কুসংস্কারের কালাপানি পেরিয়ে সেই যে গেলেন‚ আর দেশে ফেরা হয়নি নবজাগরণের মুকুটহীন রাজার

বৈষ্ণব পরিবারের ছেলের সঙ্গে শৈবধর্মে বিশ্বাসী পরিবারের মেয়ের বিয়ে | ঘটেছিল অষ্টাদশ শতকের শেষ লগ্নে | সেই সময়ে দাঁড়িয়ে সেটা কিন্তু কম বৈপ্লবিক নয় | ওই পরিবারের ছেলে পরে যে বিপ্লবের সূচনা করবেন‚ তার অভিঘাতে দুলে উঠবে গোটা বঙ্গসমাজ‚ এ আর আশ্চর্যের কী !

হুগলির রাধানগরে ছিল রাঢ়ী বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ রামকান্ত রায় ও শৈব তারিণীদেবীর সংসার | বাবা মায়ের ভিন্ন দর্শন শৈশব থেকেই প্রভাবিত করেছিল পুত্র রামমোহনকে | রাধানগরেই তাঁর জন্ম | ১৭৭২-এর ২২ মে |

গ্রামের পাঠশালায় বাংলা‚ সংস্কৃত‚ ফার্সি পাঠ শেষ হওয়ার পরে বালক রামমোহনকে পাঠানো হয়েছিল পাটনায় | সেখানে এক মাদ্রাসায় আরবিক শিক্ষা | তারপর কাশী | মন দিয়ে অধ্যয়ন বেদ-উপনিষদ |

সমাজের অচলায়তন গুঁড়িয়ে দেওয়া রামমোহনের জীবনের শুরুটা কিন্তু ছিল হিন্দু আটপৌরে রীতিনীতিতে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা | সামাজিক নিয়ম মেনে তাঁরও বিয়ে হয়েছিল অল্প বয়সে | এক নাবালিকার সঙ্গেই | অল্প দিনেই মৃত্যু হয় প্রথমা স্ত্রীর | তারপর দ্বিতীয় বিয়ে | দ্বিতীয়া স্ত্রী জন্ম দেন দুই পুত্রের | রাধাপ্রসাদ ও রমাপ্রসাদ | দু ভাইয়ের বয়সের ব্যবধান ছিল ১২ বছর | দ্বিতীয়া স্ত্রীর প্রয়াণে ১৮২৪ সালে তৃতীয় বিয়ে করেছিলেন ৫২ বছর বয়সী রামমোহন রায় |

তাঁর সঙ্গে ব্রিটিশদের সম্পর্কস্থাপনের পিছনে ছিলেন এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত‚ তান্ত্রিক হরিহরানন্দ বিদ্যাবাগীশ | তিনি রামমোহনকে নিয়ে গিয়েছিলেন উইলিয়াম কেরীর কাছে | ধর্ম প্রচারক কেরীসাহেব তখন ভারতীয় সভ্যতার সঙ্গে পরিচিত হতে সেতু খুঁজছিলেন | রামমোহন হয়ে উঠলেন তাঁর সেই সেতুবন্ধন |

১৭৯৫-১৭৯৭ অবধি একসঙ্গে কাজ করেছিলেন কেরী-রামমোহন-বিদ্যাবাগীশ | রচনা করেছিলেন বিখ্যাত বই মহানির্বাণ তন্ত্র | প্রচারিত হয়েছিল একেশ্বরবাদের তত্ত্ব |

কিন্তু এরপর আলাদা হয়ে যায় কেরী সাহেব আর রামমোহনের চলার পথ | রামমোহন চেয়েছিলেন হিন্দু ধর্মের সঠিক রূপ ও মাহাত্ম্য ব্রিটিশদের কাছে তুলে ধরতে | হিন্দুধর্ম মানেই যে শুধু আচার বিচার আর কুসংস্কারে ভরা লৌকিকতা নয়‚ সেটা বোঝাতে বেদান্ত ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন তিনি | কিন্তু মিশনারি উইলিয়াম কেরীর লক্ষ্য ছিল খ্রিস্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার |

ফলে মার্শম্যান আর ওয়ার্ডকে নিয়ে কেরী থেকে গেলেন হুগলির ওলন্দাজ উপনিবেশ শ্রীরাম পুরে | আর রামমোহন চলে এলেন কলকাতা |

সেটা ১৭৯৭ সাল | রামমোহন কলকাতায় বেশ কিছুদিন ছিলেন কুশীদজীবী | টাকা সুদে খাটাতেন | ধার দিতেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্রিটিশ কর্মীদের | তারপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুন্সি হয়ে কাজ করেছেন ১৮০৩-১৮১৫‚ টানা ১২ বছর | এই সময়ে আবার সখ্যতা গড়ে ওঠে কেরী সাহেবের সঙ্গে |

উনিশ শতকের শুরুতে রামমোহনের কাজের স্রোত বারবার গতিপথ পাল্টেছে | একসময় তিনি কেরী সাহেবের সঙ্গে আঘাত হেনেছেন বঙ্গ সমাজের কৌলীন্য প্রথায় | সতীদাহ‚ বাল্যবিবাহ‚ বহুবিবাহ‚ পণপ্রথা‚ পৌত্তলিকতা-সহ একাধিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন তিনি | আবার তিনিই সোচ্চার হচ্ছেন ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে | চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন প্রতি বছর কী বিপুল পরিমাণ অর্থ ভারত থেকে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাচ্ছে সাদা চামড়ার এই বেনিয়ারা |

