কাবেরী রায়চৌধুরী
কাবেরী রায়চোধুরী এই সময়ের অন্যতম কবি ও সাহিত্যিক যিনি দু'হাতে গল্প কবিতা ও উপন্যাস লিখছেন। প্রকাশিত উপন্যাসের ( ছোটদের ও বড়দের) সংখ্যা ২৬। গল্প সংকলন ৪ টি। প্রথম শ্রেনীর সব প্রকাশনা সংস্থা থেকে তার বই গুলো প্রকাশিত।

পৌনে দুটো! ফোন এলনা এখনো পলাশের! একটা থেকে দুটো! অফিসের লাঞ্চ আওয়ারে ফোন করা আজ বারো বছরের অভ্যাস পলাশের। আর ফোনের প্রতীক্ষায় বসে থাকা কাজ সুমনার। এখনো একটা বাজলেই বুক ঢিপঢিপ! বারোটা বছর ধরে এই একটা ঘণ্টার অপেক্ষায় থাকা! কথা? তার কি আর শেষ আছে? কথা কথা কথা! সারাদিন এত কথা সে কারোর সঙ্গে বলেনা বাড়িতে। তাও যতটুকু কথা মেয়ের সঙ্গে! স্বামীর সঙ্গে সমস্ত কথা ব্যাঙ্ক এটিএম আর চালডালে এসে শেষ!

Banglalive

পলাশের ফোন এল দুটো বাজতে পাঁচ মিনিটে! অভিমান শঙ্কা আর উদ্বেগ জড়িয়ে গেল কথায়, এত দেরী! এত দেরী কেন পলাশদা! তুমি তো জানো আমাকে!

কথা শেষ করতে দিলনা পলাশ, বলল, অযথা টেনশন করো তুমি। আমিও তো তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্য মুখিয়ে থাকি সুমনা। শালা বসের বাচ্চা আজ আমার সঙ্গে লাঞ্চ করল, তাই -!

অভিমান সমৃদ্ধ কণ্ঠস্বর সুমনার। বলল, ধ্যাত্‌! কী খেলে গো?

-আরে তার আগে খুশখবরিটা বলি? প্রোমোশন পাচ্ছি কামিং মান্থে। তোমাকে লাঞ্চ ট্রিট দেব। বলো কবে?

শুধু লাঞ্চ!

পলাশ হাসছে, হাঃ হাঃ, বলল, উঁহু। তুমি একটা ভাল ব্যাগ চেয়েছিলে, মনে আছে। তুমি পছন্দ করে কিনো।

সুখ উথলে উঠছে এক ঝলক। সেই সুখ অনুভব করতে পারছে সুমনা। বলল, তোমার মনে আছে?

  • থাকবেনা?
  • আচমকা বিষাদ ছেয়ে গেল যেন সুমনার কণ্ঠে, কতবড় ভুল করেছি সেদিন! আজ বিশ্বাস করো প্রতি মুহূর্তে তা মনে হয়।
  • সেদিন যদি গরিব মাষ্টারটার সঙ্গে বেরিয়ে আসতে পারতে! হয়ত …! অবশ্য তাও বা বলি কী করে? অঙ্গনার সঙ্গেও তো প্রেম করেই বিয়ে! তুমি বাড়ির অমতে আসতে পারলেনা! আর তার এক বছরের মধ্যে অঙ্গনা এল -! কই অঙ্গনার সঙ্গে তো কথা হয়না এত আজ, যা তোমার সঙ্গে প্রতিদিন একঘণ্টায় হয়? তোমার সঙ্গে কথা বলতে গেলে আনন্দ পাই! অঙ্গনার সঙ্গে কথা বলতে গেলে দু’কথার পরে হাঁপিয়ে যাই!
  • আমিও। আমারও তাই -!
  • বিবাহিত জীবনের চৌখুপী ঘরের সংলাপ প্রায় সর্বত্র এক।
  • অঙ্গনা পলাশ সুমনারা বহু বছর ধরে প্রায় একই গল্পের ক্লিশে নায়ক নায়িকা। ব্যতিক্রম কি নেই? আছে তাই তারা ব্যতিক্রম!

