নীহারুল ইসলাম
জন্ম- ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৭, মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘী থানার হরহরি গ্রামে (। শিক্ষা- স্নাতক (কলা বিভাগ), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা- শিক্ষা সম্প্রসারক। সখ- ভ্রমণ। বিনোদন- উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শ্রবণ। এযাবৎ তিন শতাধিক গল্পের রচয়িতা। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ কর্তৃক “ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার” প্রাপ্তি (২০১০)। ‘ট্যাকের মাঠে মাধবী অপেরা’ গল্পগ্রন্থটির জন্য পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রবর্তিত “সোমেন চন্দ স্মারক পুরস্কার” প্রাপ্তি (২০১০)। ভারত বাংলাদেশ সাহিত্য সংহতি সম্মান “উত্তর বাংলা পদক” প্রাপ্তি (২০১১)।

আমার জন্ম নানাবাড়িতেসেটা ভাগীরথী নদীর পশ্চিম পাড়ে সাগরদিঘী ব্লকে। রাঢ় বঙ্গগ্রামের নাম হরহরি। সেখানে শুধু আমার জন্ম নয়, শৈশবও কেটেছেতাই বুঝি ৭১এর মুক্তি যুদ্ধের বোমা বর্ষণের আওয়াজ আমার কানে আজও বাজে। আকাশে যুদ্ধবিমান উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য আমি আজও দেখতে পাই। যদিও তা নিয়ে আমার কোনও আতঙ্ক ছিল না তখন, বয়স তো সবে চার। ‘আতঙ্ক’ শব্দটার সঙ্গেই পরিচয় হয়নি। বরং ওসব নিয়ে প্রচণ্ড কৌতুহল ছিল। আর তা নিয়ে নিজের মতো করে বেড়ে উঠেছিলাম।

মনে পড়ে নিজের পৈতৃকবাড়িতে যেদিন প্রথম এলাম, সেদিনের কথা। একেবারে নতুন জায়গা নতুন পরিবেশ। আরও আশ্চর্যর যেটা সেটা হল নানাবাড়িতে আমি যে ভাষার সঙ্গে পরিচিত ছিলাম, এই বাড়িতে সেটার প্রচলন নেই। আমার দাদুদাদি, আব্বাচাচাফুফুরা নিজেদের মধ্যে এমন এক ভাষায় আমাকে যা জিজ্ঞেস করছেন, একআধটু বুঝতে পারলেও আমার পক্ষে উত্তর দেওয়া খুব রীতিমতো কঠিন। তবু চেষ্টা করে ব্যর্থ হতে দেখে আমার দাদী তো আমাকে বলেই ফেলে ছিলেন, বাঙাল কহেকা! আমার খুব রাগ হয়েছিলকিন্তু রাগ দেখানোর সাহস সাহস পাইনিঅগত্যা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, জীবনে কখনও ওই ভাষা উচ্চারণ করব না। আমি আমার মায়ের ভাষাতেই কথা বলব। বলা যেতে পারে, সেটাই ছিল আমার প্রথম বিদ্রোহ।

আমার মাতৃকুল খাঁটি বাঙালি। পিরফকিরদরবেশের বংশ। প্রখ্যাত লোকগবেষক শক্তিনাথ ঝা মহাশয়ের লেখা থেকে জানতে পারি আমার মাতৃকুল ছিল সন্ন্যাসীফকির বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী বংশ। আর আমাদের পূর্বপুরুষেরা আসলে ছিল বিহার না উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা। লালগোলার রাজাদের পড়শিবন্ধু। তো সেই রাজাদের আমন্ত্রণেই তাঁদের লালগোলায় আগমন ঘটেছিল।

আরও পড়ুন:  কুকুর বিড়াল বৃত্তান্ত

যাই হোক, আমার আব্বা কিন্তু আমার সেই বিদ্রোহকে সমর্থন করেছিলেন। ক্লাসের বই বাদেও তিনটে থান ইটের মতো বই হাতে দিয়ে বলেছিলেন, স্কুলের বই ছাড়াও এগুলি তোমায় পড়তে হবে। না পড়লে জীবন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হবে না।

Banglalive-8

আব্বার আদেশ অমান্য করিনি। কিছু না বুঝেই পড়েছিলাম বইগুলি। বাংলা অনুবাদে। বইগুলি ছিল ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’ আর ‘ইলিয়াড’-‘ওডিসি’ পরে আরও অনেক বই– ‘রামমোহন রচনাবলী’, ‘মধুসূদন রচনাবলী’, ‘বিবেকানন্দ রচনাবলী’, ‘বঙ্কিম রচনাবলী’, ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’, ‘সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলী’, ‘বৈষ্ণব পদাবলী’আরও কত কত বই! বাংলা ভাষার সব অমূল্য সম্পদ। এসব পড়ে জীবন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হয়েছে কিনা জানি না, তবে আপন মাতৃভাষার প্রেমে এমনই মজে আছি যে, ঘুমে জাগরণে এই ভাষা ছাড়া আমি স্বপ্নও দেখতে পারি না।

Banglalive-9

যেমন আমার ছাত্র সহিদুল। তার পঞ্চম শ্রেণি। বাংলা পড়াচ্ছি। আল মাহমুদের কবিতা ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ যার প্রথম দু’লাইন –

নারকোলের ওই লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল

ডাবের মতো চাঁদ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল। …”

এই কবিতাটির প্রথম আট লাইন বার কয়েক উচ্চারণ করে পড়িয়ে ক্লাসের সব ছাত্রছাত্রীকে বললাম, অন্তত আরো তিনবার পড় তোমরা নিজে নিজে

ওরা পড়তে শুরু করল। সেই ফাঁকে আমি কবি আল মাহমুদকে নিয়ে ভাবতে বসলাম। বাংলা ভাষায় এমন কবি ক’জন এসেছেন? তাঁর ‘সোনালি কাবিন’, আর ওই যে ভাষাদিবস নিয়ে লেখা সেই কবিতাটি

ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ

দুপুর বেলার অক্ত

বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?

