হয় নোত্র দাম গির্জার দুটি টাওয়ার যেন একইরকম‚ যমজ | কিন্তু কাছ থেকে ভাল করে দেখলে বোঝা যায় পার্থক্য | দক্ষিণের মিনারের থেকে উত্তরের মিনার কিছুটা লম্বা | 

# কুড়িটির মধ্যে সবথেকে বড়টিকে রেখে বাকি সবকটি গলিয়ে ফেলা হয়েছিল কামান বানানো হবে বলে | উনিশ শতকে গির্জায় নতুন ঘণ্টা লাগানো হয় | কিন্তু তার আওয়াজ আগের ঘণ্টাধ্বনির ধারেকাছে পৌঁছতে পারেনি | ২০১৩ সালে আবার পাল্টানো হয় তাদের | অবশেষে আবার পাওয়া যায় প্রাচীন সুমধুর ঘণ্টাধ্বনি | সবথেকে বড় ঘণ্টা এমানুয়েল বেজে ওঠে‚ তবে বিশেষ উপলক্ষে | 

# ফরাসি বিপ্লবের যে ক্ষত এই স্থাপত্য সহ্য করেছিল‚ তা অনেকটাই প্রশমন করেছিলেন নেপোলিয়ঁ বোনাপার্তে | তিনি ক্ষমতায় আসার আগে এটি ছিল কার্যত গুদামঘরে পরিণত হয়েছিল | নেপোলিয়ঁর উদ্যোগে আবার গির্জার ভূমিকায় ফেরে নোত্র দাম | তবে একে নতুন জীবন দিয়েছিল ভিক্টর হুগো (ফরাসি ভাষায় বিক্তর ইউগো)-র কলম | ১৮৩১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কালজয়ী উপন্যাস | যার প্রকৃত নাম ছিল ” Notre-Dame de Paris” | পরে অনুবাদে তা পাল্টে হয়ে যায় ” The Hunchback of Notre Dame” | যদিও কুঁজওয়ালা ঘণ্টাবাদক এর প্রধান চরিত্র নয় | গির্জাই সেখানে মূল | 

# অনেকেই বলেন‚ নোত্র দাম গির্জার অর্গ্যান ফ্রান্সে সর্ববৃহৎ | ৮০০০ টি পাইপ সম্বলিত এই অর্গ্যান বাজানো হয় পাঁচটি কি-বোর্ডে | গির্জার সামনে পাথরের পথে আছে আটকোণা ব্রোঞ্জফলক | তার উপরে খোদাই করা Point zéro des routes de France | অর্থাৎ এখান থেকেই মাপা হয় দূরত্ব | প্যারিস থেকে অন্যান্য সব স্থানের দূরত্ব পরিমাপের নির্ণায়ক এই গির্জা |

# নোত্র দাম গির্জার ছাদে ছিল মৌচাক | স্থাপত্যের আশেপাশে যে বাগান আছে তার ফুল থেকেই মধু সংগ্রহ করত মৌমাছিরা |

এখন সবই অতীত | আগুনের গ্রাসে বিধ্বস্ত ফ্রান্সের বিখ্যাত স্থাপত্য‚ যার মূল প্রবেশদ্বার পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করত দৈনিক গড়ে পঁয়ত্রিশ হাজার দর্শক | বছরে এত পর্যটক এখানে আসেন‚ যে ফ্রান্সের ৯৯%শহরে জনসংখ্যা তার থেকে কম | পর্যটক তথা ইতিহাসপ্রেমীদের অপেক্ষার প্রহর শুরু | কবে আবার স্বমহিমায় ফিরবে প্যারিসের রমণীয় দ্রষ্টব্য | 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here