শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর|রসায়ণ অনার্স নিয়ে বিএসসি পাস করেন, বিএড ও এমবিএ-র পর কর্মজীবন শুরু একটি ফার্মাসিউটিকল সংস্থায়|বর্তমানে একাধিক বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক পত্র-পত্রিকায় গল্প, কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, ছোটদের সাহিত্য, ফিচার ইত্যাদি রচনায় নিয়মিত| ঙ্গ সংস্কৃতি পুরস্কার ২০১২, ঋতবাক ‘এসো গল্প লিখি’ পুরস্কার ২০১৬-১৭, শর্মিলা ঘোষ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৬ (ছোটগল্প) ও ঊষা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার (নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন প্রদত্ত)।

আমি করলুম শিলান্যাস, আর তুমি কাটবে ফিতে?’ ২০১৮র জানুয়ারিতে ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার (NPR) তার প্রথম NRC তালিকা প্রকাশ ইস্তক সর্বভারতীয় রাজনীতিতে ধুন্ধুমার কাণ্ডNPR হল উত্তরপূর্ব ভারতে নাগরিকত্বের একটি তথ্যভাণ্ডার, যা বাকি ভারতীয় ভূখণ্ডে চালু আধার (AADHAAR) কার্ড প্রদানকারী ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অব ইন্ডিয়া (UIDAI)-র সমতুল্যNPR-এর যাবতীয় তথ্যভাণ্ডার রক্ষণাবেক্ষণ করে Registrar General and Census Commissioner of Indiaএনপিআর ও ইউআরডিআই যৌথভাবে ভারতীয় নাগরিকদের একটি পূর্ণাঙ্গ তাথ্যভাণ্ডার প্রস্তুতে প্রয়াসী। এই NPR-এর ভিত্তিতেই তৈরির কথা National Register of Indian Citizens বা NRC অর্থাৎ ‘জাতীয় নাগরিক পঞ্জি’ তৈরি হচ্ছে। নামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি হলেও NRC শুধু আসামে প্রযোজ্য, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য উত্তরপূর্বীয় রাজ্যের ক্ষেত্রেও প্রস্তাবিত, এমনকী পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও কথা উঠেছেসোজা কথা পূর্ব ও উত্তরপূর্বের যে সব সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলি অনুপ্রবেশের সমস্যায় জর্জরিত, তাদের জন্য ‘প্রকৃত নাগরিক’ সনাক্তকরণের কর্মসূচী এই NPR প্রকল্প ও NRC তালিকা

নিরন্তর প্রাদেশিক হিংসার আগুনে জল ঢালতে ১৯৮৫ সালে আসু (AASU)-র সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর করা আসাম চুক্তি (Assam Accord) অনুযায়ী প্রক্রিয়াটি প্রস্তাবিত হয়। অর্থাৎ বিতর্কিত NRC-র প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল ১৯৮৫তে কংগ্রেসি আমলে, বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের স্বেচ্ছাচারে নয় কংগ্রেসের আক্রোশটা তাই দু’মুখী – একদিকে প্রস্তাবক হয়েও প্রাদেশিক স্তরে এনআরসি বাস্তবায়িত করার কৃতিত্ব হাতছাড়া হচ্ছে, অন্যদিকে রাজ্যকে সন্তুষ্ট করতে হলে জাতীয় স্তরে সংখ্যালঘু পৃষ্ঠপোষণের চেনা রাজনীতির সঙ্গে বিরোধ বাঁধছে। আর বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে বিতাড়িত অত্যাচারিত সংখ্যালঘু হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, ক্রিস্টান ও পার্সিদের মানবিক কারণে আশ্র ও নাগরিকত্ব দিলে ভোট ব্যাংকে গেরুয়াদের পাল্লা ভারি হবে আশঙ্কায় বিরোধী দলগুলির সম্মিলিত বিরোধিতায় তাল ঠুকছে মিডিয়াও।

