বহু চোখের জলের পর IVF তিস্তা কে দিল যমজ সন্তানের সুখ

‘ তুমি খুশি থাকো‚ আমার পানে চেয়ে চেয়ে খুশি থাকো ‘ | দেওয়ালের ক্যালেন্ডার‚ আর্চিজ-এর কার্ড‚ শপিং মল-এর কিডস সেকশন‚ স-অ-অ-অ-ব দেখে এই কথাটাই কেবল মনে হয় তিস্তার | চার পুরে পাঁচে পা দিতে চলেছে বিয়ের বয়স | এখনও তিস্তাকে মা বলে ডাকার জন্য কেউ এল না | অথচ এমন নয় যে ওর দাম্পত্য অসুখী | রাতের পর রাত তিস্তায় ঝাঁপিয়েছে রঙ্গিত | কখনও বা উল্টোটা | রঙ্গিতে মিশেছে তিস্তা | কিন্তু দুই নদীর মিলনে নতুন স্রোত তৈরি হল কোথায় ?

রঙ্গিত-তিস্তা দুজনেই কলেজের লেকচারার | রঙ্গিত তিস্তার চেয়ে বছর ছয়েকের বড় | উচ্চমধ্যবিত্ত সুখী দম্পতি | দুজনেই দুজনকে নিয়ে খুশি | শুধু সুখের বাসরঘরে মাঝেমাঝেই হানা দেয় শূন্যতার দীর্ঘশ্বাস | পড়াশোনা শেষ করে কেরিয়ার গুছিয়ে বিয়ে করতে করতে তিস্তার বয়স প্রায় তিরিশ ছুঁই ছুঁই | সেটাই নাকি আসতে দেয়নি নতুন অতিথিকে | নানা অছিলায় কথা শোনান রঙ্গিতের মা | যেন‚ নিজে দেখেশুনে গৃহকর্মনিপুণা গৃবধূ পুত্রবধূ আনলেই এতদিনে তিনি ঠাকুমার ঝুলি পেড়ে বসতেন ! শুধু কি ঘরশত্রু বিভীষণ ? বাইরেও‚ আত্মীয় পরিজন থেকে শুরু করে বন্ধুবান্ধব‚ সবাই ধরে নিয়েছে দায়ী তিস্তাই | এমনকী‚ তিস্তার মা-ও কারওর সন্তানসম্ভবা হওয়ার খবর দিতে দ্বিধা করেন মেয়েকে |

মনে মনে তিস্তাও নিজেকে কাঠগড়ায় কম দাঁড় করায় না ! সাধ ভক্ষণে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে বহুদিন | এখন অন্নপ্রাশনে যেতেও ইচ্ছে করে না | বিয়ের পরপর ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে রঙ্গিত মজা করে বলত‚ ‘ এই যো খরস্রোতা তিস্তারানি‚ আমার কিন্তু ছ’টা‚ আচ্ছা‚ অন্তত তিনটে ছানা চাই-চাই ‘ | এখন আর বলে না | পারতপক্ষে ওসব প্রসঙ্গই তোলে না | শারীরিক সম্পর্কও এখন সপ্তাহান্তের রুটিনমাত্র | বন্ধুরাও জিজ্ঞাসা করা ছেড়ে দিয়েছে‚ ‘ কী রে‚ তোরা দুই থেকে তিন কবে হচ্ছিস ?’ হাল ছেড়ে দিয়েছে তিস্তাও | বত্রিশে দাঁড়িয়ে বিলক্ষণ বুঝতে পারে‚ গলদ রয়ে গিয়েছিল গোড়ায় |

কোনও অনুযোগ নেই ঠিকই | কিন্তু রঙ্গিত এই নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যেতেও রাজি হয়নি | অথচ তিস্তা কিন্তু রাজি ছিল স্বাভাবিক পথে না হলে‚ আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণে | রঙ্গিতের বক্তব্য হল‚ চিকিৎসকের কাছে গেলেই ধরা পড়বে কার সমস্যা | হাজারো চিকিৎসাতেও তা যদি দূর না হয়‚ তখন দোষারোপের পালা চলে আসবে | তাই এক হাতে কি আর তালি বাজে ? মাঝে মাঝে এত অসহায় লাগে‚ মনে হয় সব শিক্ষা জলাঞ্জলি দিয়ে তাবিজ মাদুলি পরলে কী হয় !কিছুতেই কিছু হয় না | শূন্য কোলে গণিতের লেকচারার তিস্তার হাতে রয়ে যায় পেন্সিল | জীবনের হিসেব মেলে না |

*************************

কাট টু # দু বছর পরে :

পড়াশোনা ছাড়া অন্য কারণে রাত জাগাও এত মধুর হতে পারে‚ চৌত্রিশ পেরিয়ে অনুভব করছে মেধাবী তিস্তা | যমজ ছানারা রাতে ঘুমোতে নারাজ | চোখের তলায় কালি নিয়ে তিস্তা এখন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে | এই অবস্থার জন্য দায়ী ঋতুজা | তিস্তা আর রঙ্গিত‚ দুজনেরই খুব ভাল বন্ধু সে | বিশ্ববিদ্যালয়ের পরেই থিতু বিদেশে | যোগাযোগ বলতে সোশ্যাল মিডিয়া | সেই ঋতুজা-ই ধনুর্ভঙ্গ পণ করে এ বার দেশে এসে দেখা করল পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে | জমাট আড্ডা মাঝে মাঝেই টাল খাচ্ছিল ঋতুজার দুই দস্যির জন্য | বরাবরই ঠোঁটাকাটা ঋতুজা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করে এসেছে‚ তাঁর যমজ সন্তান IVF-এর ফসল | বেশ কয়েক বছর চেষ্টাতেও যখন অতিথি আসতে দেরি করছে তখন ওরা ফার্টিলিটি ক্লিনিকের দ্বারস্থ হয় |

