মৈনাকের পর্নোটোপিয়া : রূপসী তিনকন্যার রতিলীলা – সাধ

ত্রিশ বছরেরও বেশি আগে, ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২ রিলিজ করেছিল তপন সিংহের বহু আলোচিত ছবি ‘আদালত ও একটি মেয়ে’ | সেই ছবিতে আমরা দেখেছিলাম পেশায় স্কুল শিক্ষিকা তিনটি যুবতীকে তাদের মেয়েবেলা উদযাপনে কোনও পুরুষ অভিভাবক ছাড়াই গোপালপুরের সাগরতীরে বেড়াতে যেতে | সবাই জানেন, এর ফল হয়েছিল মর্মান্তিক | তিনজনকেই ট্রেন থেকে উত্যক্ত করতে শুরু করে চারটি লুম্পেন প্রকৃতির ছেলে | এরপর সমুদ্রতীরে, সেই তিন যুবতীর একজন, উর্মিলা চ্যাটার্জিকে একা পেয়ে তারা চারজনে মিলে তাকে টেনে নিয়ে যায় সমুদ্রের কিছুটা ভিতরে | ঠোঁটে সেঁটে দেয় লিউকোপ্লাস্ট, তারপর জলের মধ্যে চেপে ধরে শাড়ি তুলে দেয় কোমর অব্দি | সেই সিনেমা ক্লোজ শটে ধরতে থাকে উর্মিলার পা দুটো, দুটো শুভ্র পা জলের মধ্যে অসহয়াভাবে দাপাচ্ছে, সে দুটোকে চেপে ধরে আছে দুষ্কৃতীরা | এরপর উর্মিলার শরীরের মধ্যে প্রবিষ্ট হতে থাকে একের পর এক চারজনেই | শেষে সঙ্গাহীনা উর্মিলাকে তীরে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় ওরা | কালক্রমে নানা সূত্র ধরে পুলিশ ওদের গ্রেফতার করতে পারে ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতাশালী মানুষজনের আত্মীয় হওয়ার সুবাদে দোষীদের দোষ প্রমাণ করতে পুলিশের ঘাম ছুটে যায় | শেষ অব্দি ধর্ষণের প্রমাণ হিসেবে তারা আদালতে উপস্থিত করে ফরেনসিক টেস্টের রিপোর্ট, উর্মিলার যৌনকেশে জড়িয়ে থাকা ওই চার যুবার যৌনকেশ |

কাট টু, একত্রিশ বছর পরে, ১০ মে ২০১৩ রিলিজ করল মৈনাক ভৌমিকের বিতর্কিত, সেন্সরে আটকানো ছবি ‘আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস’ | কি আশ্চর্য, এই ছবিতেও ফের সেই তিনটি মেয়ের মেয়েবেলা উদযাপনে একা একা বাইরে যাওয়া | তফাৎ এইটুকু যে, এবার আর তারা আগের তিনটি মেয়ের মতো শাড়ি পরেনি, পরেছে খুব সামান্য পোশাক, তাই তাদের যুবতীকে শরীরের পুরোটাই সাগর-জলে ভিজে ঝিকিয়ে উঠছে প্রতি মুহূর্তে | একজন রূপসী কৃষ্ঞকলি (পেশায় রেডিও জকি), একজন পেজ থ্রি-র স্টাইল দিভা (পেশায় বেস্ট সেলার লেখিকা) আর একজন মাঝবয়সী কামাতুর বৌদি (পেশায় স্কুল শিক্ষিকা) | মন্দারমণির সমুদ্র এই তিন প্রায় নগ্ন সুন্দরী জলকেলি করে এক্সট্রিম স্বাধীনতা চেটেপুটে খায়, কিন্তু তাদের দিকে লোভের হাত বাড়ায় না আশেপাশের কেউ | শুধু একটা দৃশ্যে দেখা গেছে আশপাশের মানুষজনের তাদের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রেয়েছে, ব্যাস ওইটুকুই | আর কিচ্ছু না | ছবির শেষে আবার এই তিনজন একইভাবে সাগরে যায়, মাঝসাগরে নৌকা ভাসিয়ে চলে তুমুল মদ্যপান্ | না, এবারেও তাদের দিকে অশোভন কোনও হাত বাড়ায়নি কেউ |

