‘এর আগে খুন, দাঙ্গায় আপনার বুক কাঁপেনি! আপনি তাহলে কার পক্ষে নাসির!’

603

জনাব নাসিরুদ্দিন শাহ,

আমি আপনার ডাই হার্ড ফ্যান। আপনার রাগী, প্রতিবাদী ইমেজটাই আপনার প্রতি আমার টান, আকর্ষণ বাড়িয়েছেঅন্যায়ের প্রতিবাদ যে ঠিকমতো করতে পারে, আমার মতো সাধারণ তো তাঁরই বীর পুজোকরে। কারণ, আমার মনের জমা অসন্তোষ, রাগ, ঘৃণা কত অনায়াসে আপনি বলে দেন! হোক না সেটা রুপোলি পর্দা। তবু তো আমার প্রতিবাদের ভাষা, আমার প্রতিরোধের আগুন প্রকাশ পায়!

আপনার অ্যালবার্ট পিন্টো কো কিঁউ গুসসা আতা হ্যায়আমি দেখেছি। দেখে মনে হয়েছিল, এই ক্রোধ যেন শুধু আপনাকেই মানায়। সম্প্রতি, আবারও আপনার গুসসাদেখলাম। রুপোলি পর্দার বাইরে। গো-রক্ষার মতো বাস্তব সমস্যা নিয়ে বাস্তবে জ্বলে উঠলেন আপনি। সত্তর পেরিয়ে আসা এক মানুষ কতটা ক্ষুব্ধ হলে মুখ খোলেন? সেটাও অনুভব করতে পেরেছি। জানি, আপনি একেবারেই অন্যায় সহ্য করতে পারেন না। বলিউড এবং আপনার একাধিক সাক্ষাৎকার বলে, আপনি বরাবরের বড্ড সিরিয়াস। প্রতিবাদী, রাগী স্পষ্ট কথায় একটুও কষ্ট নেই আপনার। এবং বলতে গলা কাঁপে না। জিভও জড়িয়ে যায় না। খন্ডহর’, ‘মির্চ মশালা’, ‘পার’, ‘আক্রোশ’, ‘ইরাদা’, ‘অর্ধসত্য’, ‘ত্রিকাল’—প্রত্যেক ছবিতেই তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছেন, বলেছেন। আপনার ছবি দেখে আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে একটাই বিশ্বাস বা ধারণা জন্মেছে, যেখানেই বিপ্লব সেখানেই কমন ম্যাননাসির।

এই তো, কিছুদিন আগে বুলন্দ শহরে গো-রক্ষার অজুহাতে বুলেটে ঝাঁঝরা হলেন পুলিশ আধিকারিক। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্য নাথ আপ্রাণ চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেন সেই ন্যক্কারজনক ঘটনা। তারপরেই আপনি তুললেন তুফান। আ ওয়েডনেস ডে ছবির যে কমনম্যানদেশ বাঁচাতে পর্দায় নিজের হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল বাস্তবে সে-ই কুঁকড়ে গেল ভয়েসন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে মুখ খুলতেই পর্দার সুপারম্যানবাস্তবে হয়ে গেলেন স্টুপিড! কেউ কেন বোঝে না বলুন তো, পর্দা কাঁপানো রাগী মানুষটার মধ্যেও ঘুমিয়ে থাকে পিতৃত্ব। যে সন্তানের শুভ চিন্তায় স্বন্ত্রস্ত হতেই পারে 

আমি জানি, আপনিই ঠিক। তারপরেও বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে, ২০১২-য় যখন জয়পুর সাহিত্য সম্মেলন থেকে বাদ পড়লেন সলমন রুশদি তাঁর একটি লেখার জন্য, তখন আপনি কোথায় ছিলেন? সেদিন দেশের আন্ডার ওয়ার্ল্ড রুশদিকে পেলেই কাটবএমন হুমকি দিয়েছিল। সেই ভয়ে আমন্ত্রিত হয়েও দেশে আসতে পারেননি আন্তর্জাতিক মাপের সাহিত্যিক। সেদিনও সাহিত্যের আঙিনায় মাথা গলিয়েছিল ধর্মভেদ, অসহিষ্ণুতা, রাজনীতি। আপনি কিন্তু প্রতিবাদ জানাননি।

তসলিমা নাসরিন। যিনি মনে-মুখে এক। যেটাই ভাবেন, সেটাই বলেন। এবং লিখেও ফেলেন। সেই লেখা পড়ে একদিকে ‘গেল গেল’ রব ওঠে। অন্যদিকে সেই লেখা পড়েই নতুন দিশা দেখার সাহসে বুক বাঁধে একুশের নারী। জাতের নামে বজ্জাতি তসলিমা কোনোদিনই সহ্য করেননি। সেই দোষে তাঁর বাক স্বাধীনতা নেই। নিজের দেশ ত্যাগ করেছে তাঁকে। তসলিমার লেখার ঝাঁঝে তাঁকে ঠাঁইনাড়া করতে বাধ্য হয়েছে ভারতও। প্রায় একঘরে হয়ে পড়ে আছেন লেখিকা। তাঁর পাশে আপনি কই নাসির?  

