মন মন মন! তোমার শরীর নেই কুসুম?

পুতুল নাচের ইতিহাস, ইতিকথা বদলে গেছে। আমূল বদলে গেছে। নব্বইয়ের দশকের শুরু বা আশির শেষ প্রান্তে এসে বদলে গেল শরীর অথবা মনের সংজ্ঞা! না, আকস্মিক নয়, আকস্মিক ভাবে কোনো কিছু ঘটে না, বিনা মেঘে বজ্রপাত ছাড়া। তেমনই, কেন বদলে গেল প্রেক্ষাপট, কখন করে কীভাবে বদলে গেল শরীর অথবা মনের সংজ্ঞা, তারও একটা পটভূমি আছে।

একটু পিছিয়ে যাই বরং।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীতে সামগ্রিক কাঠামোটি যে অনেকটা ব্যাপক হারে বদলে গিয়েছিল দেখেছি। সামাজিক অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে বাড়ির মেয়েরা বেরিয়ে এলো রাস্তায়। পরিবারে আরেকটু স্বচ্ছলতা আনতে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। আর তাই অ্যাংলো ইন্ডিয়ান স্টেনো-টাইপিস্ট ক্লার্কের পাশাপাশি আমাদের ঘরের মেয়ে বউদের দেখা গেল অফিসে অফিসে; সরকারি বেসরকারি সর্বত্র!

আরেকটু গভীরে ব্যবচ্ছেদ করি। তার আগে পর্যন্ত ঘরের মেয়ে বউ ঘরেই রয়েছে। অতএব একটা আটপৌরে জীবন। কোনমতে একটা শাড়ি ব্লাউজ গায়ে জড়ালেই কাজ দেয়। বিয়ে বাড়ি, নেমন্তন্য বাড়ি যেতে হলে একটু সাজগোজ। একটু স্নো-পমেটম ব্যবহার আর কী! সোনার গয়নার প্রচলন ছিল বেশী। তাই ঝুটো জিনিস বাজারেও আসেনি। সোনার গয়নাই পরতো সামর্থ্য অনুযায়ী। তাদের শখ আহ্লাদ বলতে পান খাওয়া। নির্জন দুপুরে মনিহারী বিক্রেতা হাঁক পেড়ে যেত। চাই রেশমি চুড়ি, চুলের কাঁটা, ফিতে, সিঁদুর, আলতা …। আর মেয়ে বউরা ঘরে ডেকে এনে সেইসব কিনত। কত আর তার দাম?

মোটামুটি দু’বেলা ভাত কাপড়েই সন্তুষ্ট তখন জীবন যাত্রা। পরিবর্তন ঘটে গেল আমূল, যখন তারা রাস্তায় বেরোল। অফিসে চাকরিতে যোগ দিল!

সেই সময় স্মার্ট অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়েরাই অফিসের সেক্রেটারি থেকে স্টেনো টাইপিস্টের পদে একচেটিয়া। তাদের সঙ্গে কাজে পোশাকে স্মার্টনেসে পাল্লা দিতে গেলে আমাদের মেয়ে বউকেও পরিবর্তিত হতে হবে। তাই বদলে গেল ফ্যাশন আর স্টাইল স্টেটমেন্টের জগৎ।

তাদের কেশ সজ্জা থেকে প্রসাধনী ব্যবহার সবেতেই এল বিরাট পরিবর্তন। লিপস্টিক, ক্রিম, ফেস-পাউডার, পারফিউমের ব্যবহার শুরু হল। প্রতিদিনের জীবন চর্চার অঙ্গ তখন এগুলো। ফলে খরচ বাড়ল। যে মুহূর্তে খরচ বাড়বে সেই মুহূর্ত থেকে আয় বাড়ানো অনিবার্য হয়ে দাঁড়াল।

জীবনযাপনে এই পথ ধরেই এল অন্য জীবন! শুরু হল সম্পর্ক, সম্পর্কহীনত্‌, অবৈধ সম্পর্ক! অবৈধ সম্পর্কের ইতিহাস প্রাচীন! কিন্তু তা যখন বাণিজ্যিক কারণে হয় তখন তাকে কী নাম দেওয়া যায় তা আলোচনার বিষয়। হ্যাঁ, ভোগ্যপণ্য এবং ভোগবাদী হয়ে ওঠার গল্প ছড়িয়ে গেল সমাজে।

