সুপ্রিয় চৌধুরী
জন্ম ও বেড়ে ওঠা উত্তর কলকাতার পুরোনো পাড়ায়। বহু অকাজের কাজী কিন্তু কলম ধরতে পারেন এটা নিজেরই জানা ছিল না বহুদিন। ফলে লেখালেখি শুরু করার আগেই ছাপ্পান্নটি বসন্ত পেরিয়ে গেছে। ১৪২১ সালে জীবনে প্রথম লেখা উপন্যাস 'দ্রোহজ' প্রকাশিত হয় শারদীয় 'দেশ' পত্রিকায় এবং পাঠকমহলে বিপুল সাড়া ফেলে। পরবর্তীতে আরও দুটি উপন্যাস 'জলভৈরব' (১৪২২) এবং 'বৃশ্চিককাল' (১৪২৩) প্রকাশিত হয়েছে যথাক্রমে পুজোসংখ্যা আনন্দবাজার এবং পত্রিকায়। এছাড়া বেশ কিছু প্রবন্ধ এবং দু চারটি ছোটগল্প লিখেছেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকা আর লিটিল ম্যাগাজিনে। তার আংশিক একটি সংকলন বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে 'ব্যবসা যখন নারীপাচার' শিরোনামে। ২০১৭ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পুরস্কার।

বেশ কিছুদিন ধরেই প্রিন্ট এবং ভিশন মিডিয়ায় বুড়বুড়ি কাটছিল খবরটা। কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারকে নাকি জেরা করতে চায় সিবিআই। শ্রী কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি নাকি তাঁর প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটিয়ে সারদা কান্ডের বহু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র (সফটকপি এবং পেনড্রাইভ সহ) লোপাট করতে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছেন এবং একাধিকবার সিবিআই দপ্তরে তাঁকে ডাকা হলেও সেখানে হাজিরা দিতে যাননি। এর ফলস্বরুপ আমরা অর্থাৎ নগরবাসী কী দেখলাম? গত ৩রা ফেব্রুয়ারি ভর সন্ধেবেলা সংখ্যায় জনা চল্লিশেকের এক হাট্টাকাট্টা সিবিআই বাহিনী পার্ক স্ট্রিটে কমিশনারের কোয়ার্টারে হানা দিল। উদ্দেশ্য নাকি শ্রী কুমারকে জেরা করা। (একজনকে জেরা করতে এতজনের কী দরকার? কে জানে বাবা !) ‘নাকি’ কথাটা ব্যবহার করলাম খুব সচেতনভাবেই। কারণ পূর্ব অভিজ্ঞতা বলছে এধরনের জেরার প্যাটার্নটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই একই ছকে অথবা গতে বাঁধা। ঘন্টার পর ঘন্টা ম্যারাথন জেরা এবং তারপরও সন্তুষ্ট না হয়ে টুপ করে বেড়ালছানার মত ঝোলায় ভরে ফেলে উড়িষ্যা উড়িয়ে নিয়ে চলে যাওয়া। সে যাওয়া যেতেই পারে। কারণ নেতা, মন্ত্রী, নগরকোটাল অথবা চলচ্চিত্র প্রযোজক, কেউই তো আর আইনের ঊর্ধ্বে নন। অপরাধ করলে তদন্ত হবে এবং তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে সাজা হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে তদন্ত অথবা সাজার গতিপ্রকৃতি, সময়, প্রেক্ষিত এবং পদ্ধতি নিয়ে। সেসব বিষয়েই দুচারটি কথা বলার চেষ্টা করছি নীচে।

