‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ : খটকা এবং অসঙ্গতিতে ভরা গল্পের কতটা সত্যি ঋতুপর্ণের লেখা!

Jestho Putro Review

প্রথমে একটু ফ্ল্যাশ ব্যাকে যাই চলুন। সেবার নতুন একটা গল্পের আইডিয়া পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু কী ভেবে নিজে লিখলেন না সেটা। প্লটটা দিয়ে দিলেন সাহিত্যিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়কে। আর প্রভাতকুমার লিখেও ফেললেন গল্পটা। এরপর প্রভাতকুমারের লেখা সেই গল্প থেকে সত্যজিৎ রায় আবার তৈরি করলেন ছবিও!

এটুকু পড়ে যাঁরা এখনও অবধি ছবির নাম বুঝতে পারেন নি, তাঁরা একটু চালিয়ে দেখুন সত্যজিতের ‘দেবী’ (১৯৬০)। শুরুতেই দেখবেন লেখকের জবানিতে স্ক্রিনে লিখে দেওয়া হচ্ছে যে, ‘দেবী গল্পটির আখ্যানভাগ শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় আমায় দান করিয়াছিলেন’।

‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ দেখতে গিয়ে মনে পড়ে গেল সেই ‘দেবী’ ছবিটার কথা। কারণ প্রায় ওরকম একটা লাইন যে এই ছবিতেও আছে। ছবির মূল ভাবনা যে ঋতুপর্ণের, আর এই কাজে তাঁর ভাবনাসঙ্গী ছিলেন প্রতিম ডি গুপ্ত, এমনই একটা লাইন লিখে বলা আছে অন স্ক্রিন। পরে আবার ক্রেডিট টাইটেলে আলাদা করে ‘মূল ভাবনা’ ক্রেডিট দেওয়া হয়েছে ঋতুপর্ণের নামে।

প্রত্যেক পোস্টারে যত্ন করে স্পষ্ট হরফে লেখা আছে ঋতুপর্ণের নাম। এরকম ভক্তি দেখানো যে খুব ভাল, তাতে আমার সন্দেহ নেই কোন। শুধু এটা মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল যে, ছবিটা মার্কেট করার চাল হিসেবে নামী পরিচালকের নামটা এরা সবাই এখানে ইউজ করছে না তো?

‘মূল ভাবনা’ মানে আসলে কী? গল্পের কতটা ঋতুপর্ণের নিজের ভাবা ছিল? বাকি কতটা কৌশিকের নিজের ক্রেডিটে ভাবা? ছবিটা দেখতে দেখতে স্পষ্ট এটা মনে হচ্ছিল, তেলে আর জলে খুব চেষ্টাতেও মিশ খাচ্ছে না যেন!

ঋতুপর্ণের ভাবনা থেকে ধীরেসুস্থে, ভেবেচিন্তে লিখলে হতো না স্ক্রিপ্ট? এত তাড়াহুড়ো করে ‘ধর-তক্তা-কর-সিনেমা’ স্টাইল নিয়ে এই ছবিটা না করলে কী ক্ষতি হতো?

এভাবে এগুলো লিখছি কেন, জানেন? ছবির কোর কনসেপ্ট ভাল। কিন্তু ফাইনালি অন স্ক্রিন যে ভার্সনটা দেখতে পেলাম, সেটা দেখতে গিয়ে কোথাও কোথাও খটকা লাগছে খুব! একেকবার তো ধাঁধা লাগছিল মনে! আর খটকা, ধাঁধা, অসঙ্গতির উত্তর খুঁজে না পাওয়া গেলে অস্বস্তি হবে না লোকের, বলুন?

