থুতুর আমিষ ও নিরামিষ

শেয়ালদা স্টেশন নতুন করে সাজবে। তাই সম্প্রতি কয়েকজন রেলকর্তা ওই স্টেশন চত্বর ঘুরে দেখেছেন। আর এই ঘোরাঘুরি করে তাঁরা যা দেখতে পেয়েছেন তা অল্প কথায় মারাত্মক, অকল্পনীয়, রোমহর্ষক। টিভিতে হ্যান্ডওয়াশের বিজ্ঞাপনে দেখেছি, হাতের আঙুলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা দুষ্টু জীবাণুও নাকি খালি চোখে দেখা যায়। তাগড়া টুথব্রাশের ঘায়ে দাঁতের কোটরে ঘাপটি মেরে থাকা কোলবালিশের মতো ব্যাকটিরিয়াও দলবল নিয়ে ফেরার হয় জলদি। খুব তাড়া যেন। আর রেলকর্তারা এত দিন পরে দেখতে পেয়েছেন, স্টেশন চত্বরের অনেক জায়গাই পিকরসে বর্ণময়। এ এক আশ্চর্য আবিষ্কার বটে।

সংখ্যাতত্ত্ব, রাশিবিজ্ঞান নিয়ে পড়ার স্বর্ণমন্দির এ শহরে। তবে থুতু মাপার হিসেবে ওই প্রতিষ্ঠানকে দারুণ দুয়ো দিয়েছে সাঁতরাগাছি রেলস্টেশন। দশ জন টিটিসাহেব একদিন সকাল আটটা থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত স্টেশনচত্বরে টহল দিয়েছেন। সিসিটিভি নয়, চোখকে সম্বল করে। মাত্র ছ’ঘণ্টায় তাঁরা পাকড়াও করেছেন একশ জন থুতুশ্রমিককে। অপরাধ বুঝে, একশ থেকে পাঁচশর মধ্যে জরিমানা আদায় হয়েছে। বিন্দু বিন্দু জলে, ভুল বললাম, থুতুতে সিন্ধু হল। রাজকোষে এসেছে কড়কড়ে তেরো হাজার টাকা, মাত্র ছ’ঘণ্টায়। বনগাঁ লোকালে, খবরের কাগজের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে সেদিন এক প্রস্থ লোকের এই নিয়ে তিন প্রস্থ আলোচনা হল। কোলের উপরে রাখা সাহেব বিবি গোলাম শাফল্ হল না, পড়ে রইল বেওয়ারিশ লাশের মতো। বটব্যালদা বললেন, এটা বিশ্ববাংলার থুতু। মা মাটি মানুষের থুতু। দিল্লি এর থেকে ফিফটি পার্সেন্টের বেশি দাবি করতে পারে না। বিমলদা ফোড়ন কাটলেন, গুরু, বাংলার সব স্টেশনে যদি এটা চালু হয়, তাহলে বকেয়া ডিএ নিয়ে আর আমাদের চিন্তা থাকে না কি বলেন? শুধু ছুটিতে পেট ভরে? বাংলা করে দেখাবে।

জননেত্রী বলেছেন, ‘এই যে দেখুন রাস্তাগুলো রং করে দিচ্ছি, হঠাৎ থুতু ফেলে চলে গেল! পানের পিক ফেলে দিয়ে দিয়ে চলে গেল!..স্কাইওয়াকটা এত ভাল করে দিলাম, পরের দিনই নাকি পানের পিক ফেলেছে।’ কত দুঃখের থেকে উনি এই কথাগুলো বলেছেন, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু অবাধ্য, দামাল, দামড়া শিশুদের রোখার সাধ্য কার? অনুপ্রেরণা নেয় না, দুষ্টুমি করে শুধু। উদ্বোধনের আগে বিশ্ববাংলা গেটও বাদ যায়নি। কোটি কোটি টাকা দিয়ে সরকারি প্রকল্প হবে, সৌন্দর্য্যায়ন হবে, অথচ ফিতে কাটতে এসে মন্ত্রী আমলারা কপাল কুঁচকে বলবেন—সকাল বেলায় এসে দেখি, ফেলে গেছ তুমি এ কি! এ সব হতে দেওয়া যায় নাকি মশাই?

