তোমাকে যে উঠতেই হবে

ধরা যাক কোনও এক কফিশপ। না না কফিশপ নয়, ক্যাফে। ধরা যাক ওই ক্যাফের ইয়া বড় এলইডি টিভিতে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ। ধরা যাক বিরাট কোহলির ছক্কা। ধরা যাক ওই ক্যাফেতেই কফিপানরতা এক যুবতী, তার নরম দুগালে ভারতের পতাকা আঁকা। ধরা যাক এমন সময়েই অনেক দূরের টেবিলে বসা উস্কোখুস্কো এক যুবকের প্রবল আহ্লাদিত হয়ে যুবতীর গালে চরম এক চুমু। তারপরই এক গাল হেসে ওই যুবকের অনেস্ট কনফেশন, আই লাভ ইন্ডিয়া।

সব ধরা গেলেও শেষেরটা ধরা যায় না। লোকে শুনে বলবে, ‘যাঃ, এমন আবার হয় না কি? ফাইজলামি হচ্ছে?’ ওই যুবক পাল্টা বলতে পারেন, ‘কেন, আমি আমার দেশকে ভালবাসতে পারি না? ইহা খাঁটি দেশপ্রেম ছাড়া আর কিছু নহে।’

যুবকটি চড়-থাপ্পড় খাবেন। মেয়েটি সোশ্যাল মিডিয়ায় দশ এমবি-র আত্মকথন লিখে বলবেন, মি টু। পুলিশ যুবকের কলার চেপে চার অক্ষর-পাঁচ অক্ষরের মালা চড়িয়ে বলবে, দেশপ্রেম দেখানো হচ্ছে হারামজাদা?

এবার একটু দৃশ্য পালটাই। ধরা যাক, শহরের কোনও ঝাঁ-চকচকে শপিং মল। সেই মলের সবচেয়ে উপরের তলায় নীল আলোয় মোড়া এক মাল্টিপ্লেক্স। অডিটোরিয়ামে অভিজাত হাউসফুল অন্ধকার। কড়া কফি-পপকর্নের গন্ধ। একটু পরেই পুরো স্ক্রিন জুড়ে সানি লিওনের নাচ। বেবি ডল কিংবা চার বোতল ভদকা। অথবা ধরি, সেক্সি সাইরেন নামে নতুন কোনও ছবি। এর ঠিক আগে, বেরসিকের মতো ডলবি অ্যাটমস বলে উঠল, ডিয়ার প্যাট্রনস, প্লিজ স্ট্যান্ড ফর দ্য ন্যাশনাল অ্যানথেম। বেডসিনের মাদকতা শুরু হওয়ার আগে জাতীয়তাবোধের এক মিনিটের ওভারডোজ। যেন মোগলাই চিকেন-চাঁপের আগে তেরঙা প্যান্টোপ্রাজোল। উপায় নেই। ‘ও চাঁদ, ও চাঁদ, তোমাকে যে উঠতেই হবে…হোক অমাবস্যা তবু, উই নিড ইউ, উই নিড ইউ।’

কয়েকজন ওঠেননি স্টার থিয়েটারে, সম্প্রতি। মহাসপ্তমীর রাতে এই মহা পাপ কাজ করে তাঁরা মহা বিড়ম্বনায় পড়েছেন। রাত নটা দশের শোয়ের একটা বাংলা সিনেমার টিকিট কেটেছিলেন তাঁরা। বেশ কয়েকজন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, জাতীয় সঙ্গীত বাজলে দাঁড়াবেন না। বাঙালিজাতিকে তামাম দেশ কাঁকড়ার জাত বলে ব্যঙ্গ করে, ক্ষ্যাপায়। কারণ, কোনও বাঙালি যদি এগিয়ে যেতে চায়, পিছন থেকে অন্য বাঙালিই তাকে টেনে ধরে। দাঁড়াতে দেয় না। কিন্তু স্টার থিয়েটারে হল তার ঠিক উল্টোটা! ওঁরা কেন দাঁড়াচ্ছেন না, তা নিয়ে যাঁরা দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁরা টিটকিরি দিতে শুরু করেন। দেশদ্রোহী বলে তাঁদের দেগে দেওয়া হয়। ফেসবুকের জমানায় দেগে দেওয়া হয় পুরনো কথা, বলা উচিত ছিল ট্যাগ করে দেওয়া হয়। সিনেমা শুরু হওয়ার পর কিছুক্ষণ চুপচাপ। দ্বিতীয় ইনিংসটা শুরু হয় ইন্টারভালে। পপকর্ন-কোল্ড ড্রিংক-ওয়াশরুম ভুলে হলের কোনও কোনও দর্শক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন ওই দেশবিরোধীদের, ‘জঙ্গি’দের দেশপ্রেমের সবক শেখাতে হবে। ওই অবাধ্য ন’জন আর ঝুঁকি নেননি। সিনেমা মাথায় ওঠে। ইন্টারভালেই হল ছাড়েন। তাঁদেরই একজন, অর্কজ আচার্য্য জানিয়েছেন, হল থেকে তাঁরা যখন বেরিয়ে যাচ্ছিলেন তখনও তাঁদের পিছু নিতে ছাড়েননি দেশভক্ত কিছু দর্শক।

