অমূল্য জেডের উপর দামী পাথরের মিনা দিয়েই খচিত ছিল মুঘলদের আফিম তোলার চামচ

1065

ছোটবেলায় অরণ্যদেবের কমিক্সে দুর্বার আকর্ষণ ছিল বালুকাবেলায় জেড পাথরের প্রাসাদ | এই পাথর চৈনিক সভ্যতায় বহুল প্রচলিত | ভারতেও কিন্তু জেডের সমৃদ্ধ অতীত আছে | বিশেষত মুঘল সম্রাটরা এর বিশেষ সমঝদার ছিলেন | ভারতে আসার বহু আগেই তাঁরা জেডে আসক্ত | মধ্য এশিয়ার দুর্ধর্ষ বীর তৈমুর লং ছিলেন এর গুণগ্রাহী | তাঁর বংশধরের একটি শাখার অন্যতম সদস্য ছিলেন বাবর | ভারতে মুঘল বংশ পত্তনের অনেক আগেই তৈমুরের ব্ংশধারা ছিল জেডভক্ত |

আকর্ষণীয় হল‚ জেড কোনও নির্দিষ্ট ধাতু নয় | বরং দুটির যৌগ | একটি হল একটি হল জেডেইট | অন্যটি নেফ্রাইট | বিশ্বে এখনও অবধি সর্বাধিক জেড পাওয়া গিয়েছে মধ্য এশিয়াতেই | সেখান থেকেই পাথর গিয়েছে চিন-সহ অন্যান্য দেশে | কিছু জেড পাওয়া গিয়েছে মায়ান্মার ও আমেরিকাতেও | তবে এ যেমন সত্যি‚ আবার এও সত্যি‚ যে ভারতের মাটিতে হরপ্পা মহেঞ্জোদাড়ো সভ্যতার ধ্বংসাবশেষে পাওয়া গিয়েছে জেডের চিহ্ন | তবে জেডের উল্লেখযোগ্য ব্যবহার সম্বন্ধে দেখে গিয়েছিলেন হিউয়েনসাং | সেকালের সমতট বা আজকের বাংলায় দেখেছিলেন জেড পাথরের বিশাল বুদ্ধমূর্তি | 

সেই মূর্তির খোঁজ নেই আজ | তবে আর এক জেড পাথরের মূর্তি আছে আজকের তেলেঙ্গানার কোলানাপাকায় | এক হাজার বছরের প্রাচীন মন্দিরে আছে জৈন তীর্থঙ্কর আদিনাথ‚ নেমিনাথ ও মহাবীরের মূর্তি | এর মধ্যে মহাবীরের ভাস্কর্য চার ফিট উঁচু | জেড পাথরের এই মূর্তি একাদশ শতাব্দীতে তৈরি বলে ধারণা ঐতিহাসিকদের |

দিল্লির সুলতান বংশের জেড নিদর্শনও কিছু টিকে আছে | দাস রাজত্বের গুরুত্বপূর্ণ সুলতান ইলতুৎমিসের সময়কার একটি ক্ষুদ্র কোরান রাখা আছে হায়দ্রাবাদের সালারজং জাদুঘরে | তা খোদাই করা জেড পাথরে | তবে জেড পাথরের সর্বোচ্চ ব্যবহার দেখা গিয়েছিল মুঘল দরবারে | বিশেষত সম্রাট জাহাঙ্গীর আর শাহজাহানের সময়ে | মুঘলদের পূর্বপুরুষ তৈমুর এতই জেডপ্রেমী ছিলেন যে তাঁর নাতি উলুঘ বেগ বিশাল একটি জেড পাথর স্থাপিত করেছিলেন তৈমুরের সমাধিতে | উজবেকিস্তানের সমরখন্দের গির-এ-আমের-এ আছে সেই সমাধি |