এই এনপিআর তৈরির প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছিল ২০১০এর এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২০১১ সাধারণ আদম সুমারি (General Census)-র জন্য তথ্য সংগ্রহের সময়। কিন্তু ২০১৮র গোড়ায় এসে দেখা গেল আসামের মোট জনসংখ্যা ৩.২৯ কোটির মধ্যে ১.৩ কোটি মানুষের নাম নেই। ৭০%-এর বেশি বাঙালি প্রথম তালিকা অনুযায়ী ভারতীয় প্রমাণিত হতে পারেনি বা বহিরাগত হিসাবে ঝুলে আছে৩০ জুলাই প্রকাশিত নতুন খসড়ায় ২.৮৯ কোটি মানুষের বৈধতা সাব্যস্ত হয়েছে। ৪০.৭ লক্ষ বাঙালি যাদের সংখ্যাগুরু তথাকথিত ‘সংখ্যালঘু’ বহিরাগত হিসাবে এখনও সন্দেহভাজনের তালিকায়। তাছাড়া পুরো ব্যাপারটার মধ্যে ফড়ে দালাল ইত্যাদি মধ্যসত্ত্বভোগীর দখলদারিতে, অবহেলাজনিত ভুলে তথা ইচ্ছাকৃত তথ্যবিকৃতির জেরে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের অনেকের নাম যেখানে তালিকায় জ্বলজ্বল করছে, সেখানে জন্মসূত্রে কয়েক প্রজন্মের ভারতীয়ের নাম বাদ পড়েছে সরাষ্ট্রমন্ত্রক ও প্রশাসনের তরফ থেকে তালিকা বহির্ভূতদের পুনরায় আবেদন করার অনুমোদন দিলেও তাতে নির্বাসন দণ্ড কার্যকর করার তারিখ পিছোয়, সাজা মকুবের আশ্বাস নেই। ততদিনে তারা ধনেপ্রাণে নিঃস্ব কাঙাল হয়ে যাবে, ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে অনেকে। উপরন্তু সন্দেহভাজনদের বন্দিশিবির ডিটেনশন ক্যাম্পের সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৮র ডিসেম্বরের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর অবস্থার উন্নতির বদলে নাগরিকত্ব বিল ২০১৬ নিয়ে শুরু হয়ে গেছে নতুন তরজা।

এর বছর পাঁচেক আগে ২০০৫ সালে তৎকালীন ছাত্রনেতা আসুর সভাপতি এবং ২০১৭য় বিজেপি প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল IMDT বা Illegal Migrants (Determination by Tribunal) Act, 1983 আইনটি অসাংবিধানিক বলে বাতিল করিয়ে আসামে রীতিমতো হিরো হয়ে গিয়েছিলেন। সেই আইন অনুসারে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ‘বিদেশি’ প্রমাণ করার দায় ছিল প্রশাসনের, যেখানে পরবর্তী আইনে নিজেকে ‘বিদেশি নয়’ প্রমাণের দায় বর্তাচ্ছে চিহ্নিত মানুষটিরবলা বাহুল্য প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ নস্যাৎ করে বিদেশি অনুপ্রবিষ্ট হিসাবে দেগে দেওয়া প্রশাসনের পক্ষে যতটা সহজ, অসহায় অভিযুক্তের পক্ষে নিজেকে নাগরিক বা বসবাসের দাবিদার বলে প্রমাণ করা ততটাই কঠিন। বাঙালিদের বিশেষত উদ্বাস্তু বাঙালিদের কিছুটা রক্ষাকবচ IMDT আইনটির পরিবর্তে নতুন নিয়ম এনে যাকে তাকে বিদেশি তথা সন্দেহভাজন ‘ডি’ (doubtful) ভোটার বলে চিহ্নিত করার ব্যবস্থা অনেক আগেই পাকা করে রেখেছিলেন সর্বানন্দ সোনোয়াল। ২০১১ সালে গুয়াহাটি হাইকোর্টের নির্দেশে বহিরাগত চিহ্নিতদের নাগরিকত্ব প্রমাণের নামকাওয়াস্তে সুযোগ দিতে হয়তো রাতারাতি গায়েব না করে ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হচ্ছে, কিন্তু এর ফলে শিলচর, কোকরাঝাড় ও গোয়ালপাড়ার ক্যাম্পগুলো ভরে উঠেছে খেয়ালখুশিমতো অবৈধ অনুপ্রবিষ্ট চিহ্নিত করা বাঙালিতে, যাদের অবস্থা জেলখানার কয়েদিদের চেয়েও করুণ, এবং সেখান থেকে মুক্তির তারিখ নিশ্চিত হওয়ার বদলে বিদেশি বলে চিরকালের জন্য দাগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

