নিজের প্রবল কূটনীতি খাটিয়েও শেষমেশ বুঝেই গেলেন জাহাঙ্গীরের কুড়িতম পত্নী নূরজাহান | বুঝে গেলেন‚ পরবর্তী মুঘল সম্রাট হতে চলেছেন তাঁর সতীন বিলকিসের ছেলে খুররম | তবু লড়াই ছাড়বেন না নূরজাহান | ঠিক করলেন দরবারে যাতে তাঁর প্রতিপত্তি নষ্ট না হয়‚ তার জন্য সতীনপোর বিয়ে দেবেন নিজের ভাইঝি অর্জুমন্দ বানুর সঙ্গে | পিসি থেকে হয়ে যাবেন সৎ শাশুড়ি | এভাবেই মুঘল দরবারে উড়িয়ে যাবেন নিজের জয়ধ্বজা |

Holi Hai

কূটনৈতিক নূরজাহানের ঘটকালিতে একদিন সম্বন্ধ পাকা হল | তখন আগ্রায় অভিজাত পারস্য পরিবারের সুন্দরী অর্জুমন্দের বয়স ১৪ বছর | সে শুনল পিসি মেহেরুন্নিসা ( নূরজাহানের ) সৎ ছেলে খুররম হবে তাঁর স্বামী |

সেটা ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দ | জাহাঙ্গীরের ছেলে খুররমের বয়স ১৫ বছর | একদিন তার দেখা হল বাগদত্তা অর্জুমন্দের সঙ্গে | তার থেকে এক বছরের ছোট‚ কিশোরী অর্জুমন্দের রূপ দেখে যাকে বলে প্রেমে পাগল অবস্থা মুঘল সিংহাসনের ভাবী উত্তরসূরীর |

কিন্তু আপাতত দুজনকে থাকতে হল বিরহকাতর হয়েই | কারণ রাজসভার গণৎকারদের কথামতো তখন বিয়ের শুভদিন ছিল না | তাই অর্জুমন্দ আগ্রায় আর খুররম দিল্লিতে‚ দুজনের শয়নে স্বপনে জাগরণে শুধু দুজনের চিন্তা |

ইতিমধ্যে সরকারিভাবে যুবরাজ ঘোষিত হয়ে গেলেন খুররম | ডাকনামের বদলে তাই এখন থেকে লেখায় রাখলাম তাঁর শাহজাহান ( যদিও এটা সংক্ষিপ্ত রূপ ) নামটাই | এনগেজমেন্টের পাঁচ বছর পরে ১৯ বছরর বয়সী অর্জুমন্দ বানুর সঙ্গে বিয়ে হল ২০ বছরের শাহজাহানের |

ততদিনে অবশ্য আরও দুজনের সঙ্গে বিয়ে কবুল করা হয়ে গেছে শাহজাহানের | কিন্তু সেগুলো নামকাওয়াস্তে | অর্জুমন্দই ছিলেন তাঁর চোখের তারা | বাকিরা রাজধর্ম রক্ষায় বিয়ে মাত্র |

বিয়ের পরে প্রিয়তমা অর্জুমন্দের নাম পাল্টে দিলেন শাহজাহান | বললেন‚ প্রেয়সীর নাম এখন থেকে মুমতাজ মহল | অর্থাৎ সারা প্রাসাদ থেকে নির্বাচিত |

শাহজাহনের মোট স্ত্রী ছিলেন ৯ জন | কিন্তু তিনি মহিষীর সম্মান দিয়েছিলেন একমাত্র মুমতাজ মহলকে | বাকিদের সঙ্গে সন্তান ছিল ঠিকই | শাহজাহানের কাছে সেগুলো শুধু কর্তব্যরক্ষা | বাস্তবিকই মুমতাজ মহল ছিলেন সুয়োরানি | বাকিরা দুয়োরানি |

কিন্তু ভাইঝিকে সৎ ছেলের বৌ করে কোনও লাভ হল না নূরজাহানের | অসামান্য রূপ ও বুদ্ধির অধিকারিণী এই মুঘল বেগম বুঝে গেলেন তাঁর ভাইঝি সম্পূর্ণ অন্য মেরুর | রাজ দরবার বা সিংহাসনের দিকে তাঁর বিন্দুমাত্র লোভ নেই | তিনি বিভোর তাঁর প্রেমিক স্বামীকে নিয়ে | এবং স্বামীও উজাড় করে ভালবাসেন আদরের স্ত্রীকে |

পিসির মতো মুমতাজও ছিলেন রূপসী | কিন্তু পিসির মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না | আগ্রা ফোর্টে তাঁর মহল ছিল আগাগোড়া সোনায় মোড়া | মহলের সর্বাঙ্গে দামী রত্ন বসিয়েছিলেন শাহজাহান |

ঐতিহাসিকরা বলেছেন‚ শাহজাহান-মুমতাজের প্রেম নাকি বাঁধ ভেঙে হয়ে যেত অশ্লীলতার পরাকাষ্ঠা | কিন্তু তাতে কিছু এসে যেত না এই জুটির | তাঁরা ছিলেন শাশ্বত প্রেমিক | শুধু মহিষী বা পাটরানি নন | মুমতাজ ছিলেন শাহজাহানের প্রেমিকা | জীবনের শেষদিন অবধি |