আরেকটা অঘটনের কথা মনে করাই? বেশিদিন নয়, ২০১৭-র ১১ জুলাইয়ের ঘটনা। ১৭ বছরের একটি ছেলে হজরত মহম্মদের কার্টুন এঁকেছিল ফেসবুকে। তার জেরে রক্তগঙ্গা বয়েছিল বসিরহাট, তেঁতুলিয়ায়। ছবির সূত্র ধরে বাইরে থেকে আসা অচেনা একদল আতঙ্কবাদী দাঙ্গা বাঁধিয়েছিল। আপনি সেদিনও স্থবির! কী করে একের পর এক ঘটে যাওয়া হিংসা মুখ বুজে সইলেন?      

আপনি কি তখন অন্যায়গুলো গিলছিলেন? আর সেই অনুভূতিগুলোই কি আ ওয়েডনেস ডেকে জীবন্ত করার রসদ জুগিয়েছিল? আমি কি ঠিক বলছি জনাব? কিন্তু নিন্দুকদের তো আপনি জানেনই স্যার। তারা এতশত বোঝে না। সবার পেছনে, সব কিছুতেই ছিদ্রখোঁজে। আপনি কী করে তার থেকে রেহাই পাবেন? তাই আপনি মুখ খুলতে না খুলতেই কেমন রে রে করে উঠেছে নব নির্মাণ সেনা। ওরা নাকি আপনাকে পাকিস্তানে যাওয়ার পরামর্শও দিয়েছিল? টিকিটও নাকি কেটে ফেলব ফেলব করছিল! নির্ঘাত আপনার সরফরোসদেখেছেন সংগঠনের নেতারা। ওই ছবিতেই তো আপনি পাক গুপ্তচর সেজেছিলেন? তাই দেখে ওঁরা বোধহয় আসল-নকল গুলিয়ে ফেলেছেন! ছিঃ ছিঃ, কী লজ্জা!

আপনাকেই বা কী বলি? গো-রক্ষা নিয়ে বলার পর খামোখা সহকর্মী-বন্ধু অনুপম খেরকে দুষলেন কেন? না জেনেশুনে আলটপকা মন্তব্য করলেন, অনুপম নাকি জীবনে কাশ্মীরে না থেকেই কাশ্মীরি পণ্ডিতদের সংগ্রামে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন! কোনও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে সেই জায়গার বাসিন্দা হতে হয় নাকি? অনুপম কাশ্মীরে না থাকলেও পণ্ডিতদের অপমান তাঁকে বিঁধেছিল। আপনিই কি বুলন্দ শহরের বাসিন্দা? তা না হয়েও যদি মুখ খুলতে পারেন তাহলে অনুপম নয় কেন? ফল কি হল? এতদিনের বন্ধু সহকর্মী অনুপম ব্যাপারটা সহ্য করতে না পেরে মুহ্ তোড় জবাব দিয়েছেন, ‘এদেশে ফৌজকে গালাগাল দিয়ে পাথর ছোঁড়া আছে। আর কত স্বাধীনতা দরকার আপনার?’ অলিম্পিকের রুপোজয়ী কুস্তিগীর যোগেশ্বর দত্ত ট্যুইট করেছেন, ‘বুলন্দ শহরের ঘটনায় নিহতদের জন্য আমরা দুঃখিত। কিন্তু এর আগে খুন আর দাঙ্গার সময় আপনার বুক কাঁপেনি! আপনি তাহলে কার পক্ষে নাসির!

আপনি তো বোঝেন, আদর্শ ব্যক্তিত্বের গায়ে টোল পড়লে কতটা আঘাত পায় তাঁকে আঁকড়ে চলা মানুষটি? আমার হয়েছে সেই দশা। তবু মন্দের ভালো, আপনার কথার রেশ ধরে পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান মুখ খুলতেই আপনি ধমকে থামিয়েছেন তাঁকে। পড়শিকে ছেড়ে নিজের দেশের ভালোমন্দ বোঝার সু-পরামর্শ দিয়েছেন। কে জানে, এভাবেই বোধহয় জন্মভূমির ঋণ শোধ করলেন।

ইতি,

আপনারই এক গুণমুগ্ধ দেশবাসী            

Advertisements

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.