রুপোর বাসনে রুই-কালিয়া‚ চিংড়ি-মালাইকারি‚ কই-কোর্মা‚ পাঁঠার মাংস…

জ্যৈষ্ঠ মাসে হিমসাগর আম‚রাশি রাশি লিচু‚যাচ্ছেতাই গরম‚ আর বাঙালি জামাইদের পোয়াবারো | শাশুড়ি ঠাকরুণরা সব কোমর বেঁধে নেমে পড়েন জামাইদের তুষ্ট করতে | জামাইষষ্ঠী বলে কথা ! সে কত কাল আগে থেকে বাঙলার ঘরে ঘরে মায়েরা এই ব্রত পালন করে আসছেন | এ তো কোনও সাধারণ ষষ্ঠী নয়‚ রীতিমত উৎসব | গল্পের রাজার জামাই গুপী গাইন বাঘা বাইন জামাই ষষ্ঠীর দিন কত আদর পেতেন সে গল্প লেখা হয়নি | কিন্তু শোভাবাজারের রাজার জামাইরা সেদিন যে দুর্দান্ত খাতির পেতেন‚ তার গল্প শুনলে আপনাদেরও সেই পুরনো দিনগুলোয় ফিরে যেতে ইচ্ছে করবে | লিখতে বসেই সেই খাবারের সুবাস কোন যুগ পেরিয়ে আমার নাকে ধাক্কা দিয়ে মন উচাটন করে দিচ্ছে |

তাহলে শুরু থেকে শুরু করা যাক | সেদিন সকাল থেকেই ওই বাড়িতে ভিয়েন বসে যেত | বাইরে থেকে বাউন (ব্রাহ্মণ)রাঁধুনিরা সেদিন বাড়ির তিন তিনটি রান্নাঘর দখল নিত | কারণ বাড়ির নিয়মিত সদস্য ছাড়াও দশ বারোজন মেয়ে তাদের ছেলেমেয়ে ও সর্বোপরি বাড়ির জামাইরা‚ অত লোককে রেঁধে খাওয়ানো সোজা কথা নয় | মূল ভোজ হত রাত্তিরে | তাও দিনের বেলা থেকেই তার প্রস্তুতি শুরু হত | কারণ বাড়ির মেয়েরা সকাল সকালই পুত্রকন্যা সমেত বাপের বাড়ি চলে আসতেন | মেয়ে বউরা ষষ্ঠী পালন করতেন বলে তাদের জন্য আবার রকমারি নিরামিষ রান্নারও ব্যবস্থা থাকত |

সন্ধেবেলায় সমবয়সী শ্যালকেরা সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরে সদর দরজায় তাঁদের জামাইবাবুদের জন্য অপেক্ষা করতেন | তাঁরা ঢুকলে তাঁদের হাতে ছোট ছোট জুঁই ফুলের মালা দেওয়া হত | সেটা তাঁদের মধ্যে কেউ হাতে জড়াতেন কেউ রাখতেন পকেটে | জামাইষষ্ঠীতে যে তত্ব পাঠানো হত তাতে জামাইদের জন্য বাজারের সেরা ধুতি চাদর কুঁচিয়ে ট্রে-তে সাজিয়ে পাঠানো হত | বেশিরভাগ জামাইরা ওই দিন সেই তত্ত্বে পাঠানো পোশাক পরেই  আসতেন | কোনও মেয়ের বিয়ের পর প্রথম জামাইষষ্ঠী হলে সেই মেয়ের শ্বশুরবাড়ির সকলেরই সেদিন নিমন্ত্রণ থাকত রাজবাড়িতে | জামাইয়ের দল আর শ্যালকদের মধ্যে সেদিন আড্ডা জমে উঠত |