বরকতের রক্ত।”

কোন ছেলেবেলায় পড়েছিলাম!

যদিও বর্তমানে তিনি গুরুতর অসুস্থ। এও শুনি তিনি নাকি সাম্প্রদায়িক! বাংলাদেশ নামক দেশটিকে সারাজীবন ইসলামি রাষ্ট্র বানানোর পক্ষে কাজ করে এসেছেন! সামরিক শাসক তো বটেই, জামাতিদের হাত শক্ত করতেও নাকি তাঁর ভূমিকা ছিল ন্যক্কারজনক।

সত্যমিথ্যা জানি না, তবে কবি হিসেবে তিনি আমার কাছে অনেক বড়। তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি।

যাই হোক, আমার এইসব ভাবনার মাঝে সহিদুল বলে উঠল, স্যারতিনবার পড়া হয়ে গেলআপনাকে শোনাব?

বললাম, শোনা।

সহিদুল পড়তে শুরু করল –

নারকোলের ওই লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল

ডাবের ‘ঠিকিন’ চাঁদ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল। …”

আমি ভুল শুনছি না তো!

সহিদুলের পড়া থামিয়ে ওকে প্রথম থেকে আবার পড়তে বললাম।

সহিদুল আবার পড়তে শুরু করল –

নারকোলের ওই লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল

ডাবের ‘ঠিকিন’ চাঁদ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল। …”

আবার খটকা লাগল। আবার পড়তে বললাম। আবার পড়ল সে। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম ‘মতো’ শব্দটির জায়গায় সে বারবার ‘ঠিকিন’ শব্দটির প্রয়োগ করছে।

করাটাই খুব স্বাভাবিক। আমার স্কুলটি যে অঞ্চলে সেখানকার মানুষেরা ওই ‘ঠিকিন’ শব্দটি ‘মতো’ জায়গায় পরম আদরে ব্যবহারে অভ্যস্ত। একেই বলে মায়ের ভাষা, মাতৃভাষা।

আমার সাহিত্যচর্চায় আমি কখনোই ভাষা নিয়ে তেমন কিছু ভাবিনি। ভাবতে হয়নি। আমার আশপাশে যাঁরা আছে, যাঁদের আমি সবসময় দেখিকথা বলি, এমনকি গাছপালাপশুপক্ষীইটপাথরকংক্রীট, তাঁরাই আমার সাহিত্যে চরিত্র হয়ে আসেতাঁরা তাঁদের ভাষায় কথা বলে মনের ভাব প্রকাশ করে একে অপরের সান্নিধ্য লাভ করেএটাই তো স্বাভাবিক।

যেমন আমাদের পড়শি ঠোটকাট্টি ফুফু। আসল নাম কী ছিল, সেটা সে নিজেও ভুলে গিয়েছিল। তাঁর ঠোট কাটা ছিল বলে লোকে তাঁকে ঠোটকাট্টি বলে ডাকত। মেয়ে সজ্জ্বাকে নিয়ে সে পনেরোদিনবিশদিন কোথায় হাওয়া হয়ে যেত। যখন ফিরে আসত, আমরা জিজ্ঞেস করতাম, কোথায় গিয়েছিলে ফুফু? ফুফু বলতেন, শিরোদ্যাশ গেলছিনু বাপ।

এই ‘শিরোদ্যাশ’ কোথায় আমি জানতাম না। পশ্চিমবঙ্গের ম্যাপে, ভারতবর্ষের ম্যাপে তন্ন তন্ন করে খুঁজে পাইনি। অনেক পরে জেনেছিলাম শিরোদ্যাশ হল ‘শির’ মানে মাথার দিকে যে দেশ অর্থাৎ মালদাদিনাজপুর। ঠোটকাট্টি ফুফু মেয়ে সজ্জ্বাকে সঙ্গে করে ভিক্ষা করতে যেত সেইসব দেশে। সংগ্রহ করে নিয়ে আসত জীবন ধারণের রসদ।

আমিও সহিদুলের ঠিকিন নিজের ভাষা ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ বোধ করি। আর ঠোটকাট্টি ফুফুর ঠিকিন ভাষার রসদ সংগ্রহ করি তাঁদের অনাবিল সাধারণ জীবন ধারণ থেকেই। এর জন্য আমার দাদীর ঠিকিন কেউ আমায় বলতেই পারেন, বাঙাল কাহেকা! আপত্তি করব না।

3 COMMENTS

  1. দাদা,
    খুব ভালো লাগলো আপনার বিশেষ রচনাটি পড়ে!
    আপনার লেখাটি পড়ে আমার গ্রামের কথা খুব মনে পড়ছে!

  2. ধন্যবাদ জনাব নীহারুল ইসলাম!
    আপনার লেখাটি পড়ে গর্ব বোধ করছি! অহংকার বোধ করছি!
    প্রত্যেক আঞ্চলিক ভাষা, সে-ই অঞ্চলের মানুষের অহংকার!

এমন আরো নিবন্ধ