ফণীর নেপথ্যে কি বিশ্ব-উষ্ণায়ন ?

রবিঠাকুর তো লিখেই খালাস, ‘ঝড় নেমে আয় …’ – সেই ঝড় সত্যি-সত্যিই নেমে এলে পরে, যে কেমনতরো হাল হয় আমাদের, তা সকলেই জানেন। তবু ঝড় আসে,ঝড় যায়। জনতার কপালে রিলিফ পড়তে পায়। আমআদমি, গরীব-গুর্বোরা সস্তায় ত্রিপল আর চাল পেয়ে থাকে। ঝড়ের আড়ালে আবার, কেউ কেউ দুপয়সা কামিয়ে নেয়। অল্প-বিস্তর দুর্নীতিরও হদিস মেলে কোথাও। কিন্তু তারপর, – তারপর আবার যে কে সেই … দিনবদলের খবর ঝুলে থাকে পোস্টারেই। যা হোক, আমি সেই সব কূটকচালীতে যাবার মানুষ নই। কেবল খবরে দেখছি, ফণী নামক ঘূর্ণিঝড়টিই নাকি গত ৪৩বছরের মধ্যে সবচাইতে শক্তিশালী গ্রীষ্মকালীন সাইক্লোন। শুনে আশঙ্কা হলো, কাগজ-পত্তর ঘেঁটেঘুঁটে দেখতে বসলাম। যা পেলাম …

বিজ্ঞানীরা ভয় দেখাতে ওস্তাদ। কিছু হলেই এখন বিশ্ব-উষ্ণায়ন অথবা পরিবেশ পরিবর্তনের কোলে ঝোল টানেন। দোষ ওঁদের নয়। কাগজ-কলম-জার্নাল, অথবা আরও নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমেই যে সমস্ত খবর উঠে আসতে পারছে, তাঁরা কেবল সেটুকুকেই পরিবেশন করতে চান। সেনসেশনালাইজ করবার উদ্দেশ্য তাঁদের নয় … তবু, ফণী যে বিশ্ব-উষ্ণায়নেরই একটি প্রতিফল – এমনতরো দাবি করছি কেন, তাকে সরল ভাষায় একটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

ছোটোবেলায় আমরা বৃষ্টি হবার বৈজ্ঞানিক কারণ সম্পর্কে বইতে কি পড়েছিলাম ? সূর্যের তাপে স্থলভাগ এবং জলভাগ উত্তপ্ত হবার জন্যে, ভূপৃষ্ঠ থেকে জলীয় বাষ্প বাতাসে গিয়ে মেশে। পরে তা বায়ুমন্ডলের ধূলিকণার সঙ্গে জোট বেঁধে নিয়ে মেঘের সৃষ্টি করে। সেই মেঘ থেকেই বৃষ্টি হয়। নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড় হয়ে ওঠবার পদ্ধতিটিও অনেকটা সেইরকম। কেবল এই ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোনিক সিস্টেমগুলি মূলত তৈরী হয় সমুদ্রের উপরে। সাগর বা মহাসাগর থেকে জল শুষে নিয়েই তাদের পুষ্টি হয়। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব-উষ্ণায়নের ফলে তাহলে কি ঘটতে পারছে ?

একদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের, এমনকি সমুদ্রের অভ্যন্তরেরও উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফল কি দাঁড়াচ্ছে – অধিকমাত্রায় জলীয় বাষ্পের সৃষ্টি হতে পারছে। পাশাপাশি – উষ্ণায়নের কারণে আবহমণ্ডলেরও উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় – একেকটি ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোনিক সিস্টেমের জলধারণ ক্ষমতারও বৃদ্ধি ঘটছে। সাইক্লোন থেকে সুপার সাইক্লোন হয়ে উঠবার পথেও, আর কোনও বাধা থাকছে না।

একারণেই, আজকাল ঘূর্ণিঝড়গুলির – যে কেবল তীব্রতাই বৃদ্ধি পাচ্ছে তা নয়। একেকটি ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোনিক সিস্টেম থেকে, আগের চাইতেও আরও অনেক বেশী পরিমাণে, বৃষ্টিরও সম্ভাবনা থাকছে। একা পবনদেবেই রক্ষে নেই, সঙ্গে বরুণদেবও দোসর। একইসঙ্গে জলে-হাওয়ায়, উড়িয়ে-ভাসিয়ে-ডুবিয়ে মারবার ভরপুর চক্রান্তের হিসেব। এইটিই বোধহয় প্রকৃতিদেবীর নতুন কৌশল এখন। এতদিনকার নির্বিচার লুন্ঠনের জবাব। তথ্য বা পরিসংখ্যানের কথায় যাই …