সাত বছরের বিবাহিত জীবনে উত্তরপ্রদেশের ছেলে রবিকান্ত যেদিন একটি অনুষ্ঠানে বাংলার মেয়ে আলোকিতাকে দেখল, প্রথম দর্শনেই মনে হল, এই তার প্রেম! বিবাহিত সম্পর্ক তার কাছে ততদিনে অসহ্য বোঝা! গ্র্যাজুয়েট সাধারণ স্ত্রী স্বাতী গ্রামের বাড়িতে যৌথ পরিবারে পাঁচ বছরের ছেলে নিয়ে দিন গোনে, কবে আসবে তার ‘পতি’! নিজের ম্যারিটাল স্ট্যাটাস গোপন করে আলোকিতার সঙ্গে তুমুল প্রেমে জড়িয়ে পড়তে সময় লেগেছিল মাত্র দশদিন! অনিবার্যভাবে সত্য প্রকাশ হল একদিন। সমাজ সংস্কার গ্রাম্য গুণ্ডামির সামনে দাঁড়িয়ে পিছিয়ে এল রবিকান্ত। আবার পুরনো দাম্পত্যে ফিরে যাওয়া! আবার মনের মধ্যে কী এক না পাওয়ার যন্ত্রণা! বয়ে গেল মধ্যবর্তী চারটি বছর! একজন হরিয়ানায় কর্মসূত্রে আরেকজন কলকাতায়! আবার যোগাযোগ হল!

আলোকিতা চার বছর পরে ফোন পেয়ে তীব্র স্রোতে বলেছিল, তোমাকে বিশ্বাস করার কারণ আছে কি? আবার ফিরে এলে কেন?

রবিকান্ত বলেছিল, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাইনি যে ফিরে আসব! বিশ্বাস করো স্বাতীর সঙ্গে আমি বলার মত কথা খুঁজে পাইনা। আমি প্রতিদিন শুধু তোমার কথা ভেবেছি আর বন্ধুদের বলেছি। আমি এক পলও তোমাকে ছাড়া ভাবিনি কিছু।

ভালবাসা! প্রেম! তার তার অনুভবটি বোঝা যায় শুধু। সংজ্ঞা দেওয়া যায়না। ভালবাসার ডেফিনেশন হয়না।

আরও পড়ুন:  কেতজেল পাখি (দ্রোহজ ২) পর্ব ২

ততদিনে আলোকিতার দু’বছরের বিবাহিত জীবনের দীর্ঘ ইতি পড়েছে। সেও প্রেমে পড়েছিল এবং বিয়ে করেছিল। কিন্তু চার দেওয়ালের কিছু নিয়মে ভালবাসায় নাভিশ্বাস উঠেছিল। অতএব বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত। যদিও তার স্বামী সন্দীপ ডিভোর্স দিতে নারাজ এবং এই বিচ্ছেদ আইনগতভাবে কবে বহাল হবে তা অজানা!

আলোকিতা ও রবিকান্ত ‘বৈধতার’ সার্টিফিকেটকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেশের দু’প্রান্তে থেকেও পরস্পরের প্রতি ভালবাসার সম্পর্কে আবদ্ধ। এবং সেই সম্পর্ক এতটাই ভালবাসা শ্রদ্ধা ও বিশ্বস্ততার যে রবিকান্তের স্ত্রী স্বাতীও তাদের বন্ধুত্বকে সম্মান জানাতে বাধ্য হয়েছে। অপরদিকে আলোকিতাও স্বাতীর সঙ্গে আলাপের পরে স্বাতীর সারল্যে এতটাই মুগ্ধ যে রবিকান্তকে বলেছিল, আমাদের ভালবাসার সম্পর্কের আঁচ যেন স্বাতীর ওপরে না পড়ে। ইন্টেলেকচুয়ালিও তোমার যোগ্য না হলেও এত ভাল মানুষ বিরল। আশ্চর্য এক সম্পর্কের ছায়াতলে বইছে দুটো সমান্তরাল সম্পর্ক!

