জামাই ষষ্ঠী পালা

(অন্য রঙে চিহ্নিত শব্দগুলির ওপর আঙুল অথবা কারসর নিয়ে গেলে পাওয়া যাবে তার ব্যাখ্যা)

দেবতা বন্দনা

প্রথমে বন্দিলাম আমি কম্পিউটার দেবী
তোমারই ইচ্ছায় আজ হইতেছে সবই
ফন্টেশ্বরী সরস্বতীর অন্য নাম হয়
ফন্টগুলি তার কৃপাতে ঠিক স্থানে যায়
গুগুল বন্দনা করি নকুল দানা দিয়া
মনোবাঞ্ছা পূর্ণ কর, পূর্ণ কর হিয়া
শেষ কালে বন্দনা করি পাঠক মহাশয়
স্ক্রিনেতে দৃষ্টি রেখো হায় সদাশয়

 জামাই প্রশংসা

সত্যি বলছি ভাই, আমার আফসোস নাই
বড় ভালো পেয়েছি জামাই।
হি ইজ ভেরি গুড টাচ উড, টাচ উড
নানা ভাবে করেছি যাচাই।।

দেখতে বেশ হ্যান্ডসাম মাইনে পায় লাম্পসাম
মেয়ের জন্য খুবই তো কেয়ার।
মেয়ে লাইক করে তাই চকোলেট আনা চাই
বেলজিয়ান কোম্পানির, বড়ই রেয়ার।।
দেখেছি পার্টিতে গিয়া আমার মেয়েরে নিয়া
অন্য নারীর সাথে কখনো নাচে না।
পান করে হয়ে হাই, কেউ বলে হাগ চাই,
আমার জামাই কিন্তু কখনো [simple_tooltip content=’

টাচে না। ক্রিয়া। মিশ্র শব্দ।

Touch – এ না।

‘]টাচে[/simple_tooltip] নাই।।
আই টি’র বিগ বস, কোম্পানিতে নাম যশ
এ আমার প্রাপ্তি পরম।
দশমীর দিনে এসে, শাশুড়িকে ভালবেসে
দিয়েছে দামী কাঞ্চিভরম।।

 আই টি ইঞ্জিনিয়ার জামাইটির জন্য শাশুড়ির প্রস্তুতি

সাতটি দুপুর ধরি চ্যানেলচ্যানেল ঢুঁড়ি
ডায়রিতে টুকিনু রেসিপি।
গুজরাটি দহিআলু, মটনের ভিঙ্গালু
কিমা দিয়ে [simple_tooltip content=’

বৌমা নাম্বার ওয়ান’ অনুষ্ঠানে শাহি বাঁধাকপি রন্ধন শেখানো হয়েছিল এইভাবে।

বাঁধাকপি এখন শস্তাই। শস্তা বলে হেলাফেলা করবেন না। পদ্মফুলের পাঁপড়ি খোলার মত করে বাঁধাকপির পাতাগুলো খুলে নিন। তারপর পাতার ভিতর কাজুকিসমিসজাফরানজয়িত্রিগোলমরিচ দিয়ে কষানো মটন কষা ভরে নিন। এবার মাখনে ডিপ ফ্রাই করে নিন। দেখুন কত সহজে শস্তার বাঁধাকপিটা কেমন সুস্বাদু হয়ে গেল।
‘]শাহি বাঁধাকপি[/simple_tooltip]।।
ভেটকির [simple_tooltip content=’ফরফরি হল কালো জিরে ফোড়ন দিয়ে পাতলা সর্ষের ঝোল, যা ফরফর করবে। ঠাকুর বাড়ির রান্না। জানেন না?’]ফরফরি[/simple_tooltip] চিচিঙ্গার চরচড়ি
তেলেগু বেগুন পোলাও।
[simple_tooltip content=’ইহা কবি কল্পনা।’]হন্ডুরাসি[/simple_tooltip] হিঞ্চে ঝোল [simple_tooltip content=’সেলিব্রেটিদের ভোজন বিলাস ছিল একদিন বৌমা নম্বর ওয়ান অনুষ্ঠানে। ওখানে প্রসেনজিত, দেব, কোয়েল, শীর্ষেন্দু, সৌরভ-রা কে কি খেতে ভালোবাসেন –এ সব নিয়ে সমৃদ্ধ এবং মননশীল কথাবার্তার পর অ্যাংকারিকা প্রয়াত সেলিব্রেটিরা কি খাবার কেমন করে খেতে ভালবাসতেন – বলতে গিয়ে বুদ্ধদেব বসু কি ভাবে আম খেতে ভালোবাসতেন বলেছিলেন। তাঁর অনেক ম্যাঙ্গোবোল ছিল। অ্যাংকারিকা অবশ্য তার আগে বলেছিলেন, এই লাইন গুলো কার লেখা বলতে পারলে গিফট হ্যাম্পার।’]বুদ্ধবোসি[/simple_tooltip] ম্যাঙ্গোবোল
চিকেনের মায়ানমারি লাউ।।
লিখিতে রেসিপি কথা, ফুরাইল ডায়রির পাতা
মন তবু রয়ে যায় খালি।
কলেজ ইস্ট্রীটে গিয়া ত্বরা করি আসি নিয়া
আধুনিক রন্ধন প্রণালী।।