সময় এগোচ্ছে, সমাজে এল মুক্ত অর্থনীতি। পৃথিবীটা চলে এল বেডরুমের চার দেওয়ালের মধ্যে। জীবন আর ভোগবাদ ক্রমশ সমান্তরাল! ভোগবাদ, এই মেটিরিয়ালিস্টিক দুনিয়ায় বাড়তে লাগল প্রতিযোগিতা! জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তখন প্রতিযোগিতা আর লড়াই। সেই লড়াইয়ে এগিয়ে যেতে ব্যবহৃত হল ছল চাতুরী, অসদুপায়! আর এই ছল চাতুরী অসদুপায় অবলম্বন করে এক শ্রেণী খুব সহজে তরতর করে উপরে উঠতে লাগল। যোগ্যতম যোগ্যতর ব্যক্তি পিছিয়ে পড়ে অবসাদের শিকার হতে শুরু করল। ক্রমে দেখা গেল একদিন সেও চতুর হয়ে উঠছে।

এই যে প্রতিদিন প্রতি নিয়ত এগিয়ে যাবার যুদ্ধ একে অন্যকে ঠেলে, প্রতিহত করে, অসদুপায় অবলম্বন করে। এর ফলে একদিন আমরা দেখলাম শরীর আর মনের সংজ্ঞাও কেমন করে যেন বদলে গেল!

সামাজিক অর্থনৈতিক এই প্রতিযোগিতার বাজারে যোগ্যতম সৎ, হেরে যাওয়া মানুষটার যেদিন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেল সেইদিন সে বাচার রাস্তা খুঁজতে খুঁজে পেল অন্য এক পথ। আর এই সকল পথ ধরে শুরু হল মূল্যবোধের অবক্ষয়। শুরু হল বিভিন্ন ধরনের ক্রাইম। শুরু হল জটিল ব্যাঁকা পথে উপরে ওঠার সিঁড়িতে পা রাখা! বদল এল সর্বস্তরে।

নারী শরীর ব্যবহার, বানিজ্যিকীকরণ বহু পুরনো প্রথা। কিন্তু সভ্যতার ক্রমবর্ধমান চাহিদার যুগে তা এবার পল্লবিত হল। মূল্যবোধটি যেন লুপ্ত ডোডোপাখির মত।

শরীরের ছুতমার্গতা হ্রাস পাচ্ছে ক্রমশই এই পরিবর্তিত সময়ে। নব্বইয়ের দশক থেকে তা যেন চোখে পড়ার মত।

সত্তর আশির দশকে সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ঘরে কোন ফোন নেই! রেফ্রিজারেটর নেই! গ্যাস নেই! ওভেন নেই! মাইক্রোওভেন নেই!

হাতে গোনা কিছু উচ্চবিত্তের ঘরে তখন কালো মোটা ভারী ল্যান্ডফোন শোভা পেত! তেমনই কিছু ঘরে শোভা পেত ফ্রিজ নামক বস্তুটি! এ সি মেশিন তখনও সকল উচ্চবিত্তের ঘরে জাঁকিয়ে বসেনি! এমনকি টেলিভিশনও তখন সকলের আয়াসসাধ্য নয়।

সময় বদলেছে। সময়ের চাহদা মেনে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মনেও ভোগ্যপণ্যের আকাঙ্খা প্রবল হল। আশির শেষ দিকে মধ্যবিত্তের ঘরে ধীরে ধীরে প্রবেশ করল টেলিভিশন স্ক্রিন।

প্রতিযোগিতা বাড়ছে সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম স্তরে প্রতিবেশীর সঙ্গে। পড়শির ফ্রিজ আছে! আমার নেই ? পড়শির ঘরে আজ টেলিভিশন এল! আমার নেই? পড়শির ঘরে কেমন দিব্যি টেলিফোন বাজে ঝনঝন করে! আমার নেই?

ওর আছে, আমার নেইয়ের শিকার তখন মধ্যবিত্ত সমাজ। পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি একজন। তার আয় নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধ। তাহলে সেই নির্দিষ্ট আয়ে সংসার চালিয়ে ভোগ্যপণ্য ক্রয় করার সামর্থ্য কোথায় তার? ধার দেনা করে কেনা হচ্ছে। কষ্ট করে কেনা হচ্ছে। কিন্তু এক শ্রেণী ততদিনে খুঁজে পেয়েছে সেই পিচ্ছিল পথ। মসৃণ গতিতে পিচ্ছিল পথ ধরে কয়েক ঘণ্টা শরীরটাকে খাটিয়ে তো উপার্জন করা যায় অনেক অর্থ!