সম্পর্ক ভাঙছে। সম্পর্ক গড়ছে। সম্পর্ক স্ট্যাগন্যান্ট; তবুও সমাজের রক্তচক্ষুর ভয়ে থেকে যাওয়া বিবাহিত দম্পতি কাটিয়ে দিচ্ছে বছরের পর বছর! হ্যাঁ, শূন্যস্থান পূর্ণ করতে চলে আসছে আরেকজন অতৃপ্ত অসুখী নারী অথবা পুরুষ! আসলে সুখ যে ঠিক কোথায়, সুখ যে কোথায় বসতি করে তা স্বয়ং ঈশ্বরের অজানা!

একটু পিছিয়ে যাই। ঘরে বাইরের সন্দীপ বিমলা নিখিলেশের কথা মনে পড়ে? মনে পড়ে চারুলতা অমলকে? শেষের কবিতায় লাবন্য কেটি অমিতের ইকুয়েশন? আসলে what is what শব্দটাই বোধহয় প্রযোজ্য।

এই যে শেষের কবিতায় লাবন্য বলল, ‘বিয়ে করে দুঃখ দিতে চাই নে। জানো কর্তা-মা খুঁতখুঁতে মন যাদের তারা মানুষকে খানিক খানিক বাদ দিয়ে বেছে বেছে নেয়। কিন্তু বিয়ের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে, স্ত্রী-পুরুষ যে বড় বেশি কাছাকাছি এসে পড়ে মাঝে ফাঁক থাকেনা; তখন একেবারে গোটা মানুষকে নিয়েই ‘কারবার’ করতে হয় নিতান্ত নিকট থেকে। কোনো একটা অংশ ঢাকা রাখবার জো থাকেনা। …… আমি যেই ওঁর মনকে স্পর্শ করেছি অমনি ওঁর মন অবিরামও অজস্র কথা কয়ে উঠেছি …।’

এই সেই স্পর্শ! এই সেই দূরত্বের সোনার হরিণ!

সময় দ্রুততর গতিতে পাল্টাচ্ছে। আগে দেওর বৌদি, শালী জামাইবাবু, ননদাই-ভাদুবউ, ঘরে ঘরে যে সম্পর্ক বিবাহিত সম্পর্কের অতিরিক্ত ছিল ঘরে ঘরেই তার চেহারাটা শুধু বদলে গেল আধুনিক উত্তর আধুনিক সময়ে। তাই তো, বর্তমান ইন্টারনেট যুগে সমস্ত মানবমানবী রাত পড়লেই জেগে ওঠে!

ফেসবুক মেসেঞ্জার ছাড়াও আরো কত ‘অ্যাপস’; সেখানে সহজেই কাছাকাছি চলে আসা যাচ্ছে!

চমকে উঠেছিল শ্রীরাধা মধ্যরাতে যখন মেসেঞ্জারে ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা এক বন্ধু; অথচ যার সঙ্গে কথাই হয়নি কোনদিনও তার কাছ থেকে ফোন এল!

আশ্চর্য! রাত দু’টো! ওয়াইফাই কানেকশন অফ না করেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে।

ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মেসেজ লিখল সে, এতরাতে একজন অচেনা মহিলাকে ফোন করলেন!

উত্তর এল, ভাবলাম একটু গল্প করি, তাই।

  • তা বলে রাত দু’টোতে!

খুব দ্রুত শ্রীরাধা লোকটির প্রোফাইলে গিয়ে আবিষ্কার করল সে বিবাহিত এবং তার প্রোফাইল পিকচারে স্ত্রীর গলা জড়িয়ে ধরা একটি ছবি যা তাদের সুখি দাম্পত্যের নিদর্শন!