প্রথমে আসি গতিপ্রকৃতি, প্রেক্ষিত এবং সময় প্রসঙ্গে। চোখ ঘোরাই একটু অন্য রাজ্যগুলির দিকে। বিহার বিধানসভা নির্বাচনে লালুপ্রসাদের হাতে কচুকাটা হওয়ামাত্র পুরনো চারাঘোটালার মামলায় তাঁকে ফের জেলে ঢোকানো হল যাতে আগামী লোকসভা নির্বাচনে ভদ্রলোক কোন সক্রিয় ভুমিকা না নিতে পারেন। উত্তর প্রদেশে এস পি বি এসপি জুটি বাঁধামাত্র অখিলেশের কাছে সিবিআই নোটিশ গেল। প্রিয়ঙ্কা গান্ধী সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর স্বামী শ্রী রবার্ট বঢরাকে সিবিআই দপ্তরে ডেকে লন্ডনে তাঁর কোন বেআইনী সম্পত্তি আছে কিনা জানার জন্য টানা পাঁচ ঘন্টার ওপর ম্যারাথন জেরা চলল। আবার উল্টোদিকে গুজরাটের নরোদা পাতিয়া, গুলবার্গ সোসাইটি, বেস্ট বেকারির গণহত্যার মামলা, ইসরাত জাহানতুলসীরাম প্রজাপতি ভূয়ো এনকাউন্টার মামলা, মালেগাঁও বিস্ফোরণ মামলার মত জঘন্য এবং নৃশংস অপরাধের মামলায় বেকসুর খালাস পেয়ে গেলেন সমস্ত অভিযুক্তরা। কেন্দ্রে বিশেষ একটি সরকার ক্ষমতায় আসার পর। তাদের বিরুদ্ধে নাকি কোন প্রমাণই জোগাড় করতে পারেনি মহামান্য সিবিআই এবং উচ্চতম গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। জানা যায়নি কোন যাদুমন্ত্রে বিজেপির মহামহিম এক নেতার পুত্রের পঞ্চাশ হাজার টাকার কোম্পানি রাতারাতি একশো কোটি টাকার কোম্পানিতে পরিণত হল? কেন চেপে যাওয়া হচ্ছে রাফায়েল এবং ব্যাপম কেলেঙ্কারি? কেন তৃনমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া মাত্র এক নেতার গলা থেকে সারদানারদারোজ ভ্যালি তদন্তের ফাঁস হঠাৎই একদম তুলতুলে হাল্কা হয়ে গেল? কাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং ছত্রছায়ায় আজও অধরা পানেসারকালবর্গীগৌরী লঙ্কেশদের আসল হত্যাকারীরা? কাদের প্রশ্রয়ে আজও প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে পার্লামেন্ট হাউসের ঢিল ছোঁড়া দুরত্বে জেএনইউএর ছাত্রনেতা ওমর খালিদের ওপর হামলা চালানো দুষ্কৃতিরা? এসবকিছুই নেহাতই ঘটনাক্রম? নেহাতই কাকতালীয়? কোন অস্বাভাবিকতা নেই? নেই কোন পারস্পরিক যোগসূত্র? কীরকম একটু কিন্তু কিন্তু ঠেকছে না? কী বলেন প্রিয় পাঠক?

আরও পড়ুন:  ‘এ পাড়ায় আগে দেখিনি তো..’

