অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম – ১৯৯২, কলকাতায়। ২০১৪-এ পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্স এঞ্জিনিয়রিং-এ স্নাতক, পরে আইআইইএসটি, শিবপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ ২০১৬-এ। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। নেশা বলতে বই আর বেড়ানো। শখের তাগিদে নানারকম বিষয়ে লিখে থাকেন। পছন্দ বলতে পরিবেশ আর মানুষের গল্প বলা।

Banglalive

সুদানের মৃত্যুর একমাস পেরিয়েছে, সুদান মরিয়া প্রমাণ করিয়াছে যে সে এতদিন অবধিও মরে নাইনা এখানে সুদান কোনও দেশের নাম নয়, পৃথিবীর বুকে নর্দান হোয়াইট গণ্ডার প্রজাতির শেষতম পুরুষ প্রতিনিধি ছিলো সে। তার মৃত্যুতে উল্লিখিত প্রজাতিটির সম্পূর্ণ বিলুপ্তির খবর আসাটা এখন সময়ের অপেক্ষা কেবল। বিজ্ঞানীরা অবশ্য চেষ্টা করেছিলেন কৃত্রিম উপায়ে নানাবিধ চিকিৎসার মাধ্যমে তাঁরা সুদানের প্রজননের চেষ্টা চালিয়েছিলেন, ফল মেলেনি কিছুতেই। সুদানের মারা যাওয়ার খবর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে যেতে পেরেছিলো, আগুনের চেয়েও দ্রুত সে খবর ছড়িয়েছিলো, ফেসবুকে, মেসেঞ্জারে, হোয়াটস্যাপের পর্দাতেওমানুষও সেই দুঃখের ভারে অবনত হয়েও, সেই খবরটিকে আরও অনত্র ছড়িয়ে দিতেও সহায়তা করেছিলো। এখন সব শান্ত, ঝড়ও থেমে গিয়েছে বোধহয়।

 

বিশ্বজোড়া জীববৈচিত্রের যে একটা ক্রমহ্রাসমানতার লক্ষণ বিগত বেশ কয়েকটি দশক ধরেই আলোচ্য হয়ে উঠেছে সুদানের মৃত্যুর পর সেই আলোচনাও বোধহয় আবার সকলের সম্মুখেই উঠে আসতে পারবে। কারণ বিজ্ঞানীরা যে খবর শোনাচ্ছেন, তা শুধু চিন্তার নয় গভীর গভীর আশঙ্কার বার্তাও সে বহন করে এনেছে আজ। বিপদের নাম এখন মাস এক্সটিংশন’, বাংলায় গণবিলুপ্তির সংকেত। সত্যি-সত্যিই আজ সচেতন হয়ে উঠবার সময় এসে গিয়েছে।

 

আজ থেকে বহু কোটি বছর আগে, যখন সেই জুরাসিক জুগের ডায়নোসরেরা পৃথিবীর বুকে রাজত্ব চালিয়েছে কোনও একবারে এক বিশাল উল্কার আঘাতে তাদের বিলুপ্তি ঘটে ধরিত্রীর ইতিহাসে অন্যতম অথবা সর্বাপেক্ষা আলোচিত গণবিলুপ্তির নজির সেইটিই। তার আগেও একাধিক বারে গণবিলুপ্তির সাক্ষী থেকেছে পৃথিবী। বিজ্ঞানীদের কথায়, ৭৫% বা তার বেশি সংখ্যক জীবের একত্রে অবলুপ্তি ঘটলে তাকে গণবিলুপ্তি হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। আর ২০১৮তে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন সভ্যতা এখন ধীরে ধীরে তার ইতিহাসের ষষ্ঠতম গণবিলুপ্তির পর্যায়ে পৌঁছিয়ে যেতে পেরেছেহাতে আর সময় নেই বিশেষ

 

এর আগের ক্ষেত্রগুলিতে মানুষের অস্তিত্বই ছিলো না কেবল তাই নয়, কোনও জীবিত বস্তু বা প্রজাতির কারণে অবলুপ্তির ঘটনা ঘটেনি, সমস্ত কারণগুলিই ছিলো প্রাকৃতিক অথবা মহাজাগতিক ঘটনার সূত্রে বাঁধা। আজ থেকে মাত্রই ২লক্ষ বছর পূর্বে পৃথিবীর বুকে প্রথম আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন একটি প্রজাতির আর কোনও দ্বিতীয় উদাহরণ নেই ধরিত্রীর এমন সর্বনাশ ঘটাতেও আর কোনও প্রজাতিই বোধহয় এমন চূড়ান্ত সাফল্যের নজির রাখেনি।

 

২০০ বছর আগেও পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিলো ১০০কোটির আশেপাশেই, ২০০ বছরে সংখ্যাটি বেড়েছে ৭গুণ। মূল্য চোকাতে হয়েছে অন্যান্য প্রজাতিদের। ১৯০০ সাল থেকে আজ অবধি অন্তত ২০০টি মেরুদণ্ডী প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটেছে (স্বাভাবিক অবস্থায় এতগুলি প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটতে লাগা উচিত ছিলো অন্তত ১০,০০০বছর)। পৃথিবীর মোট মেরুদন্ডী প্রাণীদের ৩২%, অমেরুদন্ডী প্রাণীদের ৪২% এবং সামুদ্রিক অমেরুদন্ডী প্রাণীদের ২৫%ই আজ বিলুপ্তির পথে।

 