অনেকেই বলে থাকেন নবজাগরণের আলোয় তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল | তিনি ছিলেন পাশ্চাত্যবাদের অন্ধ সমর্থক | তাঁরা ভুলে যান রামমোহন রায়ই উইলিয়াম কেরীর সঙ্গ তর্কযুদ্ধ করেছিলেন | প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন খ্রিস্টধর্মের ইউনিট্যারিয়ান ও ট্রিনিটারিয়ানের বিরুদ্ধে | তাঁর কলমেই ‘Hinduism’ শব্দটা প্রথম এসেছিল ইংরেজি ভাষায় |

রামমোহন রায়ের বক্তব্য ছিল‚ প্রকৃত হিন্দু ধর্ম বা হিন্দু দর্শনের সঙ্গে প্রচলিত সামাজিক সংস্কারের কোনও সম্পর্ক নেই | ১৯২৮ সালে যখন ব্রাহ্ম সভা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল‚ তার পুরোধা ছিলেন হিন্দু কুলীনরাই | আচার-বিচার বাদ দিয়ে প্রকৃত ব্রহ্মজ্ঞানী হতে চেয়েছিলেন তাঁরা |

শুধু সমাজ বা ধর্ম নয় | রামমোহন রায়ের দূরদৃষ্টিতে সমৃদ্ধ হয়েছিল শিক্ষা ব্যবস্থাও | ইংরেজিতে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন তিনি | আবার তিনিই স্থাপন করেছিলেন বেদান্ত কলেজ | প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষার মেলবন্ধনের উদ্দেশে | পাশাপাশি হিন্দু কলেজ বা আজকের প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়‚ জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশন বা আজকের স্কটিশ চার্চ কলেজ—প্রতিষ্ঠানের জন্য অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন রামমোহন রায় | সাংবাদিকতার দিক দিয়েও তিনি ছিলেন পথিকৃৎ |

শোনা যায়‚ রামমোহন রায়ের নিজের গোঁড়া কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবার বিশ্বাসী  ছিল সতীদাহ প্রথায় | তাঁর নিজের বৌদির সতী হওয়া আপ্রাণ প্রয়াসেও আটকাতে পারেননি রাজা | বিদ্রোহী জীবনে তিনি আগেই ব্রাত্য ছিলেন পরিবারে | তবুও লড়াই থামাননি | আজীবন যে কদর্য প্রথার বিরুদ্ধে সরব ছিলেন সেই সতীদাহ প্রথার অবলুপ্তি দেখেছিলেন রামমোহন রায়‚ ৫৭ বছর বয়সে‚ ১৮২৯ সালে | লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের শাসনে প্রণীত হয় সতীদাহ প্রথা রদ আইন |

ঠিক তার পরের বছর ব্রিটেন পাড়ি দিয়েছিলেন রামমোহন রায় | মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবরের কাছ থেকে রাজা উপাধি পেয়ে | সম্রাটের প্রতিনিধি হয়ে | ইংল্যান্ডে গিয়ে দরবার করেছিলেন যাতে ব্রিটিশ শাসনে বৃদ্ধি পায় মুঘল সম্রাটদের বার্ষিক ভাতা | সে সময় বার্ষিক ভাতা ছিল ৩ লাখ টাকা | এছাড়া তাঁর লক্ষ্য ছিল‚ সতীদাহ প্রথা রদ আইন যাতে আরও মজবুত সে উদ্দেশেও আর্জি পেশ করা |

কুসংস্কারের কালাপানি পেরিয়ে সেই যে গেলেন‚ আর জন্মভূমিতে ফেরা হল না ভারতীয় নবজাগরণের এই জনকের |

ব্রিটেনে গিয়ে শরীর একেবারে ভেঙে পড়ে | তার সঙ্গে ছিল ব্যবসায়িক ক্ষতি | আর্থিক তছরুপের অভিযোগ | সেই অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে আইনি লড়াইয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি |

১৮৩৩-এর ২৭ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডে মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন রামমোহন রায় | স্টেপলটোন গ্রোভ-এ তাঁকে সমাহিত করা হয় ১৮ অক্টোবরে | তার প্রায় দশ বছর পরে দ্বিতীয়বার সমাহিত করা হয় | ইস্ট ব্রিস্টলের আর্নোস ভেল সিমেট্রিতে | সেখানেই চিরনিদ্রিত তিনি | বাঙলা তথা ভারতের নবচেতনা উন্মেষের মুকুটহীন রাজা |

তাঁর জন্মবার্ষিকীতে এটাও মনে রাখবেন‚ তাঁকে নিন্দিত করতেও পিছপা হয়নি সমাজ | আমৃত্যু যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন তিনি | কখনও পরিবারে অপাংক্তেয়‚ নিজের মতাদর্শের জন্য | আবার কখনও সমাজে অবাঞ্ছিত | কারণ তিনি নাকি হিন্দু ধর্মকে হেয় করেছেন বিশ্বের কাছে | ব্রিটিশদের সঙ্গে আফিমের ব্যবসা করে কত উপার্জন করেছিলেন‚ সেসব নিয়েও কম ভাবনাচিন্তা করেনি উর্বর নিন্দুক মস্তিষ্ক | হিন্দু ধর্মের বাহ্যিক আচার বিচার বাদ দিয়ে সনাতন উৎসের জয়গান করতে চেয়েছিলেন | সেটাই সমাজের চোখে ছিল তাঁর মস্ত অপরাধ |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here