দেবাশিস দণ্ড
জন্ম : ২০ আগস্ট ১৯৬৭ পেশা : শিক্ষকতা প্রকাশিত গ্রন্থ : ১ মিনিটের গল্প, ঝাড়ের বাঁশ, বনফুল, ঠোঁটকাটার নোটবুক ইত্যাদি। সম্পাদিত পত্রিকা : বাংলার পাঞ্চ, ফুসমন্তর, মঙ্গলদীপ, মুশকিল আসান ইত্যাদি। প্রকাশিত অ্যালবাম : বইললে হবেক?, শনি ঠাকুর রবি ঠাকুর (স্বকন্ঠে স্বরচিত আঞ্চলিক কবিতা)। মারাংবুরু (লোকগান, মহুল)

শাশুড়িমায়ের ফোনটা পেয়েই চোঙা চৌধুরী শ্রাবণের দেশলাইয়ের মতো নেতিয়ে জ্যাবজ্যাবে হয়ে গেল। যদিও শ্রাবণ বহুত দূর, এটা ভরা জষ্টি মাস। এভাবে পৃথিবীর কোনও শাশুড়ি কোনও জেন্টলম্যান জামাইকে নেমন্তন্ন করতে পারে পাঁচ মিনিট আগেও আন্দাজ করতে পারেনি। এমন শাশুড়ির নাম আবার মাধবীলতা!
   : শোন বাবা চঙু, জামাইষষ্ঠীতে আসতে চাও এস, না বলব না। কিন্তু ট্যারাং ট্যারাং করে রিকশা বাজিয়ে আমার দুয়ারে নেমো না যেন। রিকশা আমার দু চক্ষের বিষ।  

