তাঁর নাটক দেখে রাগের চোটে মঞ্চে জুতো ছুড়ে মেরেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

ভাগ্যিস ! বাড়ি থেকে পালিয়েছিল এগারো বছর বয়সের ছেলেটা | নইলে কী করে পেতাম বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী সৃষ্টি ? শুধু সাহিত্য নয় | তাঁর রচনা ইতিহাসের জীবন্ত আকর | প্রামাণ্য দলিল |

# উত্তর ২৪ পরগনার গ্রাম চৌবেড়িয়ায় কুলীন কায়স্থ পরিবারে ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে ( ১০ এপ্রিল‚ মতান্তরে ১১ এপ্রিল তাঁর জন্ম | বাবা ছিলেন কালাচাঁদ মিত্র | ছেলের নাম শখ করে রেখেছিলেন গন্ধর্বনারায়ণ | কিন্তু এই গালভরা নাম পাল্টে নিজেই নিজের নাম রাখেন তিনি‚ দীনবন্ধু |

# পাঠশালার পড়া শেষ হতেই বাবা কোনওরকমে গ্রামের জমিদারবাড়িতে সেরেস্তায় কাজের বন্দোবস্ত করলেন | কিন্তু কিছুতেই সে কাজে মন বসাতে পারলেন না ১১ বছরের দীনবন্ধু |

# পালালেন কলকাতায় | সেখানে কাকা নীলমণি মিত্র মস্ত ইঞ্জিনিয়ার | প্রথম বাঙালি বাস্তুবিদ | তাঁর কাছেই থাকতে শুরু করলেন ভাইপো দীনবন্ধু |

# ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে ভর্তি করা হল জেমস লং-এর অবৈতনিক স্কুলে | অত্যন্ত মেধাবী দীনবন্ধু বৃত্তি পেয়ে উত্তীর্ণ হন | ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে সুযোগ পান হিন্দু কলেজে ( আজকের প্রেসিডেন্সি ) পড়ার সুযোগ | কিন্তু কলেজের শেষ পরীক্ষা তিনি দেননি |

# পড়াশোনা ওখানেই শেষ করে পাটনায় পোস্টমাস্টারের কাজ নিয়ে চলে গেলেন‚ ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে | কয়েক বছর ধরে তিনি অবিভক্ত বাংলার বহু অঞ্চল যেমন নদিয়া‚ কৃষ্ণনগর‚ ঢাকা‚ শ্রীরাম পুরে তিনি পোস্টমাস্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন | ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে ইন্সপেক্টর হয়ে যোগ দেন রেলওয়েজে |

# সিপাই বিদ্রোহের পরে লাগাতার বিদ্রোহে উত্তপ্ত হয়ে উঠল ব্রিটিশ ভারত | তার মধ্যে অন্যতম নীলবিদ্রোহ | পোস্টমাস্টার হয়ে বিভিন্ন প্রান্তে কাজের সুবাদে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন নীলকর সাহেবদের অত্যাচার ও চাষিদের দুর্দশা |

# ১৮৫৮ সালে অগ্নিগর্ভ হয়েছিল নীলবিদ্রোহ | তার দু বছর পরে প্রকাশিত হল এর ঐতিহাসিক দলিল‚ সাহিত্যের মোড়কে‚ নীলদর্পণ | এই একটি নাটকের ছায়ায় ম্লান হয়ে গেছে দীনবন্ধু মিত্রর অন্যান্য সাহিত্য সৃষ্টি |

# ১৮৬০ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হওয়ার পরেই কলকাতার বিদগ্ধ মহলে সাড়া ফেলে দেয় এই নাটক | ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত | প্রকাশ করেন জেমস লং | 

# ইওরোপে বিশাল জনপ্রিয়তা পায় বইটি | সমসাময়িক আর কোনও বাংলা বই এত জনপ্রিয় হয়নি | 

# ব্রিটিশদের জন্য অশনি সঙ্কেত বয়ে আনে এই নাটক | ছাপানোর জন্য জেমস লং-কে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় আদালতে | তাঁর বিরুদ্ধে ধার্য হয়‚ সেই যুগে‚ পাক্কা এক হাজার টাকা জরিমানা | ওখানেই ঘটনাস্থলে সম্পূর্ণ জরিমানা দিয়ে দেন বাংলা নবজাগরণের অন্যতম মুখ‚ কালীপ্রসন্ন সিংহ | চার বছর ধরে নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি চলেছিল | জেমস লং-কে এক মাস কারাদণ্ডও পেতে হয় | 

# ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে কলকাতায় শুরু হয় ন্যাশনাল থিয়েটার | প্রথম রজনীতে অভিনীত হয় নীলদর্পণ | বিখ্যাত অভিনেতা অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি রূপদান করেন চারটি ভূমিকায় | নীলচাষি‚ জমিদার গোলকবাবু এবং তাঁর স্ত্রী এবং অত্যাচারী নীলকর সাহেব মিস্টার উড-এর চরিত্রে |  

# সেই রজনীতে আমন্ত্রিত ছিলেন কলকাতার নামী ব্যক্তিত্বরা | দর্শকাসনে উপবিষ্ট সবয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর | নীলকর সাহেবের উড-এর ভূমিকায় অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফির অভিনয় দেখে রাগের চোটে মঞ্চে জুতো ছুড়ে মারেন বিদ্যাসাগর | অভিনয় বন্ধ করে সেই জুতো মাথায় তুলে নেন স্বনামধন্য অভিনেতা | তাঁর কাজের পরম পুরস্কার বলে | 

# দীনবন্ধু মিত্র কবিতাও লিখেছেন | কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত দ্বারা প্রভাবিত ছিল তাঁর সাহিত্যসৃষ্টি | উল্লেখযোগ্য হল সুরধুনী কাব্য এবং দ্বাদশ কবিতা | নীলদর্পণ ছাড়া তাঁর রচিত অন্যান্য নাটক হল নবীন তপস্বিনী‚ বিয়ে পাগলা বুড়ো‚ সধবার একাদশী‚ লীলাবতী‚ জামাই বারিক এবং কমলে কামিনী | 

# তাঁর লেখা যে দুটি উপন্যাস সাড়া ফেলেছিল সেগুলি হল পোড়া মহেশ্বর এবং যমালয়ে জীবন্ত মানুষ | দ্বিতীয় রচনা নিয়ে পরে বিখ্যাত হাস্যকৌতুক ছবি তৈরি হয় | মূল ভূমিকায় ছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও বাসবী নন্দী | হিন্দু দেব দেবীদের নিয়ে প্রহসন রচনার ধারা দীনবন্ধু মিত্রই প্রবর্তন করেছিলেন | পরে এই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যান রাজশেখর বসু |

# নীলদর্পণ রচনা করেও তিনি ব্রিটিশদের কাছ থেকে রায় বাহাদুর উপাধি লাভ করেছিলেন | লুসাই যুদ্ধে অবদানস্বরূপ | ১৮৭৩-এর ১ নম্ভেম্বর তিনি প্রয়াত হন | তাঁর অমর সৃষ্টি নীলদর্পণকে ইংরেজি সাহিত্যের আঙ্কল টমস কেবিন-এর সমকক্ষ বলে মন্তব্য করেছিলেন স্বয়ং সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় |   

Advertisements

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.