বুঝতেই পারছেন, কোনও পরিচালক কী ধরনের ছবি বানান, সেটা সম্যকভাবে জানা না থাকলে, তপন সিংহ আর মৈনাক ভৌমিকের এই দুটো ছবি পরপর দেখলে যে কারোর মাথা ঘেঁটে ঘ হয়ে যেতে পারে | দুটো ছবিকে একইভাবে বিশ্বাস করে বসলে এটাও মনে হতে পারে যে তিন দশকের তফাতে এ রাজ্য যৌন অপরাধের তালিকায় সত্যি যেন আজ এক ‘মরূদ্যান’, এবং খবর কাগজে যেটুকু দেখা যায়, সেটুকু পুরোটাই , তিনি বুঝতে পারবেন দুই পরিচালকের বোধে-চেতনায় ও নির্মাণে কী দুস্তর ফারাক, এবং একজন যদি সিনেমার নামে টুকরো রিয়্যালিটি তুলে আনেন পর্দায়, অন্যজন তাহলে স্রেফ ফ্রেম থেকে ফ্রেমে নাগরিক পর্নোগ্রাফিক ইউটোপিয়ার নির্মাতা, সংক্ষেপে যাকে আপনি ‘পর্নোটোপিয়া’ও (শব্দের ঋণস্বীকার : শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়) বলতে পারেন |

ছবির প্রচার-বিজ্ঞাপন (‘ইটস আ গার্লস ওয়ার্লড, স্যরি বয়েজ’) দেখে মনে হয়েছিল এ বোধহয় এমন তিনজন মেয়ের গল্প, যারা ছেলেদের জাস্ট কোনও তোয়াক্কা করে না, তারা নিজেরা নিজেরাই স্বয়ংসম্পূর্ণ | ও হরি, ছবি দেখতে বসে দেখি কেস পুরো উল্টো | বিজ্ঞাপনে যাই লেখা থাকুক না কেন, গল্পের তিনকন্যার আসলে ভাদ্রমাস-কালীন অবস্থা চলছে | হরমোনের অত্যাচার কি চাট্টিখানি কথা? পুরুষ ছাড়া তারা তাদের যৌবন-জ্বালা সামলাবে কী করে? যতই কথায় কথায় দু অক্ষর্-চার অক্ষার ব্যবহার করে তারা নিজেদের স্মার্ট প্রমাণ করতে চাক না কেন, আসলে তাদের মূল সমস্যা হল মনের মতো পুরুষ শরীর না পাওয়া | যেমন ধরুন শ্রীময়ীর (স্বস্তিকা মুখার্জি) কেসটা | সে স্কুলের শিক্ষিকা ঠিকই, কিন্তু আসলে পার্সোনাল লাইফে প্রচন্ড উচাটনে ছটফট করে সর্বক্ষণ, কারণ, তার নাট্যপ্রেমী কর্পোরেট চাকুরে বরের (সুজন মুখার্জি) ইদানীং আর ‘দাঁড়ায় না’ (শব্দের ঋণস্বীকার : এই সিনেমা) | এদিকে বয়েস তো বেড়ে যাচ্ছে হু হু করে, এরপর কি আর ও মা হতে পারবে? এর সহজ সমাধান যে নিজের স্কুলেই লুকিয়ে রয়েছে সেটা ও জানতে পারল ওই স্কুলেরই উঁচু ক্লাসের এক ছাত্রকে (এই ভূমিকায় ‘গান্ডু’ খ্যাত অনুব্রত বসু) দেখে | সে ছেলে যখন স্কুল চত্বরে বসে নির্বিকারে সিগারেট টানে, তখন আর থাকতে না পেরে শরীরের টান মেটাতে ওকে নিজের রুমে ডেকে এটা-সেটা ভুজুং-ভাজুং দিয়ে ওর সঙ্গে ভাব জমায় শ্রীময়ী | তারপরে দুজনে একসঙ্গে রেস্তোরাঁয় খাওয়া, গাঁজা-সিগারেটের নেশা করা আর শেষ-মেষ একটা হোটেল কাম মাধুচক্রের খালি ঘরে গোপন কম্মোটা করে ফেলা | ফল? ষোল বছরের ছাত্রের বীর্য দ্বিগুণ বয়সী স্কুল-শিক্ষিকার বমি শুরু করিয়ে দিল, আর কামজর্জর শ্রীময়ীর এতদিনের সাধ মিটিয়ে প্রেগন্যান্সি টেস্টের রেজাল্ট এল পজিটিভ্ |