Banglalive

  : অটো? চোঙা এদিক থেকে আমতা আমতা করতে থাকে।
  : অটো তো রিকশাই। এরোপ্লেন নাকি?
  : তাইলে কি হবে মা?
  : গাড়িতে আসবে– গাড়িতে। চারচাকা। বুঝেছ? কি যে ছাতার মাথা চাকরি বাকরি কর। গাড়িতে আসবে ডাঁটে নামবে। নামার আগে বার কয়েক হর্ন দেবে, যাতে চোঙদার উকিলের বউটা থোঁতা মুখটা বের করে তোমাকে একবার দেখে যায়।
   বোঝা গেল কেসটা সিরিয়াস। চোঙা আর চোঙদারের হাই টেনশন। তাই বলে এটা নেমন্তন্নর ভাষা? এই শাশুড়ি আবার রবীন্দ্রসংগীত গায়!
   চোঙা চৌধুরী বেশ চাপে পড়ে গেল। মুখের ওপর বলে দিতেই পারত, স্যরি মা, এবার যাওয়া হবে না। বলেনি। বললে ওটা মুর্খামি হত। শাশুড়ির দান খয়রাতির হাতটা একেবারে সোনাবাঁধানো। হৃদয় তো নয়, দরাজ দরজা। বুটিকের ঢেউখেলানো পাঞ্জাবী তো আছেই, সঙ্গে বাহারি ফাইল, মোবাইল, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, লিকলিকে সোনার চেন— একবার ল্যাপটপও পাওয়া গেছিল। যখন যা বাই ওঠে নামিয়ে দেন। নিয়ে কৃতার্থ কর বাবা।
   ফোনটা পেয়েছিল শামলার মোড়ে। সেখান থেকেই সোজা চলে গেল চিত্ত মান্নার কাউন্টারে। চোঙা আর চিত্ত ক্লাস ফাইভে একই বেঞ্চে বসত। চোঙা মার্জিনে বেরিয়ে গেল। চিত্ত ফেল মেরে ওই বেঞ্চেই বসে থাকল। সেই ছাড়াছাড়ি। একুশ বছর পর আবার তারা ফেস টু ফেস। চিত্তর গাড়ির কারবার। চাদ্দিকে গাড়ি ছুটছে। বোঁ বোঁ।
   চোঙা বলল- জামাইষষ্ঠীর সকালে পুঁটিরামপুর যাব রে। কি রকম রেট বল দিকি।
   চিত্ত বলল- সাত টাকা, দশ টাকা। পঁচিশ টাকাও আছে।
  চোঙা ডগমগ- বলিস কি, সাত টাকায় পুঁটিরামপুর?
   : সাত টাকা পার কিলোমিটার।
   : অ, তাই বল।
    চোঙার ফিউজ উড়ে গেল। তারপর দম নিয়ে বলল- আমাকে থোক হিসেবটা বল দিকি।
   : আঠারশ থেকে বারো হাজার। টোটাল তেতাল্লিশ রকম রেট আছে। যেমন নিবি।
   : একই পুঁটিরাম, রেট তেতাল্লিশ রকম? এতগুলো রকম কেন রেখেছিস রে? মাথা ভন ভন করে না?
   : মাথা ভন ভন? হাহ হাহ হা। কতরকম পাবলিক আছে জানিস? কেউ চিপুস, কেউ দিলবালা। কেউ ম্যাদামারা,  কেউ স্টাইলমারা। সবার আলাদা আলাদা গাড়ি।
   : আলাদা আলাদা?
   : ব্যাপারটা বোঝার আছে। অমনি অমনি তো পয়সা নিই না বাওয়া। এসি না নন-এসি? এইট সিটার না ফোর? পেট্রোল না ডিজেল? ডিজেল না গ্যাস? এসব জানতে হবে। রাস্তায় বিল হাতে উঠতি মস্তানরা  দাঁড়িয়ে আছে। বিল কে দেবে, পার্টি না আমি? এসব বুঝতে হবে। তারপর গাড়ি কটায় বেরোবে? হাইওয়ে না কানাগলি? এরপর আছে গাড়ির ব্রান্ড। ব্রান্ডের পর মডেল।   ইজ্জতবালা না বেজ্জতবালা? এগুলোও জানতে হবে বস, তবে তো দুটো পয়সা। তারপর সিঙ্গল  ‘লেডিস’ থাকলে ফ্যাচাং আছে। বউ না পিএ? পিএ না কাজের মাসি? তখন আধার কার্ড পুট করতে হবে। বউ না হলে হেব্বি রিস্ক। ফিফটি পারসেন্ট এক্সট্রা ধরে রাখতে হয়।
   এরপর চিত্ত ধরা গলায় বলল- তুই কি একাই যাবি?
   : কেউ কাজের মাসি নিয়ে জামাইষষ্ঠী করতে যায়? চোঙা রেগেমেগে প্রায় ফুঁকেই দিল।
   : গুড বয়। কেমন গাড়ি চাই বল।
   : ন্না রে, আমার আর গাড়ি চড়া আর হল না।
   : হল না মানে? তোকে আমি চড়িয়েই ছাড়ব। তুই আমার ক্লাসমেট। ইয়ার্কি? কত দিতে পারবি বল।
   : শ তিনেক টাকার মধ্যে গাড়ি নেই?
   : তিনশ? চিত্ত চিন্তায় পড়ে গেল। বাল্যবন্ধুর মুখের ওপর না বলতে গিয়েও ঠোঁট চেপে আটকে দিল কথাটা। তারপর আরও খানিকক্ষণ ভেবেটেবে বলল- নাই, কিন্তু আছে। ফেরেন্ড বলে কথা।
   চোঙা উৎফুল্ল হয়ে বলল- চারচাকা চাই কিন্তু।
   : আরে ইয়ার চারটে চাকাই থাকবে। নিউ মডেল। টাউনে তিন পিস আছে। তিনটেই আমার। ঠিক আছে?