দু’চারদিন কথা বলার পরেই প্রতিষ্ঠিত এক লেখক তার এক গুণমুগ্ধ পাঠিকাকে রাতে ফোন করলেন।

  • কী করছ? বিরক্ত করলাম না তো?
  • না। না। আপনি ফোন করেছেন! কী সৌভাগ্য!
  • কী করছিলে? আমার ‘অমুক’ উপন্যাসটা পড়েছ?
  • আপনার উপন্যাসটাই পড়ছিলাম!
  • কী পরে আছ? শুয়ে আছ?
  • হ্যাঁ শুয়ে শুয়ে পড়ছি।
  • কী পরে আছ?
আরও পড়ুন:  নির্বাসন 

তরুণী সঙ্কুচিত। এর পরবর্তী সংলাপ ‘একান্ত ব্যক্তিগতর’ অন্তর্ভুক্ত!

গঙ্গার পাড়ে সন্ধ্যা নামছে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে রঙের ছটা ছড়িয়ে। হাতে হাত ধরে সেই অপূর্ব দৃশ্যে অন্তরীণ দুই তরুণ তরুণী।

  • মেয়েটি এক সময় নৈঃশব্দ্য ভেঙ্গে বলল, আমরা বিয়ে করব না বুঝলি?
  • কী বলছিস! তাহলে … আমাদের প্রেম!
  • প্রেম যাতে নষ্ট না হয়ে যায়, তাই।
  • মানে?
  • তোর কি মনে হয়না বিয়ে করার পর আর আমরা ভাল থাকব না? আমার বাব-মা তোর দাদা-বউদি, এদের মত হয়ে যাক আমাদের সম্পর্ক আমি চাইনা।
  • আমার মা-বাবাকেও কখনো প্রেম করতে দেখিনি। না, ঝগড়াও করেনা। … কিন্তু তাহলে আমাদের রিলেশন?
  • রিলেশন তো ভালবাসার। বিয়ে না করেও তো পরস্পরকে রেসপেক্ট করে একসঙ্গে থাকা যায়। কোর্টে গিয়ে সম্পর্ককে রেজিস্ট্রেশন দেবার কী দরকার?
  • আইনি বৈধতা!
  • কী দরকার? আমার মা-বাবাও তো আইনি বৈধতায় আটকে আছে। ভালবাসা কি তাতে আছে? ভালবাসাকে এভাবে আইন দিয়ে বেঁধে জীবিত রাখা যায় না রে! আমরা যতদিন পরস্পরকে ভালবাসব সম্মান দেব একসঙ্গে থাকব। তারপর যেদিন বুঝব তোর আর আমাকে ভাল লাগছে না, বা আমারও – সেইদিন ঝগড়াঝাটি ছাড়া ‘বাই’ বলে চলে যাব।
  • আর আমাদের সন্তান … যদি কিছু হয়?
  • দু’জনেই দায়িত্ব নেব তার। নো কাঁদাকাঁদি। নো কাদা ছোড়াছুড়ি।
  • ঠিকই বলেছিস। হয়ত এটাই আমাদের প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখবে।
  • কাল অনন্তা আর সুর্বাও একই কথা বলছিল। কাগজ খুললেই অবৈধ প্রেম, খুন, পনের জন্য গৃহবধূ হত্যা! বিবাহিত জীবনে এত অবৈধ সম্পর্ক আসে কেন বল? বিয়ে করলেই যদি সুখী হওয়া যেত তাহলে এত ডিভোর্স কেন বল? ঘটা করে গাদাগাদা পয়সা খরচা করে বিয়ে! তারপর পাঁচ বছর যেতে না যেতেই ডিভোর্স! বাচ্চার কাস্টডি নিয়ে মারামারি! যত দেখছি ফ্রাসস্ট্রেটেড লাগছে রে! এর চেয়ে বোথ সাইডেড কনসেপ্টে লিভিং টুগেদার প্রেফার করব।
  • হয়ত তুই ঠিক।
  • আমার দিদি বলছিল সুগতদা অনেক চেঞ্জ হয়ে গেছে! বাচ্চাটা হবার পর থেকেই! ফেসবুকে এক মহিলার সঙ্গে কিছু চলছে বোধহয়, ও টের পেয়েছে!

