অতীতে কলকাতায় বহিরাগত মিষ্টি দই‚ বগুড়ার দইয়ের বিলেতপাড়ি

1786

প্রবাসী হোক বা বিদেশি, কলকাতায় এলে রসগোল্লা আর মিষ্টি দই খাওয়ার জন্য তাঁদের যেন হ্যাংলামোটা বেড়ে যায়। আর গরমকালে নামী মিষ্টির দোকানে তো ১০- ১১ টার মধ্যে দই খতম। অথচ অনেকেই শুনলে অবাক হবেন, কলকাতার দই আসলে কলকাতার নয়।

দই কোথা থেকে এল সে নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। তাও পাঠক বন্ধুদের জন্য দু’চার কথা না বললেই নয়। যীশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে দইয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় মেসোপটেমিয়ায়। আর ভারতে দইয়ের কথা লেখা আছে মহাভারতে। কৃষ্ণও নাকি দই খেতে খুব ভালবাসতেন। লিখেছেন বড়ু চণ্ডীদাস—
” রাধিকারে বুলিহ বিবিধ পরকার
সে যেহ্ন আক্ষ্মাক বহাএ দধিভার “

বড়ু চণ্ডীদাস যখন লিখছেন দইয়ের কথা, তার মানে বাংলায় অনেক কাল আগে থেকেই দই ছিল, এ কথা ধরে নেওয়া যায়। তবে সে দই কলকাতার মিষ্টি দই মোটেই নয়। সে হল টক দই। মিষ্টি দই তো হালে এসেছে। আড়াইশো বছরও বয়স নয়। আর আসার পর রাতারাতি ফেমাস। দূরদূরান্তের মানুষ জেনে গিয়েছে তার কথা। প্রায় আড়াইশ বছর আগে অবিভক্ত ভারতের বঙ্গদেশের উত্তরভাগে থাকতেন মিষ্টি ব্যবসায়ী ঘেঁটু ঘোষ। এই ঘেঁটু ঘোষ দই পাততে প্রথম শুরু করেন। পরে সেই দইয়ে মিশিয়ে দেন চিনি। ব্যস, তৈরি হয়ে যায় বাঙালির নিজস্ব মিষ্টি দই। পরবর্তী সময়ে বগুড়ার দইয়ের কথা দিকে দিকে পৌঁছে গেল। ১৯৩৮ সালে বগুড়ার দই মন জয় করল বিদেশিদেরও।

সেবার বগুড়ার নওয়াবাড়িতে এসেছিলেন বাংলার ব্রিটিশ গভর্নর স্যার জন অ্যান্ডরসন। তিনি প্রথম এই দই চেখে দেখেন। ব্যাস, দারুণ স্বাদ বুঝতে পেরে তিনি সেই দই পাঠিয়ে দিলেন ইংল্যান্ডে। আর যাই কোথায়, ইংল্যান্ডে বিপুল চাহিদা হল এই দইয়ের। শেষে ১০ মেট্রিক টন (প্রতিটি ছ’শো গ্রাম ওজনের ১৭ হাজার সরা) চাওয়া হল বিলেত থেকে। দেশের গণ্ডি ছাড়াল পৌঁছে গেল বগুড়ার দই ।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তৎকালীন পাক প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানও নাকি মজে গিয়েছিলেন বগুড়ার দইয়ে। তিনি ব্রিটেন এবং মার্কিনদের মন পেতে উপহার হিসেবে পাঠান এই দই । উত্তরবঙ্গে বগুড়া যেমন দইয়ের জন্য বিখ্যাত, তেমনই দইয়ের নামেই নামকরণ হয়েছে কোচবিহারের দই গ্রামের । বাণেশ্বরের এই গ্রামে প্রত্যেক বাড়িতেই দই তৈরি হয়।

এরপর গ্রামের লোকেরা দই নিয়ে বেরিয়ে পড়েন শহরের উদ্দেশে। বেশিরভাগ লোকের দই বানানোটাই পেশা কিনা—তাই গ্রামের নাম দই গ্রাম। এছাড়াও উত্তরবঙ্গের দইয়ের কথা বললে বালুরঘাট এবং গঙ্গারামপুরের দইয়ের প্রসঙ্গ তো আসবেই। কবে এখানকার দই বিখ্যাত হল, কিংবা কীভাবে বিখ্যাত হল তা জানা নেই, তবে গঙ্গারামপুরের দইয়ের কথা লেখা আছে শ্রীশ্রীহরি লীলাখণ্ডে। অর্থাৎ শ্রী চৈতন্য পরবর্তী সময়েই গঙ্গারামপুরের দই বিখ্যাত হয়েছে। তবে কালের নিয়মে এখন সে সব অতীত।

দই লাল হয়ে ওঠার পিছনে কিন্তু দক্ষিণবঙ্গের অবদানটাই আসল। সে জায়গার নাম নবদ্বীপ। ১৯৩০-এর দশক। ফাঁসিতলার বাসিন্দা কালী মোদক এবং তাঁর ভাই হরি ঘোষ লাল ঘোল তৈরি করতেন। মোষের দুধের মধ্যে জল দিয়ে ফুটিয়ে ফুটিয়ে ঘন করে সেই দুধের রঙ লাল হয়ে যেত। সেই দুধ জমিয়েই হত লাল দই। তবে দইয়ের কথা বলতে বলতে মনে পড়ে যায় রবি ঠাকুরের কথা । কাঁধে দইয়ের বাঁক নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দইওয়ালা—দই চাই দই…
কয়েক বছর আগেও কলকাতা শহরে দইওয়ালাদের এরকমভাবে পাওয়া যেত। এখন সেসব অতীত। তাছাড়া মিষ্টি দই আর মিষ্টির চাহিদা কমেছে। মিষ্টির শত হাত দূরে থেকে শরীর সচেতন হয়েছে বাঙালি। তাই যে কোনও অনুষ্ঠানবাড়িতে জায়গা করে নিয়েছে আইসক্রিম। হাতা দিয়ে কেটে কেটে দই আর কোথায় দেওয়া হয়!

তবে দইয়ের উপকারিতার কথা বলা আছে কিন্তু মহাভারতে—মনে নেই, সেই দধীচির কথা ! অসুরদের সঙ্গে ইন্দ্র যখন যুদ্ধ শুরু করেন, তখন দেবর্ষি ব্রহ্মা তাঁকে পরামর্শ দেন—একমাত্র দধীচির অস্থি দিয়ে যুদ্ধ করলেই জয় নিশ্চিত। কারণ দধীচির হাড় ছিল হীরকখণ্ডের থেকেও শক্ত। আর এই শক্ত হাড়ের তিনি অধিকারী হন দই
খেয়েই। অর্থাৎ মিষ্টিকে অগ্রাহ্য করতেই পারেন, কিন্তু ক্যালসিয়ামের গুণ ভুললে কী করে চলবে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.