Banglalive-8

তালিকা প্রস্তুতির পদ্ধতিগত ত্রুটি ও নথিপত্রের জটিলতার পরেও রয়েছে উল্টোপাল্টা মূল্যায়ন, নিত্যনতুন ফরমান জারি করে প্রমাণিত নাগরিকত্বও খারিজের আয়োজন ইত্যাদি। একটি বিচিত্র কানুনবলে ট্রাইবুনালের সিদ্ধান্তই নাকি চূড়ান্ত যার রায়কে ভারতের কোনও আদালতেই পুনর্বিচারের জন্য আবেদন করা যাবে না, সম্ভবত সুপ্রিম কোর্ট ছাড়া। আর মানবাধিকার হরণের এমন নির্লজ্জভাবে আঁটঘাট বাঁধা আয়োজন, যে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি সংক্রান্ত কোনও তথ্য জানার অধিকার (RTI) থেকে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টই আমাদের বঞ্চিত করে রেখেছে। [তথ্যসূত্র: কিছু জরুরি তথ্যের প্রেক্ষিতে আসামে বেপরোয়া বাঙালি বিতাড়ন, তপোধীর ভট্টাচার্য, জুন ২০১৮]। ফলে প্রথম তালিকায় থাকে না গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্যের নাম, যেখানে পলাতক আলফা জঙ্গির নাম জ্বলজ্বল করে

Banglalive-9

আসলে গলদ তো গোড়াতেইযে দুটি মূল ভিত্তির ওপর এই এনআরসি তালিকা তৈরি অর্থাৎ ১৯৫১ সালের নাগরিক পঞ্জি ও ১৯৭১ সালের ভোটার তালিকা – সেই দুটির কোনওটিই পূর্ণাঙ্গ ও অক্ষত রূপে পাওয়া যায়নি। ফলে দুটি অস্তিত্বহীন দলিলের ভিত্তিতে নাগরিকপঞ্জি নবায়নের প্রহসন চলেছে। ১৯৫১য় যে জেলাভিত্তিক নাগরিক পঞ্জি তৈরি হয়েছিল, তখন মেঘালয় মিজোরাম ও নাগাল্যান্ড আলাদা রাজ্য হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেনি, ছিল আসামেরই আংশ। রাজ্য বিভক্ত হওয়ায় সেখানকার অধিবাসীরা ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া প্রকৃতিক দুর্যোগ বা অর্থনৈতিক কারণে ছিন্নমূল মানুষ সভ্যতার স্বাভাবিক নিয়মেই পরিযায়ী হয়েছে। কিন্তু নাগরিক পঞ্জি নবায়নের নামে দস্তুরমতো দলিলপত্র থাকা বাঙালিদেরই যেখানে বহিষ্কারের আয়োজন চলছে, সেখানে এইসব অন্তর্দেশীয় প্রব্রজনকারীদের নাম তো বাদ পড়বেই। ১৯৭১এর ২৫ মার্চ নামমাত্র ভিত্তি তারিখ হলেও হিন্দুমুসলমান সমস্ত বাঙালিদের জন্য ‘বহিরাগত’, ‘বিদেশি’, ‘বাংলাদেশি তকমাটি পূর্বনির্ধারিত। ওদিকে এনআরসি বিরোধিতাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করতে বিয়ের পর আসামে বসবাসরত মহিলাদের প্রাকবিবাহ নথি সরবরাহে পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনিক দপ্তরগুলোও সাধ্যমতো অসহযোগিতা করছে বলে পাল্টা অভিযোগ।

২০১৪ সালে নির্বাচনী প্রচারে গিয়েই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেছিলেন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ বন্ধ করবেন১৯৭১এর পর ভারতে আসা বাংলাদেশিদের ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে উৎপাটিত হিন্দু বাঙালি যারা প্রাণ বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে তাদের মানবতার খাতিরে নাগরিকত্ব দান করা হবে। এই ঘোষণায় সায় ছিল কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈয়ের। অসমিয়ারা ও সেখানকার ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা হিন্দু বাঙালিরা দু পক্ষই খুশি হয়েছিল। সর্বশেষ অনুমোদিত অনুপ্রবেশের বছরটা রাজ্য সরকার ভেদে আগুপিছু করলেও বাংলাদেশি বহিরাগত অনুপ্রবেশকারীদের আসাম থেকে উৎখাৎ করাটা আসামের রাজনৈতিক ও সামাজিক চাহিদাসুতরাং নরেন্দ্র মোদী মুসলিম প্রধান হাইলাকান্দিতে সভা করার সময় যেমন অনুপ্রবেশ বিষয়ে প্রত্যাশিত ভাবে নীরব ছিলেন, তেমনি স্বেচ্ছাচারী ‘ডি ভোটার’ দাগানোর বিরুদ্ধেও মুখ খোলেননি পাছে অসমিয়া ভোট ব্যাংকে ব্যালেন্স কমে যায়

