অভিনয়ে দশে দুই , বাকি আট –বিছানায় কেমন করে শুই

casting couch feature

শরীর না প্রতিভা ?‌ 

এই দ্বন্দ্ব নতুন নয় । শরীরের সঙ্গে প্রতিভা , দক্ষতা , যোগ্যতা কতটা সহমত হতে পারছে তাই নিয়ে আজকাল আর কেউ বিশেষ মাথা ঘামায় না । তার চেয়ে বরং কতটা সুযোগ-সুবিধা ঝুলিতে এসে ঢুকল সেটাই আজ ভাবনার । সেটাই মুখ্য বিষয় । প্রতিদিন নিজের মনকে , বিবেককে তোয়াক্কা না করে ভাল থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি । আর এই বৃত্তির বাইরে অসহায়তা যাদের থাকছে , তারা লুপ্ত-প্রায় কতিপয় জীবের মতো কেবল টিমটিম করে বাঁচছে । ব্যাস , এই টুকুই ।  

দুটি ঘটনার কথা বলি । বিষয়টায় বুঝতে সুবিধে হবে ।

|| প্রথম ঘটনা ||

ছবিতে দৃশ্যটি ছিল অতি ঘনিষ্ঠ । 

নায়কের সঙ্গে নায়িকা । টালিগঞ্জের দেড়-খানা ছবিতে কাজ পাওয়া নায়িকা একজন প্রথম সারির নায়কের সঙ্গে কাজ করছেন । ছবিতে একটি দৃশ্য ছিল নায়ক-নায়িকা নরম তুলতুলে সোফায় বসে কথা বলবে । কিছু সময় পর তারা ঘনিষ্ঠ হবে এবং নায়িকা প্রায় নায়কের কোলের ওপর উঠে যাবে । এই ছবি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য হলেও নায়িকা ঠিক ততোদূর যান যতোদূর গেলে সেন্সর বোর্ড মেনে নেয় । কিছু-কিছু মুহূর্তে অবশ্য চিত্রনাট্যে লেখা ডিটেল ছাপিয়ে চলে যাচ্ছিলেন । শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় দৃশ্যে মেয়েটির সাচ্ছন্দে অভিনয়ের করার ক্ষমতা দেখে নায়ক রীতিমতো অবাক হন । সেদিন প্যাক-আপের পর নায়ক তার মেকআপ ভ্যানে এসে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরকে বলেন , “মেয়েটি বেশ চটপট করে সহজ হয়ে গেল ক্যামেরার সামনে । খেয়াল করে দেখলি প্রতিটা শট ওয়ান টেক ওকে ।”

ছেলেটি উত্তর দেয় , “ও মা ! খারাপ করবে কেন ? আগেই তো বহুবার আমাদের প্রোডিউসারের সঙ্গে রিহার্সাল হয়ে গেছে । নইলে এতো বড় রোলে চান্স পায় ।”

শুনতে খারাপ লাগলেও ঘটনাটি সত্যি । কাস্টিং কাউচের এই লকলকে জিভ ও তার বিষ ছোবল এড়াতে পেরেছেন কতজন মেয়ে ?  

