সব ছেড়ে সাঁওতাল গ্রামের অন্দরে স্বপ্ন বুনছেন নাটক-পাগল মেক্সিকান সাহেব

২০০৭ সালে প্রথমবার এদেশে এসেছিলেন এক সাহেব। নাম জেন ফ্রেডরিক শেভালিয়ার। তিনি একটি ‘ফিল্ম   এসে’ তুলছিলেন সেই সময়। সেই সূত্রেই কলকাতায় আসা তাঁর। আর তখনই তিনি লক্ষ করেন কলকাতার রাস্তা জুড়ে বয়ে চলেছে অনর্গল জীবনের স্রোত। সেই যে নেশা লেগে গেল আর বেরোতে পারলেন না তিনি। তৈরি করে ফেললেন ত্রিমুখী প্ল্যাটফর্ম। এতদিন তিনি চাইতেন সমসাময়িক থিয়েটারকে গ্রামে নিয়ে যেতে। তবে সেটা মেক্সিকোতেই। এবার তিনি ওই একই কাজ করা মনস্থ করলেন। তবে সেটা এখানে। সাঁওতাল অধ্যুষিত বড়তালপাড়া। কলকাতা থেকে দূরত্ব ২৪০ কিলোমিটার।

পঁয়তাল্লিশ বছরের ফ্রেডরিক মেক্সিকোর বাসিন্দা। ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটি অফ মেক্সিকোয় দর্শন ও থিয়েটার শিখেছেন। কলকাতা থেকে দেশে ফিরে তিনি তাঁর সেখানকার সব কিছু বিক্রি করে দিয়ে চলে আসেন ভারতে! এখানকার গ্রামের মানুষদের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে। না, কোনও সমাজসেবামূলক কাজ নয়। এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সে বিষয়টা স্পষ্ট করে দিয়েছে‌ন তিনি। জানিয়ে দিয়েছেন, ‘‘আমরা কাউকেই সাহায্য করতে পারব না। কেবল উচ্চমানের শিল্প তৈরি করাটাই একমাত্র কাজ।’’ কেবল অজ গাঁয়ের মানুষদের সঙ্গে মিশে শিল্প তৈরি করাই নয়, ফ্রেডরিকের লক্ষ্য, শহরের মানুষকে গ্রামে নিয়ে আসা।

দেখতে দেখতে দশ বছর পেরিয়ে গিয়েছে সেই প্রচেষ্টার। ২০০৯ সাল থেকেই অন্য সংগঠনের সঙ্গে মিলেমিশে তাঁরা আয়োজন করেন তাঁদের বার্ষিক ইভেন্ট— নাইট অফ থিয়েটার। ‘থিয়েটারের রাত’-এ অংশ নিতে স্পেন, ফ্রান্স, মেক্সিকো, জাপান থেকে কোরিওগ্রাফার, বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি আসেন কৃষিজীবী মানুষরাও। তৈরি হয় থিয়েটার, সাউন্ড ও ভিডিও ইনস্ট‌লেশনের সমন্বয়ে এক অভিনব শিল্প।

ঠিক কেমন শিল্পকর্ম তৈরি করেন তাঁরা? কখনও দেখা যায় সাঁওতাল তরুণ-তরুণীরা একটি টেবিলে চপস্টিক দিয়ে নুডলস খাচ্ছে। সেটা সরাসরি দেখা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে এক মহিলার ডাল-ভাত খাওয়ার ভিডিও ও একজন মানুষ কিছু কথা বলছেন ফরাসিতে— সেগুলি প্রোজেকশনে দেখানো হতে থাকে।

ত্রিমুখী প্রথম জনসমক্ষে শো করে ‘মনসুন নাইট ড্রিম’ নামে। তিন সপ্তাহ মহড়া দিয়ে তবে সেটা অনুষ্ঠিত হয়। জনা পনেরো সাঁওতাল পুরুষ ও নারী ও সুরকাররা তাঁদের দৈনন্দিন কাজকেই শিল্পে রূপান্তরিত করেছিলেন। সাঁওতাল নাচের পাশাপাশি কেউ বা দর্শকদের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময়ের মাধ্যমেই তৈরি করেছিলেন শিল্পরস।

আসলে এই ধরনের পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে জায়গাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রেডরিক জানাচ্ছেন, কখনও জলের গভীরেও তাঁরা নেমে গিয়েছেন‌ শিল্পের তাগিদে! মানুষের দেহ হোক বা পশুদের— ফ্রেডরিক সেগুলিকে কাজে লাগান শিল্প নির্মাণে।

স্বাভাবিক ভাবেই  প্রশ্ন জাগে, কী করে সাধারণ গ্রামবাসীদের সঙ্গে নিয়ে এমন কাজ করতে পারেন ফ্রেডরিক? তিনি জানাচ্ছেন, প্রথমেই তিনি তাঁদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁরা থিয়েটার তৈরি করবেন। কিন্তু চেনাজানা নাটকের ফর্মকে ভেঙে।

গ্রামবাসীরা সাড়া দিয়েছিল নাটক-পাগল সাহেবের আবেদনে। ক্রমেই বাড়ছে তাঁদের অংশগ্রহণ। একুশ বছরের ধনঞ্জয় হাঁসদা যেমন। কখনও তিনি লাইটম্যান। কখনও বা নাচ করছেন। আবার কখনও তিনিই ভিডিওগ্রাফার। কিংবা ফাল্গুনী হাঁসদা। তিন সন্তানের জননী তিনি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রান্না করেন। ফ্রেডরিকের আবেদনে সাড়া দিয়ে তিনিও এখন থিয়েটারে মজেছেন। সাহেবের সঙ্গে কাজ করার জন্য বহু তরুণ-তরুণীদের তাঁদের বাবাই পাঠিয়ে দিচ্ছেন।

ইংরেজি, বাংলা, ফরাসি ও সাঁওতালি— চার ভাষা তো বটেই কখনও বা হিন্দি ও স্প্যানিশও জুড়ে যায় তাঁদের কাজের সঙ্গে। কখনও সাব টাইটেল ব্যবহার করা হয়। কখনও আবার ব্যবহার করা হয়ও না।

ত্রিমুখীর অন্যতম এক সদস্য শুক্লা জানাচ্ছেন, ‘‘এই মানুষেরা তাঁদের স্বাভাবিক ও সহজ উপস্থিতিকে পারফরম্যান্সের মধ্যে নিয়ে আসেন।’’

সুদূর মেক্সিকো থেকে একটা স্বপ্ন বয়ে এনেছেন ফ্রেডরিক। আর তার স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে সারা পৃথিবীর মানুষ। গ্রামের সুন্দর প্রকৃতির সরল আশ্রয়ে তারা গড়ে তুলছে সম্মিলিত শিল্পের অনুপম দৃষ্টান্ত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here