হাতে আর বেশি সময় বিশেষ নেই…কিন্তু এই চিঠি শেষ করতে হবে…লিখে ফেলা বড্ড জরুরি…

1133

বরাবরের মতো চলে যাওয়ার আগে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ একটা চিঠি লিখেছিল ২০১৮-কে  | বিদায় নেওয়ার আগে লেখা শেষ সেই চিঠি খুঁজে পেয়েছেন দীপান্বিতা রায়  |

প্রিয় বন্ধু,

আমার হাতে আর সময় বিশেষ নেই। কিন্তু তার মধ্যেই এই চিঠিখানা শেষ করে ফেলতে হবে। চিঠিটা লিখে ফেলা বড্ড জরুরি। কারণ আর একটু পরেই আমি এই পৃথিবী এমনকী এই সৌরজগতও ছেড়ে অনেক অনেক দূরে দূরে চলে যাব। তখন তুমি আর চেষ্টা করলেও আমার নাগাল পাবে না । যদিও ইদানীং শুনেছি
বৈজ্ঞানিকরা  টাইম মেশিন নামের এক অদ্ভূত যন্ত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করছেন । তাতে চেপে বসলে
অতীত-ভবিষ্যত যখন যেখানে ইচ্ছে হুশ করে চলে যাওয়া যাবে । তবে ব্যাপারটা শুনতে যতটা সহজ আদতে যে তা নয় তা আমি দিব্যি বুঝেছি। আশা করি তুমিও খুব দ্রুতই বুঝে ফেলবে। তাই ওসব ভবিষ্যতের কপোল-কল্পনায় মাথা না ঘামিয়ে নিজের অভিজ্ঞতাটুকুই বরং তোমাকে জানানোর চেষ্টা করি।

আসলে তোমাকে একটু সতর্ক করে দেওয়ার জন্যই আমি এই চিঠিটা লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি । কারণ
আমার, এই জায়গাটা বড়ই গোলমেলে ঠেকেছে । কার্য-কারণ সম্পর্ক অনেকসময়ই খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন । যেমন ধর, আমি যেদিন প্রথম এখানে এলাম, সেদিন আমাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য কত আয়োজন,
জাঁকজমক। চারিদিকে রঙ-বেরঙের বাজি ফুটছে। আলো ঝলমল করছে। লোকে গান গাইছে, নাচছে। সব
দেখেশুনে আমি তো মহাখুশি। তোমাকে যদি কেউ এমন ঢাকঢোল বাজিয়ে খাতির করে তাহলে তুমি খুশি হবেই 

বুক আমার ফুলে দশহাত হল। অবশ্য তোমাকে চুপিচুপি বলে রাখি, এখানকার রকম-সকম তো তখন আমার জানা ছিল না । তাই প্রথমটায় ভেবেছিলাম আমার মত যে নতুন আসে তাকেই বুঝি এমন খাতির করা হয় ।কিন্তু ভাল করে চারিদিকে একটু চোখ-কান খুলেই বুঝলাম যে নাঃ, ব্যাপারটা মোটেই সেরকম নয় । আমার মতই সবে এখানে পা রেখেছে, এমন অনেকেই আছে যাদের কোনও আদরই নেই। এমনকী তারা এখানে এসেছে বলে, সবার যেন কেমন রাগ রাগ ভাব । আমার তো দেখে ভয়ই লাগছিল, এ কী রে বাবা, এরকম করছে কেন, এদেরকে তাড়িয়ে দেবে নাকি ! পরে জেনেছি এদের মধ্যে অনেককে সত্যিই তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, এই পৃথিবী থেকে হয়তো বা এই সৌরজগত থেকেও।

সত্যি কথা স্বীকার করি, শুরুতে যখন এসব বুঝিনি, তখন নিজের খাতিরদানি দেখে ভেবেছিলাম, আমার মধ্যে নিশ্চয়ই বিশেষ কোনও গুণ আছে, তাই আমাকে সবাই এত আদর করছে । আমি নিশ্চয়ই সবার থেকে আলাদা ।

কিন্তু ও হরি ! কদিন যেতে না যেতেই দেখি আমারও খাতির-যত্ন সব ধুলোয় গড়াগড়ি। কেউ আর আমাকে চিনতেই পারে না। প্রতিদিনই যে আমি একটু করে বদলাচ্ছি, বড় হচ্ছি সেসব কেউ খেয়ালই করে না । তখনই প্রথম মনে হল জায়গাটা নিয্যস গোলমেলে ।