বছরের পর বছর বহু মেয়েকে এভাবেই সিনেমার ঝলমলে আলোয় জায়গা করে নিতে হয়েছে । এখানে তারা মনে-মনে জেনেছেন বিন্দুমাত্র ভণিতা বা জড়তার কোনও স্থান নেই । অন্যদিকে মেয়েদের অপমানে সবার আগে মেয়েরাই এগিয়ে এসেছে । অন্যায়ে , প্রতিবাদে নিজেদের মুখ খুলেছে । সেখানে #মিটু ইত্যাদি মুভমেন্টের ছাই চাপা আগুন দেশ জুড়ে ভুস করে উঠছে । কারণ মেয়েরাই সব থেকে বেশী জানে সিনেমার রূপোলি পর্দার জগতটা এমনই যেখানে আজও কাস্টিং কাউচের মতো ঘটনাই মূল্য পায় । সেখানে অভিনয়ের ক্ষমতা আছে কি না তা বিবেচ্য হয় কম । ধরা যাক , কোনও নায়িকা যদি অভিনয়ের জন্য দশের মধ্যে দুই এবং আট পেলেন সে বিছানায় কতো ভাল শুতে পারেন তার জন্য — এর পর এই মার্কশিট-ই তাকে পাইয়ে দেবে একের পর এক কাজ । এই সব ঘটনার হাজার-হাজার উদাহরণ আছে । উদাহরণ আছে বলেই যারা রে-রে করে তেড়ে আসবেন তারাও জানেন সত্যি কতটা কুৎসিত , কতোটা নির্মম । আমরা প্রত্যেকে আড়ালে-অন্ধকারে ভাবি, একদিন মনের বিস্ফোরণ ঘটবে । তখন অনেক কিছু বদলে যাবে । এই বিস্ফোরণ তো ঘটে ছিল …

#মিটু আবার বন্ধ হয়েও গেল । পুরুষতান্ত্রিক সমাজে #মিটু আন্দোলন অবশ্য বেশীক্ষণ চলতেও পারে না । কারণ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে চালায় মূলত মুনাফালোভী প্রোডিউসার , জনপ্রিয় নায়ক আর বাণিজ্যিক ছবির পরিচালক । এখানে নারীকে বা শিল্পীর গুণকে আলাদা করে প্রাধান্য বিশেষ একটা দেওয়া হয় না শুধুমাত্র তাকে নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারযোগ্য পণ্য হিসাবেই দেখা হয় ।

|| দ্বিতীয় ঘটনা ||

বেশ কয়েক বছর আগে বোম্বের এক সুপার-ডুপার হিট নায়ক তখন প্রায় প্রতি মাসে নিয়ম করে আর্লি-মর্নিং ফ্লাইটে চলে আসতেন । এয়ারপোর্ট সংলগ্ন এলাকায় খুব নামী বিলাসবহুল হোটেলে এসে উঠতেন । কলকাতায় বিবিধ এনগেজমেন্ট নিয়েই আসতেন – ডিরেক্টর , প্রোডিউসারদের সঙ্গে মিটিং , রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কাঁধ ঘেঁষাঘেঁষি , সমাজসেবা , পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স ইত্যাদি । এ-সবের আগে ভোর পাঁচটার মধ্যে তথাকথিত এখানকার এক বিখ্যাত নায়িকা হোটেল রুমে পৌঁছে যেতেন । বেলা নয়টা পর্যন্ত চলত কর্ম-কান্ড । তারপর নায়ক নিভৃতে নিরালে বেলা একটা-দেড়টা অবধি বিশ্রাম নিতেন । তারপর শুরু হতো মিটিং-অ্যাজেন্ডা ইত্যাদি । আর দীর্ঘদিন এই সবটার বিপুল খরচ বহন করে চলতেন কোনও না কোনও প্রোডিউসার । বোম্বের নায়ককে হাতে রাখতে তাকে এইটুকু ব্যয় ঘাড় পেতে নিতে হতো আর নায়িকা শুয়ে-বসে-উঠে নিজের পায়ে খাড়া হলো – পর-পর কয়েকটা হিন্দি ছবিতে কাজ করল । সেই নায়কের সুবাদেই বাংলাদেশেও ভাল কানেকশন তৈরী হল । সেই রমারমা চলল বেশ অনেকদিন ।   

সাহস করে এ-কথা বলতে পারি , কাস্টিং কাউচের হাত ধরে বেডরুম থেকে সরাসরি শুটিং ফ্লোরে নিয়ে যাওয়ার প্রথা যতোদিন না বন্ধ হবে ততোদিন সিনেমায় বলিষ্ঠ অভিনেত্রী কোনও দিন-ই তৈরী হবে না । হাজার চেষ্টা করেও বিগত কুড়ি বছরের ব্যবধানে আমরা কি একটা নামও মনে করতে পারি না যার অভিনয়ী শৈলী আমাদের মনে চিরস্থায়ী আসন করে নিতে পেরেছে । সৌভাগ্য হোক আর দুর্ভাগ্য-ই হোক বর্তমানে আমাদের দেশে কয়জন নায়িকার অভিনয় টিকে আছে !

