সুদেষ্ণা গোস্বামী
কখনও লেন্সে বা কখনও কলমে – তবুও জীবনকে কতোটুকু ধরা যায় ? এই প্রশ্নই তাড়া করে ফেরে । ক্যামেরার হাতেখড়ি স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের সিনেম্যাটোগ্রাফার সৌম্যেন্দু রায়ের থেকে । আর বাদবাকি জীবন-বোধ পেয়েছে গৌতম ঘোষের সঙ্গে খুব ছোট-বয়স থেকে কাজ করে চলার সুবাদেই । মিশনারি কনভেন্ট স্কুলে পড়াশুনা । প্রাণীবিদ্যায় স্নাতক । তারপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় । ২০১৫ থেকে নিয়মিত মূলধারার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রবন্ধ, গল্প, প্রতিবেদনে আত্মপ্রকাশ । স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র নির্মাণ ও সিনেম্যাটোগ্রাফির সঙ্গে-সঙ্গে সিরিয়াসলি লেখালেখি – অনেকটা অন্ধকারে যেন এক মুঠো আলো । অনেকটা ম্যাজিক রিয়ালিজমের মতো ।

দূরে দিগন্তরেখা ছুঁয়ে যে পাহাড় দেখা যাচ্ছে সেখানে ঝিরঝির করে বরফ পড়তে শুরু করেছে । নেপালের কাঠমান্ডু থেকে বেশ খানিকটা দূরে পশ্চিম বাজুরা জেলায় টিমটিমে একটি গ্রাম । এখানে রাত্রিবেলা তাপমাত্রা হুড়মুড় করে এত নেমে যায় যে বাইরে একটিও জনমানব দেখা যায় না । টিনের দেওয়াল ও চালের ঘুপচি ঘরে বছর পঁয়ত্রিশের মহিলা কখনও মাটি আঁকড়ে , কখনও খড়বিচুলি আঁকড়ে প্রকৃতিদেবতার কাছে ভিক্ষা চাইছেন – একটু উষ্ণতার জন্য । নির্জন আস্তাকুঁড়ে বসে কড়কড়ে শীতের রাতে মহিলার এইটুকুই ছিল নূন্যতম চাওয়া । কেননা সে নির্বাসিতা ! পরিবার ও গ্রাম থেকে বিতাড়িত ।

কী তাঁর অপরাধ ? ‌

অপরাধ তিনি ঋতুকালীন সময়ের মধ্যে রয়েছেন । তাই তিনি ‘অপবিত্র’। ‌নির্বাসিত । নারী শরীরের স্বাভাবিক নিয়মের জন্য তাকে মাথা পেতে গ্রহণ করতে হয়েছে শাস্তি । জনমানবহীন পাহাড়ের কোলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে । সঙ্গী বলতে দুই নাবালক সন্তান । কি ভংয়কর !‌ কি বীভৎস !

Banglalive-6

এই অসভ্য, অমানবিক ঘটনা কবে ঘটেছে ?‌ অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ায় ?‌ নাকি তারও আগে?‌ 

Banglalive-8

না, ঘটেছে ক’দিন আগে। ২০১৯ জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ।

Banglalive-9

মহিলার নাম অম্বা বোহারা । তার দুই ছেলেকে নিয়ে ঋতুস্রাব হওয়ার অপরাধে জানলাহীন আস্তাকুঁড়ে থাকতে একপ্রকার বাধ্য হয়েছিলেন । প্রচন্ড ঠাণ্ডায় রেহাই পেতে আগুন জ্বেলেই ঘুমিয়ে পড়েন তাঁরা । তারপর মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী ।

এই অপরাধ মহিলাকে ধর্ষণ এবং শিশু দুটিকে গলাটিপে খুন করার মতোই  নিকৃষ্ট এবং নৃশংস । অপরাধী কে ?‌ সমাজ । মায়ের জঠরে আবার ঢুকে নতুন করে জন্ম নিলেও বোধহয় এই লজ্জাকে আমরা লুকোতে পারব না ।  

অম্বার মৃত্যু কোনও বিচ্ছিন্নঘটনা নয় । গতবছর একই ভাবে টক্সিক ধোঁয়ায় কুঁড়েঘরে মারা যান বছর একুশের এক তরুণী । এই প্রথার নিয়ম পালন করতে গিয়েই আরও অনেক মহিলা বনেবাদাড়ে সাপের কামড়ে মরেছেন । এদেরকে কতোটুকুই বা চিনতাম ?‌ এদের খোঁজ কতোটুকুইবা রেখেছি ?‌ সব খবর তো আর চট করে সোশ্যাল নেটয়ার্কিং সাইটে ভাইরাল হয় না বা কলেজইউনিভার্সিটিতে , বুদ্ধিজীবী মহলে কেউই বিশেষ নাড়াঘাঁটাও করে না । এতে চটজলদি মসকরা নেই যে ।

আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা , চাকচিক্ক্য , নেটফ্লিক্স , ফেসবুক , ইন্সট্রাগ্রাম , বিউটিপ্লাস ফিল্টার ইত্যাদি দিয়ে আমরা যতটা সুডৌল ভাবে জীবনকে সাজাইনা কেন তার পিছনে থেকে যাচ্ছে এক সুদীর্ঘ অন্ধকার অধ্যায় ।

ধরা যাক , ঝুমি আজন্ম মফস্বলের মেয়ে । মেট্রোপলিটন সিটিতে বেড়ে ওঠার বাড়তি সুবিধাটুবিধা বিশেষ পাইনি । ঝুমি প্রেম করে এবং বাস্তবসম্মতভাবে শারীরিক ছোঁয়াছুয়িতে ওর কোনও ছুঁৎমার্গ নেই ঝুমি যথেষ্ট ডাকাবুকো হওয়া সত্ত্বেও ওষুধের দোকানে গিয়ে জেলুসিল বা পুদিনহারা কেনার মতো চট করে এক প্যাকেট কন্ডোম কিনতে পারে না আজও কেন ? এখানে সাহস বা স্মার্টনেসের অভাব কোনটাই ঝুমিকে আড়ষ্ট করে তুলছে না । কেবলমাত্র রীতির ঘেরাটোপ , সমাজের রক্তচক্ষু এবং নীতি পুলিশের ট্র্যাফিকিংয়ের জন্যই ঝুমির মতো অনেক অবিবাহিত বা বিবাহিত মহিলারা ট্যাবু আঁকড়ে বেডরুমে ঢোকেন বাধ্য হয়ে ।   

অনলাইন অর্ডারের যুগে বা কলকাতার মতো শহরে বসে এই বিষয়টাকে বিশেষ আমল দেওয়ার গুরুত্ব হয়তো ঠিক বোঝা যাবে না । অথচ সর্বস্থানে সর্বস্তরে এই ছোটছোট ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো নিরাময়যোগ্য হচ্ছে না বলেই সমাজের ঘুণপোকারা এতো মাথা চাগাড় দিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ।  

ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অনেক মহিলাদের গোপনে গর্ভপাত করতে নিয়ে যাওয়া হয় । অথচ যদি কোনও মেয়ে সুরক্ষিত সেক্সলাইফের জন্য মেডিসিন শপে কন্ডোম কিনতে যায় সেখানে দোকানদার নিজেই খানিকটা অস্বস্তিতে সঙ্কুচিত হয়ে যায় বা পুরুষালি চাপাহাসি দেয় । হায় রে সমাজ !   

শবরীমালা মন্দিরের ‘‌অ–সভ্য’‌ ঘটনা নিয়ে রাগ , অপমান , প্রতিবাদে ঝাঁপিয়ে পড়েছি । সেকুলার ও প্রগতিশীলরা এক জোটে এগিয়ে এসে ধর্মকে আদালত পর্যন্ত টেনেহিচড়িয়ে নিয়ে গেছে । একদিকে রজঃযোগ্য নারীর অশুচিত্বের লোকগাথা ভেঙে শবরীমালার আয়াপ্পা মন্দিরে গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য লড়াই চলছে , অন্যদিকে ঘরেঘরে শবরীমালাপ্রথা চোরা স্রোতের মতো বইছে ।

আমরা কমবেশী প্রত্যেকেই তো সমাজসংস্কারের আদিম বর্বরতায় জর্জরিত । আমাদের চারপাশে বিভিন্ন ধর্মালম্বী মানুষ কোনও শুভ কাজে বা পুজোপার্বনে , ঠাকুরঘরে কোনও রজঃশলা নারীকে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয় । নারী সন্তান প্রসব করে পৃথিবীকে এক নির্মলতর উপহার দেওয়ার ক্ষমতা রাখে । তখন আমরা প্রত্যেকেই আপ্লুত হয়ে দেখি সেই মা ও শিশু । অথচ সেই নারীকেই কী সাংঘাতিক অবহেলা ও অবজ্ঞা ! কোনও যুক্তিই সেখানে ধোপে টিকবে না ।  