জামাই চতুর্থী দিনে নোয়া শাড়ি আনি কিনে
পঞ্চমীতে গেনু পারলার।
মনসুখে ছাঁটি কেশ ফেসিয়াল করি বেশ
হার হানি, খুলিয়া লকার।।
আমার মেয়ের বাবা একেবারে হাবাগোবা
তারে আমি করাই স্মরণ।
আনিও বিয়ার শিশি, আর কাজু কিশমিশি
জামাইরে করিও বরণ।।

একমাত্র কন্যা মোর একটি জামাই,
কহিলাম ষষ্ঠী দিনে করিও কামাই।
শ্রাবণে হয়েছে বিয়ে এটা তো জষ্ঠি
ম্যারেজের পর এটা ফার্স্ট ষষ্ঠি।
ষষ্ঠীর দিনে তুমি এসো এনি হাউ
তোমালাগি রান্ধিমু যে মায়ানমারি লাউ।

সরি, ইমপসিবল কহিল জামাতা
আমি বলি একি তব অলুক্ষুনে কথা।
ছুটি যদি নাহি পাও, প্লিজ দিও ডুব,
নইলে আমি কিন্তু রাগ করব খুব।।
সে কহিল তবে মাতঃ এক বুদ্ধি ধরি,
পূর্ব রাত্রে আমি তবে সব কাজ সারি।।
আমি বলি ভেরি গুড আসিও সকালে
লুচি মিহিদানা দিব কাংসের থালে।।

 আইটি – জামাইয়ের জন্য শাশুড়ির খেদ

ক্রমে সব আয়োজন হয়ে গেল সমাপন
কন্যা এল জেন ড্রাইভিয়া।
আলুদম হল চাখা, রেডি ময়দা লেচি মাখা
দেরাদুন চাল নিলাম মাপিয়া।।
এখানে চলে না সোনার প্রদীপ আনা
সোনার বীণাও নহে আয়ত্তগত
বেতের ডালায় রেশমি রুমাল টানা
অরুন বরণ আম এনো গোটা কত।
চিংড়ি কারি ম্যারিনেট নামাই ক্রকারি সেট
মৎস তে লবনহলুদ মাখাই।
ভেজা মুখ শসা রসে মেখে মেয়ে বসে আছে
বলি, জিনস খুলে পরগো ঢাকাই।
তেলেতে ছেড়েছি হিং, এ সময় ফোন রিং
ফোন করে আমার জামাই।
বলে সরি, করো মাপ ব্যাপক কাজের চাপ
এত কাজ কি করে নামাই।।
সকালের ব্রেকফাস্ট এইমাত্র করলাম জাস্ট
কম্পিউটারে হয়েছিল হ্যাং।
তাছাড়া প্রগ্রেস দেখে আপত্তি কোরিয়া থেকে
করলেন কিম লুং ছ্যাং।।
বেলা মিছে বয়ে যায় জামাই না আসে হায়
ঠাণ্ডা হল এঁচোড়ের চপ।
যতবার করি ফোন সুরেলা ফিমেল টোন
বারবার বলে সুইচ অফ।।

 প্রতিবেশীর ঘরে জামাইষষ্ঠীর বিবরণ

এদিকে পাশের বাড়ি
পাশের বাড়ি মিষ্টির হাড়ি, রিক্সা থেকে নামে,
আর জামাইবাবার ভুঁড়িখানি ভেজে মধুর ঘামে।
জামাই প্রমোটার।
জামাই প্রমোটার সঙ্গে আর একটু রাজনীতি
পণ্ডিতের কন্যার শোনে করেছে পিরীতি
করে রেজিস্টারি
করে রেজিস্টারি স্বামীস্তিরি পণ্ডিত বাড়ি আসে
আর সাহা পাত্র দেখে পণ্ডিত চক্ষু জলে ভাসে।
এসব আগের কথা।
এসব আগের কথা মনের ব্যথা মনে নাহি আর
এখন পণ্ডিতের ঘরের পাশে হণ্ডা সিটি কার।
গাড়ি জামাই দেছে
জামাই গাড়ি দেছে আর করেছে মেঝেটা মার্বেলি,
আর ফর্সা হবার কিরিম পাচ্ছে তিন তিনটি শালী।
জামাই পপুলার
জামাই পপুলারের সঙ্গে আরও শ্বশুরবাড়ি ঘেঁষা।
শালী তিনটির সঙ্গে তাহার মধুর মেলামেশা।।
জামাই মানুষ ভালো
জামাই মানুষ ভালো দিলওয়ালো রসের কারবারি
আবার শালাবাবুকে সঙ্গে নিয়ে করে [simple_tooltip content=’

