প্রজাতন্ত্র, পাবলিক ও পরিণত জনমানস

প্রজাতন্ত্র দিবস আসন্ন। মহড়া চলছে। সুরক্ষা বাড়ছে। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ গণতন্ত্রের উদ্‌যাপন হবে সমারোহে। আর একটা ছুটির দিন আমজনতার। পদাধিকারীদের সকালটা ব্যস্ততা, এখানে পতাকা তোলা, ওখানে রক্তদান, সেখানে শরীরচর্চা কেন্দ্র উদ্‌বোধন। চাকুরিজীবী আম-মধ্যবিত্ত ভাবে আহা, এবার ছাব্বিশ জানুয়ারি শুক্রবার পড়েছে, শনি রবি জুড়ে লম্বা ছুটি! আর নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে আরও নীচে যারা, তাদের কী-বা দিন কী-বা রাত। অমন কতই ছাব্বিশ জানুয়ারি এল, গেল, আর আসবে। হেরফের হয়নি কিছু। হবে নাকি কিছু!     

বিত্তের অসাম্য এবং সম্পদ তথা পুঁজির অসম বণ্টন ইত্যাদি জটিল অর্থনীতির আবর্তে না ঘুরপাক খেয়ে চলুন বরং কিছু সোজাসাপটা বিষয় নিয়ে ভাবি।

আটষট্টি বছর পূর্ণ করে (সংবিধান লাগু হয়েছে ১৯৫০ সাল থেকে) দেশের বেশিরভাগ মানুষ কতটা পরিণত হয়েছি গণতন্ত্র বহনে, তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে? লেখার অনেক কিছু আছে, সব ছোঁয়া অসম্ভব। কয়েকটায় আলো ফেলি।

ধরুন রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল আছে, এদিকে সিসিটিভি নেই। সার্জেন্ট বা ওইরকম ভারী পুলিশ নেই। জরিমানা নেই। লাইসেন্স দেখতে চাওয়া বা বাজেয়াপ্ত করা নেই। রাস্তায় আমরা সিগন্যাল মেনে চলব? সিটবেল্ট বেঁধে, হেলমেট পরে করব সব তো? উত্তরটা আমরা জানি। অবশ্যম্ভাবী প্রশ্ন যেটা মনের মধ্যে উদয় হয়, তাহলে কি প্রভু বিনে আমাদের গতি নেই?

ধরুন রোজের ট্রেনে, বাসে, ফেরি পারাপারে টিকিট চেক করার, না-কাটলে জরিমানা করার, বা নিদেনপক্ষে দু-কথা শোনানোর (পোশাক দেখে তো ভদ্রই মনে হয়, এদিকে বিনা টিকিটের সওয়ার) কেউ নেই। রাষ্ট্রের প্রভূত আস্থা আছে তার দেশবাসীর ওপর। আমরা, আটষট্টি বছর বয়সের পরিপক্ব জনগণ, সেই আস্থা রাখার যোগ্য তো? না কি এখনো সেই ইশকুলবেলাতেই আছি। শিক্ষক বা মনিটর না-থাকলেই দেদার হইহই, বাঁধনছাড়া হুল্লোড়।      

দেশপ্রেম নিয়ে এদানি আবার খুব পাল্লা মাপামাপি হচ্ছে। এ বলে আমি বেশি প্রেমিক, ও বলে আমি তারও বেশি। দেশপ্রেম নিয়ে আমরা যত সোচ্চার, তত কিন্তু মানুষে নয়, নারী-পুরুষে বা নারী-নারী কিম্বা পুরুষ-পুরুষে নয়। উলটে সেখানে বাধা বিস্তর। অশ্লীলতা, জাতপাত, ধর্ম, পারিবারিক সম্মানহানি, প্রকৃতিবিরোধিতা এবং অবিবাহিত নারী-পুরুষ জোড়ায় দেখলে তীব্র চুলকুনির দলেরা এসে বিরাট সব পাঁচিল তুলে রেখেছে। আর জীবে প্রেম তো বাণীই রয়ে গেল, ফাজলামিতে জীব কবেই জিভ হয়ে গেছে।

যাক যে কথা হচ্ছিল, এই দেশ আমাদের সকলের। একে নোংরা করার পবিত্র কর্তব্যও আমাদেরই। যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ থেকে পানের পিক বা গুটখা নির্যাস উগরে দেওয়া, আবর্জনা ফেলা, দেওয়ালে লেখা, দলীয় পতাকা থেকে বিজ্ঞাপনীয় ফেস্টুন লটকে দেওয়া— কী না করি আমরা! নিজের ঘরে তো করি না এমন। কারণ তা নিজের। আর দেশ তো পাবলিকের। দেশের রাস্তা, ফুটপাথ, ভ্যাট, পার্ক, রেল স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, বাস ডিপো, ফেরি ঘাট এ-সবই পাবলিকের। সে পাবলিকের মধ্যে আমি-আপনি নেই।

তারপর এই যে ইলেকট্রিক তার যাচ্ছে মাথার, রাস্তার, মাঠের ওপর দিয়ে। সেখানে শুধুই ফিঙে দুলবে! একটু হুক করলে কী এমন ক্ষতি! পাবলিকেরই জিনিস যখন।

