কেষ্টবিষ্টুসুলভ রাজনীতি করতে গিয়ে ডুবছে বাম ফ্রন্ট?

73

নীতি-পঙ্গুতার জেরে আরও একবার বড়সড় ধস বাম পন্থীদের ভোটব্যাঙ্কে | মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফল যে কী হতে পারে তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন দিল্লির এ কে গোপালন ভবন থেকে কলকাতার আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের বাম নেতারা | রাজ্যে গত বিধানসভা ভোটে বামেরা পেয়েছিল ৪১ শতাংশ ভোট | পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় তা কমে আসে ৩৭ শতাংশে | এবারের লোকসভা নির্বাচনে তা এসে দাঁড়িয়েছে ২৯.৭ শতাংশ | আর রাজ্যে আসন দখলের লড়াইয়ে বামেদের ঘরে মাত্র দুটি আসনের জয় | তাও আবার নিজেদের কোনও শক্তপোক্ত ঘাঁটিতে নয়, একটা আসন এসেছে কংগ্রেসের খাসতালুক মুর্শিদাবাদে | অপরটি প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির খাস তালুক রায়গঞ্জে | এই দুটি আসনে জয়ী হয়েছেন, সিপিএমের বদরুদ্দোজ্জা খান এবং মহম্মদ সেলিম | এই দুটি আসনেই নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মান্নান হোসেন ও দীপা দাশমুন্সির সঙ্গে তাদের ভোটের ব্যবধান নামমাত্র | সুতরাং, রাজ্যে দুই আসনে জয় যদি কাকতালীয়ভাবে না আসত তাহলে পরিণতিটা কতটা ভয়ঙ্কর হত তা নিশ্চয় অনুধাবন করা যেতেই পারে |

এবারের নির্বাচনে রাজ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে তৃণমূলের অনুকূলে | তাদের প্রাপ্ত ভোট ৩৯.১ শতাংশ | বাম ফ্রন্টের মধ্যে সিপিএম পেয়েছে ২২.৬, সিপিআই-এর ঘরে গেছে ২.২, আরএসপি পেয়েছে ২.৫, ফরওয়ার্ড ব্লক পেয়েছে ২.২| অন্যদিকে কংগ্রেস ৯.৭, এসইউসি ০.৭, নির্দল ০.৯ বাদ দিলে বিজেপি-র ঘরে এ-রাজ্যে ১৭ শতাংশ জনমত গিয়েছে | গত বিধানসভা নির্বাচনেও বিজেপি-র ৬ শতাংশ ভোট ছিল |

সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম কান্ডের পর থেকেই রাজ্যের এখন মূল চালিকা শক্তি তৃণমূল | বাম ফ্রন্ট পেয়ে আসছিল দ্বিতীয় দলের মর্যাদা | কিন্তু, এবারের লোকসভা নির্বাচনের ভোটগ্রাফ জানান দিচ্ছে দ্রুত রাজ্যে শক্তি বাড়াচ্ছে বিজেপি | এই শক্তিবৃদ্ধিটা যতটা না বিজেপি-র সাংগঠনিক জোরে, তার থেকে বেশি হয়েছে মানুষের ইচ্ছায় | তৃণমূল কংগ্রেসের বাইরে মানুষের কাছে পরিবর্তিত দল কোনটা? এই বিষয়ে দেখা যাচ্ছে মানুষ এখন বিজেপি-র দিকে ঢলছে |

৩৪ বছরের শাসনে নেতৃত্বে যে মরচে পড়েছিল তা থেকে আজও বামেরা বের হতে পারেনি | রাজ্য নেতা থেকে পাড়ার কেষ্টবিষ্টু সকলেই যে দাদাসুলভ রাজনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন তাতেও এবার ভোটে মাত দিতে চেয়েছিল সিপিএম | তাই তৃণমূলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ব্রিগেডে সভা করলেও জমায়েত হওয়া লাখখানেক মানুষকে কুড়ি মিনিটে এক দিশাহীন বক্তৃতা দেওয়া ছাড়া বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কিছুই দিতে পারেননি | এমনকী, যে বুদ্ধদেবকে মুখ করে এবারের লোকসভা নির্বাচনে লড়াই করছিল সিপিএম নেতৃত্বাধীন বাম ফ্রন্ট, সেই বুদ্ধদেবকে পাওয়াই যায়নি উত্তরবঙ্গের ভোটপ্রচারে | তার ওপর নির্বাচনের মুখেই দলের দুই হেভিওয়েট নেতাকে বহিষ্কার করতে গিয়ে বেসামাল হয়েছে সিপিএম নিজেই | ভাঙড় এলাকায় সিপিএমের লড়াইয়ের শক্তি ছিলেন রেজ্জাক | এই এলাকা এবং আশপাশে থাকা ক্যানিং, বারুইপুরের একটা অংশেও সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব ছিল রেজ্জাকের | কিন্তু, সেই রেজ্জাককে বোকা কালিদাসের মতোই কুড়ালের কোপে বিসর্জন দিয়ে দেন বিমান-বুদ্ধরা | অন্যদিকে দলের বিপর্যয়ে দীর্ঘদিন ধরেই হলদিয়ার দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা লক্ষ্মণ শেঠকে বলির পাঁঠা করেছিল সিপিএম |নির্বাচনের মুখে তাঁকে বিসর্জন দিয়ে হলদিয়া শিল্পাঞ্চলে লড়াইয়ের ক্ষেত্রটাই নষ্ট করে দেয় আলিমুদ্দিন |

