খালি পেটে ধর্ম হয় না

খালি পেটে ধর্ম হয় না

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

শীতের হাওয়ায় নাচন লেগেছে বেশ কিছু কাল হল। আমলকির ডাল যা নেচেছে, তার থেকে আম আদমির মন নেচেছে বেশি। না নাচতে চাইলেও নাচানোর হেতুর অবশ্য অভাব ছিল না। খাদ্যমেলা, পুষ্পমেলা, আনন্দমেলা, পরিবেশমেলা, পাখিমেলা, বিবেকমেলা, সুভাষমেলা, বেবি শো, ডগ শো, হটডগ শো—একে একে প্রায় সব কটাই হল। এখনও চলছে অনেক জায়গায়। তবে এমন মেলা তো মা মাটির স্বার্থে। অনুপ্রেরণা মাখা মানুষের পরমার্থে। ‘বাঙালি উৎসব করবে না তো কি শ্রাদ্ধ করবে?’ তবে সমস্যা হল, ইহাতে ইনটেলেক্ট কোশেন্ট নাই। সব মেলার সেরা যে মেলা, যেখানে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে চেয়ারে বেঞ্চিতে সতরঞ্চি বিছিয়ে বসে থাকেন বুদ্ধিজীবিরা, তা হল বইমেলা। সেই মেলা আবার এসেছে ফিরিয়া।

শুধু বইমেলার জন্য কত মানুষ অফিস কাছারি ক্লাসঘর তাচ্ছিল্য করেন। ফেলে আসা ময়দানের ফেলে আসা মেলার কথা ভেবে অনেকেরই মনে তারসানাই বাজে। তবে আকুল হয়েও গুমরে গুমরে তাঁরা ঠিক মিলনমেলা পৌঁছে যান। পুলিশি ঘেরাটোপে, ফাঁকা করে দেওয়া রাস্তায় বড় বড় মানুষেরা বইয়ের জন্য হাঁটেন। হেঁটে পুষ্পস্তবক পান। আর আম আদমিরা বইমেলার জন্য বাসে ট্রেনে ঝোলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বইয়ের জন্য ধুলো খান। কলকাতার একশ কিলোমিটার রেডিয়াসের মধ্যে থাকব অথচ বইমেলা যাবে না, এমন বাঙালির সংখ্যা আজও হাতে গোনা।

তবে বুঝলেন, ওই টুকুই! হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ডাক দেওয়ায় দেখা হয় অক্ষরের বনে। কিন্তু যেন তেন প্রকারণে একটিবার গেট পেরিয়ে মেলায় ঢুকে পড়তে পারলেই হল। জয় হুজুগের জয়। বই কেনার কথা মাথা থেকে কর্পূরের মতো বেমালুম উবে যায়। অধমের কথার সারবত্তা বুঝতে হলে বইমেলার যে কোনও গেটে আসা যাওয়ার পথের ধারে মানুষের ঢলটা একটু দেখবেন। ফিশফ্রাই আর চিকেন ললিপপের ঢেকুর তুলতে তুলতে মেলা ফেরত কটা লোকের হাতে বই থাকে একটু নজর দিয়ে দেখা যেতে পারে। প্রশ্নটা সহজ। আর উত্তরটাও জানা!

বইমেলায় প্রায় প্রতিটি গেটের কাছেই ঢালাও জলের পাউচের ব্যবস্থা। ভুললে চলবে না, এই জলও কিন্তু অনুপ্রেরণা মাখা। মেলায় ঢোকার লাইনে আমারই সামনে এক গিন্নি একটি বিগ শপার বের করে কর্তাকে বললেন, ‘ওগো, যত পার জলের পাউচ নিয়ে নিও ব্যাগে। খেয়ে হাত ধোব কি দিয়ে?’ বউয়ের বুদ্ধিমত্তার তারিফ করে কর্তা বললেন, ‘ঠিক বলেছ। তুমি তিন চারটে মেলার ম্যাপ নিয়ে নিও। না পেলে বড় লিফলেট। হাতটা মোছা যাবে। রুমাল তেলচিটে হবে না।’