১৮৯১ থেকে ২০০২ সাল অবধি (এই ১১১টা বছরে) তামিলনাড়ু এবং অন্ধ্রপ্রদেশে আছড়িয়ে পড়া ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ছিলো যথাক্রমে, ৭৭ এবং ৫৫। সেখানে ২০০৩ থেকে ২০১৯ – এই ১৬ বছরেই, সংখ্যাদুটি দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৮ এবং ১৩। আর এর চাইতেও বড় কথা হলো যে, সংখ্যায় বাড়বার সাথে সাথে – শক্তির নিরিখেও তাদের বহর বেড়েছে। আগে যত সংখ্যায় নিম্নচাপ বা সাধারণ ঘূর্ণিঝড় তৈরী হতো, এখন তার চাইতেও বেশী পরিমাণে শক্তিশালী – প্রবল বা অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারছে। সমুদ্রতলের উষ্ণতাবৃদ্ধির কারণে, বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করছেন – যে, ঘূর্ণিঝড় বা এমন সাইক্লোনিক সিস্টেমগুলি এখন অনেকটা বেশী সময় ধরে সাগরের উপরেই অবস্থান করছে, তাদের গতিবেগ কমছে – তাদের শক্তিবৃদ্ধিতেও এর ফলে সুবিধে হতে পারছে। রসিক গবেষকেরা বলছেন, যেহেতু বঙ্গোপসাগরের আয়তন সে অর্থে কম – তাই সাইক্লোনগুলি প্রবল ঘূর্ণিঝড় অবধি শক্তিশালী হয়ে উঠলেও, খাতায় কলমে সুপার সাইক্লোনের তকমা তারা পেয়ে উঠতে পারছে না। আবার সাগরের আয়তন কম হবার কারণেই, ঝড়গুলির উপকূলে আছড়িয়ে পড়াটাও একেবারে নিশ্চিত হয়ে থাকতে পারছে। শ্যাম থাকলেও, কূল থাকছে না … অতঃ কিম!

ফণীর সর্বোচ্চ গতিবেগ ২১০কিলোমিটার প্রতি ঘন্টায় গিয়ে দাঁড়াবে। কলকাতার উপর দিয়ে ফণী বয়ে যাবে যখন, বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন – আয়লার চাইতেও তার শক্তি অধিকতর মাত্রায় প্রদর্শিত হবে। কাজেই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাবৃদ্ধি নিয়েও সংশয় থাকছে না। বিশ্ব-উষ্ণায়নের কারণে স্থলভাগ ও জলভাগের মধ্যে যে উষ্ণতার তারতম্য, তাও ক্রমবর্ধমান। এর কারণেও ঝড়গুলির শক্তিবৃদ্ধি ঘটছে। বিশ্ব-উষ্ণায়নের ঠেলাতেই, ফণীর ফণার নাচনে আমরা এদিক সেদিক নেচে বেড়াচ্ছি কেবল। অতঃ কিম!

আবার কিম! আরও এসি লাগিয়ে ঘর ঠান্ডা করুন। গাছ কেটে বসতি বানান, কংক্রীটের জঙ্গলে এ্যাস্ট্রোটার্ফ বসিয়ে, সবুজ আবাসনে গলফ-কোর্টের বিজ্ঞাপন দিন। জল-জঙ্গল-ধরিত্রীর খবর রাখতে কেউ তো আর মাথার দিব্যি দেয়নি আপনাদের। কেবল, আর্থ আওয়ারের দিনটিতে – মোমবাতি জ্বালিয়ে পরে, ট্যুইটার-ইনস্টাগ্রামে টুকুস স্টেটাস ছাড়ুন। হ্যাশট্যাগে সবুজ হয়ে উঠুন। আমাদের কাছে ঝড় কিংবা ষাঁড়াষাঁড়ির বান দেখতে যাওয়াটা বিলাসিতা। আমরা ঢেউয়ের ছবি তুলে ফেসবুক বিলাস করি। ফসল নষ্ট হলেও, ঠান্ডাই মেশিনওলা বাজারগুলোতে সবজির জোগান কমে না।

রাগ করছেন পাঠক ? ফণীর কথা বলবো বলে কত কথাই না বলে এলাম। একটুস ভাববেন কেবল। বিশ্ব-উষ্ণায়নের সমস্যাটা বলিউডের স্ক্রিপ্ট নয়। দেড় ঘন্টায় জট পাকানো – জট ছাড়ানোর হিসেব নয়। দিনের পরে দিন, বছরের পরে বছর, হয়তো বা শতকের পরে শতক – আমরা মা ধরিত্রীর কাছ থেকে নিয়েইছি কেবল। বদলে ফেরত পাঠাইনি কোনও উপহার। আজ যখন বঙ্গোপসাগরে ফণীর নাচন অথবা ক্যালিফোর্নিয়াতে দাবানলের আগুন দেখতে পাই, তলিয়ে কি ভাবতেও ইচ্ছে করে না – এসবের পিছনেই রয়েছে, যুগযুগান্তের শোষণ আর লুন্ঠনের হিসেব ? সমুদ্র গরম হয়ে উঠেছে। আবহাওয়াতে মিশেছে বিষ। মেঘেরা এখন অনেক বেশী ভার বহনে সক্ষম। ঝড়ের প্রকোপ বাড়ছে। রবিঠাকুর কি এখনও গান লিখতেন ? ঝড় নেমে আসবার গান ? নাকি বলতেন – শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর ? ফণী হইতে সাবধান … বিশ্ব-উষ্ণায়ন থেকেও।

Advertisements

1 COMMENT

  1. বেশ তথ্যসমৃদ্ধ । সত্যিই শেষের সেদিন না জানি কি ভয়ঙ্কর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.