আরও পড়ুন:  কেতজেল পাখি (পর্ব ৬)

   জামাইষষ্ঠীর সকাল। চোঙা চৌধুরী কড়কড়ে পাঞ্জাবীতে সেন্ট মেরে বসে আছে। একাই যেতে হবে। লতিকা দিন সাতেক আগের থেকেই বাপের বাড়িতে বসে আছে। ওটাই ও বাড়ির নিয়ম। লতিকা যেহেতু একমাত্র সন্তান তাই শাশুড়ি নিজেই নিয়মটা বানিয়ে নিয়েছেন।  কেনাকাটা, টেরিকাটা, রান্নাবাটা– হ্যাপা তো কম নয়। জামাইষষ্ঠীর আগের বিকেলে পার্লারে গিয়ে রূপ খোদাই করে নিয়ে আসেন মাধবীলতা দত্ত।
   কাঁটায় কাঁটায় নটা পঞ্চাশ। নটা পঞ্চাশেই কাঁটায় কাঁটা চাপে। দুয়ারে হর্ন  দিল গাড়ি। গাড়ির ফিগার দেখে চোখ ট্যারা হয়ে গেল চোঙার। হারামজাদা চিত্ত চার দুগুনে আট চাকার পাঞ্জাব লরী পাঠিয়ে দিয়েছে।
   চোঙা নাকের পাটায় সুগন্ধী রুমাল ঘষতে ঘষতে বলল- এটা কি করলেন দাদা, গিটিবোঝাই লরী চেপে শ্বশুরবাড়ি যাব?
   : আরে সোচিয়ে মত চোঙাবাবু, চারচাক্কা ভি হ্যায়। পিছে দেখিয়ে জী।
   ড্রাইভার মিথ্যে বলেনি। সত্যিই একটা লেটেস্ট মডেল কার লরীটার পিছনে। হাঁসের পিছনে যেমন হাঁসের বাচ্চা থাকে। ঝক্কাস গাড়ি। কি জেল্লা, বাপ রে!
   ড্রাইভার বলল- ঝটপট উঠিয়ে পড়েন চোঙাবাবু। দের হো যায়গা।
   : আরে উঠে কি করব, গাড়িতে তো ড্রাইভার নেই। ডাকুন তাকে।
   : ডেরাইভার তো আমি আছি চোঙাবাবু। আপনার গাড়ি তো রশি সে লরী কা সাথ বান্ধা আছে।
   সত্যিই দড়ি দিয়ে বাঁধা। এমন সুন্দরীর গলায় দড়ি? হায় হায়! চোঙা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ড্রাইভারের দিকে।
   ড্রাইভার বলল- তিনশ রুপিয়ে মে অউর ক্যা মিলেগা চোঙাবাবু? ব্রেক দবানা আতা  হ্যায়?
   চোঙা বলল- আমি কিচ্ছু জানি না। শালা চিত্ত।
   : মালিক কো গালি মত দিজিয়ে। আসেন, আপনাকে শিখায়ে দিচ্ছি। জব লরী কা পিছে লালবাত্তি জ্বলেগা আপ তুরন্ত ব্রেক দবা দিজিয়েগা। অ্যায়সে।
   আরও কিছু ডেরাইভারি বিদ্যে চোঙার মাথায় গুঁজে দিয়ে রওনা দিল জয় শম্ভু বলে। চলল চোঙা শ্বশুরবাড়ি।
   লরী ছোটে — চোঙা ছোটে। লরী লালবাতি দেখালেই চোঙার কেরামতি শুরু হয়ে যায়। দারুন রোমাঞ্চ! লোম খাড়া খাড়া। জয় মা শাশুড়ি। জয় শালা চিত্ত। চোঙা যেতে যেতে মনস্থ করল, যেভাবেই হোক একটা গাড়ি কিনে ফেলতেই হবে। শাশুড়িকে ইঙ্গিতটা দিয়ে  রাখতে হবে। শাশুড়ি ছাড়া গতি নেই।
   ঘন্টা দেড়েক রোমাঞ্চের পর লরী দাঁড়াল একটা ধাবার সামনে। ড্রাইভার নেমে খইনি ডলতে ডলতে বলল- উতর যাইয়ে চোঙাবাবু। অভি দো তিন ঘন্টে কা মামলা হ্যায়।
   কিসের মামলা? চোঙা নাক কুঁচকোয়।
   : পহলে বহার তো আইয়ে জী।
   চোঙা নামল। যেন স্বপ্নের জগৎ থেকে নেমে এল বাস্তবের মাটিতে। ধাবার নাম হাউসফুল। জমজমাট ধাবা। ভজন চলছে। ভোজনও চলছে। দুইই হালকা চালে। কারও কোনও তাড়া নেই। আঙিনায় সারি সারি খাটিয়া। খাচ্ছে আর ল্যাদ মারছে। লরী ড্রাইভারও খেয়েদেয়ে  টান টান হয়ে চিতিয়ে গেল। গেল তো গেলই। ব্রেকলেস ঘুম।
   চোঙা বলল- লে হালুয়া।