সন্ধের সৌন্দর্য ভারী ম্লান হয়ে গেল! তাহলে আজ যারা গঙ্গা পাড়ে হাতে হাত ধরে, ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে পরস্পরকে বলছে, ‘তোমায় ছাড়া বাঁচবো না’ বিবাহের খাঁচায় প্রবেশের পরে ক’জন পরস্পরের প্রতি এমন ভালবাসায় আকৃষ্ট হয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দেবে?

আদালত চত্বর এর সুন্দর উত্তর দিতে পারবে। প্রতিদিন আদালতে আদালতে কয়েকশো বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা চলছে!

আইন! আইন তো মানুষের সৃষ্ট। সমাজ; সমাজ তো মানুষ গড়েছে! প্রকৃতির অবাধ উদারতায় শিকল পরিয়ে মানুষ নিজের প্রবৃত্তির পায়ে শিকল পড়াতে চেয়েছিল সেই সুদূর কালে! কিন্তু প্রকৃতির নিয়মের সঙ্গে মানুষ পেরে উঠবে কেন?

ভালবাসা তো এক আবেগ! কখন কার ছোঁয়ায় বুকের মধ্যে ঢেউ ওঠে কে বলতে পারে? স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে শৃঙ্খলিত করার ফল মধ্যরাতে ফোনের ইশারা! স্বামী বা স্ত্রীর নামে ঝুড়িঝুড়ি নিন্দে করে অন্য কারোর বন্ধুত্ব চাওয়া! প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া! বিবাহবিচ্ছেদ না দিলে প্রতিহিংসায় খুন!

আসলে দিনশেষে সুদুরের প্রতি মোহ! আমি সুদুরের পিয়াসী!

আইন দিয়ে বেঁধে ফেলার পরেই ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড!’ ঠিক যেমন হাড়িকুড়ি ঘটিবাটি! প্রাণহীন বস্তু। কাজে লাগাও, ব্যবহার করো। তারপর অবহেলায় রেখে দাও!

আজকের প্রজন্ম অনেকেই বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বরং পারস্পরিক ভালবাসা ভাললাগা শ্রদ্ধার সঙ্গে একত্রে জীবন যাপন পছন্দ তাদের। খুনখারাপি নেই। ঘৃণা নেই! তিক্ততা নেই! প্রেমের অনুভব যতদিন থাকবে তারা একসঙ্গে থাকবে। বিবাহবিচ্ছেদের কঠিন ঝামেলায় যাবার ইচ্ছা তাদের নেই!

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ২৫)

রস্মিতা, আমার প্রতিবেশী। এম.ফিল করছে একটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে। রস্মিতার সঙ্গে দীর্ঘ কয়েক বছর যে যুবকটিকে প্রায়ই দেখতে পাই অনুমান করেই নিয়ে ছিলাম সে তার প্রেমিক। প্রশ্ন করা আধুনিক সভ্যতার লঙ্ঘন নয়। তাই করিওনি।

কিন্তু সুযোগ এসে গেছিল বিয়ে না লিভটুগেদার এ নিয়ে প্রশ্ন রাখার।

জিজ্ঞেস করতে একটি সুচিন্তিত উত্তর পেলাম, বলল, বিয়ে! নো ওয়ে! দেখো দিদি, শুধু আমি আর অয়নই না, আমাদের অনেক বন্ধু-বান্ধবই এই বানানো বিয়ে ব্যাপারটাতে আর বিশ্বাস করি না। চারদিকে তো দেখছি পাঁচ ছ’বছর কোর্টশিপ করার পরেও বিয়ে করল, তারপর হাজার সমস্যা। বনিবনা নেই! ঝগড়াঝাটি! সন্দেহ! ইগো ক্ল্যাশ … লটস অব …! তারপর মিউচুয়াল ডিভোর্স হল তো ভাল, আর না হলে কাজকর্ম ফেলে কোর্টে হাজিরা দাও বছরের পর বছর! ইনফ্যাক্ট, অয়নও ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তান! আমার জ্যাঠতুতো দাদা ডিভোর্স চেয়ে পাচ্ছে না! সমানে অশান্তি অথচ ডিভোর্সও দেবে না বউদি! দাদা বউদির কাছে ওপেন অফার রেখেছিল, তোমার যখন এত সমস্যা, কয়েকবার মিথ্যে ডোমেস্টিক পয়োলেন্সের অভিযোগ এনেছ, হ্যারাস করেছ তাহলে ডিভোর্স দাও। আমার ফ্ল্যাট, লিকুইড ক্যাশ অ্যালিমনি হিসাবে দিয়ে দেব’। তারপরে বউদির কথা হল, ডিভোর্স আমি দেব না। ডিভোর্স দিলে আবার বিয়ে কোর্টে পারবে ভাবছ?’ … তাহলেই বোঝ দিদি!