অবশ্য গোলমালটা যে সবজায়গাতেই আছে সেটা বলা বোধহয় ঠিক হবে না । কোথাও খুব বেশি, কোথাও কম । তবে সবথেকে গোলমেলে জিনিস এখানে কী , সেটা যদি জানতে চাও তাহলে আমি বলব সেটার নাম হল ধর্ম ।

জিনিসটা যে কী তা কিন্তু আমি অনেক চেষ্টা করেও খুঁজে বার করতে পারিনি। কোথায় থাকে, তাও জানি না। কেমন দেখতে তাও জানি না । অথচ সময় নেই, অসময় নেই সে ঘাড়ের ওপর ঘ্যাঁও করে ঝাঁপিয়ে পড়ে । আর তখনই বেঁধে যায় ফাটাফাটি –লাঠালাঠি কাণ্ড। তখন সেই ঘ্যাঁও-এর ম্যাও সামলাতে সবার একবারে প্রাণান্ত। অথচ এমন যে ঝামেলা পাকানো জিনিসটি, তাকে তুলে নিয়ে সমুদ্দুরের জলে ফেলে দিয়ে আসি, এমন কথাটি কিন্তু কেউ বলে না । সেকথা নাকি বলা যাবে না । বরং তাকে মেনে চলতে হবে। কেন রে বাপু ? এত কীসের দায় ! বিদেয় দিলেই ল্যাটা চোকে অথচ তা হবে না। সেইজন্যই তোমায় বললুম এই ধর্মটি হচ্ছে এখানকার এক নম্বর গোলমেলে জিনিস। এর থেকে দূরে থাকার চেষ্টা কোরো। আমি যদিও খুঁজে পাইনি, তবে তুমি পেলে সবাইকে লুকিয়ে সমুদ্দুরের জলে চুবিয়ে দিতে পারো, হাঙর-তিমিতে খেয়ে নেবে ।

এমনিতে এজায়গাটা বেশ সুন্দর, বুঝলে। নীল নীল আকাশ। গাছে গাছে সবুজ পাতা,। নানারকম ফুল ফোটে । পাখি-প্রজাপতি ওড়ে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল এতসব যে সুন্দর ব্যাপার-স্যাপার, সেসব যে সবারই ভাল লাগবে তেমনটা কিন্তু মোটেই নয় । আমি দেখেছি দুধরনের লোকেরা এসব নিয়ে মোটেই মাথা ঘামায় না। প্রথম ধরনের লোকেদের আমার বেশ পছন্দ। তারা বেশ হেঁকোডেকো, বীর গোছের ।

সারাদিনই তারা কিছু না কিছুকে জব্দ করে ফেলছে । কেউ মস্ত একটা কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে সেটাকে
চৌরস করছে । কেউ আবার বিশাল বিশাল সব মেশিন-পত্র চালাচ্ছে । সারাটা দিন এমন সব নানা কাণ্ড-কারখানা সেরে সন্ধে নামতে না নামতেই ঘুমে ঢুলছে । তাদের এসব ফুল-পাখি- এদিক-সেদিক দেখার সময়
কোথা ? তবে এর মধ্যেও যদি কখনও ফাঁক মেলে, যদি নদীতে দাঁড় টানতে টানতে ক্লান্ত ঘাম ঝরা পিঠের
ওপর বাতাস হাত বোলায় তখন তারা মাঝেসাঝে চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকায় । ডানায় পাল তোলা বুনো হাঁসের সারি দেখে দু-কলি গুণগুণও করে।

কিন্তু দ্বিতীয় যে ধরনটি আছে তারা কিন্তু এসবের ধারপাশে নেই। তারা কোদাল কিংবা মেশিন কোনওটাই চালাতে পারে না । তারা শুধু পারে সারাক্ষণ রকমারি ফন্দি আঁটতে । কেমন করে কাকে ঠকাবে, কী করে কার সাধের জিনিসটি কেড়ে নেবে, এইসব শতেক রকম ফন্দি। অন্যকে খেতে না দিয়ে ভাল ভাল খাবার-দাবার সব নিজেদের পেটে পুরতেও এরা ওস্তাদ। তবে অন্যদেরও আমি বলব বোকা। একজন পেট ভর্তি করে খাবে আর অন্যজন তাই দেখে আঙুল চুষবে এমনটা কেন হবে বলো ?