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ২৭)

   ড্রাইভারের ঘুম ভাঙল ঘন্টা দেড়েক পর। ভাঙল মানেই উঠল না। খাটিয়া মচমচিয়ে পাটিসাপটার মতো গড়াল খানিকক্ষণ। চোঙার পকেটে মোবাইল ট্যাং ট্যাং করে উঠল।
  লতিকার ফোন। এই নিয়ে আটবার। চোঙা ধরল না। অস্থির হয়ে বলে উঠল- দাদা, এবার তাহলে চলা যাক।
   কথাটা ড্রাইভার শুনতে পেল কিনা বোঝা গেল না। হাঙরের মতো হাঁ করে মস্ত একটা হাই তুলল। তারপর খানকতক ডাইনে বাঁয়ে মোচড় দিল। আবার লতিকার ফোন। চোঙা ফোন তুলে বলল- হ্যাঁ হ্যাঁ গাড়ি সারাই হয়ে গেছে। আর একটু।
   লতিকাই বার বার ফোন করছে। শাশুড়ি একবারও না। এটা একদিক থেকে ভালই। সেয়ানা মহিলা। চোঙার চালাকি ধরে ফেলত। মুখের ওপর ন্যাতা ঘষে দিত। দ্বিগুণ অস্থির হয়ে বলল- অনেক তো হল, এবার চলুন। শাশুড়ি দুব্বো নিয়ে বসে আছে।
   ড্রাইভার হাঁ হাঁ করল। করল বটে, নড়ল না। ওর আর কি, ওর তো জামাইষষ্ঠী নয়।
   যাবতীয় কেরদানি সারার পর বলল- চলেন, থোড়া সা নাস্তাপানি করে লি।
   দুপুর গড়িয়েছে বিকেলের ঢালে। চোঙার পেট চোঁ চোঁ। সেই সকালে আলুর তরকারি আর তিনটে রুটি খেয়ে বেরিয়েছে। পুঁটিরামপুর পৌঁছাতে পারলে গলদা চিংড়ি, ইলিশের ভাপা জুটত। শেষ পাতে বংশীধরের দই, মালদার ল্যাংড়া। চেটেপুটে খেয়ে এসি ছেড়ে লম্বা ঘুম। কিচ্ছু হল না। এসব চাপা দুঃখ কি করে বোঝাবে এই বুরবক ড্রাইভারকে। কিছু বলতে গেলেই তিনশ টাকার ভেংচি কেটে ছেড়ে দেবে।
   নাস্তাপানি সারতে একটা পর্দা টানা কেবিনে ঢুকে পড়ল দুজন। গামছা পরা বয় এসে এক প্লেট চিকেন কষা আর একটা বোতল ঠুকে দিয়ে গেল। চোঙা হে হে করে জোর আপত্তি তুলল। ড্রাইভার হুমকি দিল- আপ নেহি পিনে সে হম নেহি যায়গা। চোঙা পড়ল খ্যাচাকলে। এমন খচ্চর ড্রাইভার বাপের জম্মে দেখেনি। চোঙার ভ্যাটকানো মুখ দেখে লোকটার কিঞ্চিৎ মায়া হল। আশ্বাস দিল- পি লিজিয়ে জী। কুছ গড়বড় নেহি হোগা।  শশুরাল পৌঁছনে সে পহলে বিলকুল নরমাল হইয়ে যাবেন।
   কেবিন থেকে যখন বেরিয়ে এল চোঙার চোখে তখন সর্ষেফুল। টেবিল থেকেই ভাটবকা শুরু হয়ে গেছে।