সুবিশাল হল ঘরে মাটিতে আসন পেতে বাড়ির জামাই ও ছেলেদের বসার জায়গা করা হত | এই আসনগুলি প্রত্যেকটিই ছিল শাশুড়িদের নিজে হাতে বোনা | খাওয়ার জন্য শুধুমাত্র রুপোর বাসন ব্যবহার হত | প্রথমেই আসত ভাজার প্লেট | তাতে থাকত আলুভাজা‚কপি ভাজা‚পটল ভাজা‚ গোটা বেগুন দু আধখানা করে ভাজা | আর তার সঙ্গে ছোট সাইজের সমান মাপের লুচি | এছাড়া পাতে পোলাও এবং ভাত দুরকমই দেওয়া হত | আমিষের মধ্যে মাছের পুর ভরা পটলের দোরমা‚তোপসে মাছের ফ্রাই‚রুই মাছের কালিয়া‚চিংড়ি মাছের মালাইকারি‚কই মাছের কোর্মা‚পাঁঠার মাংস ছিল বাঁধা | বাড়িতে তৈরি পান্তুয়া‚দরবেশ‚বোঁদে‚সন্দেশ ও পায়েস শোভা পেত মিষ্টির থালায় | আর ফলের থালাতে হিমসাগর আম‚লিচু থাকবেই থাকবে | সবশেষে আসত পান আর মশলার ট্রে | বাড়ির মেয়েদের তৈরি নানারকম ঝাল মিষ্টি মশলার বাহার থাকত তাতে | পরিবেশন করত বাড়ির মেয়ে বউরা আর তত্বাবধানে থাকতেন শাশুড়িরা | বাড়ির সমস্ত কর্তারাও খাবার সময় উপস্থিত থেকে জামাই আদরে কোনও ত্রুটি হচ্ছে কিনা নজর রাখতেন |

শাশুড়িরা একটু আড়াল থেকেই জামাইদের খেয়াল রাখতেন | সকলের খাওয়া মিটলে সবশেষে মেয়ে বউদের নিয়ে খেতে বসতেন | সেদিন এই বাড়ির বউদের বাপের বাড়ি যাওয়ার উপায় ছিল না | ননদ-ননদাইদের আপ্যায়নের জন্য তাঁরা সেদিন তাঁদের প্রাপ্য ছুটি পেত না | বিখ্যাত বাড়ির বউ হওয়ার এটাই ছিল বিড়ম্বনা | তবে সকলে মিলে হৈ হৈ করে খাওয়া এবং খাওয়ানো তার আনন্দ ও বড় কম ছিল না |

আজকের দিনে এই জোড়া পরিবারের কারবার প্রায় লোপ পেয়েছে | ঘরে ঘরে হয়তো একটির বেশি দুটি জামাই নেই | জামাই থাকলে আবার তার হয়ত ষষ্ঠীর দিন খেতে আসার সময় নেই | অনেক ক্ষেত্রে এখন সময় সুযোগ বুঝে হোটেলে খাইয়েই জামাইষষ্ঠী সারা হয়ে যায় |

তবে বিগত দিনেই হোক‚ বা এখনকার কালেই হোক‚ জামাইষষ্ঠীর উৎসবকে কেন্দ্র করে মেয়ের স্বামীকে তার শ্বশুরবাড়ির কাছে আপন করে নেওয়ার এই রেওয়াজটি ভারী মধুর | ছেলের বউ সহজেই শশুর শাশুড়িকে বাবা মা বলে মেনে নিয়ে তাঁদের সঙ্গে থাকে | সেই পরিবারের একজন হয়ে ওঠে | কিন্তু জামাইয়ের সঙ্গে তার শ্বশুর শাশুড়ির কোথায় যেন একটা দূরত্ব থেকে যায় | সেদিক থেকে দেখতে গেলে এই উৎসবের মাধ্যমে জামাই ধীরে ধীরে বাড়ির ছেলে হয়ে ওঠে | স্ত্রীর বাবা-মা ও তার পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও সহজ হয় | তাই বলি‚ বন্ধুগণ‚ জামাইষষ্ঠী যুগ যুগ জিও | জামাইষষ্ঠী জিন্দাবাদ |

(পুনর্মুদ্রিত)

Advertisements

2 COMMENTS

  1. Very interesting lekha. Hi Debipriya, if you want, I can translate this for you in English. Let me know.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.