আগে ছবির গল্পটা দু’লাইনে লিখি। বাবা ইন্দ্রনাথের মৃত্যুর কথা শোনার পর প্রায় একযুগ বাদে দেশের বাড়ি ফিরে আসছে তাঁর সুপারস্টার ফিল্ম অভিনেতা ছেলে। ইন্দ্রজিৎ (প্রসেনজিৎ) নাম। সেই বাড়িতে তখন ভাই পার্থ (ঋত্বিক), বোন ইলা (সুদীপ্তা) আর অন্য পরিজন আছেন। সুপারস্টার দাদার সঙ্গে বাড়ির সেই খুব সাধারণ মানুষগুলোর সম্পর্কের কেমিস্ট্রিটা কেমন হয়, সেটা নিয়েই ছবি।

এবার সবচেয়ে বড় খটকার কেস বলি। ইন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় নামে যে মানুষটার চলে যাওয়ার খবর শুনিয়ে এই ছবিটার শুরু, সিনেমায় তাঁকে দেখান হয়েছে আদর্শবাদী কমিউনিস্ট বলে। কার্যত এক অজ পাড়া গাঁ’র একটা স্কুলের হেডমাস্টার তিনি।

এবার কাণ্ড দেখুন, এই মানুষের ‘বাড়ি’ বলে যা দেখলাম, সেটা তো বেশ পেল্লাই এক ভিটে! এঁর ছেলে পার্থকে নিজের মুখে এটাও আপনি বলতে শুনবেন যে, এত বড় বাড়ির সব ঘরগুলো এককালে নাকি গমগম করতো লোকে, এখন কেউ আর থাকে না বলে বাড়িটার ঘরে ঘরে শুধু পোকামাকড়ের বাস! এত বিশাল বাড়ি ওই পার্থের মতো মামুলি এক নাট্যকর্মী লোকের পক্ষে মেনটেন করা সম্ভব নয় বলে বাড়িটা প্রোমোটারের হাতে তুলে দিয়ে তার বদলে ভাগের টাকা আর ফ্ল্যাট নাকি বুঝে নিতে চায় সে!

ওসব কথা বুঝলাম, কিন্তু একটা কথা বুঝিয়ে বলুন সৎ কমিউনিস্ট আদর্শবান হেড স্যরের পক্ষে কী করে সম্ভব হল অত বছর আগে এমন একটা দালানকোঠা তৈরি করে ফেলার? স্কুল টিচারের মাইনে কত ছিল? তাঁর জীবৎকাল ১৯৩৬ থেকে ২০১৮ – ছবিতে সেটা লিখে জানিয়ে দেওয়া আছে। মানে গত শতকের শেষ দিকে তাঁর অবসর-দিন শুরু! এই যে টাইম জোনের কথা হচ্ছে, সেই জোনটায় ওই চাকরিতে সৎ মনিষ্যির এরকম বাড়ি হয়?

একটা সিকোয়েন্স আছে এরকম যে হঠাৎ করে হারিয়ে গেছে মেজো বোন ইলা, আর তাঁকে খুঁজতে সবাই পৌঁছে গেছে বাড়ির পেছন দিকে। মাইরি বলছি, সে অংশটা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল হপ্তা কয়েক আগেই দেখা ‘বসু পরিবার’ ছবির সেই পুরনো জমিদার বাড়ির পেছন কোণে নতুন বৌয়ের হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়ার সেই সিনটা আবার দেখছি যেন! এখন যে বাড়ি দেখলে এমন জমিদারবাড়ির ফিল এসে যায়, সেটা সৎ কমিউনিস্টের বাড়ি যে কী করে হয়, ছবির শেষ অবধি সেই কথাটা বুঝতে পারিনি আমি!