বইমেলায় বই কেনার উৎসাহ যত কমছে, তত ভারি হচ্ছে আলোচনার বিষয়। হয়ত ঘাটতি পোষাচ্ছে এ ভাবেই। ল্যাটিন আমেরিকার লোকসাহিত্যে প্লেটোর প্রভাব কিংবা বাংলা রহস্য উপন্যাসে লালন কি ভাবে জাগেন, এমন সব গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে বইমেলার সাজানো প্রেক্ষাগৃহে নানা আলোচনা সেমিনার হয়। পিছনের সারিতে বসে অনেক লোক নাক ডাকেন। আলোচনার কয়েক টুকরো মেলার সন্ধের বাতাসে উড়ে উড়ে আসে মাইকে। আর এই সব শুনতে শুনতে ‘বইপাগল’রা চিকেনের স্যাঁকা ঠ্যাঙে পুদিনা সস মাখান। এক মনীষী তো অনেক আগেই বলে গিয়েছিলেন, খালি পেটে ধর্ম হয় না।

মমার্ত থেকে তরুন কবির ক্রন্দনধ্বনি ভেসে আসে। প্রবল ঝড়ে পাতা ঊড়ে যাওয়া ন্যাড়া তালগাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন একাকী কবি। এমনই এক কবিকে এক বার মিনমিন করে বলতে শুনেছিলাম, ‘কবিতা আমার কাছে প্রসব যন্ত্রনার মতো।’ হয়ত কবিতা পাঠের শেষ কবি ছিলেন তিনি। তাঁর স্রোতা বলতে ছিলেন শুধু এক বেচারা ইলেকট্রিশিয়ান। আর হ্যালোজেনের সামনে ভনভন করছিল এক গাদা কালো পোকা।

কবিদের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে লিটল ম্যাগাজিনের কর্নারে। তার পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেই কবিতায় সিক্ত এবং রিক্ত হওয়া যায়। সূর্য ডোবার পালা এলেই ‘বেশ তো’ বলতে বলতে সন্ধে নামলেই এখানে অনেককে ক্রমশ ঢলে পড়তে দেখা যায়। জীবন যখন শুকায়ে যায়, কারণধারায় এসো। গুপ্ত ঝোলায় সুপ্ত থাকে অমৃতসুধা। রাজারহাট নিউটাউনের সিন্ডিকেটের মতো এখানেও কবিদের অনেক দল থাকে। প্রতিটা দলই নিজের দলের সম্পর্কে ভাবে, সব্বাই কবি নয়, কেউ কেউ কবি! নিজেদের দলের কবিরা সেখানে জটলা করেন। নিজেদের মতো করে চলে কবিতাযাপন। গত বছর এমনই এক মাইক্রো কবি সম্মেলনে এক কবিকে রকেটগতিতে সুধারসে চুমুক দিয়েই বলতে শুনেছিলাম, ‘মূল্যবোধের কাঁচালঙ্কা ঠোঁটে নিয়ে অবুঝ সবুজ টিয়া উড়ে গেল সূর্যের দিকে।’ অতি কষ্টে এইটুকু বলেই চেয়ার থেকে ধপ করে পড়ে গেলেন কবি। উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ছিল না। তাঁর চোখে মুখে ছেটানো হল জল। চোখ খোলার পর তাঁর মুখ থেকে যা বেরোতে শুনেছিলাম তা হল, ‘আমার হাত ধর, কবিতা।’

কবীর সুমনের গানে ছিল, সুনীল গাঙ্গুলির দিস্তে দিস্তে লেখা, কত কবি মরে গেল চুপি চুপি একা একা। সত্যিকারের বিদগ্ধ লেখকেরা একা একা ঘুরে বেড়ান। আর জনতা ফলো করে সেই গুটিকয়েক সাহিত্যিকদের, যাঁরা নিয়মিত মুখ দেখিয়ে থাকেন টিভি চ্যানেলগুলোতে। যাঁরা কলমেও আছেন, ভাঙড়েও আছেন, উড়ালপুলের খসে পড়া চাঙড়েও আছেন। আর গায়ে একটু পার্টি পার্টি গন্ধ থাকলে তো আর কথাই নেই। অ্যাকাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত এক সাহিত্যিককে বইমেলার একটি প্রকাশনার সামনে রাখা চেয়ারে শূন্য চোখে বসে থাকতে দেখেছি। তাঁর ‘অপরাধ’, তিনি শুধুই লেখেন। আর তার ঠিক দু-আড়াইশ মিটার দূরে টাকমাথা চশমা পরা এক তরুন কবিকে হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মতো সদর্পে হেঁটে যেতে দেখেছিলাম। পদ্যের লাইন এবং কেবল্ লাইন—এই দুটোতেই ওই কবি জনপ্রিয়। মানে পাবলিক খুব খায় আর কি। তাঁর পিছনে লাইনে ছিলেন তাঁর লাইনপ্রেমীরা।