হ্যাঁ, আপনারা প্রশ্ন করতেই পারেন, নাম-না-জানা অচেনা-অজানা এত সমস্ত প্রজাতির থাকা বা না থাকাতেই বা বিপদটা কোথায়? উত্তর হলো, বাস্তুতন্ত্র এমন ভারসাম্যের অভাবকে মেনে নেবে না কিছুতেই একটি প্রজাতির বিলুপ্তি পরবর্তী আরও একটি প্রজাতির বিলুপ্তিকেই আরও ত্বরান্বিত করবে। তথ্যে জানা যাচ্ছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যেই চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বাড়বে অন্তত ৪০% (বদলে স্বাভাবিক বনাঞ্চলগুলির নির্বিচার ধ্বংসকরণের সাক্ষী থাকব আমরাই)। মোট শহরাঞ্চলের আয়তন বাড়বে প্রায় ১০লক্ষ বর্গকিলোমিটার। ভারসাম্যের বিপদ বাড়াতেও যে তা অত্যন্তই সহায়ক হবে তা এক্ষেত্রে বলাই বাহুল্য বলে জেনেছি

 

বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত ৬.৫ কোটি বছরের ইতিহাসে এমন দ্রুতগতিতে প্রজাতির অবলুপ্তি দেখা যেতে পারেনি। ২০৫০ সালের মধ্যেই পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের ১০% জীবের সম্পূর্ণ বিলুপ্তির সম্ভাবনা দেখছেন তাঁরা। মাত্রাতিরিক্ত মৎস্যশিকারের কারণে সমুদ্রে মাছের সংখ্যা কমছে, ২০৫০-এর মধ্যে সামুদ্রিক মাছেদেরও একটা বড় অংশই অবলুপ্তির পথে যাবে বলে তাঁদের অভিমত। বিশ্ব-উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রের জলস্তর বাড়বে, নিয়মিত বন্যার কবলে পড়বে উপকূলবর্তী শহর ও গ্রাম। ভৌমজল ও অন্যান্য মিষ্টি জলের উৎসগুলিও শুকিয়ে আসতে থাকবে। এই মুহূর্তে পৃথিবীর ১.১ কোটি মানুষ পানীয় জলের অসুবিধায় ভোগেন, ২০৫০ সালের ভিতরেই সংখ্যাটি ২ কোটি ছাড়াবে। এছাড়াও আরও প্রায় ১০কোটি মানুষ জল-বিরল এলাকায় বাস করবেন। আজ থেকে ১০০ বছর বা তার আশেপাশেই মানবসভ্যতারও সম্পূর্ণ বিলুপ্তি সম্ভব। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কাও কিন্তু আজ তেমনটাই ইঙ্গিত বয়ে এনেছে

 

উদাহরণ হিসাবে তারা তুলে ধরছেন ইস্টার আইল্যান্ডের সভ্যতা-অবলুপ্তির নজিরকেই। উন্নত সভ্যতার ধারক ও বাহক হওয়া সত্ত্বেও তাদের সভ্যতা টিকতে পারেনি, রসদের অভাব আর জনসংখ্যার বিপুলত্বের ঠেলায়। আজ আমরাও ঠিক সেই পথ ধরেই হাঁটতে হাঁটতে চলেছি। দুনিয়ার ডাস্টবিন উপচিয়ে গেলেও, কেবল আরও নতুন জঞ্জাল উৎপাদনেই আমাদের লক্ষস্থির। পৃথিবীতে ৮০ কোটি মানুষের আজও খাদ্যের নিরাপত্তা নেই, আর আমরা প্রতি বছরেই মোট উৎপাদিত খাদ্যের একের পঞ্চমাংশ স্রেফ নষ্টই করি। ভারসাম্যের বিসদৃশতাটা চোখে লাগছে বোধহয়। জলাজমি, নদী, ক্ষেত, বাড়ি, পুকুর, অফিস, বন-জঙ্গল, চাষজমি কোনকিছুই যে রেহাই পাচ্ছে না। কেবল সুখ ও স্বাচ্ছন্দের তাগিদে পৃথিবীর সমস্ত রসদ-সম্ভারেরই আমরা নির্বিচার ধর্ষণে মেতে উঠতে পেরেছি, সামান্যতম অনুশোচনা ছাড়াই

 

ভয় দেখানোটা উদ্দেশ্য নয় আমার, কেবল যা শুনি বা জানি অথবা দেখি তা আর পাঁচজনের সঙ্গেই ভাগ করে নিতে ইচ্ছে হয়। রক্তকরবীর সেই রাজার মতোই যদি আমরা কেবল সোনার তালের তালবেতালকে নিয়েই নৃত্য করে চলি, তবে সোনার ধান পুকুরের মাছ তিরতিরে হাওয়ার দিন ফুরাতে সময় লাগবে না। আমাদের আরও স্বভাব একবারে নিজের পিঠটাতেই যতক্ষণ না ঘা আসছে, আমরা সচেতন হবার প্রয়োজনটুকুও বোধ করতে পারিনেবিপদ যখন আসে, সে কিন্তু বলে কয়ে আসবার ধার ধারবে না, আর প্রকৃতির প্রতিশোধ যে কি ভয়ানকটা হয়ে পড়তে পারে তার নমুনাও দেখেছি। কাজেই সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার কোনও বিলুপ্ত পাখি বা প্রজাতির একেকটি মৃত্যুসংবাদও যেন আজ এই খাস কলকাতায় বসেও, আমাদের শিরদাঁড়াতেও শিহরণ তুলতে পারে কারণ আমাদের চেনা প্রজাতিদেরও আমরা হারিয়ে যেতে দেখছি বারংবার। ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির এইনির্বোধ সময়-গণনার চাইতেও তাই পরিবেশ, প্রকৃতি, ঘাস, মাটি, জল, আকাশকে নিয়েই আজ অধিক সচেতন হওয়া প্রয়োজন। নচেৎ সেই শেষের দিন আর দূরে নয় মোটেই। 

আরও পড়ুন:  বাঘ-টাঘ

1 COMMENT

এমন আরো নিবন্ধ