ঘোড়াকে শুদ্ধ করতে গনগনে অগ্নিকুণ্ডের ভিতর দিয়ে চালাতে হবে এই অবলা জীবকে ! সেই আগুনেই ঝলসাবে সসেজ…

429

আমাদের দেশে যেমন জল্লিকাট্টু‚ মোরগের লড়াই‚ বুলবুলির লড়াই এর মতো লোকজ খেলা আছে‚ যার উদ্দেশ্য অ্যাডভেঞ্চার ও বিনোদন‚ তেমনি বিদেশেও আছে | সূত্রপাত হয়েছিল পৌত্তলিক সভ্যতার সময়ে | কিন্তু খ্রিস্টধর্মের প্রসারেও অবলুপ্তি ঘটেনি | আমাদের মতো ওখানেও সেই উৎসবের কেন্দ্রে থাকে গৃহপালিত প্রাণী | উৎসব ঘিরে উন্মাদনা‚ সেন্টিমেট তুঙ্গে | আবার বিরোধী মতও সক্রিয় | তারা সোচ্চার হয় এই বলে যে উৎসবের নামে‚ আনন্দের নামে নির্যাতন করা হচ্ছে অবলা জীবের উপরে |

যেমন ধরুন স্পেনের লা ল্যুমিনারিয়া (Las Luminarias) উৎসব | ফ্রেঞ্চ ও স্প্যানিশ ভাষায় ‘Lumière’ শব্দের অর্থ বাতি | নামেই বুঝতে পারছেন এর সঙ্গে কোথাও আলোর সম্পর্ক আছে | শুরু হয়েছিল কবে তা ঠিকমতো কেউ জানে না | তবে প্রামাণ্য তথ্য অনুযায়ী এর অফিশিয়াল স্টার্টিং ধরে নেওয়া হয় আজ থেকে ৫০০ বছর আগে | 

মূলত স্পেনের গ্রামাঞ্চলে এর জনপ্রিয়তা বেশি | প্রতি বছর সেন্ট অ্যান্টনি ডে উপলক্ষে পালিত হয় এই পার্বণ | উৎসবের মূল আকর্ষণ হল‚ অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে | তারপর প্রদর্শন শেষে হলে ওই আগুন হয়ে যাবে বার-বি-কিউ | তখন সেখানে ঝলসানো হবে সসেজ |

সেন্ট অ্যান্টনিকে বলা হয় গৃহপালিত পশুদের রক্ষাকর্তা | তাই তাঁর নামে উৎসর্গীকৃত দিনে পোষ্যদের শুদ্ধ করে নিতে হয় | কীভাবে ? না‚ বন ফায়ারের ধোঁয়ার স্পর্শে | যাতে বছরের আগামী দিনে তারা সুস্থ সবল থাকে | কিন্তু ধোঁয়ার কথা আপাতত ধোঁয়ায় ঢাকা | হয়তো রোমাঞ্চ বাড়ানোর জন্যই হোক বা অন্য কোনও কারণে‚ অশ্বারোহীরা ঘোড়া চালায় গনগনে আগুনের মধ্যে দিয়ে |

স্প্যানিশ গ্রামের সরু অলিগলিতে জ্বালা হয় আগুন | গনগনে হয়ে তার আঁচ পৌঁছে যায় আকাশে | আগেই প্রস্তুত থাকে গ্রামের তরুণ যুবকরা | তাদের তেজি বাহনের পিঠে চেপে | ড্রাম‚ ব্যাগপাইপার বাদ্যি আর সমবেত কয়েক হাজার জনতার উল্লাসের মধ্যে তারা ঘোড়া চালিয়ে প্রবেশ করে আগুনে | সন্ধ্যে থেকে শুরু করে মধ্যরাত্রি অবধি চলতে থাকে অগ্নিকুণ্ডে ঘোড়সওয়ারি | এই উৎসবে যোগ দিতে পারাকে খুবই সম্মানজনক ও বীরোচিত বলে মনে করে স্প্যানিশ যুবকরা |

গভীর রাতে ওই বন ফায়ারের আগুনে ঝলসে নেওয়া হয় শোরিজো সসেজ | সঙ্গে অবশ্যই থাকে সেরা মদীরা | শেষপাতে আমাদের মিষ্টিমুখের মতো ওদের হল ব্ল্যাক পুডিং |

সারা স্পেনে প্রচলিত হলেও লা ল্যুমিনারিয়াস বা ল্যুমিনেয়ার সবথেকে বেশি বিখ্যাত মাদ্রিদের উত্তর পশ্চিমে সাঁ বার্তোলোম দ্য পিনারেস গ্রামে | উৎসব বন্ধ করার জন্য অনেক বার সোচ্চার হয়েছে পশুপ্রেমী সংগঠনগুলো | কিন্তু কোনও লাভ হয়নি | উদ্যোক্তা ও সমর্থকদের এক কথা‚ পোষ্যদের কোনও ক্ষতি হয় না | এর সঙ্গে এতটাই ভাবাবেগ জড়িত‚ যে অনেক চেষ্টাতেও বন্ধ করা যায়নি | যেমন‚ বন্ধ হয়নি বুল ফাইটিং | রমরমিয়ে চলছে স্পেনের জাতীয় খেলা হিসেবে | 

আসলে মানুষ নিজে খুব ধূর্ত পশু | ঘোড়াদের প্রশিক্ষণ দেয় অগ্নিকুণ্ড টপকে যেতে | সেভাবেই যায় বিশ্বস্ত‚ প্রভুভক্ত জীবগুলো | কিন্তু অগ্নিকুণ্ড থেকে বেরোনোর সময় গায়ে আগুনের তাপ লাগে না‚ তা অসম্ভব | বাহকেরও লাগে | চালকেরও লাগে | বেচারি বাহক আর কী করে ! কর্তা চালকের ইচ্ছায় কর্ম | মানুষ বেছে বেছে ঘোড়াকেই নির্বাচন করেছে এই খেলায় বীরত্ব দেখাতে | জানে‚ প্রাণও থাকবে | আবার হিরো হয়ে বাহবাও কুড়োনো যাবে | ভাবুন তো একবার‚ পোষা গাধার পিঠে চেপে তার মালিক লা ল্যুমিনেয়ার করছে ! 

জানতে ইচ্ছে হয়‚ ঘোড়া বাদে অন্য গৃহপালিত পশুকে কীভাবে শুদ্ধ করে স্প্যানিশ আর্মাডা ?

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.