ধরা যাক কোনও অল্প বয়সী মডেল ঘুম থেকে উঠলেন । অভ্যেস মতো হাল্কা চা-কফি খেলেন । জিমে গেলেন । শরীরচর্চা সেরে রূপের যত্ন-আত্তি করলেন । মোবাইলে এতো দিন যার সঙ্গে কাজের খাতিরে কনভারসেশন চালাচ্ছিলেন আজ তার সঙ্গে দেখা করলেন । তারপর ?

কাস্টিং কাউচ ব্যাপারটা খুব সহজ ও স্বাভাবিক ঘটনার আকার নিতে পেরেছে আজ অনেক বছর হল । নিজের জামার আস্তিনের ফাঁকে বিষয়গুলোকে অনায়াসে গুঁজে রাখতে মেয়েরা শিখে গেছে । মেয়েরা নিজের ভাল এবং মন্দটা যাচাই করে নিতে পারছে । কাস্টিং কাউচ কখনও শুরু হয় হাল্কা ডেটিং-এর মাধ্যমে আবার কোনও-কোনও ক্ষেত্রে হুড়ুমতাল করে একে অপরের সঙ্গে মধ্যস্থতা বা চুক্তিতে ল্যাটা চুকিয়ে নেয় ।

বিছানাকে মাধ্যম করে কাজের সূত্রপাত ও তার বাড়-বাড়ন্ত এটা কোনও বড় কথা নয় । আদতে এমন নায়িকা ঝাঁকে-ঝাঁকে আসছেন আবার ঝাঁক বেঁধে তারা উধাও হয়ে যাচ্ছেন । অথচ কি ভাল অভিনেত্রী নেই ? – আলবৎ আছে । হিন্দিতেও আছে , বাংলাতেও আছে বা অন্য ভাষাতেও যথেষ্ট আছে । কিন্তু প্রথম সারির নায়িকাদের ভিড়ে কোথায় তারা ? নিজেকে প্রমাণ করার কতোটুকুই বা সুযোগ তারা পাচ্ছেন ?

ডিরেক্টর , প্রোডিউসার ও তার এক্সিকিউটিভ , প্রোডাকশক কন্ট্রোলার ছাড়াও বোম্বেতে অনেক সময় এই সব কেলো-কীর্তি ঘটায় কোনও কাস্টিং ডিরেক্টরা । অবশ্য টালিগঞ্জে কাস্টিং ডিরেক্টরের বাজার এখনও জেঁকে বসতে পারেনি ।     

কাস্টিং কাউচের জন্য আমরা সাধারণত পুরুষ শাসিত ফিল্ম-ইন্ডাস্ট্রিকে দায়ি করি । যে লোকটি নানা টোপ দেখিয়ে শুতে বাধ্য করাচ্ছেন , বিছানায় এনে তুলছেন – দোষ তার-ই । অন্যদিকে যে মেয়েটি পরিস্থিতির মোকাবিলা না করে বিছানায় গিয়ে উঠছেন তাকে কি সম্পূর্ণ অসহায় ও নিরপরাধ বলা যায় ? — এখানে অবশ্য দু-পক্ষই দোষী নয় । কে কাকে বেডরুমে নিয়ে যাবেন আর কে কার সামনে নগ্ন হবেন , সেটা কোনও দোষের হতে পারে না । জৈবিক প্রবৃত্তি ও চাহিদা মিটানো দোষের নয় ।

তবে দোষ কোথায় ? – বিছানা যদি যোগ্যকে তাড়িয়ে দেয় , দোষ সেখানে । আর অভিনয়ের সুযোগ দেব , এই লোভ দেখানোটাও দোষের । সত্যি বলতে , মাথা নুইয়ে-নুইয়ে নারীরাই এদের ক্ষমতাবান করে তুলছেন । ভেবে দেখেছি কি , কাস্টিং কাউচকে আস্কারা দিতে-দিতে কোন পথে আমরা হাঁটছি ?  