বিধানসভা জয়ের পর যখন বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অত্যাচারিতদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে উদ্যোগী হল, বিরোধ বাঁধল তখনই। এনআরসি নিয়ে অনিয়ম ও অবিচারের মীমাংসা হতে না হতেই নাগরিকত্ব বিল নিয়ে বিরোধীরা তো বটেই আসাম সরকার ও জনতাও বেঁকে বসল। ডিটেনশন ক্যাম্পে কতদিন পর্যন্ত কাউকে আটকে রাখা যাবে, কতদিন ধরে ও কী পদ্ধতিতে ‘বাংলাদেশি’ বা বিদেশি বিতাড়নের কর্মসূচী চলবে, সেসব পরিষ্কার নয়। তাদের শধু আশঙ্কা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ২০১৬ বা The Citizenship (Amendment) Bill, 2016 আইনে পরিণত হলে সমস্ত অমুসলিম অনাসমিয়ারা নাগরিকত্ব পেয়ে যাবে। আসু বা অগপর মতো কট্টর জাতি বিদ্বেষীদের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করার মূল্য বিজেপিকে এখন দিতে হচ্ছে। প্রাক্তন আসু নেতা থেকে শুরু করে অসমিয়া সাধারণের মধ্যে হিন্দুমুসলিম নির্বশেষে সামগ্রিক বাঙালিবিদ্বেষের কথা জেনেই মোদীজি সর্বানন্দরূপ বাঘের পিঠে চড়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার করেছেন। আর প্রাক্তন আসুনেতা যে বিজেপিকে বিভ্রান্ত করতেই দলে যোগ দিয়েছেন, বিজেপির ঘোষিত অ্যাজেন্ডা শরণার্থী পুনর্বাসন ও নাগরিকত্ব আইন সংক্রান্ত পরিকল্পনা বানচাল করে বাঙালিদের আরও নির্বল করাই যে তাঁর অভিসন্ধি ছিল, তা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। আর নাগরিকত্বের প্রশ্নে বিজেপি অমুসলিম অনুপ্রবিষ্টদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতেই জোটসঙ্গী আসাম গণপরিষদ তো জোট ছেড়েই দিয়েছে।