বাড়িটা আরও পুরনো কোনও পিতৃপুরুষের বানানো কিনা, সেটা নিয়ে ছবিতে কোন সূত্র পাইনি খুঁজে। আমার বুঝতে কিছু ভুল হয়ে থাকলে সেটা আমায় ধরিয়ে দেবেন প্লিজ।

জানেন তো, এই কারণেই মনে হচ্ছিল, ‘মূল ভাবনা’ যেমনই হোক না, স্ক্রিপ্টটা বোধহয় তাড়াহুড়ো করে লেখা। আসলে যা দিন পড়েছে, ছবিটা কবে রিলিজ হবে, সেই ডেটটাও তো আগে থেকে লক করে নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে দখল জমাতে হয়! আর সেটার থেকেই বোধহয় এমন হুড়োতাড়াগুলো আসে!

না হলে আপনি বলুন, ছবির মধ্যে একটা সিনে আপনি দেখবেন গালে হওয়া অল্প দাড়িতে (ইংরেজিতে যেটাকে বলে ‘স্টাব্‌ল’) মেক আপ বোলাতে বোলাতে হিরো ইন্দ্রজিৎ তার ভাইকে বলছে, ‘দাঁড়া, বয়েসটা ঢেকেনি। মানুষের কাছে সুপারস্টার হচ্ছে অরণ্যদেবের মতো। যুগে যুগে যার বয়েস বাড়ে না।’

এখন এটা শুনে আপনি থতমত খেয়ে যেতে পারেন দুই ভাবে। এক, অরণ্যদেব নিয়ে যে ইনফোটা শোনানো হল, সেটা হানড্রেড পারসেন্ট ভুল। অরণ্যদেবই বোধহয় একমাত্র সুপারহিরো, যার বয়েস বাড়ে, এমনকি যে লোকটা মারা অবধি যায়! আর তারপর তার সন্ততি এসে সেই দায়িত্ব তুলে নিয়ে নতুন অরণ্যদেব হয়ে ওঠে।

আর দুই হল, সুপারস্টারকে বয়স লুকিয়ে চলতে হবে বলেই যদি মনে করে ইন্দ্রজিৎ, তাহলে ছবির ফার্স্ট সিনেই থুত্থুড়ে বুড়ো এক বাউল ফকিরের রোলে সে অভিনয় করে কেন?

বুঝতে পারছেন তো, যে স্ক্রিপ্ট আর ডায়ালগগুলো একটানে লিখে যাওয়ার পর বোধহয় আর রিভাইস করার সময় ছিল না কোন। চেক করে এটা দেখে ওঠার সময় ছিল না যে, কোথায় কী কী অসঙ্গতি থেকেই যাচ্ছে এতে।

সবচেয়ে রগড় হল এইটে যে, খুচরো খুচরো এমন সব ভুলে ভর্তি ছবিতে আবার কৌশিক হেভি ঠুকে দিয়েছেন বছরখানেক আগে প্রকাশিত বিশেষ একখানা বইকে। ব্যক্তি প্রসেনজিতের আত্মজীবনী সেটা। সেই বইয়ের নামটা পালটে ‘অন্য নায়ক’ করে দিয়ে বাকি কভারটা হুবহু এখানে দেখান হয়েছে স্ক্রিনে। ঠেস মেরে ছবিতে সেই বইটাকে বলা হয়েছে, ‘সিনেমায় হিরোর মুখের মতো – মেক আপ করা আত্মজীবনী’। ডায়ালগে এটা শোনান হয়েছে, বইমেলা টার্গেট করে ছাপতে গিয়েই বইতে নাকি অগুন্তি ছাপার ভুল আছে। হ্যাঁ, সত্যি হয়তো সেরকমই ঘটেছিল। কিন্তু ইয়ে, মানে বলছি কি, চালুনির কি ছুঁচের বিচার করতে বসাটা মানায়?