তাই আজকের নায়িকাদের কয়েক বছর পর টাকা-সম্পত্তি-ব্যাঙ্ক-ব্যাল্যান্স ইত্যাদি ঘুছিয়ে নিয়ে সাইড বিজনেসের কথা ভাবতে হয় । হয় হোটেল-রেস্টুরেন্ট খুলতে হচ্ছে বা নয় রাজনীতিতে নাম লেখাতে হচ্ছে । কারণ – এই ফিল্ডে পুরনো চাল ভাতে কম বাড়ে । মনে-মনে নায়িকারা জানেন প্রোডিউসারের মন-ভজানো মর্মস্পর্শী আবেদনকে ধরে রাখা দুষ্কর । আবার যে কোনও দিন উড়তি এক নায়িকা এসে নিমেষে চুড়মাড় করে দেবে তুড়ি মেরে সব কিছু ।

অন্যদিকে প্রচুর পুরুষ পরিচালকদের দিকে বন্ধুত্বসূচক হাত বাড়িয়ে দেয় এই বলে , “প্রোডিউসার এনে দিচ্ছি , তবে শর্ত একটাই ; আমাকে বা আমার ছেলেকে নায়ক করতে হবে ।” – এই ধরনের ঘটনা কাস্টিং কাউচের ধ্যাষ্টামির থেকে কোনও অংশে কম নয় । আর যে ছেলেটি তার প্রতিভা , বুদ্ধিমত্তা , মেধা থাকা সত্ত্বেও হাতের মুঠোয় ভরে কোনও প্রোডিউসার আনতে পারছেন না , সে অভিনয়ের চান্স না পেয়ে বহু যোজন দূরে দিয়ে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছেন । বা এমন টপক্লাস কিছু নায়ক আছেন যারা আবার এই সব পাঁকে সরাসরি না নেমে উড়তি মডেল বা নায়িকার সঙ্গে প্রযোজকের আলাপ করিয়ে দেন । — দুহাত ভরে কে কার ঋণ নিল , পাল্টা কতোটা দিল , তাতে কারও কিচ্ছুটি যায় আসে না । তবে রেডিয়েশনের মতো , সংক্রমণের মতো , কার্বনের কালো বর্জ্যের মতো সিনেমার আবহাওয়া ও সংস্কৃতিকে বছরের পর বছর যারা এই ভাবে দূষিত করছে চলছে , সেটা নিশ্চয়ই দোষের ।   

দালালি , পলিটিক্যাল কানেকশন , কালো টাকা সাদা করার বাইরেও কিছু প্রতিভাবান মানুষ তাদের বোধবুদ্ধি ও পারকতা দিয়ে সিনেমা গড়তে চায় , ভাঙতে চায় , মুচড়ে আবার নতুন ছাঁদে ভাবনার জন্ম দিতে চায় । কাস্টিং কাউচকে মেনে নিয়ে এইসব মানুষকে খুন আর না-ই বা করলাম ।    

গায়ে টোকা দেওয়া আর চলবে না । ভুলে গেলে চলবে কেন শর্মিলা ঠাকুর , জয়া ভাদুড়ি , মহুয়া , মৌসুমি চ্যাটার্জি ও প্রমুখ – এঁদের শুরুয়াৎ কিন্তু কাস্টিং কাউচের হাত ধরে হয়নি ।  

অভিনয়ের প্রতি , সততার প্রতি বিশ্বাস আজ কারুও কি এতোটুকু নেই ?

শিল্পের একটা নিজস্ব লড়াই থাকে । হেরে গিয়েও সে যে কোনও মুহূর্তে আবার জিতে জেতে পারে । আমরা সেই লড়াইটুকু কি নিষ্ঠা ভরে লড়তে দিতে একেবারেই পারি না ?  

শরীর আর কতদিন প্রতিভাকে পরাস্ত করবে ? নেবে ঘৃণা ?‌

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here