একা এবং কয়েকজন এক অক্ষৌহিনীর সঙ্গে লড়তে পারে না। তা সম্ভবও নয়।

প্রশ্ন হল, সিনেমা হলে জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হলেই কি দর্শকরা দাঁড়াতে বাধ্য? এ নিয়ে দেশের শীর্ষ আদালতের ডিভিশন বেঞ্চ গত বছরের অক্টোবরে একটি রায় দিয়েছিল। বলা হয়েছিল, ‘জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হলে নিজেকে দেশপ্রেমিক প্রতিপন্ন করার জন্য কাউকে সিনেমা হলে উঠে দাঁড়ানোর দরকার নেই। যদি কেউ উঠে না দাঁড়ান, এটা মনে করা যাবে না যে তাঁর দেশপ্রেম কম।’ সোজা কথায় বলতে গেলে, জনগণমন বাজানো হলে, বিশাল স্ক্রিনে ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা দেখতে দেখতে কারও যদি মনে হয় দাঁড়াবেন না, তাঁর দাঁড়ানোর দরকার নেই।

সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ যে কথা বোঝে, সে কথা আম-আদমি বুঝবে কেন? জনগনমনঅধিনায়ক শুনলেই স্প্রিংয়ের মতো দাঁড়িয়ে পড়তে হবে, এটাই রেওয়াজ। ছোটবেলা থেকে এই শুনেই বড় হয়েছে, বড় হচ্ছে একশ একুশ কোটির জনগন। মফস্বলের মেলায় মাঝে মধ্যে এরকমের ঘোষনা আজও শোনা যায়—অমুক চন্দ্র তমুককে অনুরোধ করা হচ্ছে, আপনি যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, মেলা অফিসের সামনে এসে উপস্থিত হোন। ওখানে আপনার জন্য তমুক চন্দ্র অমুক অপেক্ষা করছেন। এই ‘যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন’ ব্যাপারটা খুব গোলমেলে। জাতীয়তাবোধের স্যালাইন আমাদের রক্তে ওই সঙ্গীত শোনামাত্র যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, দাঁড়ানোর ফরমান জারি করে। সমাজ শাসিত, সমাজ ঘোষিত ফরমান। এর অবজ্ঞা করা মানেই আমার-আপনার দেশপ্রেম তলানিতে। অথবা আমার ঠাঁই হওয়া উচিত পাকিস্তানে।