কর্তা বাঁ হাতে ঘুষ নিচ্ছে আর গিন্নী ব্যবহৃত হচ্ছে অন্য পথে! পয়সা আসছে ঘরে দু’হাতে সহজ উপায়ে। শরীরের শুদ্ধতা পবিত্রতার ট্যাবু মুছে যাওয়া শুরু হল গোপনে!

নব্বইয়ের মধ্যভাগে এল পেজার। তারপর মোবাইল ফোন। অত্যন্ত মহার্ঘ সেই বস্তু যার হাতে সে ইর্ষনীয়!

বিজ্ঞাপনের চালচিত্রও বদলে গেল। উস্কে দিল মানুষের আবেগ। ‘আপনার অহঙ্কার পড়শির ঈর্ষা।’

ঈর্ষা! ঈর্ষা থেকে উদ্ভূত হল ‘অহঙ্কার’ ক্রয়ের ইচ্ছা। অতএব আমারও চাই। যেমন করে হোক চাই। যেভাবে হোক চাই। মূল্যবোধের সামনে প্রশ্নচিহ্ন! চাহিদার জন্য আবেগের কাছে খড়কুটোর মত ভেসে গেল মূল্যবোধ।

বদলে গেল প্রেমের সংজ্ঞা। বদলে গেল বিবাহের সংজ্ঞা। বদলে গেল দাম্পত্যের সংজ্ঞা। বদলে গেল বন্ধুত্বের সংজ্ঞা। ‘মূল্যবোধ’ তখন সিন্দুকে তালা বন্ধ। তার প্রকাশ নেই। দেখা যায় না। শুধু নামটি শোনা যায়।

না হলে একটি বিখ্যাত জিম-এর মহিলা ইন্সট্রাকটর, ধরা যাক তার নাম মালতি, হঠাৎ বিয়ে করে ফেললো এক সমপর্যায়ের যুবককে, বিয়ের পরেও তার পোশাকে চালচলনে সেই নিন্মবিত্ত দারিদ্রের চিহ্ন, কিছুদিন পর হঠাৎ উধাও সে এবং বছর খানেক পরে আমার বাড়িতে হঠাৎ আবির্ভাব তার, তাকে দেখে বিস্ময়ের অবধি নেই, এ কোন মালতি? মুখের পুরনো আদলটি ছাড়া আর সবই নতুন তার।

মালতির পেছনেই এক ফর্সা ভারী চেহারার সুবেশ ভদ্রলোক। গলায় হাতে সোনার চেন। আঙুলে মোটা মোটা আংটি। পান জর্দা খাওয়া অভ্যাস মুখ। আমি চরম বিস্মিত! আর মালতি? পার্লার চর্চিত ত্বক ও চুলের বিন্যাস! পরনে অত্যন্ত দামি শাড়ি, ভ্যানিটি ব্যাগ। জুতো।

বুঝলাম মালতির ট্রান্সফরমেশনের কারণটি!

মালতি আলাপ করিয়ে দিল, বলল, দিদি গাড়ি নিয়ে এই রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিলাম। তোমার কথা খুব মনে পড়ল, তাই ভাবলাম দেখা করে যাই। উনি হলেন আমার বরের বন্ধু, প্রভীন শাহ! আমরা দুজনে একটা বিজনেস করছি।’

ওরা দু’জনে মিনিট দশ বসলো। গল্প করল। আর আমি দু’জনের শারীরিক মানসিক কেমিস্ট্রিটা আবিষ্কার করলাম। যাবার সময় মালতি বলল, জিমে আমি এসেছিলাম বলোনা। অনেকে আমার নামে খারাপ কথা রটাচ্ছে তো, তাই! বুঝলাম, শরীরের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে সে। তাহলে মন?

প্রতিষ্ঠিত একটি ফ্যামিলি। উকিল বাড়ি নামে পরিচিত। সেই বাড়ির তরুণী বউটি সিঁথি ভর্তি ডগডগে সিঁদুর, পায়ে আলতা, নুপুর, ছাপার শাড়ি পরনে যখন দু’বেলা  শিশুকন্যাকে ইস্কুলে নিয়ে যেত তখন তাকে দেখে কল্পনাও করতে পারিনি সে তার মূল্যবোধটি সিন্দুকে তুলে রেখেছে সযত্নে। ঢাকুরিয়া অঞ্চলের একটি বিখ্যাত গেস্ট হাউস থেকে যখন সে পুলিশের গাড়িতে উঠল তখনও অবিশ্বাস্য।