ছবির প্রোমোশনে বারবার প্রসেনজিৎকে এটা বলতে শুনেছি, প্রসেনজিতের মা যখন চলে গেলেন, ঋতুপর্ণ নিজে তখন প্রসেনজিতের সঙ্গে নাকি টানা দিন দশেক ছিলেন। আর সেখান থেকেই নাকি প্রথম এই ভাবনা আসে ছবির! এরপর প্রসেনজিৎকে ঋতু এই ছবিটা অফার করলে প্রসেনজিৎ তা’ করতে চাননি, কারণ ঠিক তখনই ‘অটোগ্রাফ’-এ (২০১০) সুপারস্টারের রোল করছেন বলে। পরপর দুটো ছবিতে সুপারস্টার হতে চাননি নাকি তিনি।

এই অবধি শোনার পর মনের মধ্যে টাইমলাইনটা ঘেঁটে যাচ্ছিল পুরো। প্রসেনজিতের মা চলে গেছেন হিসেব মতো প্রায় বছর চব্বিশ হল। এই তথ্য ওঁর আত্মজীবনী ‘বুম্বা শট রেডি’ থেকে নেওয়া (পৃষ্ঠা ২৫২)। আর ‘অটোগ্রাফ’ তৈরি হয়েছে তো মোটে এই বছর নয় আগে। তাহলে প্রসেনজিতের মায়ের মৃত্যু দেখে গল্প লিখে সেই ছবি প্রসেনজিৎকে ঋতুপর্ণ অফার করেন কবে?

বাড়িতে হঠাৎ কোন সেলিব্রিটির মৃত্যু হলে সেই বাড়ির মানুষজনের ওপর যে কোন টানাপোড়েনটা যায়, সেটার অসাধারণ একটা ছবি ঋতুপর্ণের ‘আবহমান’-এই (২০১০) আছে। কাণ্ড দেখুন, একই বছরে – ‘অটোগ্রাফ’-এর মাস দশেক আগেই কিন্তু রিলিজ করে সেটা! আর সেই ছবির পাশে বসিয়ে দেখতে গেলে হালের এই ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’কে ভোঁতা লাগছে যে খুব! এরকম সোজাসাপটা লেখার জন্যে আমায় ক্ষমা করবেন, স্যর।  

মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল যে করে হোক গল্পটাতে ড্রামা এলিমেন্ট বাড়িয়ে তুলতে চেষ্টা করছেন কৌশিক। পরিভাষায় যেটাকে স্টোরির ‘হাই পয়েন্ট’ বলা হয়। এবার সেটা করার জন্যে এক দফায় এটা দেখানো হল, বাড়ির মেজ মেয়ে অপ্রকৃতিস্থ ইলাকে বাড়িতে দেখতে না পেয়ে তাকে খুঁজতে নেমে পড়েছে হিরোর সঙ্গে আসা পুলিশগুলোও! সঙ্গে হেভি টেনশনের মিউজিক! সবে এখানে এসে পৌছনো বেচারা এই পুলিশগুলো ইলাকে দেখে চিনবে কী করে, তার অবশ্য কোন ক্লু এখানে নেই! আর এরকম একটা সম্পর্ক-জালের ছবিতে এভাবে জোর করে তৈরি করা মেকি টেনশন দেখানোর কোন দরকার ছিল কিনা, সেটাও বোধহয় ভাবা দরকার ছিল!

এবার আসুন স্কুলে ইন্দ্রনাথের স্মরণসভার সিনে। অনুষ্ঠানের আয়োজকরা বলেই গেছিলেন, ইন্দ্রজিৎ এসে পৌঁছলে চুপিচুপি পেছনের দরজা দিয়ে তাকে ভেতরে ঢুকিয়ে নেওয়া হবে। যাতে লোকে হৈ-চৈ না করে। এবার কৌশিক এটা দেখাচ্ছেন যে, এমন কথা শোনার পরেও সেই অনুষ্ঠানে ইন্দ্রজিৎ এসে পৌঁছচ্ছে সামনের গেটে, রীতিমত হুটার বাজিয়ে, বাউন্সার আর পুলিশ বাহিনী নিয়ে! ছবির এই অংশটা লিখছিলেন যখন, পেছন গেট দিয়ে নিঃশব্দে আসার পয়েন্ট কি তখন খেয়াল ছিল না, কৌশিক? নাকি এই সুপারস্টারকে আপনি দেখাতে চাইছিলেন এরকমই ইনসেনসিটিভ, অশ্লীল প্রচার-হ্যাংলা বলে!