আরেক কন্যা প্রীনিতার (রাইমা সেন) গল্পটাও কম ইন্টারেস্টিং নয় | মা-বাবার (বরুণ চন্দ – অন্সূয়া মজুমদার) বিচ্ছেদ, নিজের প্রেমিকের সঙ্গে বিচ্ছেদ, সব কিছু মাখিয়ে-টাখিয়ে বাজারে আত্মজীবনীমূলক বেস্ট সেলার নামিয়েছে একখান | এখন একলা থাকে একটা বহুতলের উঁচুতলার ফ্ল্যাটে | সাক্ষাৎকার নিতে যে সাংবাদিক আসে, তাকে প্রায় উলঙ্গ করিয়ে মজাদার যৌন-ফ্যান্টাসির খেলা খেলে তার সঙ্গে | আর রাতের ইন্টরনেট খুলে চ্যাটিং করতে বসে টের পায়, তার সবকিছু নিঃসাড়ে লক্ষ্য করে চলেছে কোনও এক অজানা পুরুষা | সেই পুরুষ যে তার মোটে দুটো ফ্ল্যাটের তফাতে থাকা সুরজিৎ (বিশ্বনাথা বসু) সেটা অবশ্য রয়ে যায় তার কল্পনার বাইরে | একদিন সে ঠিক করে, দেখা করবে এই পুরুষটির সঙ্গে | কিন্তু এই ট্যাঁশ মেয়ের সঙ্গে দেখা করার সাহস পায় না সুরজিৎ, নার্ভাস হয়ে শেষটায় নিজের বদলে নিজের মিস্ত্রি বন্ধুকে পাঠিয়ে দেয় প্রীনিতার কাছে |

এই তিনকন্যার মধ্যে সবচেয়ে করুণ অবস্থা রিয়ার (পার্নো মিত্র) এমন ঢলো ঢলো কাঁচা শ্যামলা যৌবন যে মেয়ের, তাকে প্রায় পাগলা কুকুরের মতো ছেলে খুঁজে বেড়াতে হয় কেন, আর সবকটা ছেলেই তাকে রিজেক্ট করে চলে যায় কেন, সে এক নিপাট রহস্যের মতো | সহকর্মী দীপ (বিক্রম) অবশ্য তাকে গ্রুম করতে চেষ্টা করে আপ্রাণ | সোজাসুজি এটাও বলে, যে ছেলেরা নাকি মেয়ে দেখে প্রথমেই এটা মেপে নেয়, যে মেয়েটাকে ল্যাংটো অবস্থায় কতটা সুন্দর লাগবে | আর এর ওপরেই নির্ভর করে ছেলেটা সেই মেয়েটার ওপর অ্যাট্রাকটেড হবে, না কি হবে না | তার পরে দীপ যখন সরাস্সরি জানতে চায় রিয়ার কাছে, ওর শরীরের ‘জিনিষপত্র’ সব কিছু ঠিকঠাক আছে তো, ঢোলা পোশাকে ওপর থেকে তো কিছুই বোঝার যো নেই, তখন প্রায় মরিয়া হয়ে ঘাড় নেড়ে রিয়া বলে হ্যাঁ, বাকি আর সব মেয়ের যা আছে‚ ওরও সেইসব আছে | এইভাবে প্রায় নিজের শরীরের টেস্ট দিয়ে সহকর্মী দীপকে কনভিন্স করে রিয়া, যে ওর সবকিছুই ঠিকঠাক, তাই ওরও এবার একটা ছেলে জোটা উচিৎ | এরপর একদিন প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে অনিচ্ছুক দীপকে কিস করতে যায় রিয়া, একটা বয়ফ্রেন্ড না থাকলে ও ওর বন্ধুদের কাছে মুখ দেখাবে কী করে!

তিনকন্যার এই তিন রকমের গল্পের শেষ পরিণতি কী‚ সেটা আগে-ভাগে বলে দিয়ে ছবি দেখার মজাটা নষ্ট করে চাই না | কিন্তু একটা সতর্কবাণী দিয়ে রাখা অবশ্যই দরকার, জাতে-গোত্রে এই ছবি একেবারেই মৈনাকের আগের তিনটে ছবির মতো | ‘আমরা’ (২০০৬), ‘বেডরুম’ (২০১২) আর ‘মাছ, মিষ্টি অ্যান্ড মোর’ (২০১৩), এই তিনটে ছবিতে নাগরিক জীবনের যে মুখগুলোর গল্প বলেছেন মৈনাক, এই ছবিতেও ফের যেন তাদের গল্পই বললেন তিনি | উপরি পাওনা শুধু সুন্দরী যূবতীদের মুখে অনেক অনেক গালাগালি, যেগুলো শুনতে শুনতে আপনি নিষিদ্ধ পাড়ায় বেড়াতে যাওয়ার গোপনা মুচমুচে মজা পেলেও পেতে পারেন | সাম্প্রতিক অতীতে বাংলা ছবির পুরুষালি-সংলাপ জুড়ে গালাগালির আশ্চর্য যে বিন্যাস ঘটিয়েছিলেন সৃজিৎ মুখার্জি, প্রায় সেই উত্তরাধিকার মেনেই বোধহয় মৈনাকের এই স্ল্যাং-বিচরণ | শুচিবায়ুগ্রস্তরা কি বলবেন জানি না, কিন্তু যে ভাষা সাহিত্যের দরবারে শীর্ষেন্দু-সুচিত্রার পাশে নবারুণ-সুবিমলদের অবললীলাক্রমে ধারণ করে‚ সেই ভাষা সিনেমার দরবারে ঋতুপর্ণ-অপর্ণার পাশাপাশি সৃজিৎ্-মৈনাকদের কাঁচা খিস্তি হজম করতে পারবে না, বললে হল?