তাঁদের উনিশ বছরের দাম্পত্যে মুমতাজ মহল জন্ম দিয়েছিলেন মোট ১৪ জন সন্তানের | তাদের মধ্যে ৭ জন মারা গিয়েছিল একদম শিশুবেলায় | আসুন দেখে নিই তাঁদের সন্তান সন্ততিদের নাম |

. হুরুউন্নিসা বেগম (১৬১৩-১৬১৯),  ২. জাহানারা বেগম (১৬১৪-১৬৮১),  ৩. দারা শিকো (১৬১৫-১৬৫৯),  ৪ . শাহ সুজা (১৬১৬-১৬৬১),  ৫রোশেনারা বেগম (১৬১৭-১৬৬১), ৬ . আওরংজেব (১৬১৮-১৭০৭), ৭আহমদ বক্স (১৬১৯-১৬২২), ৮. সুরাইয়া বানু বেগম (১৬২১-১৬২৮),  ৯উন্নামেদ সন (১৬২২-১৬২২), ১০. মুরাদ বক্স (১৬২৪-১৬৬১) , ১১ . লুৎফুল্লাহ (১৬২৬-১৬২৮) , ১২ . দওলৎ আফজল (১৬২৮-১৬২৯) , ১৩ . হুসনারা বেগম (১৬৩০-১৬৩০) এবং ১৪. গওহর বেগম (১৬৩১-১৭০৭) |

কার্যত পুরো দাম্পত্যই অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন মুমতাজ মহল | তবু স্বামীর সঙ্গে প্রায় সারা ভারত ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি | যেখানে যেতেন শাহজাহান‚ সঙ্গী হতেন মুমতাজ | সবদিক দিয়েই তিনি ছিলেন পঞ্চম মুঘল সম্রাটের অর্ধাঙ্গিনী |

ক্রমশ চলে এসেছি শাহজাহানের প্রিয়তমা তৃতীয় পত্নীর জীবনের শেষ লগ্নে | সেটা ১৬৩১ খ্রিস্টাব্দ | চোদ্দতম বার অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন মুমতাজ মহল | স্বামী অওরংজেব যাবেন দাক্ষিণাত্য অভিযানে | কিছুতেই স্বামীসঙ্গ ছাড়লেন না মুমতাজ | আসন্নপ্রসবা হয়েও চললেন স্বামীর সঙ্গে |

অভিযানের শিবির পড়ল দাক্ষিণাত্যের ( অধুনা মধ্যপ্রদেশ ) বুরহানপুরে | সেখানে প্রসববেদনা উঠল মুমতাজ মহলের | যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেলেন মুঘল সম্রাজ্ঞী | রাজধাত্রীর দক্ষ হাতে জন্ম নিল কন্যাসন্তান | কিন্তু ক্রমে অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগলেন মুমতাজ মহল |

কোনও কোনও ঐতিহাসিক বলেন‚ সন্তানের জন্ম দিয়ে সে রাতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন শাহজাহানের আদরের মুমতাজ | আবার কেউ কেউ বলেন‚ সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে কয়েক দিন জীবিত ছিলেন অসুস্থ রানি |

শেষ মুহূর্তে নিজের জীবনের ধ্রুবতারা মুমতাজের পাশে ছিলেন সম্রাট শাহ্জাহান | শোনা যায়‚ স্বামীর হাত ধরে শেষ তিনটি অনুরোধ জানিয়ে গিয়েছিলেন ৩৭ বছর বয়সী মুমতাজ | তারমধ্যে একটি অনুরোধ ছিল‚ তাঁর মৃত্যুর পরে এমন একটি সৌধ যেন বানানো হয়‚ যা হবে জগতে প্রেমের মূর্ত প্রতীক |

ঋণস্বীকার :  Islam Today : A Short Introduction to the Muslim World by Akbar Ahmed & other sources

আরও পড়ুন :

আরও পড়ুন:  মহাজাগতিক জাদুতে বুধ-আকাশে কখন পূর্ণচন্দ্র‚ কখন পূর্ণগ্রাসে লোহিতচন্দ্র‚ কখনই বা বৃহৎ নীল চন্দ্র ?

কন্যা জাহানারার সঙ্গে নিয়মিত যৌন সম্পর্কের জেরেই ঈর্ষাকাতর শাহজাহান জীবন্ত দগ্ধ করেছিলেন তাঁর প্রেমিককে ? http://banglalive.com/shah-jahan-had-incestuous-relationship-with-daughter-jahanara-killed-her-lovers/

মেয়েকে ভোগ করতে নৃশংস হত্যা তাঁর দুই প্রেমিককে…তবু কামুক পিতা শাহজাহানকে ক্ষমা করেছিলেন শাহজাদী জাহানারা http://banglalive.com/incestuous-relationship-brutally-killing-her-lovers-how-could-jahanara-forgive-her-father-shahjahan/

NO COMMENTS