অতঃপর আসি পদ্ধতির প্রশ্নে। আগেই বলেছি তদন্তের স্বার্থে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকাই যেতে পারে এবং যাকে ডাকা হচ্ছে তারও সেক্ষেত্রে সহযোগিতা করাটাই কাম্য। কিন্তু তার জন্য একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। নিদেনপক্ষে ইনভেস্টিগেশনের জন্য একটা কোর্ট অর্ডার? ৩রা ফেব্রুয়ারি সেটা সিবিআই আধিকারীকদের পকেটে ছিল কি? অনেকে শুনলাম এরকম কিম্ভুত যুক্তিও দিচ্ছেন যে সিবিআইয়ের নাকি কাউকে জেরা করতে ওসব কোর্ট অর্ডার-ফর্ডার কিস্যু লাগে না। কেন? সিবিআই কি সর্বশক্তিমান পরমপিতা ব্রহ্মা নাকি? তা সেই মহাবলীকেও তো বাবা আদালতের দরজায় নাক খত দিয়েই অর্ডার আনতে হল। আর তারপরে রাজ্যও কোন বাধা দিয়েছে বলে এই অধম প্রতিবেদকের অন্তত জানা নেই। ব্যক্তিগতভাবে এই রাজ্য সরকারের সমস্ত নীতি ও ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে সহমত নই, বিশেষভাবে ক্ষমতায় আসার আগে অন্যতম ঘোষিত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি না দেয়া নিয়ে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে মনে। এরপরও সরকারের তিনটি পদক্ষেপ সত্যিই বিশেষভাবে প্রশংসাযোগ্য বলে মনে হয়েছে এই প্রতিবেদকের। ১) ক্ষমতায় এসেই সিঙ্গুরের কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দেয়া। ২) শান্তিপূর্ণভাবে ভাঙ্গড় সমস্যার সমাধান করা। প্রতিশোধস্পৃহা আর দর্পে উন্মত্ত হয়ে আরেকটা নন্দীগ্রামের মত অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সৃষ্টি না হতে দেয়া। যা পূর্বতন শাসকেরা করেছিলেন। সর্বশেষ ওই ৩০ তারিখ সন্ধেবেলা ওরকম সাহসিকতার সঙ্গে সিবিআইকে রুখে দেয়া। ‘কেন্দ্রের দমননীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন’ শুনেই এসেছি চিরটাকাল। মমতা, একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, সেটা কাজে করে দেখালেন। দেশের স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথমবার ! কোন নিয়মকানুনের পরোয়া না করে যখন-তখন হলিউডি সিনেমার ভয় দেখানো এফ বি আই জ্যাকেট পরিহিত সাদা পোশাকের সান্ত্রীদের মত সি বি আই জ্যাকেট পরে এসে যখন ইচ্ছে যাকে তাকে তুলে নিয়ে যাবে ‘অখন্ড ভারত’ আর ‘হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান’এর জিগির তুলে, ( ঠিক যেভাবে বস্তার, দণ্ড্কারণ্য, পালামৌএ রাষ্ট্রীয় সামরিক আধাসামরিক বাহিনীর বিভিন্ন বিভাগের ‘কোবরা’, ‘স্করপিও’, ‘গ্রেহাউন্ড’ ইত্যাদি ভয়ঙ্কর সব জন্তুজানোয়ারের নাম দিয়ে প্রান্তিক, আদিবাসী জনসাধরনের ওপর অত্যাচার চালানো যায়, একইসঙ্গে সন্ত্রস্ত করা যায়) অনেকটা সেই মহাভারতের বকাসুরের কায়দায়, এই চমকানোধমকানোভীতিপ্রদর্শন তথা কেন্দ্রীয় দমননীতির প্রতিবাদ এবং একইসঙ্গে প্রতিরোধ হওয়া দরকার অবিলম্বে। অনুঘটকের কাজটা শুরু করে দিয়েছেন মমতা। বাকি রাজ্যগুলোও এবার সেই পথেই এগোবে বলেই বিশ্বাস। বহুদিন আগে মুম্বই গিয়েছিলাম ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরামের একটি কনফারেন্সে যোগ দিতে। সারা বিশ্ব থেকে নানা দেশের প্রতিনিধিরা এসেছিলেন। তখন ইরাক যুদ্ধ চলছে। হরেকরকম প্রতিবাদী শ্লোগান লেখা পোষ্টার আর ব্যানারে ছাওয়া গোটা সম্মেলন প্রাঙ্গন। তার মধ্যে একটি পোষ্টার। চোখ টেনেছিল বিশেষভাবে। ‘ইফ বুশ কামস টু শোভ, রেজিস্ট !!’ গোদা বাংলায় যার মানে দাঁড়ায় – ‘বুশ দাদাগিরি করতে এলে প্রতিরোধ কর !!’ আমাদের লালন, তিতুমীর, সিদোকানহো, রবি ঠাকুর, দুখু মিয়া, সুকান্ত, সুভাষ মুখুজ্জে, শঙ্খ ঘোষের বাংলায় ‘বুশ’ শব্দটা কেটে শুধু সিবিআই (পড়ুন মোদী) বসিয়ে দিতে হবে। ব্যাস ! আর কিচ্ছুটির দরকার নেই।

আরও পড়ুন:  'ভবিষ্যতের ভূত' নিয়ে একটি ভীরু প্রতিবেদন

পরিশেষে : যখন এই লেখাটি ছাপা হবে ততক্ষণে হয়তো উদ্ভুত পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। তাসত্বেও এ প্রতিবেদন এত তাড়াতাড়ি তার প্রাসঙ্গিকতা হারাবে না বলেই মনে হয়।

Banglalive-8

2 COMMENTS

  1. খুবই যুক্তিযুক্ত কথা লিখেছেন, এবং এই দমনমূলক নীতির প্রয়োগ যেমন কেন্দ্র, রাজ্যের উপর দেখাচ্ছে, তেমনি রাজ্যও, বিরোধীদের উপর দেখাচ্ছে। দুই পক্ষই খারাপ, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন যেমন কমিউনিস্টরা ,পুঁজিবাদ খারাপ হলেও নাজিবাদের চেয়ে কম খারাপ বলে, তাদের সঙ্গ দিয়েছিল, তেমনি মনে হয়, আমাদের কম খারাপের দলে থাকতে হবে। সুষ্ঠ রাজনীতি কবে আসবে জানা নেই, দিল্লীর আপ আন্দোলন যেভাবে হারিয়ে গেল। ততদিন ঐ..