তবে শুধুই পূর্বপুরুষের প্রতি আনুগত্য নয় | জেডের রূপেও মুগ্ধ ছিলেন মুঘলরা | তাঁদের বিশ্বাস ছিল‚ জেড পাথর বিষের উপস্থিতি চিহ্নিত করতে পারে | ফলে মুঘল সাম্রাজ্যে জেডের বহুল প্রয়োগ দেখা যায় | শৌখিন জিনিস‚ গয়না‚ গয়না রাখার বাক্স‚ বাসনপত্র‚ অস্ত্রশস্ত্রর অ্যাকসেসরিজ‚ সর্বত্র ছিল জেডের উপস্থিতি | এককথায়‚ জেড ছিল প্রমোদ ও বিলাসব্যসনের সমার্থক |

নিজেদের মতো মুঘল সমরাস্ত্রকেও সাজাতেন শৌখিন মুঘলরা | ছুরিকার খাপ থেকে তরবারির হাতলে ছিল জেডের স্নিগ্ধ অথচ তীব্র উপস্থিতি | তার উপর রত্নের কারুকাজ বুঝিয়ে দিত যুদ্ধের ময়দানের বাইরেও মর্যাদার প্রশ্নেও ভূমিকা আছে এই অলঙ্কার অ্যাকসেসরিজের | সেগুলির বেশির ভাগই এখন আছে ব্যক্তিগত জাদুঘরে |

তবে একটি বিষয় লক্ষণীয় | মুঘল অলঙ্কারে জেড কিছুটা পিছনের সারিতে | বরং যুদ্ধের সামগ্রী থেকে শুরু করে প্রাসাদের খুঁটিনাটিতে তার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য | বিভিন্ন বর্ণের জেডের উপরে থাকত সুক্ষ্ম মিনাকারি | তারপর আয়না | সেটি মুঘল দরবারে এসেছিল ষোড়শ শতাব্দীতে | প্রথম থেকেই তা ছিল চরম কৌতূহলের জিনিস | আয়না সাজাবার জন্য জেডকেই বেছে নেন মুঘলরা | জেডের সুদৃশ্য আবরণ ঘিরে থাকত আয়নাকে | 

আরও একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবহার ছিল বাসনপত্রে | সৌন্দর্য তো অবশ্যই | মুঘলদের বিশ্বাস ছিল‚ জেড পাথরের বাসনে বিষ মেশানো খাবার দিলে তা ফেটে যাবে | সেই বিশ্বাস থেকে মুঘল বাসনে জেড বহুল ভাবে আছে | পেয়ালা‚ পিরিচ‚ হাতা‚ মশলার বাক্স‚ আফিম তোলার চামচ‚ সুরাপাত্র এবং হুকাহ | সর্বত্র জেড-শাসন | 

১৬০৯ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীরের রাজসভায় এসেছিলেন ব্রিটিশ ব্যবসায়ী উইলিয়ম হকিন্স ‚ বিবরণে লিখে গিয়েছেন‚ মুঘল দরবারে ছিল অন্তত ৫০০ টি জেডের পেয়ালা | যার গায়ে মূল্যবান পাথরের মিনাকারি করা ছিল | লাপিস লাজুলি‚ হিরে‚ রুবি‚ এমারেল্ড খোদাই করা থাকত জেড-বাসনের গায়ে | নক্সার মধ্যে ফুল লতাপাতাই ছিল সবথেকে বেশি | আর থাকত জন্তু জানোয়ারের মোটিফ | 

মুঘলদের সমসাময়িক রাজপুত ও দাক্ষিণাত্যের বিজাপুরের সুলতানারও ছিল জেডভক্ত | তবে তা কোনওভাবেই মুঘল জৌলুসের ধারেকাছে আসত না | মুঘলদের পরে জেডের বিশাল সংগ্রহ ছিল হায়দ্রাবাদের নিজাম পরিবারের | এবং তা অনুসরণ করত পূর্বসূরী মুঘলদেরই | ব্যক্তিগত সংগ্রহ ছাড়া এই বিপুল ঐতিহাসিক সংগ্রহ সংরক্ষিত আছে দেশ বিদেশের নামী জাদুঘরে | ভারতের দিল্লির জাতীয় জাদুঘর এবং হায়দ্রাবাদের সালারজঙ জাদুঘরে আছে সংরক্ষণের কিছু অংশ |  

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.