কয়েক বছর ধরে দেখে আসছি, বইমেলার রিং রোডের ধারের বইয়ের স্টলগুলো রীতিমতো মাছি তাড়ায়। ভিড় উপচে পড়ে ওই বৃত্তাকার রাস্তায় ঘাঁটি গেঁড়ে থাকা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের স্টলগুলোতে। সেখানে হাসি হাসি রাশি মাখা ফুলটুসি মৌটুসি শুকতারারা মধু ভান্ডার নিয়ে বসে থাকেন। শ্যামাপোকা যেভাবে বাল্বের আলোর দিকে ধেয়ে চলে, ঠিক সেভাবে লোকেরা মৌচাকের মৌমাছির মতো কিলবিল করেন শুধু সিরিয়ালের মুখগুলো নিজের চোখে একবার দেখার জন্য। চ্যানেলের লোগো ছাপা টিশার্ট পরা ঝিঙ্কুমামনিরা বাংলা-হিন্দি-ইংরিজির এক অদ্ভুত মিশেলে ঝিঙ্গালালা করেন। মেলার মাঠে দুষ্টুমিষ্টি নায়িকার সঙ্গে সেলফি তোলার টোপ দেওয়া হয়। ক্যুইজে জিতলেই সেলফি। তবে টুসকির প্রিয় মাছ কিংবা ফুলঝুরির শাশুড়ির সঙ্গে কি নিয়ে লেটেস্ট ঝগড়াটা হল, তা না জানলে ওই ক্যুইজের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। অবশ্য কপালকুন্ডলা কার লেখা না জানলেও এই সব ক্যুইজের প্রশ্নের জবাব জানে অনেকেই।

এ বারের বইমেলায় কয়েকটি প্রাপ্তিযোগ হল। প্রেমিকার একটি ইংরিজি পেপারব্যাক উপন্যাস পছন্দ হওয়ার পর প্রেমিকের আশ্বস্তবাণী শুনলাম, ‘এ ভাবে ফালতু পয়সা নষ্ট করে না সোনা। আমি কালকেই ওটার পিডিএফ তোমায় ডাউনলোড করে দেব ফ্রিতে। ট্যাবে পোড়ো।’ প্রেমিকা মিচকি হেসে বলল, ‘আইডিয়া! তা হলে ওই টাকাটা দিয়ে ড্রামস্টিক খাই?’ ছেলেটি মেয়েটির গাল টিপে দিল। অন্য একটি স্টলে দেখলাম, বাংলা বই ঘাঁটতে থাকা এক খুদের উদ্দেশে ওর স্ট্রেটচুলো স্লিভলেস মা সত্তর ডেসিবেলে খুদের বাবাকে বলছেন, ‘অ্যাই দ্যাখো দ্যাখো আবার বেঙ্গলি ঘাঁটছে। ওকে সরাও এক্ষুনি। কতবার তোমায় বলেছি, ওনলি ইংলিশ স্টলস।’ বাবা তাঁর ছেলের ‘ওরিয়েন্টেশন’ সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

তবে চমকে গিয়েছিলাম এক পনিটেলধারীর কথা শুনে। গিটার আর গার্লফ্রেন্ড নিয়ে মেলায় এসেছিলেন। এক কানে দুল। পনিটেলের গলায় কাঁকড়াবিছের ট্যাটু। আর গার্লফ্রেন্ডের উন্মুক্ত কাঁধে মাকড়সা। দূর থেকে শ্রীজাতকে দেখে পনিবাবু বললেন, ‘হেই লুক। শ্রীজাত দেয়ার। তেততিরিশ বছর কেটে গেল, কেউ কথা রাখেনি।’ আর ‘আই লাভ ধানসিঁড়ি’ লেখা টিশার্ট পরা গার্লফ্রেন্ডটি বলে উঠলেন, ‘ওএমজি।’

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

3 Responses

Leave a Reply

Handpulled_Rikshaw_of_Kolkata

আমি যে রিসকাওয়ালা

ব্যস্তসমস্ত রাস্তার মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে কাটিয়ে হেলেদুলে যেতে আমার ভালই লাগে। ছাপড়া আর মুঙ্গের জেলার বহু ভূমিহীন কৃষকের রিকশায় আমার ছোটবেলা কেটেছে। যে ছোট বেলায় আনন্দ মিশে আছে, যে ছোট-বড় বেলায় ওদের কষ্ট মিশে আছে, যে বড় বেলায় ওদের অনুপস্থিতির যন্ত্রণা মিশে আছে। থাকবেও চির দিন।