যখন নীতিকে বাস্তবের উপর দাঁড় করানোর দরকার ছিল বামেদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ ঠিক তখন বাম নেতারা একে অপরের উপরই ক্ষমতার জোর প্রদর্শন করে গেছেন | মানুষের পাশে দাঁড়ানো থেকে দলের অন্তর্কলহ বড় করে দেখা দিয়েছে | যে বাম ফ্রন্ট এককালে সাধারণ মানুষের অভাব অভিযোগকে নিয়ে আন্দোলনের মধ্যে ইতিহাস গড়ে ক্ষমতায় এসেছিল তার ছিটেফোঁটাও এখনও দেখা মেলা ভার | মাইলের পর মাইল বন্ধ হয়ে পড়ে আছে পার্টি অফিস | পার্টির হয়ে রাস্তায় লোক নামানোই ভার | অবশ্য শোনা যায়নি যে আলিমুদ্দিনের ঠান্ডা ঘরে বসে থাকা নেতারা সেই এলাকায় গিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করেছেন | তাই রাজ্যে শাসক দলের বিরুদ্ধে ওঠা নারী নির্যাতন, কৃষকের হাহাকার, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন, চিটফান্ড নিয়ে অভিযোগে বামেদের আন্দোলন সেভাবে সংগঠিত হয়নি | যার জেরে কলকাতার বুকে এককালে যে কসবা থেকে কাশীপুর বা জোড়াসাঁকো, বেলেঘাটায় সিপিএম এবং বামেদের শক্তি ছিল অসামান্য, সেখানে এই লোকসভা নির্বাচনে হয় বিজেপি-র প্রাপ্ত ভোট বামেদেরকে ছাড়িয়ে গেছে নয়তো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভোট টেনেছে নরেন্দ্র মোদীর দল |

অবশ্য এ রাজ্যে শুধু নয়, জাতীয় স্তরেও বামেদের অবস্থান বেহাল | কেরলে কোনওমতে ৮টি আসন নিতে পারলেও, ভোটব্যাঙ্কে যথেষ্টই ভাটার টান | ত্রিপুরায় দুটি আসনের দুটিতেই জয় পেয়ে মানিক সরকাররা হুঙ্কার দিতে পারেন, কিন্তু তথ্য বলছে এখানেও কমেছে বামেদের ভোট | তত্ত্বের মোড়কে নীতির রাজনীতি যেমন দরকার তেমনই দরকার রাজনীতির বাস্তবতা, যেখানে মানুষ আস্থা পাবে | নির্দিষ্ট কোনও রাজনৈতিক দলকে কাছে টানবে | কয়েকটি রাজ্যে বহুদিন ধরে ক্ষমতা ধরে রাখা বামেরা যা আদৌ গুরুত্ব দিতে চাইছেন না |

বামেদের পাশাপাশি, এই লোকসভা নির্বাচন অবশ্য সপা, বাসপা, জেডিইউ, আরজেডি, ডিএমকে-র মতো দলগুলির কাছেও একটি বার্তা দিয়েছে | বামেদের মতোই আঞ্চলিক রাজনীতিতে এই দলগুলিরও যথেষ্ট প্রভাব আছে | কিন্তু, এবারের সাধারণ নির্বাচনে বামেদের মতোই হাল হয়েছে এই দলগুলির | যে ক্ষমতার অহং-কে নিয়ে বামেরা দ্রুত রাজনীতির আঙিনায় মানুষের কাছে ব্রাত্য হয়ে পড়ছে, আগামী দিনগুলিতেও সপা, বাসপা, জেডিইউ, আরজেডি, ডিএমকে-র মতো দলগুলিরও একই হাল হওয়ার সম্ভাবনা | এই লোকসভা নির্বাচনকে তাই শুধু সরকার গঠনের জনাদেশ বলে দেখলে হবে না, বলতে গেলে বামেদের মতো দলগুলির কাছে এই ছবি আসলে এক কঠিন বাস্তব |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.