এ তো গেল সমস্যার কথা। কিন্তু এর প্রেক্ষিতটা কী? আসামের রাজনীতির নিজস্ব একটা প্রাদেশিক চরিত্র আছে, যেখানে দলমত নির্বিশেষে সমস্ত অসমিয়াভাষী এককাট্টা। সারা ভারতের বামকংগ্রেসতৃণমূল শিবিরের ছদ্ম অসাম্প্রদায়িকতার টোটকা সেখানে অকেজো৫ম৬ষ্ঠ শতাব্দী থেকেই অর্থাৎ ‘খিলাঞ্জিয়া’ বা ভূমিপুত্রের দাবিদার অহমদেরও আগমনের আগে থাকতেই আসামে বরাক উপত্যকায় হিন্দু বাঙালির বসত, যার প্রমাণ একাধিক মন্দির ও প্রত্ন নিদর্শনে ছড়িয়ে আছে ভাষাগত মামুলি দ্বন্দ্ব উনবিংশ শতাব্দীতেও ছিল। কিন্তু ১৯০৫০৬এ বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহার ও মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা ইস্তক আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতেও মুসলিম আগমন বাড়তে থাকে। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো সরকারিভাবে ঘোষিত নীতি হলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রসারণের অভিসন্ধি পরিষ্কার হতেই প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষ করে ভোটে জিতেও ১৯৩৬ ও ১৯৩৯এ নীতিগত কারণে কংগ্রেস প্রদেশ সরকার গঠন না করায় ফাঁকতালে মুসলিম লীগের মহম্মদ সইদুল্লা মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ১৯৪৬ পর্যন্ত ব্যাপক হারে মুসলিম আমদানি ঘটান। কংগ্রেসনেতা গোপীনাথ বরদোলইয়ের আপত্তি ধোপে টেঁকেনি। পরে গোপীনাথ মুখ্যমন্ত্রী হয়ে কিন্তু দেশভাগের পর আসামে বাঙালি উদ্বাস্তু পুনর্বাসনে তথা যুগপৎ পাক ও চিনা আগ্রাসন থেকে আসামকে বাঁচিয়ে ভারতে অঙ্গীভূত রাখতে অত্যন্ত সদর্থক ভূমিকা নেন। কিন্তু হিন্দু শরণার্থীর পাশাপাশি মুসলিম অনুপ্রবিষ্টের ভিড়ে আসামের জনমানচিত্র ওলটপালট হচ্ছে সন্দেহে অসমিয়াদের বাঙালি বিদ্বেষ ক্রমশ উগ্রতর হতে থাকে বিশেষত ১৯৫৭ সালে কৃষিমন্ত্রীত্ব পেয়ে মইনুল চৌধুরী যেভাবে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির নামে মুসলমান বৃদ্ধির উদ্যোগ নেন, তাতে সংঘাত আনিবার্য হয়ে ওঠে। ১৯৬৪তে কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিয়া বেআইনি অনুপ্রবেশ রুখতে নেহেরুর একপ্রকার বিরুদ্ধে গিয়ে Prevention of Infiltration from Pakistan (PIP) Act 1964 নিয়ে এসেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উদাসীনতায় ও মুসলিম বিধায়কদের চাপে পড়ে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত ‘বঙ্গাল খেদা’নোর আয়োজন হলেও ১৯৭১এ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর মুসলিম শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারীরও ঢল নামলে অসমিয়া ও আসামের উপজাতিগুলিও হিংস্র হয়ে ওঠে

মহম্মদ সাইদুল্লার আমল থেকে আসামে প্রবিষ্ট এই ‘বাঙালি’রা কিন্তু পরবর্তীতে পাকিস্তান গঠনের অন্যতম দাবিদার হয়ে ওঠে, অথচ দেশ ভাগ হওয়ার পরেও পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে যায় না, আসামের মাটিতে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকে কিন্তু ষাটের দশকে বাংলাভাষার ওপর অন্যায় অবদমন নেমে এলে প্রতিবাদ করেছে ও করে প্রাণ দিয়েছে হিন্দু বাঙালিরাই। মুসলমান বাঙালিরা সাম্প্রদায়িক প্রসারণের স্বার্থে আসামে বিশেষত ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় লোকগণনার সময় নিজেদের অসমিয়া পরিচয় দিয়ে দিব্যি রাজ্যের মূল অধিবাসীদের মধ্যে ‘নঅসমিয়া’ বা নতুন অসমিয়া হিসাবে মিশে গেছে ও রীতিমতো শক্তি সঞ্চয় করে ফেলেছেতারাও অসমিয়া ও বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে দাঙ্গা বাধাতে সদা সচেষ্ট। অথচ এদের পাশে নিয়েই বাঙালি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করতে চাইছে আসামের বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা, বিশেষ করে বামপন্থীরা, যাতে সুর মিলিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের আত্মঘাতী হিন্দু বাঙালি বুদ্ধিজীবীরাও।

সুতরাং অসমিয়া বাঙালির দ্বৈরথ সহজে আরোগ্য লাভের বিষয় নয়একদিকে অসমিয়া জাতিসত্ত্বা  অন্যদিকে বাংলাদেশের ইসলামি সাম্রাজ্যবাদদুইয়ের টানাপোড়েনে সবচেয়ে বেশি ঘর পুড়েছে রক্ত ঝরেছে কিন্তু হিন্দু বাঙালির, যারা সবার সঙ্গেই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চেয়েছেমাঝখান থেকে ভারতে পশ্চিমবাংলার বাইরে বাঙালি ও বাংলাদেশি শব্দদুটি সমার্থক হয়ে যাওয়ায় সমগ্র উত্তরপূর্ব জুড়ে উঠেছে বাঙালি বিদ্বেষের জিগির। এই ডামাডোলে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের আকাশচুম্বী ৩০০০ কোটি টাকার মূর্তি যেদিন ‘ঐক্য ও জাতীয় সংহতি’র প্রতীক হিসাবে উদ্বোধিত হল, সেদিনই আসামের তিন সুকিয়ায় অজানা বন্দুকবাজদের গুলিতে আরও পাঁচজন বাঙালি, নির্দিষ্ট করে বললে হিন্দু বাঙালির মৃত্যু নতুন ব্যাপার না হলেও বিরোধী শিবিরকে নতুন ইন্ধন যোগান দিয়েছে