   চোঙা বলল- দেখিয়ে ড্রাইভার ভাই, আমার গাড়িটা গরু হয়ে গেছে।
   : গায়? হা হা হা। ক্যায়সে?
    : আমি বলছি কমপিলিট গরু। অই দেখুন গলায় দড়ি বাঁধা। এবার টানতে টানতে বাড়ি চল। তারপর…
   : অউর ক্যায়া?
   : গাড়ির হর্ন আছে,  গরুর ভি হর্ন আছে। আছে কিনা?
   : গায় কা হরন?
   : শিং কো ইংলিশ মে ক্যা কহতে হ্যায়?
   : হরন?
   : রাইট। ও ড্রাইভার ভাই, এই গরু চড়ে গেলে শাশুড়ি বহুত গুসসা করেগি। মেরা কপাল মে ক্যায়া হ্যায় কউন জানে।
   ড্রাইভার বলল- আপ চিন্তা মত কিজিয়ে চোঙাবাবু। আমি সব বেবোস্তা করিয়ে দিবে। আপনি পাঁচ মিনট পহলে হরন দিবেন, বাস।
   ব্যবস্থা করিয়ে দিবে বলল, কিন্তু কি ব্যবস্থা করিয়ে দিবে সেটা আর খোলসা করে বলল না।
   পুঁটিরামপুর যখন পৌঁছাল সন্ধ্যে তখন হব হব। শ্বশুরবাড়ি পৌঁছানোর পাঁচ মিনিট আগে কষে হর্ন দিল চোঙা। হর্ন শুনে ড্রাইভারের কিছু একটা ব্যবস্থা করিয়ে দেওয়ার কথা। করল না। যেমন যাচ্ছে, যেতেই থাকল। প্রায় দুয়ারের কাছেই পৌঁছে গেছে। বাঁয়ে বাঁকলেই হল। চোঙা খেপে গিয়ে আবার হর্ন দিতে লাগল। আরেকটু হলেই পৌঁছে যেত শশুরাল। কিন্তু তার আগেই ঘ্যাঁচ মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল লরীটা।
   ড্রাইভার নেমে ফটাফট দড়ির বাঁধন খুলে ফেলল।
   চোঙা জড়ানো গলায় বলে উঠল- আমি কিন্তু হেঁটে যেতে পারব না। রিস্ক আছে।
   ড্রাইভার বলল- ঘাবড়াইয়ে মত। যা বলছি ধ্যান সে শুনেন। আপনি আরাম সে গাড়ির ভিত্রে বঠিয়ে থাকেন। আমি লরীটা ঘুরাইয়ে আপনার পিছনে ধাক্কা দিব। অ্যায়সান ধাক্কা দিব আপনার কুছু হোবে না। গাড়ির ভি কুছু হোবে না। আপনি সড়সড়াকে শশুরাল পৌঁছিয়ে যাবেন। অউর হাঁ, গেট তক পৌঁছাইয়ে গেলে ঘ্যাচাক সে ব্রেক দাবায়ে উতর যাবেন, বাস।
    : তারপর?
   : তারপর আপনি অন্দর ঘুষে গেলে গাড়িটা ওয়াপস লিয়ে আসব। উটা আমার উপর ছোড়িয়ে দিন।
   ব্রেক দাবানো চোঙার কাছে এখন জলভাত। বলল- ঠিক হ্যায়।
   : জয় শম্ভু।