কলেজ তরুণী থেকে মধ্যবিত্ত গৃহবধূ সকলেই এখন স্বপ্নে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া বা দীপিকা পাড়ুকোন! ভোগ্যপন্যের জোগান অঢেল। বাজারে আসছে নিত্য নিয়মিত বিদেশী দেশী কোম্পানির প্রসাধনী থেকে পোশাক, পারফিউম, অ্যাকসেসরিজ! প্রতিবেশীকে আর ঈর্ষা করে সময় নষ্ট করা নয়, বরং তার আগেই পণ্য হস্তগত করা এখন মূলমন্ত্র জীবনের। তাই সন্তানকে ইস্কুলে পৌঁছে একঘণ্টা সময় ব্যয় করে যদি বিনা পরিশ্রমে নগদ অর্থ হাতে চলে আসে মন্দ কী?

কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসের ফাঁকে সপ্তাহে দু’একটা দিন যদি কয়েক ঘণ্টা ব্যয় করলে কাঁচা পয়সা হাতে আসে তাতে কি জাত গেল?

এমনটাই মনে করছেন আজকের তথাকথিত সভ্য দুনিয়ার কতিপয় মানুষ।

তাহলে তোমার শরীর নিয়ে কোনো ছুৎমার্গ নেই? প্রশ্ন করতে জিম-এ আসা এক উঠতি র‍্যাম্পে হাটা মডেল কন্যা দুটো চোখ মাথায় তুলে এমন হাসল প্রথমে যে আমি একটু অপ্রস্তুতে পড়েছিলাম। হাসি কোনো মতে চেপে সে বলল, আচ্ছা, তুমিই বলো শরীর কী?

তার প্রশ্নে আমিই অবাক, বললাম, বুঝলাম না।

সে বলল, আমার একটা বিউটিফুল ফিগার আর ফেস আছে। সেই শরীরটা যদি কেউ উপভোগ করে আমার ডিমান্ড মত পে করে তাহলে কার কী ক্ষতি হল? প্রফেসনেও এসব আছে সবাই জানে। আমার মত আরো অনেক সুন্দরী মেয়ে আছে। নিয়মমত যে বসকে খুশি করবে, ক্লায়েন্টকে খুশি করবে অবভিয়াসলি সে কাজটা পাবে। তাহলে বোকার মত সতীসাবিত্রী হয়ে থেকে আমি কি আঙুল চুষব? ওসব শরীর টরীর নিয়ে মাথা ঘামাই না। দুজনের কনসেন্টে যা করছি, করছি। আমার শরীর তো ক্ষয়ে যাচ্ছে না। বরং আমি একটা বেটার লাইফ লিড করছি অন্যদের থেকে। আমি গাড়ি পেয়েছি। ক্লায়েন্ট গিফট করেছে। আমি ফ্ল্যাট কিনেছি। ব্যস। ঔর ক্যা চাহিয়ে, দি?

তোমার বয়ফ্রেন্ড জানে?

ইয়েস! শোনো বয়ফ্রেন্ডরাও অমনি। তারাও বড়লোক গার্লফ্রেন্ড খোঁজে গো। আমার ফার্স্ট বয়ফ্রেন্ড আড়াই বছর আমার সঙ্গে ঘুরে টুরে খিল্লি করে হাওয়া। বড়লোক বাপের এক বেটির সঙ্গে ডেট করছে এখন। আমারও তো একজন বয়ফ্রেন্ড না! হাতে আছে চার পাঁচটা। দেখি শেষ পর্যন্ত কোনটা দাঁড়ায়।

বললাম, তাহলে মন? মন তো একটাই! এতজনকে একসঙ্গে ভালোবাসো কী করে?

সে বলল, দি, তুমি হাসালে! মন আবার কী? ছ্যাঁকা খেয়ে ‘তেরে ইয়াদ আয়েগি’ গাইতে পারবোনা তাই, সিম্পলি কেঁদেকেটে সময় আর শরীর নষ্ট করা পোষায় না গো। বিন্দাস আছি। ওসব মন-ফোন চক্করে নেই।

ভাবনা উস্কে যাচ্ছে আমার। তাহলে মূল্যবোধ আর ভোগবাদী সমাজ পরস্পরের থেকে সহস্র যোজন দূরে বাস করে?

একটা কথাই মনে হল, পুতুল নাচের ইতিকথা আবার নতুন করে লিখিত হবে। সেখানে বলব, শরীর শরীর শরীর। তোর মন নেই কুসুম?

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.