বললাম, সমস্যা কোথায় তলিয়ে ভেবেছ?

অয়ন এই প্রশ্নের উত্তর দিল, বলল, আমার মনে হয় আইন দিয়ে বেঁধে ফেলার পরেই একটা গাছাড়া ভাব এসে যায়। দু’পক্ষই ভাবে যাবে কোথায়? এই যে স্বস্তির নিশ্চিন্ততা পুরো সম্পর্কটাকে টেকেন ফর গ্রান্টেড স্তরে নিয়ে যায়।

  • তোমরা কী করবে?
  • আমরা আর দু’বছরের মধ্যেই দু’জনের টাকায় একটা ফ্ল্যাট কিনছি। তারপর একসঙ্গে থাকব। বিয়ের ন্যাকামোর মধ্যে নেই! দু’টো মানুষ একসঙ্গে সহবাস করতে চাইলে আইনমত একসঙ্গে থাকার অনুমতির নামই তো বিয়ে। আগে না হয় পুরুত ডেকে হতো! এখনো হয়, তবে রেজিস্ট্রি মাস্ট! আমরা ভালবেসে একসঙ্গে থাকতে চাই।
  • আর বাচ্চা?
  • সে ভবিষ্যতে ভাববো। দু’জনেই দেখব। যদি আলাদা হতে চাই আলাদা থাকব।
  • বাচ্চার বাবা মা’র পরিচয়?
  • কী মুশকিল! আইন দিয়ে বাবা মা হয় নাকি? কত আইনত স্বামী-স্ত্রীর সন্তানই তো শাটল কক-এর মত বাবা-মা’র কোর্টে ছোঁড়াছুড়ি হচ্ছে!

রস্মিতা বলল, ভবিষ্যতে বিয়ে ব্যাপারটা অনেকটাই উঠে যাবে দেখবেন!

  • একটা ইনডিসিপ্লিনড্‌ সিচুয়েশন তৈরি হবেনা কি তাতে?
  • হয়ত হবে না। যারা লিভ টুগেদার করবে দায়িত্ব নিয়েই করবে। এখন বিয়ে করে সমাজে ভণ্ডামি করে এক সঙ্গে থেকে চারটে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েই বা কী ডিসিপ্লিনড্‌ থাকছে সমাজ?

হয়ত ঠিক! হয়ত বা না। কিন্তু অয়ন রস্মিতা আলোকিতা, সুমনা-পলাশদের আজকের গল্পগুলো থেকেই তো উঠে আসছে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটির ভণ্ডামি ! সুখী সেজে থেকে যাওয়া প্রায় প্রতিটি দম্পতির ঘরে তৃতীয় ব্যক্তির আগমনই তো বলে দেয় সুসজ্জিত সমাজ দেহটি আসলে ভেতরে ভেতরে পচে গেছে!

তাহলে কৃত্রিম মুখোশ খুলে ফেলে প্রতিটি মানুষ নিজের মত ভাল থাকতে চাইলে ভণ্ড সমাজের অহেতুক চোখ রাঙানি হবে কেন?

বিবাহে যার ভরসা এবং রুচি সে তার পথে চলুক। ভালবেসে প্রতিষ্ঠান বহির্ভূত নিজস্ব সৃষ্ট সমাজেই যার ভরসা ও রুচি সে থাক তার মত!

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