ধর্ম ও শাস্ত্রকে কখনোই সভ্যতা ও শিষ্টাচারকে উল্লঙ্ঘন করতে দেওয়া উচিত নয় । শবরীমালা মন্দিরের দ্বার সব বয়সের মহিলাদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেছে ঠিকই । কিন্তু সেখানেও এই রায়ে দ্বিমত পোষণ করা হয়েছে । ছিঃ ! যে দেশে নারীকে দেবজ্ঞানে শক্তিরূপে পুজো করা হয়, সেখানে এই বৈষম্যমূলক আচরণ !‌ এই বার আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে অন্যায়ের পূর্ণঘড়াকে খালি করতে হবে ।      

প্রাকৃতিক নিয়মেই যে রক্তস্রাব হয় তাকে ‘শরীর খারাপ হয়েছে’ এই আখ্যা দেওয়াটাই মারাত্মক ভুল । তাতে মেয়েদের যথাসাধ্য মেয়েরাই দুর্বল ঠাহর করছে । এটি একটি শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া । প্রত্যেক মাসে নির্দিষ্ট সময়ে ‘‌পিরিয়ড’‌ হয় বলে মহিলারা তো কোনও অংশে পুরুষের থেকে কম দায়দায়িত্ব পালন করে না । বরঞ্চ ক্ষেত্র বিশেষে অতিরিক্ত ঝুক্কি সামলাতে হয় । সেক্ষেত্রে ‘শরীর খারাপ’ এই শব্দটার ব্যবহারে নারীপুরুষ বৈষম্যকে প্রকট করা বা একই সঙ্গে মর্যাদাক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে , সেটা কি আমরা একেবারেই বুঝতে পারছি না ?      

পিরিয়ড চলাকালীন রাতঘুমের পর সকালে উঠে বিছানায় বা জামাকাপড়ে রক্তের দাগ লেগে গেলে বাড়িতে মা বা মাতৃস্থানীয় মহিলারা চরম অস্বস্তিতে পড়েন । সেই রক্তদাগ বাবাকাকাদাদার নজরে পড়ার আগেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মুছে ফেলতে হবে , পোশাক বদলাতে হবে । ভাবলে হাসিই পায় , বিষয়টা কি সত্যি এতটাই লজ্জার ? নাকি সর্বসমক্ষে পুরুষদের ঘুণাক্ষরেও জানতে না দেওয়ায় বাধ্যবাধকতা ? এভাবেই নারীত্বকে যত আড়াল করে চলা যাবে ততো সামজিকপ্রথার কারণে অপমৃত্যু , ধর্ষণ ইত্যাদির বাড়বাড়ন্ত হবে তরতরিয়ে ।  

পিরিয়ড বা রজঃস্রাবকে এবার বেআব্রু করার প্রয়োজন এসেছে ।

আমারা আধুনিক জনজীবনে প্রাচীন লোকবিশ্বাস ও সংস্কারকে মালার মতোই গলায় ঝুলিয়ে মর্ডান থেকে মর্ডানতর হয়ে ওঠার বৃথা চেষ্টা করছি । আমাদের সমাজে এখনও ‘ঋতুকালীন সভ্যতা’ একেবারে আলাদা । এখনও কুসংস্কার , দ্বিধা , সঙ্কোচ , কুণ্ঠা , অস্বস্তি – প্রাধান্য পায় ।

অন্ধকারে একমাত্র বিদ্যুতের ঝলক – মহিলাদের জন্য ‘পিরিয়ড লিভ’ চালু হয়েছে কোনও কোনও অফিসে । ঋতুমতী কর্মী অধিকারের সঙ্গে কর্মবিরতি নিতে পারবে । পেটব্যথা বা অন্য অসুবিধা হবে অথচ তার পুরুষ সহকর্মী বা বস্‌কে বলতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়বে এমনটা আর হবে না ।  জানুক , কথা সকলে জানুক । এটা লজ্জা নয় , নারী হিসেবে গর্বের ।

আরও পড়ুন:  বিজ্ঞাপন ছাড়া বিক্রি হয়নি রবীন্দ্রনাথের বইও

1 COMMENT

  1. অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং উচিৎ কথা লিখেছিস সুদেষ্ণা। এই বাঁধ ভাঙার সময় এসে গেছে। ভাঙ্গুক যত কুপ্রথা। ভাঙ্গুক শেকল বেড়ি।