ভাল কথায় না দিলে কেড়ে নিলেই তো হয় ? কিন্তু না, সেটি চলবে না । ওই যে বললাম গোলমেলে
জায়গা, কেড়ে খেলে শাস্তি হবে, না খেয়ে মরলে কেউ কিচ্ছুটি বলবে না । এসব নিয়ম-কানুন আমার মাথায় ঢোকে না। আমার কথা যদি শোন, তাহলে ওই দ্বিতীয় ধরনের মানুষজনের থেকে দূরে থাকাই ভাল। একটা সমস্যা অবশ্য আছে, তুমি তাদের চিনবে কী করে ? আমি তো আর তোমার পাশে থেকে তাদের চিনিয়ে দিতে পারব না। সোজা রাস্তা বাতলে দিচ্ছি শুনে নাও ।

এরা সব থাকে মস্ত উঁচু, মেঘের সঙ্গে মুখ শোঁকাশুঁকি বাড়িতে । মোটরগাড়িতে চড়ে ঘোরে-ফেরে আর এদের গা থেকে কেমন যেন বদ-বুদ্ধির বোঁটকা গন্ধ বেরোয় । কাছে গিয়ে দাঁড়ালে চিনতে অসুবিধা হবে না একটুও ।

হাতে আর সময় মোটেই নেই । কিন্তু তবু আর একটা জরুরি কথা তোমায় বলতেই হবে। এ জায়গাটার তিন নম্বর গোলমেলে ব্যাপারটা হল যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা । সেই ছোটবেলায় সবাই যেমন চোর-পুলিশ খেলার সময় সারাক্ষণ সতর্ক হয়ে থাকে, এই বুঝি পুলিশের রুলের গুঁতো এসে পিঠে পড়ল, তেমনি এদেরও সারাক্ষণ কেমন যেন একটা মারি-মারি, ধরি-ধরি ভাব । এই বুঝি তোমার পিঠে কেউ সঙ্গীন উঁচিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এই বুঝি তোমার খানিক জমি অন্যে খাবলা মেরে নিয়ে নিল। তোমার সাগরের নোনা জল বালতি তিনেক হাত-সাফাই করে ফেলল। তোমার বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়োটা কুলপি মালাইয়ের মত কামড়ে নিল । আর এসব আটকাতে সারাক্ষণই চলছে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা । নতুন অস্ত্র, নতুন নজরদারি, নতুন নতুন নিয়ম-কানুন। কী বিপদ বল দিকিনি !

কিন্তু ওই যে প্রথমেই বলেছি ভারী গোলমেলে জায়গা। এই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলাটা সবাই যে পছন্দ করে তা নয় মোটেই। বরং আমি তো দেখেছি চারপাশের কারুরই এটা পছন্দ নয় । আর হবেই বা কেন । যুদ্ধ হলে
তাদের কষ্টটাই তো বেশি । তারাই সব হাঘরে-বেঘর হয়ে যায় । তাদের ছেলেপুলেরাই মরে । তাদের বয়ে গেছে যুদ্ধের খেলা খেলতে। কিন্তু কিছু লোক আছে যাদের এটি ভারী পছন্দ। তা আমার কথা হচ্ছে সেই
লোককটাকে আলাদা করে বেশ করে ঠ্যাঙানি দিয়ে, সবাই সবার গলা জড়িয়ে, হাতে হাত রেখে ভাব-সাব করে থাকলেই হয়। তাতে এত ঝামেলা ঝঞ্ঝাট কিছুটি থাকে না। কিন্তু না, সেটি করা যাবে না। কেন করা যাবে না, তাও কেউ বলবে না। শুধু কলের পুতুলের মত ঘাড়টি নেড়ে বলবে, এ হয় না, এরকম হওয়ার নিয়ম নেই।

চুলোয় যাক এই গোলমেলে দেশের গোলমেলে নিয়ম । আমি তো চললাম এদেশ ছেড়ে। তবে তোমাকে এখন থাকতে হবে তো , তাই বলে-কয়ে দেওয়া । যাক্ গে, এতসব গোলমালের বেত্তান্ত শুনে আবার ভেবে নিও না যেন, এজায়গাটা নিতান্তই খারাপ । ভাললাগার কিছুটি নেই । মোটেই কিন্তু তা নয়। ভাললাগার, ভালবাসার মত অনেক কিছুই এখানে আছে ।

সত্যি কথা বলতে কী, তুল্যমুল্য বিচার করলে এইসব গোলমেলে ব্যাপারের তুলনায় ভালটাই বেশি। কিন্তু
সেসব কথা আমি তোমাকে বলব না । ও তুমি নিজেই খুঁজে নেবে, খুঁজে পাবে আর হাসিতে-খুশিতে ভরে উঠবে।

ওই দ্যাখো, গির্জের ঘড়িতে বারোটার ঘন্টা বাজতে শুরু করল । আসি ভাই ২০১৮। তোমার যাত্রাপথের জন্য অনেক শুভেচ্ছে রইল।

-ইতি,
তোমার বন্ধু ২০১৭

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.