অন্য প্রসঙ্গে আসি। ছোটো বড়ো যেকোনো নির্বাচনের আগে প্রায় সব দলেই একটা মুখের মতো মুখ সামনে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। ভেবে দেখুন, এটা কোনো মঞ্চাভিনয় বা সিনেমা নয়, নির্বাচন। তাহলে! আচ্ছা, নাহয় পাওয়া গেল সুন্দর ও মসিহা গোছের কিছু মুখ। দিকে দিকে ব্যানার, পোস্টার, কাট-আউটে ভরে গেল মুখগুলি। সংবাদপত্রে এবং টিভি বিজ্ঞাপনেও। যতই ধরা হোক দলের ওপরে নয় দলীয় ব্যক্তি, তবুও তলে তলে এই চলে।

এবার শুরু হবে ধুমধাম প্রচার। মিছিল, জনসভা, দলীয় কর্মীদের নিয়ে গোপন সভা আরও কত কী! নির্বাচনী প্রচারে মৃদুভাষী যুক্তিনিষ্ঠ বক্তা গো-হারান হেরে যায় গলা উঁচিয়ে, রসিয়ে, রাঙিয়ে, আড়ম্বরে বক্তব্য যিনি পরিবেশন করেন তাঁর কাছে। শব্দ-বাক্যের গোলাবর্ষণে সত্যির চেয়ে স্বপ্নের কদর বেশি হয়। এমন স্বপ্ন, যা মানুষ দেখতে চায়, পেতে চায় বাস্তবে। জানে, যা চেয়েও পাওয়া যায় না। আশ্চর্য না!

বেশিরভাগ সময়েই তথ্য ও উন্নয়নের খতিয়ানে নির্বাচন জেতা যায় না। জেতা যায় ইমেজারিতে, রাজকীয়তায়, জাঁকজমকে। জেতা যায় সাজপোশাকে। জেতা যায় ব্যক্তিত্বে, জাদু ক্যারিশমায়।  

যাকে দেখে বিহ্বল হয়ে পড়বে সবাই। আহা বাহা করে ছুঁয়ে দেখতে ব্যাকুল হয়ে উঠবে। মনে করবে, আমাদের সব সমস্যার সমাধান বটিকা আছে সেইজনের কাছে। আমাদের ক্লেদাক্ত, জীর্ণ, দীর্ণ জীবন লহমায় না-হলেও, শিগগিরই মেঘমুক্ত রৌদ্রকরোজ্জ্বল সুসমীরণের সকালে পদার্পণ করবে। ওই তো তিনি হাতছানি দিয়ে গাইছেন, ‘হেথা বাতাস গীতি-গন্ধভরা চির-স্নিগ্ধ মধুমাসে।’      

তাহলে তো সেই আমার আগের কথাই রইল — আজও কি প্রভু বিনে আমাদের গতি নেই?   

গণতন্ত্র আর রাজতন্ত্রের মূল ফারাক এখানেই। রাজতন্ত্রে রাজা ভালো হলে দেশ আলো, খারাপ হলে দেশের সমূহ অন্ধকার। গণতন্ত্রে দায় উভয়ত। প্রশাসক তথা সরকার একদিকে, অন্য দিকে জনগণ। জনগণমন যদি সুবুদ্ধিতে, সচেতনতায়, স্বচ্ছ ভাবনায় মজবুত ঝকঝকে থাকে তবেই গণতান্ত্রিক কাঠামো চকচকে ধারালো হয়।

আসলে আজও ‘পাবলিক’ কয়েক ধাপ নীচে রয়ে গেছে আমাদের তথাকথিত আলোকপ্রাপ্ত মনে। তাই আমরা সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা খুঁজি, আর সরকারি পরিষেবার, শিক্ষা (ইশকুল) বা স্বাস্থ্য (হাসপাতাল)-র মতো বেসিকস-এই দেখুন না, ডিফল্ট উপভোক্তা ধরে রাখি ওই ‘পাবলিক’-দের। ব্যতিক্রম আছেই। কিন্তু ব্যতিক্রম দিয়ে প্রবণতা বোঝা যায় না।

‘পাবলিক’-দের মধ্যে সেনাকর্মী, ডাক্তার, আইনজ্ঞ, সাংবাদিক, অধ্যাপক হলে জাহির করা যায় বাড়ির দরজায় বা গাড়ির গায়ে। বাকিরা। ফ্যা ফ্যা জনগণ?

ফ্যা ফ্যা হলে তো প্রভু আবশ্যিক। আজও।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

2 Responses

  1. সুন্দর প্রতিবেদন যে দেশের সাধারণ মানুষ এখনও জানে না ২৬২৬শে জানুয়ারী কেন ছুটি ।মনে ভাবে কোনো একটা উৎসব আছে ববোধহয় ।সে দেশের মানুষ চিতায় উঠেও দেশের মূল্য বুঝবে না । আসলে মানুষের স্বার্থপরতা এত প্রবল গতিতে গ্রাস করছে মানুষকে, বুদ্ধির উপর তা আস্তরণ গড়ে তুলছে । আসলে মানুষ অদৃষ্টের চালেই চলতে ভালোবাসে।

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Illustration by Suvamoy Mitra for Editorial বিয়েবাড়ির ভোজ পংক্তিভোজ সম্পাদকীয়

একা কুম্ভ রক্ষা করে…

আগের কালে বিয়েবাড়ির ভাঁড়ার ঘরের এক জন জবরদস্ত ম্যানেজার থাকতেন। সাধারণত, মেসোমশাই, বয়সে অনেক বড় জামাইবাবু, সেজ কাকু, পাড়াতুতো দাদা