এ মাসের শুরুতে পুণে পুরসভা নিয়ম করেছে, থুতু ফেললে প্রথমে জরিমানা দাও। তারপর মগ বালতি ন্যাকড়া লাগানো ঝাঁটা দিয়ে অপকর্ম সাফ কর। বালতি, ন্যাকড়া এসব যোগাবে পুরসভাই। তা আবার ভিডিওগ্রাফি করা হবে। বাংলা আজ যা ভাবে, দেশ আর কাল তা ভাবে না। বলা যায় না, হয়ত পুণে থেকেই শিক্ষা নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। শোনা গেল, রাজ্যর কয়েকটা তাবড় স্টেশনে আবার এক কাঠি এগিয়ে মুখনিঃসৃত রসের প্রকারভেদ করা হয়েছে। স্টেশন বা লাইনের উপরে সাধারণ, নিরীহ থুতু ফেললে জরিমানা করা হবে একশ টাকা। তবে যদি পাপী থুতু হয়, মানে থুতুর মধ্যে যদি মেশানো থাকে পান বা গুটখার অবশেষ, তাহলে গচ্চা যাবে পাঁচ গুণ, একেবারে পাঁচশ টাকা। রেলকর্মীদের কাজ বেড়েছে। ফরেন্সিক তদন্তটা করতে হচ্ছে তাঁদেরই। অর্থাৎ ভেজ থুতু শ রুপিয়া, নন-ভেজ পাঁচশ রুপিয়া। প্রফেসর ক্যালকুলাসের মতো তাঁদের হাতে আতসকাচ আছে কি না জানি না। কেউ যদি কাশতে কাশতে লাল থুতু ফেলে বলেন, ‘ও পিক নেহি, বেলাড থা স্যার’, তা হলে কি তাঁকে মুখ খুলে ঘা দেখাতে হবে? আইন ধাঁধাঁর থেকেও জটিল এক বস্তু। অথবা ধরা যাক, চিকেন মোমোর সঙ্গে অ্যাটম বোমার মতো যে লাল সসটা দেয় বহু স্টেশনে, তা গিলতে না পেরে হু-হা করতে করতে কোনও নিরীহ মানুষ যদি পুচ করে থুতু ফেলে দেন স্টেশন চত্বরে, তার বিচার কিভাবে হবে? দুধে জল ধরার জন্য ল্যাক্টোমিটার হয়, শ্বাসে মদ ধরার জন্য ব্রিদ অ্যানালাইজার হয়। সবই হাতে ধরা যায়। হাতেনাতেও। থুতুর জন্য হয় কি কোনও ছোটখাটো থুথুনোগ্রাম?

একটা ছোট্ট দেশলাই কাঠি লঙ্কাকান্ড বাধিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে। তবে তার মুখে উসখুশ করছে বারুদ। নিরীহ থুতু সশস্ত্র সংগ্রামে না গিয়েও হাওড়া ব্রিজের থামকে, পিলারকে চুরমুরের মতো করে দিতে পারে। সমীক্ষা বলছে, থুতুর কল্যাণে ওই সেতু ক্রমশ কেতুর দশার দিকে এগোচ্ছে। হাওড়া ব্রিজ ‘প্রভাবশালী”। খবরে আসে। অন্য বহু সেতু তো দুয়োরানির মতো। তাদের চোখের জলের খবর থুতু ছাড়া আর কেই বা রাখে?

এ বারে একটু মাইক্রোস্কেলে দেখা যাক। থুতু নিয়ে কিছু মান অভিমান। মনিষীরা বলেছেন, আকাশে থুতু ছুঁড়লে তা নাকি নিজের মুখেই পড়ে। ভুল বলেছেন। কোনও এক সিরিয়ালে দেখেছিলাম, শাশুড়ির কাছে কান ভাঙানোর জন্য ছোট বউ থুতু ছুঁড়লেন বড় বউয়ের দিকে। বনেদি বাড়ির বনেদি সিঁড়ির নিচের ধাপে ছিলেন ছোট বউ। বড় বউ সাত-দশটা ধাপ ওপরে। থুতুটা গিয়েছিল স্লো মোশানে, ব্যাকগ্রাউন্ডে ডঙ্কা বাজতে বাজতে। কুরুক্ষেত্রে কেউ ম্যাজিক তির মারার পরে টিভিতে যেমন দেখা যেত ঠিক তেমন। বড় বউয়ের রাঙা গালে তা স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে ছবি স্টিল করে দেখানো হয়েছিল—এর পর আগামী পর্বে।

বিখ্যাত কলেজ থেকে হোটেল ম্যানেজমেন্ট পাশ করা, সুখ্যাত হোটেলের এক শেফের কথা বলি। আড্ডাসূত্রে আলাপ হয়েছিল। বয়স বছর তিরিশ। ‘চিকেন অ্যালগোরিদম উইথ সিক্রেট সস’ বলে একটা পদে মাংস সিদ্ধ না হওয়ায় এক বার এক কাস্টমার ওকে অপমান করেছিলেন কিচেন থেকে ডেকে এনে, প্রকাশ্যে। মাসখানেক পরে ফের ওই কাস্টমারের উদয় হয়। শেফের কথায়, ‘মালটা এবারে অর্ডার করল মার্টিনা মটন উইথ স্পাইস শাটলকর্ক। তাওয়া থেকে নামানোর পরেই পুচুক করে দিলাম দু এমএল থুতু ঝেড়ে। গ্রেভি আপন করে নিল। আর কাস্টমার জিএসটি অ্যাড করে বিল মেটাল। শালা আমায় অপমান!’ সেবার নাকি ওই কাসটমার খুশি হয়ে শেফকে টিপস দিয়েছিলেন চারশ টাকা।