এই ক্যাটারার কোম্পানির নাম ‘জীবনমুখী ক্যাটারার’।

এদের একটা মেনু কার্ড পড়লেই বুঝবেন এদের উদ্ভাবনী শক্তি।

আজকের নাটক শুভবিবাহ

প্রযোজনা জীবনমুখী ক্যাটারার

নায়ক ফ্রায়েড রাইস

নায়িকা চিকেন মাঞ্চুরিয়ান

সহনায়ক রাধাবল্লভী

খলনায়ক বাটার ফ্রাই

অ্যাকশন – খাসির মাংস কষা

অতিথি শিল্পী মাছের কালিয়া

অন্যান্য চরিত্রে – আলুর দম, শাহি পনির

হাস্যকৌতুকে প্লাস্টিক চাটনি ও পাঁপড়

দ্বৈত কণ্ঠ সঙ্গীতে – রাজভোগ ও প্রাণহরা

সঙ্গীতে আইসক্রিম।

‘]ক্যাটারারি[/simple_tooltip]
সেথায় হুলুস্থুলু
সেথায় হুলুস্থুলু সঙ্গে উলু সিডিতে জ্ঞান বাজে
মহামান্য জামাই রাজে শালীদিগের মাঝে।
প্রেশার কুকার ফোঁস
প্রেশার কুকার ফোঁস জামাই খোস বাটনা বাটার গন্ধ
ট্র্যাডিশনাল ভোজনটাই [simple_tooltip content=’

এই জামাইটি একবার বইমেলায় গিয়েছিলেন।

সেখান থেকে অনেক ভেবে, বেছে একটা বই কিনে ধর্মপত্নীকে উপহার দিয়েছিল। বইটার নাম বাঙালীর সনাতন রন্ধন। ভূমিকায় আছে “ধিক বাঙালী, তুমি তোমার রত্ন সদৃশ খাদ্য সামগ্রী ত্যাগ করিয়া ছাউ, পিচ্ছা, বার্গারাদি কুখাদ্য ভোজনে মাতিয়াছ। তোমরা চচ্চড়ি, ছেচকি, লাফরার মত উপাদেয় পদ ভুলিতে বসিয়াছ। কোথায় গেল কই মাছের গঙ্গাযমুনা, কাতলার হরগৌরী। খাইয়াছ কি ভেটকির নুরজাহানি। লাউ পাতার বরগুছি, চালকুমড়ার বিধবা ভোগ, চালতার চালকুমরী, বেগুনের বিরিঞ্চি, তিলপটলেশ্বরী

‘]জামাইয়ের[/simple_tooltip] পছন্দ। 

প্রমোটার জামাইয়ের শাশুড়ি কী করছেন এখন?

গ্যাস ওভেন জ্বালিয়ে বামা মনের হরিষে
পাটশাক রন্ধন করি ওলাইল বিশেষে।
উমা বড়ি ভাজি রান্ধে ঘৃতেতে আগল
জাতি কলা দিয়া রান্ধে ঝুনা নারিকেল।
কাঁচা আমের অম্বল রান্ধে মহা হৃষ্ট হয়্যা
সম্ভারি ওলাইল তারে সর্ষে পোড়া দিয়া।
তাহাতে সজিনা ডাঁটা পোস্ত তিল বাটা
পুই বেগুনের [simple_tooltip content=’

ঘণ্ট যখন ঘাঁটাঘাটা হয়ে যায় তখন সেটা ঘ্যাট। ছ্যাচড়া হল ঘণ্ট আর ঘ্যাটের মাঝামাঝি।

তেল একটু বেশি থাকে। মাছের তেল, কাঁটা, ফুলকো ইত্যাদিতে ছ্যাঁচড়া আরও স্বাদু হয়। পুঁই ডাঁটা, বেগুন, কুমড়ো ইত্যাদি অনেক তরতরকারি থাকে। যে কোনও ভোজবাড়িতে ছ্যাঁচড়া একটি লোভনীয় পদ। এই বন্দিত স্বাদু পদটি কি ভাবে গালাগলিতে পরিণত হল সমাজতাত্ত্বিকরা ভেবে দেখেছেন? নিরীহ প্রাণী খচ্চরটির এই দশা। এবং বুদ্ধিজীবী শব্দটাও