আরও পড়ুন:  বাঙালীর বিশ্বকাপ এবং কমলাকান্তের পুনরার্বিভাব

   একতলার ব্যালকনিতে শুকনো মুখে দাঁড়িয়েছিল লতিকা। সপ্তব্যঞ্জন জুড়িয়ে পানসে হয়ে গেল, মানুষটা এখনও এল না। বেতের চেয়ারে খ্যাট মেরে পড়ে আছেন মাধবী। লতিকার মা। তারও নজর রাস্তার দিকে। কড়মড় করছেন। লতিকা কনফার্মড, মা চোঙার মাথা চিবোচ্ছে।
   হঠাৎ একটা মারকাটারি গাড়ি ল্যাতরাতে ল্যাতরাতে চলে গেল। লতিকা স্পষ্ট দেখল গাড়ির ভিতর স্টিয়ারিং হাতে প্রাণেশ্বর চোঙা। গর্বে বুক ফুলে উঠল। লতিকার মাও দেখতে পেলেন। দেখতে পেয়ে তড়াং করে দাঁড়িয়ে পড়লেন। এই বিদ্যুৎগতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি বেতের চেয়ারটা। সে বেচারা পেছনে বিশ্রীভাবে আটকে রইল। মেয়ে তাকাল  মায়ের দিকে, মা তাকালেন মেয়ের দিকে। দু জোড়া চোখ টেরিয়ে ছানার জিলাপি হয়ে গেল।
   চোঙা চৌধুরী শ্বশুরবাড়ি এল গাড়ি চালিয়ে। এল তো চলে গেল কেন? মেয়ে ওড়না লুটিয়ে রাস্তায় নামল। মাও নামলেন চেয়ার ঝেড়ে।
   গাড়িটা গিয়ে দাঁড়াল পরের ল্যাম্পপোস্টের সামনে। তারপর এন্তার হর্ন মারতে লাগল। দশ বারোটা হর্ন মেরে পুরো মহল্লা কাঁপিয়ে নেমে এল চোঙা চৌধুরী।  দত্তবাড়ির জামাই। ততক্ষণে চোঙদার গিন্নী কাপড় তোলার ছলে ছাদে উঠে পড়েছেন। কাপড় ঝুলে রইল তারে। তিনি ঝুলে রইলেন রেলিং ধরে।
   চোঙা নামল কিন্তু এক ইঞ্চিও নড়ল না। লাইটপোস্টের সামনে আরেকটা লাইটপোস্টের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল।
   লতিকা গেল। মাধবী এগোলেন আগে আগে।
   মাধবী গলা নামিয়ে বললেন- এসেছ, বেশ করেছ, এখানে নামলে কোন আক্কেলে?
   : কি করব মাই মাদার-ইন-ল, ব্রেকটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। যখন পাব, তখন তো দাঁড়াব।
   : গাড়ি ঘোরাও।
   : আমি ঘোরাতে পারব না। আপনারা মা বেটিতে ঠেলে ঠেলে নিয়ে যান।
   : শাট আপ! তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ হুঁশ আছে? ঠিক আছে, গাড়ি পড়ে থাক। ঘরে চল।
   : আমি চলতে পারব না। একটা রিশকা ডাকুন।
   : হোয়াট?
   : রিশকা রিশকা। আমি যে রিশকাবালা, দিন কি এমনি যাবে? মাধবী ও মাধবী তুমি কি আমার হবে?
   মাধবীলতা আর মেজাজ ধরে রাখতে পারলেন না। ঠাটিয়ে মারলেন এক চড়। কোন ভাটিখানায় জামাইষষ্ঠী মেরে এখানে এসেছ ফাজলামি করতে?
   চোঙদার গিন্নী মুখে আঁচলচাপা দিয়ে খ্যাক খ্যাক করে হাসতে হাসতে নেমে গেলেন।
   হাসিটা মাধবীলতার কান অব্দি পৌঁছাল কিনা সেটা অবশ্য বোঝা গেল না।

3 COMMENTS

  1. খুব মজার লেখা…দন্ড বাবুকে অভিনন্দন …

এমন আরো নিবন্ধ