আপনি বলুন, বাড়িতে বছরের পর বছর ধরে তালাবন্ধ ঘরে বন্দি থাকেন যে, একদিন বের হওয়ার সুযোগ পেয়েই সে অমনি অটো ধরে স্কুলের সেই স্মরণসভায় পৌঁছে যেতে পারে? ঋতুপর্ণ নিজে লেখার সুযোগ পেলে কাঁচা এই সিনগুলো লিখতেন কিনা, সন্দেহ আছে সেটা।

ছবির সেকেন্ড হাফে ওই সিনটায় আসুন। ইন্দ্রজিতের সঙ্গে দেখা করতে সাত সকালে ওর গেস্ট হাউসে পৌঁছে গেছে সুদেষ্ণা (গার্গী রায়চৌধুরী)। হাতে একটা বইয়ের প্যাকেট। এদিকে সুপারস্টারের পাবলিক রিলেশনস ম্যানেজার মেয়েটি তো আটকে দিয়েছে তাকে! সাড়ে দশটার আগে দেখা করার জন্যে কেউ অ্যালাউড নয় বলে।

এবার এই সিনে আপনি দেখবেন, সুদেষ্ণা এটা বলছে যে, ওর হাতের প্যাকেটে থাকা বইটা নাকি এক্ষুনি ইন্দ্রজিতের কাছে পৌঁছতে হবে, তাই ওর এখানে আসা। এটা এমন একটা বই, যার আর দ্বিতীয় কপি গোটা পৃথিবীতে নেই।

এটা শোনার পর তো সিটে টানটান হয়ে বসলাম আমি, কী জানি এটা রহস্যময় কোন বই এলো, বলে!

ওমা, পরে দেখি, বইটা হল, ভুলে ভরা সেই আত্মজীবনীর নিরীহ একটা কপি! বাজারে অ্যাভেলেবল অন্য কপিগুলোর সঙ্গে এর ফারাক শুধু এইটে যে, এর লাইনে লাইনে ছাপার ভুলগুলো পেন চালিয়ে মার্ক করে দিয়েছে সুদেষ্ণা। কিন্ত এই বইটা সেই সকালবেলায় ইন্দ্রজিতের হাতে গিয়ে না পৌঁছলে যে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত, গোটা সিনেমায় যথারীতি তার আর কারণ জানানো নেই!

কোথাও কোথাও বোঝা যাচ্ছিল যে এই পার্টগুলো ঋতুপর্ণের লেখা। যেমন ধরুন, ইন্দ্রজিতের মুখের ওপর পার্থের বলা ওই ডায়ালগ, ‘পাপীরা দীর্ঘায়ু হয়। জোচ্চোরের সম্পত্তি বাড়তে থাকে। আর কিছু সাধারণ অভিনেতা সুপারস্টার হয়ে যায়।’ আহা, কথা তো নয়, সপাট একটা চড়! আবার এর ঠিক উলটো ব্যাপারটাও আছে! বাবা ইন্দ্রনাথের কথা বলতে গিয়ে কাগতাড়ুয়া নিয়ে হাস্যকর যে কবিতাটা শোনানো হল, প্লটের মধ্যে ওই অংশটা, বোঝা যাচ্ছিল, কোন নভিশের অ্যাড করে দেওয়া পিস।