বছর দুয়েক আগে, ২০১৬ সালের ৩০শে নভেম্বর, দেশের শীর্ষ আদালতের রায়ে সিনেমা হলে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আগে জাতীয় সঙ্গীত বাজানো বাধ্যতামূলক করা হয়। আদালত নতুন করে না বললেও দাঁড়ানোটাও এক রকম ভাবে বাধ্যতামূলকই হয়ে যায়। যাঁরা দাঁড়াননি অথবা দাঁড়াতে পারেননি, তাঁদের হেনস্থা করার কথা খবর হয়ে আসতে থাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। শারীরিক কারণেই যাঁরা পত্রপাঠ দাঁড়িয়ে পড়তে পারেন না, লাঞ্ছিত, অপমানিত হওয়ার তালিকা থেকে বাদ পড়েননি তাঁরাও। যাঁরা হুইলচেয়ারবন্দি, কিন্তু মাল্টিপ্লেক্সে বহু কষ্ট করে সিনেমা দেখতে যান, তাঁদের বলতে শোনা যায়, এবার থেকে কি ‘আমি প্রতিবন্ধী’ এমন ব্যাজ লাগিয়ে সিনেমা হলে ঢুকতে হবে আমাদের? বাদ পড়েননি ভিন দেশের নাগরিকরাও, যাঁরা ভেবেছিলেন অন্য দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হলে দাঁড়ানোটা তাঁদের নৈতিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। ২০১৭-র অক্টোবরে সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ বলে, সিনেমা হলে জাতীয় সঙ্গীত বাজলেই দাঁড়ানোটা বাধ্যতামূলক নয়। আর এ বছরের গোড়ার দিকে চলচ্চিত্র শুরুর আগে জাতীয় সঙ্গীত বাজানোটাও সিনেমা হলগুলোর কাছে অপশনাল হয়ে যায়। সরকারকে তিরে বিঁধে আদালত বলে, ‘এর পরে তো সরকার চাইবে, সিনেমা হলে টি-শার্ট আর শর্টস পরে আসাটাও বন্ধ হোক। এ সব পরলেও তো জাতীয় সঙ্গীতকে অসম্মান করা হয়।’

কিন্তু জাতীয় সঙ্গীত বাজানো বন্ধ হয়েছে কটা হলে? আমি যে সিনেমা হল কিংবা মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে যাই, তার একটাতেও হয়নি। তেরঙা পতাকা না দেখানো হলে কি দিল্লির সরকার বাহাদুর চটবেন? সারা দেশ জুড়ে ব্যবসা করে যে মাল্টিপ্লেক্সের চেন, তারা কি সেই ভয়েই জাতীয় সঙ্গীত বাজানো থেকে নিরস্ত হতে পারেননি? যেখানে একটা ছোট কাগজের বাকেটে পপকর্ন কিনতে হয় আড়াইশো টাকা দিয়ে, এক গ্লাস ঠান্ডা পানীয়র জন্য একশ টাকা গচ্চা দিতে হয়, সেখানে জাতীয় সঙ্গীতের বদলে এক মিনিটের বিজ্ঞাপন দেখালেও তো চেন মালিকের হাতে কয়েক কোটি টাকা আসত, বাড়তি। দেশজোড়া প্রতিটা অডিটোরিয়ামে প্রতিটা সিনেমা শুরু হওয়ার আগের এক মিনিটগুলো যোগ করলে কত মিনিট হয়? অত দেশপ্রীতি থাকলে সেই টাকা তো দুর্গতদের তহবিলেও জমা করতে পারতেন মাল্টিপ্লেক্স চেন মালিকরা। এ দুটোর মধ্যে কোনটা করলে দেশের জন্য বেশি করা হয়? নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কায়দায় টুপি পড়ে দেশপ্রেম জাহির করতে চান যিনি, তিনি হয়তো কপাল কুঁচকোবেন। কিন্তু দেশের লাভ, দশের লাভ কীসে?