সিনেমা শুরু হওয়ার আগে জাতীয় সঙ্গীত বাজালে নাকি দেশপ্রেম বাড়ে। বছরের অর্দ্ধেক সময়ই বিদেশে থাকা এক শীর্ষমন্ত্রীর অন্তত এমনটাই ইচ্ছে। অথচ দেখি, জাতির জনকের ছবি দেওয়া নোটের বান্ডিল গোণার সময় টকাশ করে জিভ বের করে আঙুলে থুতু লাগিয়ে যাঁরা মহাত্মার মুখে লাগাচ্ছেন, তাঁদের কোনও অপরাধ নেই। নোটের উপরে কিছু লেখা দোষ, থুতু দেওয়া হয়। কত শহীদের মুখওয়ালা ডাকটিকিটের পশ্চাদ্দেশ থুতুসিক্ত হচ্ছে প্রতিদিন। কত প্রাণ বলিদানের প্রায়শ্চিত্ত করে স্যালাইভা জল। কর্মসূত্রে বড়বাজারের এক তস্য গলির এক মাড়োয়াড়ি অফিসের রিসেপশানে ঘণ্টাখানেক বসে থাকার ‘সৌভাগ্য’ হয়েছিল। ইলেকট্রনিক যন্ত্রে চব্বিশ ঘণ্টা জয় মাতা দী। সেখানকার এক কর্তাকে দেখেছিলাম বায়োমেট্রিক মেশিনে আঙুল ছোঁয়ানোর আগেও হাতটা একবার জিভে ছুঁইয়ে নিচ্ছেন। তাঁর টেবিলে ফুলদানির পাশে সগরিমায় রাখা ছিল পিকদানিও। তার গায়েই আলো করে ছিল এক সুদৃশ্য বোর্ড। তাতে লেখা, বাতেঁ কম, কাম জাদা। মানে কথা কম, কাজ বেশি আর কি। জানতে পেরেছিলাম, আক্ষরিক অর্থেই তিনি খুব কম কথার মানুষ। মুখে সারাদিনই পানমশলা থাকে।

বাঙালিও আজকাল দিবারাত্রি চিবোচ্ছে বেশ। থুতু-গুটখা-পানমশলা-জর্দা-খৈনি নিয়ে দিব্যি আছে। শহর পরিস্কার রাখতে আর্থিক বছরে পুরসভা বাজেট বরাদ্দ করছে প্রায় ছশো কোটি টাকা। আর গুটখা-পানমশলা কেনা ও পিক ফেলার জন্য সু-নাগরিকরা পকেট থেকে বরাদ্দ করে চলেছেন একশ চল্লিশ কোটি টাকা, ফি বছর। এ এক দারুণ রঙ্গ বটে। শহর নীল সাদা। কিন্তু চৌত্রিশ বছরের ‘বদ’ স্বভাব বলেই হয়ত লুকিয়ে লাল করার অভ্যেস গেল না আজও। বুক বাজিয়ে বলতে পারি, ধবধবে ভিক্টোরিয়ায় আনাচ কানাচ থেকেও লাল রং বেরোবে। তারামন্ডলের বাইরেটাও ভাল করে দেখলে হয় এক দিন। মঙ্গলগ্রহ নিশ্চয়ই আছে!

এক রসিক সহনাগরিকের কথা বলে দাড়ি টানি। এক সরকারি অফিসের সদ্য রং হওয়া শ্বেতশুভ্র দেওয়ালে সবে মাত্র তিনি পিচিক করে দাগ রেখেছেন। সত্যি কথা বলতে কি, দেওয়ালের অন্য পাশটা তখনও রং হচ্ছিল। আমি তখন ক্লাস ফাইভ। বলেছিলাম, কাকু, ছি ছি। ভদ্রলোক আমার মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন, বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে মা আঙুল কামড়ে মাথায় থু-থু করে দেয় কি না? বলেছিলাম, দেয়।

উনি বললেন, আমিও তাই করলাম সোনা। দেওয়ালটা কি সুন্দর দেখো। কারও যেন নজর না লাগে।

অম্লানকুসুম চক্রবর্তী
অম্লানকুসুমের জন্ম‚কর্ম‚ধর্ম সবই এই শহরে|বাংলা ছোটগল্পের পোকা|একেবারেই উচ্চাকাঙ্খী নয়‚অল্প লইয়া সুখী|

4 COMMENTS

  1. এবার জেল খানায় কাটাও বাকি জীবন – – অবশ্য আমিও তোমার সাথে থাকবো ! এরকম চাবুক লেখার জন্য – তোমার অমরত্ব দাবি করা যায় ! যদি স্বদেশ টা শেষ অবধি শুদ্ধ হয় ! hats off !

  2. ভালো লিখেছেন , শেয়ার করলাম নিজের ফেসবুক টাইম লাইনে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here