বলেছি না, একটা যদি তেল হয় তো, অন্যটা তবে জল! তেলে আর জলে মিশ খায় কখনও, পাগল? একেকটা ডায়ালগ শুনে মুগ্ধ হয়ে যাবেন! প্রথম প্রেমের কথা ওঠায় সুদেষ্ণা কী শীলিত ভাবে শব্দ সাজিয়ে বলছে দেখবেন, ‘এই বয়সে (প্রেমের কথা উঠলে) লজ্জা লাগে না পারুল, বিব্রত লাগে’। আবার এই সিনেমাতেই দেখতে পাবেন নিজের পি.আর.এম. ‘প্রিয়া মিত্রা’র নাম নিয়ে খাজা মশকরা করে সুপারস্টার ইন্দ্র এটা বলছে যে, ‘আজ প্রিয়া না থাকলে কাল মিনার বিজলী দর্পণা কেউ না কেউ জুটে যাবে’!

প্রসেনজিৎকে নিয়ে কৌশিক গাঙ্গুলীর এটা তিন নম্বর ছবি। এর আগের দুটো তো ভয়ানক ছবি ছিল! একটাতে চোখে অদ্ভুত একটা মেক আপ ঠুসে পার্ট করেছিলেন তিনি। নামে ছিলেন উকিল, কিন্তু ছবিতে তাঁকে দেখান হয়েছিল গোয়েন্দাগিরির প্রক্সি দিয়ে যেতে! আর পরের ছবিতে তিনি হলেন গায়ক, যিনি নাকি গানের পরে গান শুনিয়ে হিংস্র সব টেররিস্টের মনও পালটে দেন!

এখন একটা কথা সত্যি যে, এই ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ আর যাই হোক সেই ‘দৃষ্টিকোণ’ (২০১৮) বা ‘কিশোরকুমার জুনিয়র’-এর (২০১৮) মতো তালজ্ঞানহীন আনাড়ি সিনেমা নয়।

গল্পের একটা রেডি বাঁধুনি আগের থেকে ছিল বলেই মোটের ওপর দেখতে ছবিটা মন্দ লাগে না খুব। আর অভিনয়ে তো জাস্ট কাঁপিয়ে দিয়েছেন সুদীপ্তা আর ঋত্বিক। শুধু ওঁদের দুজনকে দেখার জন্যেই ছবিটাকে দেখা যায়। সিনেমায় যে সুপারস্টার কাজ করেছেন, বলে বলে তাঁকে দশ গোল দিয়ে ছেড়েছেন তাঁরা! আর হ্যাঁ, আলাদা করে বলা উচিৎ প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা। তাঁর আবহটাও ছবির মেজাজ সময়-সময় পালটে দিচ্ছিল পুরো।

শুরুতে যে ছবির কথা লিখেছিলাম, শেষে আবার সেটার কাছেই ফিরি। ‘দেবী’। ওই ছবির ডিরেক্টরের ফিল্মোগ্রাফি খেয়াল করুন, দেখবেন গড়ে বছরে একটা করে ছবি! তা’ এরকম সময় দিয়ে যত্ন নিয়ে ছবি যদি বানানো হয়, আর সঙ্গে যদি ডিরেক্টরের ট্যালেন্ট থাকে অসীম, সে ছবি তো দাদা তখন ওই লেভেলেরই হবে!

আর এখন? স্রেফ রুটি-রুজি জোগাড় করতে বছরে তিনটে-চারটে ছবি করছে সো কল্‌ড নামী ডিরেক্টরের দল! সারভাইভ্যাল করতে হবে তো, নাকি! একটা ছবি হতে না হতেই শর্টকাট মেথড মেরে পরের ছবি শুরু! এই অবস্থায় এর চেয়ে ভাল ছবি কি আর হয়!

দোষ যদি কারুর থাকে, সে তো সিস্টেমটার দোষ। আপাতত তাই করবেন কী, বলুন? আসুন, মুখ বুঁজে এটা সহ্য করতে থাকি! পোস্টারে ঋতুপর্ণের নামটা দেখে গদগদ হয়ে যাই, আর মাঝারিমানের সিনেমা দেখে পরম খুশিতে হাততালি দিই জোরে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here