আসলে সময় যেভাবে যেভাবে বদলে যাবে, পরিচালকেরা যেভাবে যেভাবে বদলে যাবেন, ভাষা আর শব্দের ল্যান্ডস্কেপটাও তো সেইভাবেই বদলে যাবে, দাদা? সেই ১৯৬১ সালে সত্যজিৎ রায় যখন তিনকন্যার গল্প বলেছিলেন (‘পোস্টমাস্টার’, ‘মণিহারা’, ‘সমাপ্তি’), তার সঙ্গে ১৯৮২ সালে তপন সিংহের বলা সাগরতীরে বেড়াতে আসা তিনকন্যার গল্পের (‘আদালত ও একটি মেয়ে’) কোনও মিল পেয়েছিলেন? কিংবা বছর দশেক আগে মলয় ভট্টাচার্য যখন বলেছিলেন আরেক তিনকন্যার গল্প (‘তিন এক্কে তিন’, ২০০৪), তার সঙ্গে কোনও মিল পেলেন গত বছরে অগ্নিদেব চাটুজ্জের বলা ২০১২ সালের ‘তিনকন্যা’-র (ঋতুপর্ণা, অনন্যা, উন্নতি দাভেরা) গল্পের? ঠিক সেইভাবে পূর্বসুরী সবকটি তিনকন্যার থেকে আলাদা মৈনাকের এই তিনকন্যারাও | তারা যেন পরিচালকের পার্সোনাল ফ্যান্টাসি থেকে উঠে আসা তিন সেক্স-স্টার্ভড জলপরী — তাদের এই মর্ত্যে কিংবা কলকাতায় আসার একটাই কারণ — রতিলীলা-ইচ্ছা |

আরে সেই রতিলীলা-ইচ্ছার সাক্ষী থাকতে গেলে এই ছবি আপনাকে দেখতেই হবে | এখানেই শেষ নয় | আরে, সেই কোন ছোটবেলা থেকে আপনি শুনে আসছেন, ঘর থেকে একটু বাইরে যাও, মা-মণি, সোনামণিরা এখন ড্রেস চেঞ্জ করবে | ভাবতে পারছেন, এবার কিনা মৈনাক তাঁর ক্যামেরা নিয়ে হৈ হৈ করে ঢুকে পড়লেন সেই মামণি-সোনামণিদের পোশাক পাল্টানোর ঘরেও, আর আপনি দেখতে পেলেন কীভাবে ব্রা-প্যান্টি পরে গালি দিতে দিতে ফর্সা সুন্দরী মাংসল মেয়েরা মনের মতো ড্রেস বাছে ওয়ার্ড্রোব থেকে | মৈনাক এরপর ক্যামেরা তাক করলেন টয়লেটে | আপনি দেখতে পেলেন কমোডে বসে থাকার সময় কেমন লাগে আপনার স্বপ্ন সুন্দরীকে | কিংবা কেমন লাগে যখন তারা রেজর চালিয়ে বাহুসন্ধি নির্লোম করে | বা, জোকস বলে ফার্টিং আর পটি নিয়ে | আর হ্যাঁ, একেবারে ঠিক ধরেছেন, শুরু থেকে শেষ অব্দি মৈনাকের এই ছবির সব ফ্রেম সাপটে থাকে পুরুষ্টু যৌবনের এই ডোন্ট কেয়ার উল্লাসটাই |

হয়তো শেষ অব্দি কাহিনির এই বিন্যাস সত্যি নয়, বাস্তব নয়, অলীক ইউটোপিয়া, জানি | হয়তো এসব সুসংস্কৃতি নয়, সফট পর্নো, তাও জানি | আরে বাবা, সেইজন্যে শিবাজীবাবুর থেকে ধার করে আগেই বলেছি না ওই শব্দটা ‘পর্নোটোপিয়া’! আর হ্যাঁ, আন্ডারগ্রাউন্ড ফিল্ম ‘গান্ডু’কে বাদ দিলে, এহেন পর্নোটোপিয়া কিন্তু বাংলা ছবিতে সম্ভবত এটাই প্রথম | আর সেই প্রথমটাকেই আপনি মিস করে যাবেন? রিস্ক কিন্তু আপনার |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here