বাকপটু ঋতুজা কলেজের মতোই কাউকে ইনফ্লুয়েন্স করতে সিদ্ধহস্ত | ইন্ট্রোভার্ট তিস্তা অবাক হয়ে দেখল‚ ঋতুজা কী নিঃসঙ্কোচে রঙ্গিতের সঙ্গে সব আলোচনা করল ! এবং ম্যাজিক বোধহয় একেই বলে | লাঞ্চ থেকে ডিনার‚ মোটামুটি ঘন্টা দশেক ঋতুজা ওর দুই মেয়েকে নিয়ে ছিল তিস্তাদের বাড়ি | তারমধ্যেই কনভিন্স করে ফেলল পুরনো বন্ধুর হাবিকে | দেখাও দিল না মেল ইগো | রঙ্গিত রাজি হয়ে গেল ক্লিনিকে যেতে | তাহলে কি এমন কোনও কাউন্সেলিং-এর অভাব ছিল ?

সে পরে ভাবা যাবে কীসের অভাব ছিল | ঋতুজা বলে দিয়েছিল ও আরও পনেরো দিন আছে | তার মধ্যে ফার্স্ট সিটিং যেন হয় আর ওকে যেন সেটা জানানো হয় | ওর তাড়নাতেই একদিন গুটি গুটি দুই অধ্যাপক হাজির মাদারহুড ফার্টিলিটি ক্লিনিকে | যারা নিজেদের ইনফার্টিলিটি ক্লিনিক না বলে ফার্টিলিটি ক্লিনিক বলতেই ভালবাসে |

তিস্তা তো ধরেই নিয়েছে‚ সব দোষ তার | ইষ্টনাম জপতে থাকা গণিত অধ্যাপিকা তিস্তা যেন তখন অঙ্ককে ভয় পাওয়া ছাত্রী | ছবিটা পাল্টে গেল কিছু সিটিং-এর পরেই | জানা গেল‚ তিস্তার দিক দিয়ে অল ক্লিয়ার | কোনও সমস্যাই নেই | সমস্যা রঙ্গিতের | যাকে বলে‚ মেল ইনফার্টিলিটি | প্রায় ৩০% ক্ষেত্রে বন্ধ্যা পুরুষের জন্য মা হতে পারে না নারী | গ্যাজেটস-নির্ভর জীবনযাত্রা‚ বিবাহে বিলম্ব‚ স্ট্রেস‚ স্মোকিং‚ বেলাগাম ড্রিঙ্কিং তো কারণ বটেই | তবে অনুর্বর পুরুষের জন্য মূলত দায়ী তার জিনঘটিত এবং হরমোনাল অবস্থা |

চিকিৎসার পরিভাষায় এই সমস্যার পোশাকি নাম ‘Azoospermia’ | দুটি ক্ষেত্রে এই টার্ম প্রযোজ্য | হয়‚ শুক্রাণু উৎপাদন কম | অথবা শুক্রাণুমুক্তির পথে বাধা | TESA-র মাধ্যমে নির্ধারিত হয় সমস্যার ধরণ |

রঙ্গিত-তিস্তার দুজনের বয়স ও পরিস্থিতি বিচার করে IVF-কেই বেছে নেওয়া হল | কারণ অপারেশনের মাধ্যমে রঙ্গিতের শুক্রাণুমুক্তির পথের বাধা দূর করা সম্ভব হলেও চলে যেত আরও খানিকটা সময় | স্টিমুলেশনের সাহায্যে তিস্তার ডিম্বাণু উৎপাদনের হার বাড়ানো হল | রঙ্গিতের TESA তো হয়েইছিল | টেস্টিস থেকে সামান্য পরিমাণ বীর্য নিয়ে পরীক্ষা করা হয় এতে | এর পরের ধাপ ICSI | যেখানে ডিম্বাণুতে ইনজেক্ট করা হয় শুক্রাণু | নিষেকের ফলে জন্ম ভ্রূণের | পরীক্ষাগারে জন্ম নেওয়া দুটি ভ্রূণ স্থান পেল তিস্তার গর্ভে |

এরপর কল্কাকাজের আসনে বসে তিস্তার সাধভক্ষণ ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা | বয়স বেশি বলে একটু বেশি বিশ্রাম গর্ভাবস্থায় | আর‚ স্বাভাবিক প্রসবের পথে না গিয়ে সি-সেকশন | এই দুটোই ছিল বাড়তি সতর্কতা | ন’ মাস পরে কোল আলো করে এল আখ্যান আর কাহিনি | নলজাতক হলেও তারা তিস্তার গর্ভজাত |

এখন তাদের বড় করে তোলা রঙ্গিত আর তিস্তার কাছে নতুন উপন্যাস |

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

কফি হাউসের আড্ডায় গানের চর্চা discussing music over coffee at coffee house

যদি বলো গান

ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স-এ সারা রাত ক্লাসিক্যাল বাজনা বা গান শোনা ছিল শিক্ষিত ও রুচিমানের অভিজ্ঞান। বাড়িতে আনকোরা কেউ এলে দু-চার জন ওস্তাদজির নাম করে ফেলতে পারলে, অন্য পক্ষের চোখে অপার সম্ভ্রম। শিক্ষিত হওয়ার একটা লক্ষণ ছিল ক্লাসিক্যাল সংগীতের সঙ্গে একটা বন্ধুতা পাতানো।