নীতিগতভাবে একটি রাষ্ট্র যদি সিদ্ধান্ত নেয়, বহিরাগত অনুপ্রবেশে রাশ টানবে, মানবিক কারণে শরণার্থীদের আশ্রয় দিলেও অনুপ্রবিষ্টদের বহিষ্কার করবে, তাহলে তো আপত্তির কারণ থাকতেই পারে না। কিন্তু কে শরণার্থী আর কে অনুপ্রবেশকারী তার মানদণ্ডটি গোলমেলে হলে বিতর্ক হবেইবিশেষত বিনা প্রমাণে অভিযোগ এনে বন্দি করে তারপর বন্দির কাছে নির্দোষিতার প্রমাণ চাওয়ারটা বোধহয় পৃথিবীর কোনও দেশেরই আইন হতে পারে না। কিন্তু গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষের উত্তরপূর্বে সেটাই কার্যত হচ্ছে। আর তার জেরেই গতি পাচ্ছে নেতিবাচক বিরোধী রাজনীতি। নির্যাতকদের বদলে শুধু নির্যাতিতের প্রতি সহানুভূতিশীল ২০১৬র নাগরিকত্ব বিলটি বিরোধী স্বার্থে তো বটেই, সেই সঙ্গে অসমিয়া নেতাজনতার সম্মিলিত চাপেও কোমায় চলে গেল বিরোধীদের আপত্তি ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে অনুপ্রবিষ্টের তফাত করা নিয়ে, আসমিয়াদের আপত্তি ছাড়পত্রের বছরটা ১৯৭১ থেকে ২০১৪য় এগিয়ে আনা নিয়ে। অতএব ওপার বাংলা থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা হিন্দু বাঙালিদের হয় ডিটেনশন ক্যাম্প নামক বন্দিশালায় মৃত্যুর দিন গুণতে হবে, কিংবা বাংলাদেশ নামক অগ্নিগর্ভে নিক্ষিপ্ত হতে হবে।

বারবার সাম্প্রদায়িক আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত হয়েও বাঙালির ইসলাম সমান মানবতা এবং হিন্দুত্ব সমান সাম্প্রদায়িকতা – এই অসম্ভব সমীকরণ প্রতিষ্ঠার একরোখা জেদই তার অস্তিত্ব সংকটের জন্য দায়ী। বরাক উপত্যকা কেন পৃথক বাংলাভাষী রাজ্যের দাবি করছে না – প্রতিবাদীরা সবাই এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাচ্ছেন, যদিও উত্তরটা তাঁদের খুব ভালো করেই জানা। একে তো আসামের অঙ্গহানি ঘটালে আসামের অন্যত্র বাঙালির মার খাওয়া অবশ্যম্ভাবী, উপরন্তু মুসলিম প্রধান বরাক যে হিন্দু বাঙালির জন্য দ্বিতীয় বাংলাদেশ হয়ে যাবে, তা অনুমান করতে বেশি দূরদৃষ্টি লাগে না। তাই আলাদা রাজ্যের দাবি তোলা তো দূর স্বপ্নও দেখা যাচ্ছে না। এর উল্লেখ কোনও আন্দোলনকারীর কণ্ঠে বা কলমে ঘুণাক্ষরে পাওয়া যায় না। প্রশ্নটা ২৩ জুন কলকাতা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ‘এনআরসি’ বিরোধী বামপন্থী সংগঠনগুলোর প্রতিবাদী সভায় ক্ষীনভাবে তুলে জবাব পেয়েছিলাম, বাংলাদেশে হিন্দুরা বিপন্ন এটা বাজে কথা এবং সে কথা ভেবে ভয় পাওয়াটাও নাকি কাল্পনিক সমস্যা। তাহলে সেই দাবি জানাতে বাধা কোথায়? এর জবাব “আপনি প্রোগ্রামড্ সঙ্ঘী”।

আরও পড়ুন:  ভূমিপুত্রদের কাছ থেকে অরণ্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া কি অপরাধ নয়!?

NO COMMENTS