‘]ছ্যাঁচড়া[/simple_tooltip] সঙ্গে ভেটকির কাঁটা।
চাপড়ের ঘণ্ট রান্ধে ডাইল বাটা দিয়া
মৌরলার ঝাল রান্ধি হরষিত হিয়া
বড় বড় কৈ মৎস রান্ধায় হরিষে

[simple_tooltip content=’ফাইব স্টার ক্যুজিন স্কুল স্পনসরিত বৌদিমনিদের জন্য অনুষ্ঠানে গার্ণিশিং প্রতিযোগিতা। ফেনা ভাত গার্ণিশ করতে হবে। না, কাঁচালংকার ব্যবহার চলবেনা। বলাই হয়েছে। ক্লিশে। কি করে করবেন?’]গার্ণিশিল[/simple_tooltip] ধনিয়াপত্র টমেটোর সসে।
এত পদ খাইয়া সাধুর হরষিত মন
দিবা নিদ্রা শেষে আহা বায়ু নিঃসরণ ।।
হরিবোল হরিবোল বল পাপী মন

এ বাড়িতে মাতা ও কন্যার ক্রন্দন

মাতা – আমার ফ্ল্যাটের নীচের টিনের ঘরে গো
কেমন সুখের ফুল ঝরে গো
ও আমার ম()না, [simple_tooltip content=’মেয়ের নাম রাখা হয়েছিল মোনালিসা। এখনও ওরকম রহস্য রহস্য হাসে। ঠিক হাসেই কিনা ওর বর বুঝতে পারে না। তবে হ্যাঁ, মোনালিসা নাম রাখাতে সুবিধা হয়েছে। মাবাবা মনা বলে ডাকতে পারে, ওর বড় ডাকে লিসা।‘]()না গো[/simple_tooltip]
ওদের মেয়ে মনে হল প্রেগ্ন্যান্ট গো
বছর ঘুরে গেল ইট ক্যান নট গো
ইট ক্যান্নট, ক্যান্নট গো
মেয়ে – কেন এমন হাজব্যান্ড করলাম আইটি
এমন আইটি গো
আমার দুঃখ কেবল জানে আমার নাইটি
আমার নাইটি গো
আমার ঘরে জমল বোতল শিশি
কত শিশি গো
আমার দুঃখে কান্দে ঘরের এ.সি.
মেশিন এ.সি. গো।

 অবশেষে জামাই বাবাজির আগমন

রাত দশটা বেজে গেছে লিপস্টিক মুছে গেছে
কন্যা বলে এসো গো মা খাই ।
এমন ষষ্ঠীর দিনে ঘরে এলো মিষ্টি কিনে
সাধের জামাই।।
পা দুখানি টলোমলো আঁখি দুটি ঢলেঢলো
মুখে কিন্তু গন্ধ কিছু নাই ।
ধপাস সোফায় বসে ল্যাপটপ রাখে পাশে
বলে একটু জল দাও খাই।
এরপরে করে স্নান বিছানার টানটান
বালিশের পাশে ল্যাপটপ
আসিয়া শাশুড়ি মাতা কহে কী যে
করো যাতা
ওঠো, চলো খেতে হবে সব।
জামাই কহিল মাম্মি, ফিল করি বমি বম্মি
এখন ঘুমোব চটপট।
শাশুড়ি কহিল কাঁদি সব রান্না বরবাদি
খাও তবে [simple_tooltip content=’হিং শিং ঝট একটি চ্যানেলিত রান্নার নাম। রমিতার রান্নাঘরে শেখানো হয়েছিল – যখন গ্যাস অম্বল অরুচি হয় তখন হিং ফোড়ন দিয়ে শিং মাছের ঝোল ঝট করে করে নিন। ব্যস। হিং শিং ঝট।’]হিং শিং ঝট[/simple_tooltip] ।।

এত দেখি স্বপ্নময় হাতজোড় করি কয়

শাশুড়ি মাতার পদ নমি
বেচারাকে ছেড়ে দিন
আজ আর নেই সিন
কাল হবে জামাই সপ্তমী ।।

Advertisements

3 COMMENTS

  1. চমৎকার, গবেষণাপূর্ণ লেখা। সমস্ত দিকগুলোকে যত্ন করে ধরা হয়েছে। আধুনিক বিভঙ্গ ও টার্মিনোলজি… প্রাচীন মোড়কে।
    আমি তাঁর এই কলমটির ভক্ত তা’ লেখক জানেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.