খুব বোকা বোকা লাগবে শুনতে, তাও বলছি। বাহান্ন সেকেন্ডে হয়তো অ্যাসিডিটি কমানো যায়, দেহে ইনসুলিন ঢোকানো যায়, কিন্তু দেশপ্রেম বাড়ানো যায় না। দেশের জন্য শুরুতে মিনিট খানেক দাঁড়িয়ে, দুঘণ্টা আইটেম নাচ ভর্তি মশলা মুভি মেখে, কিংবা দেশেরই কোনও কপ্লিত মন্ত্রী-আইপিএসের ঘুষবৃত্তান্ত দেখে যে লোকটা সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে ওই হলেরই দেওয়ালে প্রস্রাব করে, তারপরে মুখভর্তি গুটখার পিক প্রকাশ্য রাজপথে উগরোতে উগরোতে অন্য ঠেকের রাস্তা ধরে, তার দেশপ্রেমের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী কি না জানার শখ হয় খুব। অসমের যে লোকগুলো জানেন না নাগরিকপঞ্জির যাদুমন্ত্রে আর কয়েক মাস পরে তাঁরা আদৌ এ দেশের নাগরিক হওয়ার ‘যোগ্যতা’ অর্জন করবেন কি না, তাঁদের কোন অধিকারে সিনেমা হলে জাতীয় সঙ্গীতের সময় দাঁড়াতে বাধ্য করতে পারি আমরা? খাবারে ভেজাল বন্ধের সুরাহা দিকশূন্যপুরে, এই ২০১৮ সালেও পুলিশ আর উপরি, মন্ত্রী আর দুর্নীতি দু’জোড়া সমার্থক শব্দ, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান এই তিনটে যোগাতেই নির্লজ্জভাবে ডাহা ফেল যে দেশ, গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে যে দেশের স্থান ১০৩, তার আগে একটু খাবার দরকার। খালি পেটে ধর্ম যেমন হয় না, তেমনই হয় না আধার কার্ড কিস্সা কিংবা সিনেমাহলে জাতীয় সঙ্গীতের সময় দাঁড়িয়ে সমাজ-চাবুকের ভয়ে দেশের প্রতি মেকি ভালবাসাও।

দুয়ো দিচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের বলি। শুধু সিনেমা হল কেন? দেশ কি শুধু অডিটোরিয়ামে বন্দি? বাসে-ট্রামে-মেট্রোয় যখন কোনও স্মার্টফোন থেক প্রবল বেগে ধেয়ে আসে জনগনমন-র রিংটোন, ভোকাল কিংবা ইনস্ট্রুমেন্টাল, তখন লড়াই করে পাওয়া সিটটা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়াবেন তো? শুধু নিজে দাঁড়ালেই হবে না, অন্যদেরও দাঁড় করাতে হবে কিন্তু। মেরা ভারত মহান না?

ধুর মশাই, কি যে বলেন!

Advertisements

4 COMMENTS

  1. সত্য সেলুকাস কি বিচিত্র ………..

    দুদিন আগে বাংলার কোনো এক প্রথম শ্রেণীর দৈনিকে ফলাও করে বের হয় সিঙ্গাপুর সরকারের জাতীয় পতাকা অবমাননা করার শাস্তির খবর। জনৈক ভারতীয়কে একটি facebok
    পোস্ট এর জন্য বরখাস্ত করা হয় এবং সতর্ক করে দেওয়া হয়। সেই সিঙ্গাপুর যার জীবনযাত্রার মান সামগ্রিক সুযোগ সুবিধা দেখে বাঙালি লালায়িত হয়। কিন্তু একবার ও ভেবে দেখে না দেশ টা এত সুশৃঙ্খল ভাবে কি ভাবে চলে। আর তাই জাতীয় সঙ্গীত কে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়াতে বাধ্য করলে ( মন থেকে আমরা কিছুই যে সম্মান করি না আজকাল!) সবাই গেল গেল রব তুলে নোংরা রাজনীতি করতে বসি। জাতীয় পতাকা সংগীত এসব তুলে দিলে এ তো ল্যাঠা চুকে যায়। কি জানি তখন হয়তো কেউ বলে বসবে ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল বা অলিম্পিকে ও জাতীয় সংগীত না বাজিয়ে বিজ্ঞাপন দিলে সেই টাকাই খেলোয়াড়দের কল্যানে খরচা করা যাবে!!!

  2. Sabi sarkar…..jamon pataka ba jatiyasangeet er prati sraddha temni sab khettre applied vabe ta kare dekhano….asole ei desh ta k sabai aktu anno chokhe dekhe…..ekhane notun train theke headphone churi hoi…mathai neta mantrira besivagi corrupted(manush setakei support kare).valo keu kichu korle tar anek khati hoe jai….tai esob nie tarka na kare chalun field e jadi kichu kare dekhano jai….sabar chesta te hoito ta samvab hobe but please kichu na kare rajnaitik dalali korben na….

  3. শেয়ার না করে পারলামনা আপনার লেখা আমার ফেসবুক টাইম লাইনে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.