কে জানে, হয়ত হাত কামড়েছেন, ‘ ইস ! যদি সেদিন ড্রাইভারকে ভোট দিতে পাঠাতাম…’

649

ভারত সংবিধান লাভ করার আগেই কিন্তু জাতীয় নির্বাচন কমিশন তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ২৫ জানুয়ারি, ১৯৫০। বয়সের বিচারে সংবিধানের থেকে একদিনের বড় পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম গণতন্ত্রের নির্বাচন কমিশন ।

ভারতে কিন্তু নির্বাচনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের । প্রাচীন ভারতেও রাজা নির্বাচন করতে প্রজাদের ভোট দেওয়ার কথা শোনা যায় । খালি উঠমান এবং আলিকে নির্বাচিত হয়েই শাসনে আসতে হয়েছিল। মধ্যযুগে রুশদিন খিলাফতকেও ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন করা হয় । বাংলায় প্রজাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের কথা প্রথম শোনা যায় পাল রাজাদের আমলে। পাল রাজ গোপালকে নির্বাচন করা হয়েছিল ভোটের মাধ্যমেই।

অনেকেই মনে করেন আধুনিক ভারতের প্রথম ভোট ১৯৫১ সালে, সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর। কিন্তু একেবারেই তা ভুল। স্বাধীন ভারতের প্রথম ভোট ১৯৫১ সালে হলেও আধুনিক ভারতের প্রথম ভোট হয় ১৯২০ সালে। ইম্পিরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল এবং প্রভিনসিয়াল কাউন্সিলের জন্য ভোট গ্রহণ করা হয়। দিল্লির ইম্পিরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল নিম্ন কক্ষ সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি। নিম্নকক্ষের আসন সংখ্যা ছিল ১০৪। এর মধ্যে ৬৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল। উচ্চকক্ষ কাউন্সিল অফ স্টেটের ৩৪টি আসনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল ২৪টিতে। প্রভিন্সিয়াল কাউন্সিলের ৬৩৭ টি আসনের ৪৪০ টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও বাকি ১৮৮ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন প্রার্থীরা।

স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচন সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর ১৯৫১ এবং ১৯৫২ সালে । এ নিয়ে একটা দারুণ তথ্য দেওয়া যাক—–স্বাধীন ভারতের একটি রাজ্য বাদে বাকি অন্য রাজ্যে প্রথম লোকসভার জন্য ভোট শুরু হয় ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তবে হিমাচল প্রদেশে ভোটপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় মাস পাঁচেক আগে ১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসে। এর কারণ ঠান্ডায় বরফে ঢেকে থাকত হিমাচল ।সেখানকার ভোটাররাও যাতে প্রথম নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন, সে জন্যই ভোট এগিয়ে আনা।

প্রথম ভোট দেন কিন্নরের শ্যামশরণ নেগি । তিনিই স্বাধীন ভারতের প্রথম ভোটার । ২০১০-এ নির্বাচন কমিশনের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে শ্যামশরণ নেগিকে সম্মান জানায় জাতীয় নির্বাচন কমিশন। তার পরের বছর নির্বাচন কমিশনের প্রতিষ্ঠা দিবসকে (২৫ জানুয়ারি) ঘোষণা করা হয় ‘ন্যাশনাল ভোটারস ডে’ বা জাতীয় ভোটার দিবস হিসেবে।

এটা কিন্তু আর পাঁচটা দিনের মতো আরও একটা দিন নয় । জাতীয় ভোটার দিবস পালনের গভীর তাৎপর্য রয়েছে । ১৯৮৮ সালে ৬১তম সংবিধান সংশোধনে ভারতের নাগরিক ভোটাধিকার প্রয়োগের বয়স ২১ থেকে কমিয়ে আনা হয় ১৮-তে । কিন্তু নতুন প্রজন্মকে সেভাবে রাজনীতিতে উৎসাহ নিতে দেখা যায়নি। তাঁদের কথা ভেবেই জাতীয় ভোটার দিবস। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য তাঁদের উৎসাহ দেওয়ার দিন ২৫ জানুয়ারি । নবীন ভোটারদের কথা ভেবেই জাতীয় ভোটার দিবস।

এ বছর ভারতের নির্বাচনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । এ বছর প্রথম ভোট দেবেন একুশ শতকের ভোটাররা । ২০০০ সালে যাঁদের জন্ম হয়েছে, তাঁরা ভোটাধিকার পেয়েছেন এ বছরের ১ জানুয়ারি। মণিপুর বিধানসভা ভোটই সাক্ষী থাকবে শতাব্দীর প্রথম ভোটারদের ভোটের ।

কেন ভোট দেবেন ? এই প্রশ্নটা যদি ওঠে, তাহলে অবশ্যই একটি বিষয় মাথায় রাখা উচিত। একটি ভোট, মাত্র একটি ভোটই ইতিহাস বদলে দিতে পারে । এরকম নজিরও অঢেল। এই তালিকা দীর্ঘ। তবে এর মধ্যে সব চেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনাটা এখানে বলা হল—

২০০৪ সাল। কর্নাটক বিধানসভা ভোটের প্রার্থী এ .আর কৃষ্ণমূর্তির সেদিন নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই। গাড়ি নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছেন । শোনা যায় সেদিন তাঁর গাড়িচালক অনেকবারই তাঁকে বলেছেন, ‘স্যর, ভোটটা আমি দিয়ে আসি’। গাড়িচালকের এমন আবদারে রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়েছেন এ আর কৃষ্ণমূর্তি। চোয়াল শক্ত হয়েছে তাঁর। নিজে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিলেও গাড়িচালককে তিনি অনুমতি দেননি ভোট দেওয়ার । গণনার পরে ফলাফল ঘোষণা হলে দেখা যায়, মাত্র এক ভোটেই হেরে গিয়েছেন কৃষ্ণমূর্তি। কর্নাটক বিধানসভা ভোটের ইতিহাসে এক ভোটের হারের তালিকার শুভ সূচনা করেছেন তিনি। কে জানে, হয়ত হাত কামড়েছেন, ‘ ইস ! যদি সেদিন ড্রাইভারকে ভোট দিতে পাঠাতাম…’

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.